শিশুদের অনলাইন যৌন শোষণ ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে সমন্বিত আইনি কাঠামোর দাবি

বর্তমানে দ্রুতবর্ধনশীল ডিজিটাল পরিসর শিশুদের জন্য যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে অনলাইন যৌন শোষণ ও নির্যাতনের (OSAEC) চরম ঝুঁকি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিপুলসংখ্যক শিশু অনলাইনে যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং ও সেক্সটোরশনের শিকার হচ্ছে, অথচ তাদের সুরক্ষায় ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।

বর্তমানে দ্রুতবর্ধনশীল ডিজিটাল পরিসর শিশুদের জন্য যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে অনলাইন যৌন শোষণ ও নির্যাতনের (OSAEC) চরম ঝুঁকি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিপুলসংখ্যক শিশু অনলাইনে যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং ও সেক্সটোরশনের শিকার হচ্ছে, অথচ তাদের সুরক্ষায় ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে দেশের প্রায় অর্ধেক নারীর ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়ে যাওয়া এবং বিবাহিত কিশোরীদের ৬২ শতাংশেরই সঙ্গী দ্বারা সহিংসতার শিকার হওয়া আমাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকারের (SRHR) নাজুক চিত্রটিকেই ফুটিয়ে তোলে। এ উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নেদারল্যান্ডস এম্বাসির সহায়তায় টেরে দেস হোমস-নেদারল্যান্ডস, পিএসটিসি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘‌‍শোষণ থেকে সুরক্ষা: আইন ও নীতিমালার প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুদের অনলাইন যৌন শোষণ ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিতকরণ’"শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দ্য ওয়েস্টিন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুইটি রিসার্চ বেজড ‘‌পলিসি ব্রিফ’ করা হয়। ‘‌চাইল্ড অনলাইন সেফটি অ্যান্ড অনলাইন সেক্সচুয়াল এক্সপ্লয়টেশন অব চিলড্রেন (ওএসইসি)’-বিষয়ক পলিসি ব্রিফ করেন ইনসিডিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক একেএম মাসুদ আলী এবং ‘‌এসআরএইচআর অব চিলড্রেন অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্টস’ বিষয়ক পলিসি ব্রিফ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সানজিদা আক্তার। টেরে দেস হোমস, নেদারল্যান্ডসের বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার নজরুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সহকারী সম্পাদক ও বিশেষ প্রতিনিধি বদরুল আলম

নজরুল ইসলাম

কান্ট্রি ম্যানেজার, টেরে দেস হোমস, নেদারল্যান্ডস

যেকোনো কর্মসূচিতে আমরা শিশুদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিই। শিশুদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। তাদের অনলাইন সুরক্ষা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আরো গভীরভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের সবারই দায়িত্ব—শিশুরা যেন নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে।

আমরা বিশ্বাস করি, শিশুদের কণ্ঠস্বর শোনা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া শুধু একটি কর্মসূচির অংশ নয়—এটি একটি দায়িত্ব। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়নে শিশুদের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

ড. নূর মোহাম্মদ

নির্বাহী পরিচালক, পিএসটিসি

আজকের আলোচনায় আমাদের কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অনলাইন যৌন শোষণের (OSEC) ভয়াবহ চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তবে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু কেবল নীতিমালার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং বড় সংকট হলো এর বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতার অভাব। এটা আমাদের চিন্তা করা উচিত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আজকের বৈঠকে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতিনিধিত্ব থাকলে ভালো হতো। নির্বাচনের আগে তারা যে বড় বড় কথা বলছেন, সেসব বিষয়ে তাদের মুখোমুখি করা যেত। পাঠ্যপুস্তকে প্রজনন স্বাস্থ্য এবং যৌন সচেতনতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও শিক্ষকদের ব্যক্তিগত জড়তা ও রক্ষণশীল মানসিকতার কারণে শ্রেণীকক্ষে এটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অথচ সরকারের অর্থ ব্যয় করে তাদের দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্ন এফর্ট দিয়ে হবে না। আন্তঃমন্ত্রণালয় লিংকেজ যদি আমরা না করতে পারি, তখন পলিসি ইমপ্লিমেন্টেশনে কাজ হবে না।

এ কে এম মাসুদ আলী

নির্বাহী পরিচালক, ইনসিডিন বাংলাদেশ

দেশে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও সে অনুযায়ী ডিজিটাল লিটারেসি ও আইনি সুরক্ষা বাড়েনি। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্লাটফর্মগুলো শিশুদের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ শিশু ও কিশোর তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময় অনলাইন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে গ্রুমিং (৫৩শতাংশ), সাইবার ফ্ল্যাশিং (৩৮শতাংশ) এবং সেক্সটোরশন (১২শতাংশ) অন্যতম। গ্রামীণ অঞ্চলেও এই ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বিস্তৃত হয়েছে; যেমন মোল্লারহাট উপজেলার এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে ৩০শতাংশ কিশোর-কিশোরী পর্নোগ্রাফিক টেক্সট বা অডিও এবং ২১শতাংশ পর্নোগ্রাফিক ভিডিও পাচ্ছে। বিশেষ করে কভিড-পরবর্তী সময়ে শিশুদের ডিজিটাল প্লাটফর্মে উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ নির্যাতনের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা অপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছে। কেবল আইন করলেই হবে না, বরং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং শিক্ষক, অভিভাবক ও শিশুদের মধ্যে ব্যাপক ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি জরুরি জাতীয় দায়িত্ব যা পালনে বিলম্ব করা মানেই কোটি শিশুর শৈশবকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া।

ড. সানজিদা আক্তার

অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের দেশে কিশোর-কিশোরীরা প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অনলাইন যৌন শোষণের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, কিশোরী বয়সে মাতৃত্ব এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (MICS) অনুযায়ী ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের হার প্রতি হাজারে ৯২ জন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাল্যবিবাহ বন্ধ করাকে প্রধান শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কারণ বর্তমানে অর্ধেকের বেশি নারী ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিবাহিত। বৈঠকে কিশোরীদের পাশাপাশি কিশোরদের প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অনেক শিক্ষক ব্যক্তিগত জড়তার কারণে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান এড়িয়ে চলেন, ফলে কিশোররা অনির্ভরযোগ্য উৎস এবং পর্নোগ্রাফির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে সম্মতি এবং জেন্ডার বিষয়ক ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে যা পরবর্তীতে সহিংসতাকে উৎসাহিত করে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং সমন্বিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।

রোকসানা সুলতানা

নির্বাহী পরিচালক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স

ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স মূলত পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে শিশুদের ওপর ঘটা যৌন নির্যাতনের নীরবতা ভেঙে সত্য তুলে ধরার লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সমাজে ‘সেক্সুয়াল’ শব্দটি উচ্চারণ করা যতটা সহজ, বাংলায় আমার সঙ্গে ‘যৌন নির্যাতন হয়েছে’ শব্দটির প্রকাশ ততটাই কঠিন। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশুরা নিঃসংকোচে তাদের সঙ্গে ঘটা ‘যৌন নির্যাতনের’ কথা প্রকাশ করতে পারবে। এ লক্ষ্যে আমরা বাবা-মা এবং শিশুদের চারপাশের মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’ বা ইতিবাচক অভিভাবকত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরি।

মো. নুরুল কবির

উপদেষ্টা (পিএমই ও ফান্ডরেইজিং), টেরে দেস হোমস, নেদারল্যান্ডস

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশই শিশু, এবং এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাদের একটি বড় অংশ অনলাইনে যৌন শোষনের ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি দুইজনের মধ্যে একজন শিশু অনলাইন যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এ জন্য আমরা নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার কম থাকা, আইনি সহায়তার অভাব, পিতা-মাতার অজ্ঞতা ও দুর্বল শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করতে পারি। আমাদের দেশে কঠোর আইন থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা নেই। শিশুদের জন্য ক্ষতিকর সাইটগুলো দ্রুত শনাক্ত করে বন্ধ করা জরুরি। আমরা অনলাইনে শিশুদের যৌন শোষণ রোধে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান’ এবং সমন্বিত গাইডলাইন দাবি করছি। সরকার এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং বিটিআরসির মধ্যে দায়িত্বশীল আচরন এবং স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা আশা করছি। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজ থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত সবার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো উন্নত করা প্রয়োজন। বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে শিশুদের সুরক্ষা দিতে। বিবাহিত ও অবিবাহিত উভয় শ্রেণীর কিশোর-কিশোরীদের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতারোধে একটি কার্যকর ‘রিপোর্টিং ও রেফারেল সিস্টেম’ গড়ে তোলা এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আয়বর্ধক কাজে সম্পৃক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

সুপা বড়ুয়া

কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর (সুফাসেক প্রজেক্ট) , টেরে দেস হোমস, নেদারল্যান্ডস

আমাদের প্রকল্পের আওতায় আমরা দুটি বিশেষ নীতিমালা প্রণয়ন করার সুযোগ পেয়েছি—যার একটি আইনি কাঠামো এবং অন্যটি যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধের উপায় নিয়ে কাজ করে। যৌন নিপীড়নের বিষয়টি অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমেই মোকাবেলা করা জরুরি। বর্তমানে উন্নয়ন খাতে আমরা শিশুকে কেবল মেয়ে বা নারীদের আলাদা করে না দেখে জেন্ডার ইকুইটির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। বিশ্বজুড়ে ছেলেদের সচেতন করার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, আশা করি আমাদের দেশেও সে ধারা শক্তিশালী হবে। এখন আমাদের সমস্যার চেয়ে সমাধানের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। বিশেষ করে “‍‌ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন’’ বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময়।

সৈয়দ মো. নূরউদ্দীন

উপদেষ্টা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ‌

বাংলাদেশে ৫০টিরও বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থাকলেও জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কণ্ঠস্বর আজ কার্যত অনুপস্থিত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভৌগোলিক প্রতিকূলতা; যেমন কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকায় পৌঁছতেই পুরো দিন পার হয়ে যায়। সেখানকার শিশুরা যেমন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত, তেমনি তাদের নেই কোনো ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ। বর্তমান নীতিমালাগুলোয় এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর বাস্তবতা প্রতিফলিত হচ্ছে না বললেই চলে। দেখা যায়, ১৩ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সেসব এলাকার মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাব শুরু হচ্ছে এবং ১৪-১৫ বছরের মধ্যেই সে বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে সন্তানের মা হচ্ছে। এ চরম জীবন-বাস্তবতার সামনে রাষ্ট্রের বিদ্যমান নীতিমালাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিক ও ম্লান হয়ে পড়ছে।

মো. সিরাজ উদ্দিন বেলাল

হেড অব প্রোগ্রাম (প্রিভেনশন অ্যান্ড প্রটেকশন), জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার

বর্তমানে সরকারি সেফ হোমগুলোয় নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণীর শিশুদের উপস্থিতি বাড়ছে, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে করোনাকালীন থেকে শিশুদের মধ্যে যে ডিভাইস নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, তার মাধ্যমে তারা ইতিবাচক তথ্যের পাশাপাশি নেতিবাচক ও অনিরাপদ জগতের সঙ্গেও সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখছি, ফেসবুক বা অনলাইনের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে কিশোর-কিশোরীরা পাচার ও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, এমনকি দেশের বাইরে অনলাইন স্ক্যামিংয়ের মাধ্যমে তাদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গড়ে প্রতি বছর ৪৯৫ জন শিশু-কিশোর বাংলাদেশ থেকে পাচারের শিকার। অপরাধগুলো বন্ধে সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

ডা. মো. মাহবুবুল আলম

হেড অব প্রোগ্রামস, পিএসটিসি

অনলাইন যৌন শোষণের বিস্তার বর্তমানে জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে দুর্গম এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অপরাধীরা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রতিনিয়ত ধরন পাল্টাচ্ছে, তাই বিষয়টিকে সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই। এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে, অনলাইন অপব্যবহার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে, তা জানতে বৃহৎ পরিসরে গবেষণায় বিনিয়োগ করা জরুরি। দেশে কৈশোরবান্ধব অনেক কেন্দ্র থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল ও প্রশিক্ষণের অভাবে সেগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে। এমনকি অনলাইন শোষণের মানসিক প্রভাব সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকদেরও স্বচ্ছ ধারণা নেই। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কেবল নীতি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে আশার কথা হলো, জাতীয় স্বাস্থ্য কৌশলের চলমান ‘মিডটার্ম রিভিউ’ কমিটিতে আমরা অনলাইন যৌন শোষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করছি। কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সরকার, এনজিও এবং বেসরকারি খাতকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে অভিভাবকদের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা অসম্ভব। সঠিক বিনিয়োগ এবং সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই পারে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

ওয়াফা আলম

সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো কিশোর-কিশোরীদের জন্য অন্যতম প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (SRHR) বিষয়ক স্পেসে পরিণত হয়েছে। এখান থেকেই তারা স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং শারীরিক অধিকার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করছে। তবে এ ডিজিটাল অবাধ বিচরণ শিশুদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিও তৈরি করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো শিশু যখন অনলাইনে যৌন নিপীড়ন বা শোষণের শিকার হয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়, তখন ডিজিটাল সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য বা আইনি সহায়তা পেতে সে ব্যর্থ হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক কুসংস্কার ও লোকলজ্জার ভয় (স্টিগমা), যা ভুক্তভোগীকে আরো কোণঠাসা করে ফেলে। তাই ডিজিটাল স্পেসকে নিরাপদ করার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও সুরক্ষা ব্যবস্থার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

মো. সাজিদ মোনতাসির

শিশু ফোরামের সদস্য, পিএসটিসি, গাজীপুর

‌বর্তমানে অফলাইন জগতের চেয়ে অনলাইন প্লাটফর্মগুলোয় যৌন হয়রানির প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যার প্রধান শিকার হচ্ছে নারী ও কিশোরীরা। বিশেষ করে নারীরা যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের দক্ষতা প্রকাশ বা ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে চায়, তখনই তারা নানাবিধ সাইবার বুলিং ও যৌন হেনস্তার সম্মুখীন হয়। এসব অপরাধ দমনে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালাগুলোর যথাযথ প্রয়োগ লক্ষ করা যায় না। পিএসটিসির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার সুবাদে আমি দেখেছি, সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতামূলক নাটিকা, সভা ও সেমিনারের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আবু হেনা রুমি

সদস্য, শিশু ফোরাম, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স

যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অনেকে লোকলজ্জা বা প্রভাবশালী মহলের ভয়ে মুখ খুলতে চায় না, বিশেষ করে যখন নির্যাতনকারী পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশী হয়। আমরা ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের মাধ্যমে এ নীরবতা ভেঙে শিশুদের মনের কথাগুলো তুলে আনতে কাজ করছি।

মোহাম্মদ বেলাল হোসেইন

অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা এখনো সামাজিক ‘ট্যাবু’ বা লোকলজ্জার বৃত্ত থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি। বড় সংকটের জায়গা হলো, রাষ্ট্র এ সুরক্ষা নিশ্চিতের দায়িত্ব নিজের কাঁধে দৃঢ়ভাবে না নিয়ে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর ওপর অনেকাংশে চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এককভাবে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পক্ষে এ বিশাল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সামলানো বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের সমাজে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ‘ফোবিয়া’ বা অকারণ ভীতি কাজ করে, যা সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাটানো কঠিন। তাই সরকারের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ও নীতিগত নেতৃত্ব অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে এ খাতের অধিকাংশ কার্যক্রমই দাতা সংস্থার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, অথচ সরকারি বাজেটে বরাদ্দের ব্যাপক স্বল্পতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। টেকসই সমাধান চাইলে রাষ্ট্রকে সরাসরি এর মালিকানা নিতে হবে—নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে নেতৃত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন আনতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং জবাবদিহিতার স্পষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব।

জুমানা হায়াত খান

সহযোগী গবেষক, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ

বর্তমানে আমাদের গৃহীত নীতিমালা এবং তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নীতিমালার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায় না। তাই আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত এ নীতিমালাগুলো আসলে কতটা বাস্তবসম্মত এবং কেন সেগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখা। আমাদের নীতিমালায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিংবা পথশিশুদের মতো প্রান্তিক শ্রেণীর কথা সেভাবে উঠে আসে না। এমনকি তাদের অভিভাবকদের মতামত শোনার বিষয়টিও উপেক্ষিত থাকে। এছাড়া প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে কেবল মেয়েদের সমস্যা হিসেবে দেখার সামাজিক প্রবণতার কারণে বিভিন্ন প্রোগ্রামে ছেলেদের অংশগ্রহণ অনেক কম থাকে, যা পরিবর্তন করা জরুরি। স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হলেও বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন খুবই নগণ্য; এটি সাধারণত মিটিং পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। এছাড়া দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রায়ই নীতিগত সুপারিশগুলো বদলে যায়, যা এ লক্ষ্য অর্জনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া আমাদের মনোভাব ও কাঠামোগত দুর্বলতাও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। নীতিমালা প্রণয়নের সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় না। ফলে পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব থেকেই যায়। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় অনেক উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। স্থানীয় সরকার, সিভিল সোসাইটি এবং কমিউনিটির মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি।

আব্দুর রহমান শিবলী

সদস্য, শিশু সুরক্ষা ফোরাম

ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স

ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের শিশু প্রতিনিধিরা এখন আর চুপ করে থাকে না, আমরা সবাই এখন না বলতে পারি, যা আমাদের ভালো লাগে না বা যা অন্যায্য, আমরা সরাসরি তা নিয়ে প্রতিবাদ করতে শিখেছি।

ড. মো. আহসান হাবিব

অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের সঙ্গে আমাদের বড় ধরনের সামাজিক ও চিন্তাগত ব্যবধান (কগনিটিভ গ্যাপ) তৈরি হয়েছে। পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে শ্রেণীকক্ষে কথা বলতে শিক্ষকরা এখনো জড়তা বোধ করেন। অথচ এ জেনারেশন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক বেশি সক্রিয় এবং বৈশ্বিক নানা ট্রেন্ড সম্পর্কে আমাদের চেয়েও বেশি সচেতন। সরকারি নীতিমালায় কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে আমাদের এ পরিবর্তনের ধারাকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

তাসনীম বিনতে করিম

ন্যাশনাল প্রোগ্রাম

কো-অর্ডিনেটর

ইউএন অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় সংকট হলো বিদ্যমান নীতিমালাগুলোর যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে এক ভয়ংকর ফাঁদ তৈরি হয়েছে। চাকরি বা সুন্দর ভবিষ্যতের প্রলোভনে কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন যৌন শোষণের শিকার করা হচ্ছে। ফলে তারা শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক বিপর্যয়েরও সম্মুখীন হচ্ছে। সমন্বিত সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার—প্রত্যেককে একসূত্রে কাজ করতে হবে।

আরও