১৬ বিলিয়ন মাইল দূরের ভয়েজারকে সচল রাখার চেষ্টা নাসার

প্রতি বছর এটি প্রায় ৩০ কোটি মাইল পথ অতিক্রম করে। ফলে মাত্র কয়েক বছর বাড়তি সময় পেলেও সূর্যের প্রভাববলয়ের বাইরের অঞ্চল সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব

পৃথিবী থেকে কয়েক হাজার কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করেও নাসার ভয়েজার মহাকাশযান দুটির কার্যক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি ভয়েজার–২-এর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন প্রকৌশলীরা। এতে মহাকাশযানটির তিনটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় সচল রাখা সম্ভব হবে। এবার একই পরিবর্তন ভয়েজার–১-এ প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।

১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা ভয়েজার–১ ও ভয়েজার–২ প্লুটোর কক্ষপথ অনেক আগেই অতিক্রম করে বর্তমানে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে অবস্থান করছে। পৃথিবী থেকে ভয়েজার–১-এর দূরত্ব ১ হাজার ৫০০ কোটি মাইল বা ২ হাজার ৫০০ কোটি কিলোমিটারের বেশি। এত দূরে একটি নির্দেশ পাঠাতেই প্রায় ২৩ ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে কোনো পরিবর্তনের ফল জানতে প্রকৌশলীদের প্রায় দুই দিন অপেক্ষা করতে হয়।

ভয়েজার মহাকাশযান দুটি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পায়। এ ব্যবস্থায় প্লুটোনিয়াম–২৩৮-এর ক্ষয় থেকে তৈরি তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। তবে প্রতি বছর মহাকাশযান দুটির উৎপাদনক্ষমতা প্রায় চার ওয়াট করে কমছে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মহাকাশে থাকায় এগুলোর বিদ্যুৎ এখন অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নাসা আগে থেকেই একে একে অপ্রয়োজনীয় হিটার, যন্ত্র ও অন্যান্য ব্যবস্থা বন্ধ করে আসছে। প্রতিটি ভয়েজারে উৎক্ষেপণের সময় ১০টি করে বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ছিল। গ্রহ পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর বন্ধ করে দেয়া হয়। বিদ্যুতের সংকট বাড়ায় ২০২৪ সালের পর থেকে উভয় মহাকাশযানের আরো দুটি করে বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বন্ধ করতে হয়েছে।

তবে শুধু যন্ত্র বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। ভয়েজারের জ্বালানি নলসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো কার্যকর রাখতে নির্দিষ্ট মাত্রায় তাপ প্রয়োজন। কোনো যন্ত্র বন্ধ করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলেও তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে মহাকাশযান অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

এ সমস্যা মোকাবেলায় নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির প্রকৌশলীরা ‘বিগ ব্যাং’ নামে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর আওতায় ভয়েজার–২-এর বিদ্যুৎচালিত কয়েকটি ব্যবস্থা একসঙ্গে বন্ধ করে সেগুলোর জায়গায় কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহাকাশযানটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ সচল রাখার মতো তাপমাত্রাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

নাসা জানিয়েছে, এ পরিবর্তন না করা হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ভয়েজার–২-এর আরো একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বন্ধ করতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় মহাকাশযানটির তিনটি সচল বৈজ্ঞানিক যন্ত্র অন্তত আরো এক বছর চালানো যাবে। তবে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ‘১০ ওয়াট সাশ্রয়’ ও ‘দুই থেকে তিন বছর আয়ু বৃদ্ধি’র হিসাব নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

ভয়েজার–২ বর্তমানে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যের চৌম্বকক্ষেত্র, প্লাজমা তরঙ্গ ও মহাজাগতিক রশ্মিসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রতি বছর এটি প্রায় ৩০ কোটি মাইল পথ অতিক্রম করে। ফলে মাত্র কয়েক বছর বাড়তি সময় পেলেও সূর্যের প্রভাববলয়ের বাইরের অঞ্চল সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব।

ভয়েজার–২-এ পরিবর্তন সফল হওয়ায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে একই ব্যবস্থা ভয়েজার–১-এ প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে নাসা। পরিবর্তনটি সফল হলে মানবজাতির সবচেয়ে দূরবর্তী মহাকাশযানটির বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানও আরো কিছুদিন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।

আরও