ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার
প্রধান অতিথি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, স্বাস্থ্যবিষয়ক
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধে বহু বছর ধরে টিকাদান কর্মসূচি চালু রয়েছে। প্রতি চার বছর পরপর ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা দেয়া হয়। পাশাপাশি রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতেও নয় মাস বয়স থেকে শিশুদের হামের টিকা দেয়া হয়। তবে ২০২০-২১ সালের কভিড পরিস্থিতির কারণে এসব ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন হয়নি বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। এরপর ২০২৩-২৪ সালের ক্যাম্পেইনও বাস্তবায়ন হয়নি। সে সময় স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। অপারেশনাল প্ল্যানের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সেই অর্থ সময়মতো না আসায় প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন কেনা সম্ভব হয়নি। এর ফলে এক বছরের নিচে এবং এক থেকে দুই বছরের মধ্যে থাকা বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। পাশাপাশি মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না থাকলে শিশুও পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায় না। দেশে প্রথম হামজনিত মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় চলতি বছরের মার্চে। হামের কারণে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের অনেকেই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছিল। অপুষ্টি ও সংক্রমণ একে অপরকে আরো জটিল করে তোলে। তাই এ দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মার্চের মাঝামাঝি প্রথম মৃত্যু শনাক্ত হওয়ার পর ৬ এপ্রিলের মধ্যেই সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহ, জনবল মোতায়েন এবং দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। প্রথমে ৩০টি উপজেলায় কর্মসূচি শুরু হয়। পরে চারটি বড় শহরে এবং পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য এলাকায় তা সম্প্রসারণ করা হয়। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। মাত্র চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে প্রায় শতভাগ কাভারেজের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন
নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
দক্ষ ও সুস্থ জনশক্তি ছাড়া কোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই স্বাস্থ্য খাতকে আলাদা করে দেখি, অথচ স্বাস্থ্যই অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকেও (হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট) দেশের অবস্থান ইতিবাচক ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি একসময় বিশ্বজুড়ে সফলতার উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ছন্দপতন দেখা যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। স্বাস্থ্য খাতে ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন পরিস্থিতি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ধারাবাহিকভাবে জাতীয় জিডিপির ১ শতাংশেরও কম এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনেক সময় পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না। ফলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সেবার মানোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো, হাসপাতাল কিংবা আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অবশ্যই প্রয়োজন। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত স্বাস্থ্য খাতের ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এ; অর্থাৎ দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাব তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কেস স্টাডি হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ শিক্ষা আমাদের অনেক বড় মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হচ্ছে।
মঈনুল ইসলাম
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) এএনএম
আমাদের হাতে বর্তমানে প্রায় ২২ মাস বা দুই বছরের হামের টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের মজুদ ও নিশ্চয়তা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ মাসের টিকা সরাসরি মজুদ আছে এবং আরো পাঁচ মাসের টিকা পাইপলাইনে অর্থাৎ আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এছাড়া আগামী এক বছরের জন্য আমরা বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) করছি। ফলে সব মিলিয়ে প্রায় দুই বছরের জন্য আমাদের ভ্যাকসিন সুরক্ষিত আছে। এছাড়া টিকাদানের ক্ষেত্রে টার্গেট এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যে ঘাটতি রয়েছে, তা আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। অনেক সময় শহর অঞ্চলের বস্তি এলাকা বা দুর্গম অঞ্চলে আমরা সহজে পৌঁছাতে পারি না। এ কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ‘মপ-আপ’ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি। এর মাধ্যমে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে যাতে একটি শিশুও টিকার আওতার বাইরে না থাকে। গত ২৬ জুলাই থেকে এ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা থার্ড পার্টির মাধ্যমে এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে ‘ক্রস-চেকিং’ বা তদারকির ব্যবস্থা করেছি। সিভিল সার্জনদের কাছ থেকে যে তথ্যগুলো আসছে সেগুলো যথাযথ কিনা, তা আমাদের মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং ইউনিসেফের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন উপজেলা বা এলাকায় সরাসরি যাচাই করছেন। এছাড়া বর্তমানে গবেষণায় বিশেষ জোর দেয়ার সময় এসেছে। কেন হামের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে বা কেন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার পরও রোগী পাওয়া যাচ্ছে—এ কারণগুলো গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করে আমাদের পলিসি গ্রহণ করতে হবে। এবার স্বাস্থ্য খাতের বাজেট প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আমরা এখন অবকাঠামোর পাশাপাশি গবেষণা ও সেবার মান উন্নয়নের এরিয়াগুলো চিহ্নিত করে প্রজেক্ট নিচ্ছি যাতে বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
হামে এখন পর্যন্ত আট শতাধিক শিশু মারা গেছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হামের যে ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, তা দুইবার পেছানো হয়। যদি সেই ক্যাম্পেইন সময়মতো হতো, তবে এত শিশুর মৃত্যু হওয়ার কথা ছিল না। এ মৃত্যুর দায় কার? যারা ক্যাম্পেইন পিছিয়েছে, তাদের কেন কোনো জবাবদিহি বা শাস্তির আওতায় আনা হয়নি? টিকার কোনো অভাব ছিল না, সমস্যা ছিল ব্যবস্থাপনায়। সরকার ইউনিসেফকে টিকার জন্য ৪৫৮ কোটি টাকা দিয়েছিল এবং পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনও মজুদ ছিল। কিন্তু সেই টিকা ফিল্ড পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে আনুষঙ্গিক খরচ প্রয়োজন, সেই অর্থ সময়মতো ছাড় না হওয়ায় টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কেন হামের ক্যাম্পেইন বাদ দিয়ে টাইফয়েড বা এইচপিভি ভ্যাকসিনের ক্যাম্পেইনকে অগ্রাধিকার দেয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা দরকার। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৯ শতাংশ শিশু টিকা পাওয়ার পরও মারা গেছে। এর অর্থ হলো টিকার মান বা শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির সক্ষমতায় কোনো সমস্যা ছিল কিনা, তা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করে দেখা উচিত ছিল, যা আমাদের দেশে হয় না। অনেকে ‘ভিটামিন এ’ বা অপুষ্টিকে মূল কারণ বলছেন, কিন্তু আমি এর সঙ্গে একমত নই। কারণ অপুষ্টি আমাদের দেশে নতুন নয় এবং এক মাস আগেই ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন হয়েছে, অথচ মৃত্যুহার কমেনি।
ডা. এমএইচ চৌধুরী লেলিন
চেয়ারম্যান, হেলথ অ্যান্ড হোপ হসপিটাল
হামের বিরুদ্ধে টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এবারের প্রাদুর্ভাবকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এটি হঠাৎ তৈরি হওয়া সংকট নয়; বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘাটতির ফল। কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকেই দেশে টিকাদানের হার কমতে শুরু করে। লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ছিল ৯৫ শতাংশ, সেখানে ২০২৩ সালে হামের প্রথম ডোজ পেয়েছে ৮৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৮১ শতাংশ শিশু। এর সঙ্গে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ভ্যাকসিন সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমাদের টিকাদান পরিকল্পনায় সরকারি হিসাবের বাইরের জনগোষ্ঠী—ভাসমান শিশু, বস্তিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক শিশুই অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাঁচ-ছয় মাস বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে, যদিও এ বয়সে তারা মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডির কারণে সুরক্ষিত থাকার কথা। এটি ইঙ্গিত করে যে অনেক মা-ই হয়তো প্রয়োজনীয় টিকা পাননি। তাই শুধু শিশু নয়, মায়েদের টিকাদান পরিস্থিতিও মূল্যায়ন করতে হবে। কোন মা ও কোন শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তা জানতে জাতীয় পর্যায়ে একটি মৌলিক গবেষণা জরুরি। আমরা দেখেছি, টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হলেও হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি
দেশে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাবে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রধান কারণগুলোর একটি হলো কভিড-পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি বা ইমিউনিটি গ্যাপ। এ ইমিউনিটি গ্যাপ কমাতে চাইলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে ইমার্জেন্সি রেসপন্স বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। সেখানে এরই মধ্যে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে হটস্পট হিসেবে শনাক্ত করে কাজ শুরু করা হয়েছে। আগে রুটিন ইমিউনাইজেশনের আওতায় নয় মাস বয়স থেকে টিকা দেয়া হতো। এখন সেটিকে আরো এগিয়ে এনে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এ ক্র্যাশ প্রোগ্রামের আওতায় টিকা দেয়া হচ্ছে। তবে সচেতনতার অভাবে অনেক শিশুকেই প্রথম ডোজ দেয়া যায়নি। আবার অনেকেই প্রথম ডোজ নিলেও দ্বিতীয় ডোজ মিস করেছে। অথচ দ্বিতীয় ডোজই দীর্ঘমেয়াদি বা লাইফলং ইমিউনিটি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণেই বর্তমানে রোগটির প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।
অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলি
চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ
২০২০ সাল থেকে নিয়মিত ক্যাচআপ বা অতিরিক্ত টিকাদান কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ছিল, যার ফলে একটি বড় ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। তবে এই ইমিউনিটি গ্যাপের সঙ্গে আরো কিছু বিষয় গভীরভাবে জড়িত। সম্প্রতি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় যত সংখ্যক শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে তার তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ বেশি শিশুর উপস্থিতি দেখা গেছে। অর্থাৎ আমাদের মৌলিক পরিসংখ্যানেই বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মাঠপর্যায়ের তথ্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি বহুদিনের সমস্যা। এবার সেই সমস্যাটি আরো স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। তাই প্রথমেই আমাদের তথ্য ব্যবস্থা নির্ভুল করতে হবে, যাতে বিবিএসের তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা একে অন্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা দেখছি ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আবার যেসব শিশুর হাম হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ টিকা পায়নি।
ডা. আহমেদ সাঈদ
কনসালট্যান্ট ও শিশু বিশেষজ্ঞ, স্কয়ার হাসপাতাল
আমাদের দেশের শিশু স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (পিআইসিইউ) বা এইচডিইউর অপ্রতুলতা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো জায়গায় মাত্র ১০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এমনকি বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে কোনো পেডিয়াট্রিক আইসিইউ নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিওনেটাল আইসিইউর কয়েকটি বেড দিয়ে কোনোমতে কাজ চালানো হচ্ছে, যা দিয়ে হামের এমন প্রাদুর্ভাব সামলানো কঠিন। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আগে থেকেই চিহ্নিত করা এবং তাদের রুটিন ইমিউনাইজেশনের আওতায় আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নবজাতক, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, যাদের ক্রনিক ইলনেস, হার্ট ডিজিজ বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ আছে, তারা হামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এ শিশুদের ক্যাচআপ ইমিউনাইজেশন নিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে খুব বেশি কার্যকর ফলাফল দেখছি না। একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থার জন্য আমাদের অবশ্যই ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক রেজিস্টার সিস্টেমে যেতে হবে।
ডা. আজমেরী সুলতানা চৌধুরী
কনসালট্যান্ট
পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড এনআইসিইউ
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
বর্তমানে হামের যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, সেটিকে শুধু ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। কারণ যাদের বয়স পাঁচ বছরের বেশি—এমনকি ১২-১৩ বছর পর্যন্ত অনেক শিশু হামের টিকা পায়নি। ফলে তাদের অনেকেই হাম আক্রান্ত হয়েছে এবং চিকিৎসা নিয়েছে। এছাড়া শুধু শিশুদের নয়, মায়েদের টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। যদি কোনো মা আগে টিকা না পেয়ে থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে তার সন্তানও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। একই সঙ্গে গর্ভধারণের আগে নারীদের টিকাদান নিশ্চিত করা যায় কিনা, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি হামের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা সহজলভ্য করা দরকার। বর্তমানে এ পরীক্ষার খরচ অনেক বেশি। ফলে অনেক রোগী বা অভিভাবক পরীক্ষাটি করতে চান না। এতে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। এ সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি। সব রোগীর চিকিৎসাও এক রকম হয় না। যাদের জটিলতা নেই তাদের অনেককে চেম্বার থেকেই পরামর্শ দিয়ে বাড়িতে পাঠানো যায়।
মেমেহ্লা মারমা
সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, ইউনিকো হাসপাতাল
হাম একটি সম্পূর্ণ টিকা দিয়ে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অথচ যে টিকা দিয়ে আমরা একসময় অনেক এগিয়েছিলাম, সেখানে এখন কেন এমন পিছিয়ে গেলাম তা গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার। ২০২০ সালের পর দেশে আর কোনো বড় ধরনের ‘ক্যাচআপ’ ক্যাম্পেইন হয়নি এবং আমাদের নজরদারি বা সার্ভিল্যান্স কতটা কার্যকর ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে আমাদের কাছে টিকার পর্যাপ্ত মজুদ আছে, এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই টিকা সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়া। আমরা দেখেছি, শুধু বস্তি এলাকা বা দুর্গম অঞ্চলেই নয়, শহরের অনেক উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের মধ্যেও টিকা নিয়ে ভুল ধারণা বা অনাস্থা কাজ করছে। তারা অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে টিকা নিতে চান না। তাই শুধু গ্রাম বা দুর্গম এলাকা নয়, শহরের সচেতন মহলের দিকেও আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। হাম প্রতিরোধে কেবল টিকাদানই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে রোগটি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। রোগটি কীভাবে ছড়ায় এবং আক্রান্ত হলে রোগীকে কীভাবে আলাদা (আইসোলেশন) রাখতে হয়, তা প্রতিটি পরিবারকে জানতে হবে।
ডা. লামিসা রহমান
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট
ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব কেন দেখা যাচ্ছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এ বিষয়ে আমরা সীমিত পরিসরে প্রায় ২৬০ শিশুর ওপর একটি গবেষণা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে মায়েরা নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াননি। অনেক মা মনে করেছেন, শিশুর পর্যাপ্ত দুধ হচ্ছে না। ফলে তারা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা বিকল্প খাদ্যের ওপর নির্ভর করেছেন। এখানে একটি বড় সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। অনেক মা এখনো জানেন না যে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভ্যাকসিন হেজিট্যান্সি বা টিকা নেয়ার অনীহা। বাংলাদেশে আগে এ ধরনের সমস্যা তেমন ছিল না। এমনকি কভিডের সময়ও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে টিকা গ্রহণের প্রবণতা ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা কিছু উদ্বেগজনক বিষয় লক্ষ করছি।
ডা. এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন
পরিচালক
সেন্টার ফর হেলথ পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
আমি দীর্ঘ ২৫ বছর দেশের বাইরে কাজ করেছি। ফলে দেশের অনেক বিষয়ে হয়তো আমার পর্যবেক্ষণ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সত্য কথা বলার কারণে অনেক সময় আমার বক্তব্য তিক্ত শোনাতে পারে। তাই শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই—আমার বক্তব্য কোনোভাবেই সরকারের বিরুদ্ধে নয়, এটি আমাদের সবার জন্য। জনস্বাস্থ্য একটি সামষ্টিক দায়িত্ব এবং আমি নিজেকেও সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবেই দেখছি। আমার প্রথম প্রশ্ন হলো—এই হামের প্রাদুর্ভাব দেখে আমরা এত বিস্মিত হলাম কেন? যদি ২০২৩ সালে হামের টিকাদানের কাভারেজ ৮৬ শতাংশে নেমে আসে, তাহলে জনস্বাস্থ্যের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে যার ধারণা আছে, তিনি জানতেন যে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে একটি বড় আউটব্রেক ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ হামের ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশের নিচে টিকাদান কাভারেজ নেমে গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই প্রাদুর্ভাব হওয়া স্বাভাবিক। বাস্তবতা হলো, আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তাই এ পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু ছিল না; বরং আগেই প্রস্তুতি নেয়া উচিত ছিল।
ডা. মো. জহিরুল আলম আজাদ
শিক্ষক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শুধু অবকাঠামো নয়, এর বিভিন্ন স্তম্ভ থাকে। প্রতিটি স্তম্ভেই এখন ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতিগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা নেতৃত্বের সংকট। হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা নাজুক। কভিডের সময় রিস্ক কমিউনিকেশন এবং কমিউনিটি এনগেজমেন্ট অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাবের সময় সেই মাত্রার জনসম্পৃক্ততা দেখা যায়নি। নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান হয়নি। একইভাবে কভিডের সময় আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, হামের ক্ষেত্রেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সে রকম ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৫ দিনের মধ্যে যেসব কার্যক্রম নেয়া জরুরি, তার একটি হলো প্রতিটি টিকাদান ক্যাম্পেইনের পরে বাধ্যতামূলকভাবে ডোর টু ডোর সার্চিং পরিচালনা করা। এর মাধ্যমেই টিকার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ যেসব ঘনবসতিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ নগর এলাকা চিহ্নিত করেছে, বিশেষ করে বস্তি এলাকায়, সেখানে নিয়মিত বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
ডা. মো. ফয়জুল ইসলাম
মেডিকেল অফিসার, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)
যেকোনো প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেক পরিস্থিতিতে আমাদের দুটি মূল ম্যান্ডেট থাকে—একটি হলো নজরদারি এবং অন্যটি মোকাবেলা বা রেসপন্স। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে আইইডিসিআরের নেতৃত্বে ন্যাশনাল রÅvপিড রেসপন্স টিম এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রেসপন্স টিম কাজ করছে। আমরা দেখেছি, মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করছেন তাদের সঠিক ওরিয়েন্টেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি ছিল। সেটি দূর করতে আমরা একটি নতুন মডিউল তৈরি করেছি এবং এরই মধ্যে রংপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহের নয়টি জেলার সব উপজেলায় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমাদের জনবলের একটি ট্রানজিশন থাকে; সাধারণত দুই বছর পরপর মেডিকেল অফিসাররা বদলে যান। এ কারণে আমরা উপজেলা রেসপন্স টিমগুলোকে নতুন করে সক্রিয় বা রিভাইটালাইজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো তারা যেন যেকোনো আউটব্রেক শনাক্ত করতে পারেন, সঠিক কেস রিপোর্টিং ফর্ম পূরণ করতে পারেন এবং কন্টাক্ট লিস্ট তৈরি করে আইইডিসিআরের কাছে দ্রুত ‘স্পট রিপোর্ট’ পাঠাতে পারেন।