প্রাকৃতিক সম্পদ ও অফুরন্ত সম্ভাবনায় ঘেরা দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলার উন্নয়ন নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলার চারটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীরা কী ভাবছেন এবং তাদের কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে—তা জানার বিষয়ে ভোলাবাসীর মধ্যে প্রবল আগ্রহ ও প্রত্যাশা রয়েছে। কারণ ভোলার টেকসই উন্নয়ন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ। এ বাস্তবতা বিবেচনায় কোস্ট ফাউন্ডেশন ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদ সদস্য প্রার্থী, রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভোলায় কোস্ট ফাউন্ডেশনের কোস্ট সেন্টারে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোলার উন্নয়নে আমাদের ভাবনা’ শীর্ষক একটি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে বক্তারা চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত অঙ্গীকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্বাগত বক্তব্যে কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এম রেজাউল করিম ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্থায়ী সেতু নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্যাসভিত্তিক শিল্প স্থাপন, ইলিশসম্পদ সংরক্ষণ, নদীভাঙন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বন সংরক্ষণে ভোলার চারটি সংসদীয় এলাকা ভোলা-১, ভোলা-২, ভোলা-৩ ও ভোলা-৪ থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল আকন্দ
মো. হাফিজ ইব্রাহিম
সংসদ সদস্য প্রার্থী
বিএনপি, ভোলা-২
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত ভোলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ করছি। কিছু সুনির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে আমরা প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছি এবং আমরা একটি প্রকৃত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রত্যাশা করি। ভোলার উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমার ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো কর্মসংস্থানের অভাব। ভোলা প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোনো বড় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে ভোলার গ্যাস অন্যত্র সরবরাহ করা হলেও স্থানীয় মানুষ রান্নার গ্যাস পর্যন্ত পায় না। এ চরম বৈষম্য দূর করাই হবে আমার প্রথম অগ্রাধিকার। পাশাপাশি মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল ছাড়া কোনো সুস্থ উন্নয়ন সম্ভব নয়। এরই মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আমার নির্বাচনী এলাকা (ভোলা-২) পরিদর্শন করেছেন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানা ও হাসপাতাল স্থাপনে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ‘চাইনিজ ইপিজেড’ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হলে ভোলার হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রসারে ভোলার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে কাজে লাগিয়ে আমাদের যুবসমাজকে দক্ষ করে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। আমার বিগত সংসদীয় মেয়াদে ২০০১-২০০৬) আমি ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলাম। চর ও নদীর জমি প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেয়াই আমাদের নীতি। আগামীতে আমার দল নির্বাচিত হলে গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়ন, ইপিজেড, কর্মসংস্থান এবং ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণসহ ভোলার সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
নুরুল ইসলাম নয়ন
সংসদ সদস্য প্রার্থী
বিএনপি, ভোলা-৪
এলাকার সন্তান হিসেবে আমি এ জনপদের আলো-বাতাসে বড় হয়েছি। এবারের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যখন আমি ঢালচর, চর নিজাম, মনপুরা কিংবা কলাতলীর মতো চরাঞ্চলগুলোতে গিয়েছি, তখন আমি উন্নয়নের এক করুণ চিত্র দেখেছি। কোথাও হাঁটার রাস্তা নেই, কোথাও বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল নেই; নেই পর্যাপ্ত স্কুল বা মসজিদ। জোয়ারের পানিতে যখন রাস্তাঘাট তলিয়ে যায় কিংবা মসজিদের ভেতর পানি ঢুকে পড়ে, তখন এ মানুষের অসহায়ত্ব আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তাদের মলিন মুখের দিকে তাকালে চরম দারিদ্র্যের যে প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সাম্প্রতিক গণসংযোগে আমি দেখেছি, চরম অবহেলার শিকার এ মানুষগুলো অনেক সময় নিজেদের অধিকারের কথাটুকুও বলতে জানে না। ভোলার এ ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের কষ্টই আমার ভেতর দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। আমি উপলব্ধি করেছি মানুষ কেবল ত্রাণ বা খাবার নয়, আগে জীবনের নিরাপত্তা চায়। নদীভাঙন কবলিত মানুষ চায় টেকসই বেড়িবাঁধ, আর অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদ চায় বিদ্যুতের আলো। প্রতিটি এলাকার সমস্যা ভিন্ন হলেও মানুষের দীর্ঘশ্বাসের ভাষা একই। আমি কেবল ভোট চাওয়ার জন্য আপনাদের সামনে আসিনি। আমি এসেছি আপনাদের জীবনের বাস্তবতা বুঝে সেই দায়িত্ব কাঁধে নিতে। নির্বাচিত হতে পারলে এ প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষগুলোর বেঁচে থাকার লড়াই এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই হবে আমার রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। ইনশা আল্লাহ, আপনাদের দোয়া ও সমর্থনে আমি ভোলার এ বৈষম্য দূর করতে কাজ করে যাব।
মো. নজরুল ইসলাম
সংসদ সদস্য প্রার্থী
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ভোলা-১
ভোলার উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়গুলো আমাদের সবার নখদর্পণে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নদীভাঙন এবং মূল ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। এসব সংকট নিরসনে আমরা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। বিশেষ করে, ভোলায় একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের বিষয়ে আজ আমরা সব রাজনৈতিক দল একমত। ইনশা আল্লাহ, জনস্বার্থের এ বড় প্রকল্প আগামীতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তা বাস্তবায়িত হবেই। ভোলার অর্থনীতিকে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিতে ভোলা-বরিশাল সেতু আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। এর পাশাপাশি যাত্রী চলাচল ও বাণিজ্যিক প্রসারে একটি আধুনিক নৌবন্দর স্থাপন এখন সময়ের দাবি। আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে ভোলার অর্থনৈতিক চেহারা আমূল বদলে যাবে। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম কারিগর জেলেদের অধিকারের বিষয়ে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মাস ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা গেলে বছরে অতিরিক্ত ১৫ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব। তবে এ নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত সহায়তা যেন প্রকৃত মানুষের হাতে পৌঁছায় এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যেন তাদের বঞ্চিত করতে না পারে, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোস্ট ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠনগুলোর গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। পরিশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের অঙ্গীকার—আমরা একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখব। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই যেন স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। ভোলার রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক মানসিকতার কারণে এখন পর্যন্ত এখানকার পরিবেশ সুন্দর রয়েছে, যা আমরা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।
মো. মোসলেহ উদ্দীন
সংসদ সদস্য প্রার্থী
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ভোলা-৩
আমি বিশ্বাস করি, সমাজের কাউকে পেছনে ফেলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নির্বাচিত হলে আমি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করতে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করব। পাশাপাশি ভোলা-লক্ষ্মীপুর-চট্টগ্রাম রুটের ফেরিঘাটে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করে তা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াতের কেন্দ্রে পরিণত করতে কাজ করব।
মুহা. নিজামুল হক
সংসদ সদস্য প্রার্থী
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, ভোলা-৩
একটি সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভোলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমি নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং সব প্রার্থীর মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাই। কারণ মানসিকতা ইতিবাচক না হলে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। তবে এটা বাস্তব সত্য যে প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায়ই তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে যান। আমি আপনাদের এ আস্থার সংকটের অবসান ঘটাতে চাই। নির্বাচিত হলে আমার অন্যতম প্রধান কাজ হবে অবহেলিত চরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করা।
এম রেজাউল করিম চৌধুরী
নির্বাহী পরিচালক
কোস্ট ফাউন্ডেশন
মৎস্যসম্পদের বিপ্লব ভোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারে পরিচিতি পাওয়ার দাবি রাখে। দেশের মোট ইলিশের প্রায় ৩০ শতাংশই সরবরাহ হয় এ দ্বীপ জেলা থেকে। জাটকা নিধন বন্ধ করে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ইলিশের বাজারমূল্য কয়েক মাসেই ৫০০ থেকে ২-৩ হাজার টাকায় পৌঁছা সম্ভব, যা জেলে ও ব্যবসায়ী—উভয়কেই অভাবনীয় সমৃদ্ধি দেবে। একইভাবে মেঘনার মোহনা ও তেঁতুলিয়া নদী হচ্ছে পাঙাশের ‘প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র’। বর্তমানে ২৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া এক কেজি পাঙাশের পোনা মাছকে বড় হওয়ার সুযোগ দিলে তা প্রতিটি হাজার হাজার টাকায় বিক্রয়যোগ্য মাছে রূপান্তর করা সম্ভব। সঠিক সংরক্ষণের মাধ্যমেই জেলেদের প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ নিহিত। পাশাপাশি রিজার্ভ ফরেস্ট ও আগামীর বাসযোগ্য ভোলার জন্য সংরক্ষিত বনাঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভোলার অদূরবর্তী চরাঞ্চলে প্রায় এক লাখ একর ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চল’ রয়েছে। এ বন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং ভোলার মাটিকে স্থিতিশীল রাখার প্রধান রক্ষাকবচ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ বনায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভোলার নিচে আরেকটি বাংলাদেশের মতো বিশাল ভূখণ্ড গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আগামী ২০-৩০ বছর এই বন রক্ষা করা না গেলে ভূমি পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং জনবসতি হুমকির মুখে পড়বে। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ—রিজার্ভ ফরেস্ট রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিন এবং জনগণকে এর গুরুত্ব বুঝিয়ে বন নিধন রোধ করুন। উল্লেখ্য, ভোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দিতে এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি বিমানবন্দর নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যকেই গতিশীল করবে না, বরং সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। এভাবে কোস্ট ফাউন্ডেশন ধারাবাহিকভাবেই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে ভোলার এ সুবিশাল সম্ভাবনাগুলো জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে চায়। আর রাজনৈতিক নেতাদের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। কারণ তাদের সঠিক পরিকল্পনা এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোলা হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।
মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী
বোর্ড সদস্য
কোস্ট ফাউন্ডেশন
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য কেবল নির্বাচিত হওয়া জরুরি নয়, সদিচ্ছা থাকলেই যেকোনো অবস্থান থেকে অবদান রাখা সম্ভব। আমি বর্তমান প্রার্থীদের প্রতি অনুরোধ জানাব—আপনারা কেবল ভোটারদের মন ভোলাতে নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য ও যৌক্তিক প্রতিশ্রুতি দিন। বিশেষ করে ভোলায় যে ২৫০ শয্যা হাসপাতালের ঘোষণা রয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হোন। রাষ্ট্রের পরিবর্তন এলেও আজও সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বৈষম্য দূর হয়নি; আর এর প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ভোলার তরুণদের জন্য আজ আরো বেশ কিছু কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সময়ের দাবি। তবে আরেকটি রূঢ় বাস্তবতা হলো নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষের জমি যখন জেগে ওঠে, তখন একদল স্বার্থান্বেষী মানুষ তা দখলের চেষ্টা করে। আমি আশা করি, প্রকৃত মালিক যেন তার ভিটেমাটি ফিরে পায়, সেটি নিশ্চিত করা হবে। এ জনপদে ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ড. আমিরুল ইসলাম বাসেত
আহ্বায়ক
জেলা প্রেস ক্লাব, ভোলা
আমি ভোলার চরাঞ্চলে গিয়ে যে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত ১৭ বছরের দীর্ঘ বাস্তবতায় দেখা গেছে, চরে জমির কোনো স্পষ্ট মালিকানা নেই; বরং যার শক্তি আছে, সেই চর দখল করে রেখেছে। এমনকি এখনো অনেক রাজনৈতিক নেতার দৃষ্টি থাকে চর দখলের দিকে। আমি মনে করি, এ দখলদারত্বের মানসিকতা ত্যাগ করতে না পারলে চরাঞ্চলের ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার কখনই সম্ভব নয়। ভূমি হবে সাধারণ মানুষের, দখলদারদের নয়। চরাঞ্চল সফরের সময় আমি আরো একটি বিষয় গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি—সেখানের অনেক শিশু-কিশোর আজ শিশুশ্রম এবং মাদকের নীল ছোবলে আক্রান্ত। আমি বর্তমান ও আগামীর রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাব—এ ধ্রুব সত্যগুলো উপলব্ধি করুন এবং ভোলাবাসীর সামনে তা সাহসের সঙ্গে তুলে ধরুন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এখনই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব ভবিষ্যতে আপনাদের হাতেই আসবে, তাই ভোলার মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। আগামী দিনে যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাবেন, তাদের প্রতি আমার সবিনয় অনুরোধ—ভোলার মানুষের এ প্রাণের দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরুন। বিশেষ করে ভোলা-বরিশাল সেতু ও মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়ন এবং চরাঞ্চলকে দখলমুক্ত করে সাধারণ ভূমিহীন মানুষের মধ্যে বণ্টন করা এখন সময়ের দাবি। ভোলার প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এ জেলা দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হবে।
মো. মিজানুর রহমান
সংসদ সদস্য প্রার্থী
ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এনপিপি, ভোলা-১
আমি চাই ভোট ও চাকরি সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হোক, প্রতিটি মানুষ—গরিব হোক বা ধনী—সবাই সমান সুযোগ পাবে এ আশা করছি। আমার কাছে বড় বড় কথার চেয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচিত হলে আমার মূল লক্ষ্য হবে—দেশের জন্য একটি প্রকৃত, টেকসই ও ন্যায়সংগত পরিবর্তন আনা। তারুণ্যের অদম্য মেধা আর ভোলার প্রাকৃতিক সম্পদ—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আমরা গড়ে তুলব এক আধুনিক ও সমৃদ্ধ ভোলা।
মো. ওবায়দুর রহমান
সংসদ সদস্য প্রার্থী
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ভোলা-১
ভোলার সব সমস্যা আজ আমাদের সামনে চিহ্নিত; এখন সময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা সমাধানের। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, নির্বাচিত হলে ভোলার তেল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় আমি সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকব। নদীভাঙনের অভিশাপ থেকে ভোলাবাসীকে মুক্তি দিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি টাকা যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করব। জনগণের রায়ে যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের সবার প্রতি আমার আহ্বান—আসুন, কাদা ছোড়াছুড়ি ভুলে আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করি।
অ্যাড. মো. জাহাঙ্গীর আলম রিটু
সংসদ সদস্য প্রার্থী
জাতীয় পার্টি, ভোলা-২
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো প্রশাসনের শতভাগ নিরপেক্ষতা এবং প্রতিটি প্রার্থীর সহনশীল ও গণতান্ত্রিক আচরণ। নির্বাচিত হলে ভোলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্পের বৈপ্লবিক বিকাশ এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা হবে আমার অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি আমাদের প্রিয় তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে আমি কারিগরি শিক্ষার প্রসারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করব।
মো. আকবর হোসাইন
সংসদ সদস্য প্রার্থী
জাতীয় পার্টি, ভোলা-১
ভোলা-১ আসনের আপামর জনসাধারণের প্রাণের দাবি—গ্যাস সংযোগ, উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং মানসম্মত শিক্ষা। এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ মেহনতি ও দরিদ্র; তাই নির্বাচিত হলে আমার প্রধান লক্ষ্য হবে দারিদ্র্য বিমোচন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে, যা আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরো বেগবান করবে। বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে স্থানীয়ভাবে মামলাজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে। একই সঙ্গে অবহেলিত নারীদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা এবং মাদকের করাল গ্রাস থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে আমি বদ্ধপরিকর। ভোলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য আমরা একটি বিশেষ ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তুলব।
মো. আবু তৈয়ব
সংসদ সদস্য প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদ
ভোলা-৩
আমার অন্যতম লক্ষ্য হলো তরুণদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে একটি ‘তারুণ্যনির্ভর সমৃদ্ধ ভোলা’ গড়ে তোলা। আধুনিক শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা আজ কেবল সময়ের প্রয়োজন নয়, বরং প্রতিটি ভোলাবাসীর প্রাণের দাবি। ভোলার অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে আমরা নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলব। এর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং বেকারত্বের অভিশাপ দূর হবে।
মোস্তফা কালাল আকন্দ
পরিচালক (প্রশাসন)
কোস্ট ফাউন্ডেশন
কোস্ট ফাউন্ডেশনের জন্ম ভোলার চরফ্যাশন থেকে। শিকড়ের সেই গভীর টান থেকেই আমাদের প্রত্যাশা—ভোলার মানুষের উন্নয়ন ভাবনাগুলো জাতীয় নির্বাচনের সম্মানিত প্রার্থীদের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যাক এবং এটি অন্য অঞ্চলের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠুক। ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি হলো মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একটি কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ। বিচ্ছিন্নতার এ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বলিষ্ঠ ভূমিকা কামনা করি। পাশাপাশি ভোলার অমূল্য ইলিশসম্পদ রক্ষা এবং উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ১৯৯৮ সাল থেকে খাসজমি ও ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে কোস্ট ফাউন্ডেশন যে ধারাবাহিক লড়াই চালিয়ে আসছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক মানুষের ভূমি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে বিচ্ছিন্নতার অভিশাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় স্বাস্থ্য খাতে। জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকা, বরিশাল বা চট্টগ্রামে নেয়ার পথে মাঝ রাস্তায় অনেক রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ ঝুঁকি এড়াতে ভোলায় অন্তত এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন এখন সময়ের দাবি। আমরা চাই, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতাহারে ভোলার প্রধান সংকটগুলো—যেমন ভূমিদস্যুতা, জলদস্যুতা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ রক্ষা ও বনায়ন—বিশেষ অগ্রাধিকার পাক। আজকের এ ‘ভোলার উন্নয়ন ভাবনা’ আলোচনার মাধ্যমে প্রার্থী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও এনজিওগুলোর মধ্যে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হলো তা সমন্বিতভাবে একটি সমৃদ্ধ ভোলা গড়তে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
মো. ইকবাল হোসেন
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা
ভোলা
ভোলার চরগুলো মাছের ‘প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র’, যেখানে বর্তমানে এক ভয়াবহ বাস্তবতা বিরাজ করছে। আমরা চরাঞ্চলে প্রচুর পাঙাশের পোনা নষ্ট হতে দেখছি অথচ এ পোনা রক্ষা করা গেলে কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বাঁচানো সম্ভব। বর্তমানে ভোলার প্রায় ৯০ শতাংশ মাছই ধরা হচ্ছে চায়না জালসহ বিভিন্ন অবৈধ জালে, যা আমাদের মৎস্যসম্পদকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। মৎস্য খায়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। ঘাটে ঘাটে দাদন ব্যবসায়ীরা সামান্য টাকা ও জাল দিয়ে জেলেদের বছরের পর বছর জিম্মি করে রাখছে। আজ আমরা যাদের ‘জেলে’ বলছি, তাদের বড় অংশই মূলত দাদনদারদের অধীনে কাজ করা মৌসুমি শ্রমিক। সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় যখন আমরা বরফকল বন্ধ করতে যাই, তখন প্রভাবশালী মহলের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবই আজ এ বিশাল মৎস্যসম্পদকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আমরা ইলিশ না পাওয়ার অভিযোগ করি, কিন্তু জাটকা ধরে ও পোনা ধ্বংস করে ইলিশের প্রাচুর্য আশা করা যায় না। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হলো—দরিদ্র জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফ কার্ড ও চাল রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা দখল করে আত্মসাৎ করছে। আগামী দিনে যারা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হবেন, তাদের প্রতি আমার জোরালো আহ্বান—মৎস্যসম্পদ ও জেলেদের অধিকার রক্ষায় আপনারা কার্যকর ভূমিকা নিন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতার মাধ্যমে দাদনদার ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে এ সেক্টরকে মুক্ত করুন।
সুফল রায়
সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা
বন বিভাগ, ভোলা
ভোলা জেলা উপকূলীয় বন বিভাগের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে, যার মধ্যে ৯৪ হাজার একরেরও বেশি এলাকা সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত। এ বিপুল বনাঞ্চল, আমাদের বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং ইকোপার্ক কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ভোলার প্রধান রক্ষাকবচ। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন—অকাল বৃষ্টি ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের যে চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে ছুড়ে দিচ্ছে, তা মোকাবেলায় এ বনাঞ্চল রক্ষা করা অপরিহার্য। সুন্দরবনের মতো ভোলার এ ম্যানগ্রোভ বাগানগুলোও সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের গতি কমিয়ে জনপদকে সুরক্ষা দিচ্ছে। বন বিভাগ নিয়মিতভাবে বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢালচরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে আমরা শত শত হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগান করেছি। তবে এ নতুন বাগানগুলো টিকিয়ে রাখা বর্তমানে আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা রাজনৈতিক নেতারা, স্থানীয় প্রশাসন এবং কোস্ট ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করি।