সুশাসনের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটে ভুগছে খাতটি। বাজেটে যে বরাদ্দ দেয়া হয়, সেটিও কার্যকরভাবে ব্যয় করা যায় না। আবার স্বাস্থ্য খাতের পরিসরও যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। সমন্বিত পাবলিক হেলথ পলিসি বা জনস্বাস্থ্য নীতি এখনো গড়ে তোলা যায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে বড় সাফল্য থাকলেও এখনো শিশুর অপুষ্টি অনেক বেশি।
গত ১২ বছরে নবজাতক মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ইমিউনাইজেশন কাভারেজ ৮০-৮২ শতাংশে স্থির হয়ে আছে, পরিবার পরিকল্পনা কাভারেজও আটকে আছে ৬৪-৬৫ শতাংশের মধ্যে। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন সুসংগঠিত, আধুনিক ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বণিক বার্তার কার্যালয়ে ১৯ মে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাদের আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে। যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে বণিক বার্তা ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বৈঠকের প্রতিপাদ্য ছিল ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট: একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনে নাগরিক প্রত্যাশা।’
মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি
প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রকল্প মিলিয়ে এর মধ্যে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৩ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়ন, নির্বাচনী ইশতাহার এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক যে প্রতিশ্রুতি ছিল সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যই এ থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতেও বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান রয়েছে। যেমন সর্বজনীন হেলথ কার্ডের পরিকল্পনা।
বাজেট মূলত একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দলিল। এখানে জনগণের জন্য রাষ্ট্র কী করবে তার প্রতিফলন থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনাগুলোকে পুরোপুরি বাজেট কাঠামোয় রূপান্তর করতে সময় প্রয়োজন। কারণ বিদ্যমান সরকারি কাঠামো ও প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন পরিকল্পনাগুলোকে সংযুক্ত করতে হয়। সেই কারণেই এবারের এডিপিকে একটি ‘লিভিং ডকুমেন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে—অর্থাৎ এটি চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত ও সমন্বিত হবে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনো মূলত চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবেই পরিচালিত হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকে আমরা চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কিন্তু প্রকৃত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় অংশ হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধ, জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ। মানুষকে অসুস্থ হওয়ার আগেই সুস্থ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য পাবলিক হেলথ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রও আমাদের সামনে আছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান—সব মিলিয়ে একটি কাঠামো আছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেবা কাঙ্ক্ষিত মানে নেই। বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কীভাবে উন্নত করা যায় এবং কীভাবে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিত করা যায় সে পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। সরকারের নিজস্ব সক্ষমতার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্ষমতাও কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন
মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর
ফেব্রুয়ারি নাগাদ যখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন বাজেট প্রণয়নের কাজ এরই মধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। ফলে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনী ইশতাহারের প্রতিফলন এ বাজেটে পুরোপুরি নাও দেখা যেতে পারে, যদিও সরকার সেটি বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা উন্নয়নে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকার সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগও নিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করা হবে। এখানে ‘পর্যায়ক্রমে’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। আমার যতদূর ধারণা, প্রথম বছরে এটি হয়তো ১ থেকে দেড় শতাংশের মধ্যে থাকবে। গত বছর মূল বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির প্রায় দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে সেটি নেমে যায় দশমিক ৫ শতাংশেরও নিচে। অর্থাৎ যদি আমরা ১ শতাংশেও যেতে চাই, তাহলেও গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আমরা অনেক সময় বাজেট বরাদ্দ পেলেও তা কার্যকরভাবে ব্যয় করতে পারি না। এ বাস্তবতা মেনেই আমাদের এগোতে হবে। আমি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় শেয়ার করতে চাই। আমরা এ দুর্বলতা কাটাতে প্রথমেই গুরুত্ব দিয়েছি সক্ষমতা উন্নয়নে।
যারা বাজেট বাস্তবায়ন করবেন, বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালক বা পিডিদের দক্ষতা বাড়ানো খুব জরুরি। কারণ অনেক সময় পিডিরা অনভিজ্ঞ হন, ফলে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে বা কাজ এগিয়ে নিতে পারেন না। অর্থাৎ কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিলে বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা অবশ্যই বাড়ানো সম্ভব।
ড. ফাহমিদা খাতুন
নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য আমাদের সমাজের অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সামাজিক পণ্যগুলোকে কম গুরুত্ব দেয়া হয়। চিরাচরিতভাবে বাজেটে ভৌত অবকাঠামোয় বেশি গুরুত্ব ও বরাদ্দ দেয়া হয়। নিঃসন্দেহে এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে আমরা একটি ভারসাম্যহীনতার মধ্য দিয়ে যাই। ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতে অনেক কম বরাদ্দ রাখা হয়। অথচ মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য এই খাতে সরকারের বরধিত অর্থ বরাদ্দ জরুরী। সুস্বাস্থ্যর অধিকারী মানুষ না থাকলে সামাজিক অগ্রগতি সম্ভব না। আমাদের স্বাস্থ্য খাত যুগ যুগ ধরে অবহেলিত হয়ে আসছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হামের প্রাদুর্ভাব। এরও আগে আমরা কভিড-১৯ মহামারীর সময়েও সংকটময় মুহূর্তে আমাদের প্রস্তুতিহীনতার ও এর কারণে ঘটে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতির উদাহরণ দেখেছি। এ পরিস্থিতি এড়াতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া দরকার।
বাজেটে স্বাস্থ্য খাত পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পাওয়ার কারনে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবায় ব্যয়ের বড় অংশ আমাদের নিজেদের বহন করতে হয়, যেটিকে আমরা বলি "আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে এ ব্যয় সবচেয়ে বেশি-প্রায় ৭৫ শতাংশ। তাছাড়া বরাদ্দকৃত বাজেট ব্যবহারেও দুর্বলতা রয়েছে। এর পাশাপাশি সুশাসনের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটও রয়েছে। অবকাঠামো, ভবন কিংবা যন্ত্রপাতি থাকলে সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল কমে এসেছে।
এসএম হুমায়ুন কবির সরকার
অতিরিক্ত সচিব
(বাজেট অনুবিভাগ), স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট
আমাদের স্বাস্থ্য বাজেটকে দুটি দিক থেকে দেখতে হবে। একটি হলো রাজস্ব বা ট্যাক্স আদায়ের অংশ, আরেকটি হলো স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের অংশ। আমি মূলত ব্যয়ের দিকটি নিয়েই কথা বলতে চাই। এ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও আবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—একটি ম্যানেজমেন্ট, অন্যটি ইমপ্লিমেন্টেশন। অনেকেই বলেন, স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বাজেট দেয়া হয় না। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী সরকার স্বাস্থ্য খাতে খারাপ বাজেট দেয়নি। আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা।
অনেক সময় উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশই খরচ করা যায় না। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, সেটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার বাজেট দিয়েছে, কিন্তু আমরা যারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছি, সেই জায়গায় আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এ ব্যর্থতার দায় আমাদেরও নিতে হবে। এছাড়া আমাদের সবার আগে নিজেদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আপন করে নিতে হবে। সরকার, বেসরকারি খাত, চিকিৎসক, প্রশাসন—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পিপিপি হোক, নন-পিপিপি হোক, সরকারি বা বেসরকারি যেভাবেই হোক—দেশের স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের দেশের টাকা যদি আমরা শতভাগ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি, সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
ড. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সামনের দিনগুলোয় দারিদ্র্য আরো বাড়বে। বিভিন্ন গবেষণা ও পূর্বাভাসেও এ কথাই বলা হচ্ছে। আর দারিদ্র্য বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও বাড়বে, শুধু সামান্য নয়, অনেক বেশি বাড়বে।
তাই বর্তমান ঘাটতি ও ভবিষ্যতের এ চাপ মাথায় রেখে স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরি করতে হবে। সেই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দুটি বিষয়—প্রথমত, স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি করা এবং দ্বিতীয়ত, বরাদ্দকৃত বাজেটের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, সেটি দক্ষতার সঙ্গে খরচ করতে হবে। আবার যেখানে প্রকৃত প্রয়োজন নেই সেখানে বাজেট বরাদ্দ দিলে হবে না। অর্থাৎ সঠিক খাতে বরাদ্দ এবং স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সারা দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে—শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু অগ্রাধিকার দিলেই হবে না, সেটি বাস্তবসম্মত কিনা, সেটাও দেখতে হবে।
আমাদের স্বাস্থ্য খাতে জনবলের ঘাটতি আছে—এটি সত্য। কিন্তু শুধু জনবল বাড়ালেই হবে না। প্রতিটি এলাকার চাহিদা অনুযায়ী জনবল নিয়োগ করতে হবে। উপজেলা বা অঞ্চলভিত্তিক বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা করতে হবে। শুধু ‘রুল অব থাম্ব’ মেনে লোক নিয়োগ করলে হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জনগণ কোন সেবাকে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করে, সেটি বুঝতে পারা। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অ্যাম্বুলেন্স ও রক্ত পরিষেবা—এসব খাতে। এসব ক্ষেত্রে ব্যয়ের চাপ মানুষের জন্য খুবই কষ্টকর। তাই দরিদ্র মানুষের জন্য এসব সেবার নিশ্চয়তা দেয়া জরুরি এবং এটিকে অগ্রাধিকারমূলক বাজেট খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ কারণে দরিদ্র রোগীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রীতি চক্রবর্তী
চেয়ারম্যান, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল;
সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিসিআই
আমরা যখন বেসরকারি বিনিয়োগের কথা বলি, তখন বুঝতে হবে—একটি বড় টারশিয়ারি হাসপাতাল গড়ে তোলা ব্যক্তিগত পুঁজিতে সম্ভব নয়। এর জন্য ব্যাংক ঋণ, আর্থিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের নীতিমালায় ডাল ব্যবসা, জুতা ব্যবসা আর হাসপাতাল ব্যবসার মধ্যে প্রায় কোনো পার্থক্য নেই। সুদের হার, ঋণের শর্ত, মর্টগেজ সুবিধা—কোথাও স্বাস্থ্য খাতের জন্য আলাদা কোনো নীতিগত সুবিধা নেই।
আমরা বহু বছর ধরে এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়গুলো তুলে ধরছি। এখন হয়তো কিছু জায়গায় এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা করা যায়। আমাদের কথা খুব পরিষ্কার—স্বাস্থ্য খাতকে একটি বিশেষ খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
যদি অন্যান্য শিল্প খাতের জন্য সুদের হার কমানো যায়, তাহলে স্বাস্থ্য খাতের জন্য কেন বিশেষ সুবিধা থাকবে না? নীতিগত সহায়তা ছাড়া বড় বিনিয়োগ সম্ভব নয়। বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর সেই বিনিয়োগ আনতে হলে সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা বাধ্যতামূলক।
ড. আবু জামিল ফয়সাল
সাবেক সভাপতি
পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অনেক নীতি বা পলিসি রয়েছে—যেমন জনসংখ্যা নীতি, পুষ্টি নীতি, প্রজনন স্বাস্থ্যনীতি, কিশোর স্বাস্থ্যনীতি ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি সমন্বিত পাবলিক হেলথ পলিসি বা জনস্বাস্থ্য নীতি এখনো নেই। অথচ আজকে এতক্ষণ ধরে যে আলোচনা হলো, প্রায় সবকিছুই জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এসেছে। তাই আমি সরকারের প্রতি শুরুতেই অনুরোধ রাখব—বাংলাদেশের জন্য একটি সুসংগঠিত, আধুনিক ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করা হোক। এ নীতিতে বিভিন্ন বক্তা যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলোর জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্য খাতে যেকোনো চিকিৎসামূলক কাজেরও একটি জনস্বাস্থ্য প্রেক্ষাপট রয়েছে। বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে সংক্রামক রোগ মোকাবেলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা এখন ‘ডাবল বার্ডেন অব ডিজিজের’ মধ্যে আছি।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখন এ দ্বৈত স্বাস্থ্যচাপের মুখোমুখি। তাই আমাদের জনস্বাস্থ্য নীতিতে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে—কীভাবে এ দ্বৈত রোগ-চাপ মোকাবেলা করা হবে।
ড. নূর মোহাম্মদ
নির্বাহী পরিচালক
পিএসটিসি
একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তখনই আধুনিক হবে যখন সেটি ন্যায়ভিত্তিক, সহজপ্রাপ্য এবং মানুষের জন্য সম্মানজনক হবে। আমরা যে সেবা দিচ্ছি, সেটি মানুষ সহজে পাচ্ছে কিনা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সেটির আওতায় আসছে কিনা সেটা দেখতে হবে। বিশেষ করে নারী, কিশোর-কিশোরী, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এবং দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে। আমরা যেহেতু কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করি, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলি, তাই তাদের প্রত্যাশাগুলোও খুব পরিষ্কারভাবে জানতে পারি। তারা চায় স্বাস্থ্যসেবা যেন সাশ্রয়ী হয় ও মানসম্মত হয়। তারা স্বাস্থ্যকর্মীর থেকে সম্মানজনক আচরণ চায়। শুধু চিকিৎসা নয়, মানবিক আচরণও। আরেকটি বিষয় মানুষ বারবার বলে—প্রেসক্রাইব করা ওষুধ যেন সেই কেন্দ্রেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ তারা ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চায়। তারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেবাদানকারীও চায়। একই সঙ্গে তারা চায় স্বাস্থ্যসেবায় যেন কোনো বৈষম্য না থাকে।
ডা. নিজামউদ্দীন আহম্মেদ
চেয়ার, সিএসও স্টিয়ারিং কমিটি, গ্যাভি
মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং ইমিউনাইজেশন খাতে অগ্রগতি কোনো ম্যাজিক বা রাতারাতি অর্জন নয়। এ দেশের মানুষ, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সীমিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এ সাফল্য এসেছে। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। পৃথিবীতে খুব অল্প কয়েকটি দেশই এমন সাফল্য দেখাতে পেরেছে। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের সেবাদান ব্যবস্থাই এ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এত সাফল্যের পরও আমরা এখনো কেন পিছিয়ে। এর একটি বড় কারণ হলো, ১৯৮৫ সালের পর থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলা করেছি। ওই সময়ে যে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতের অনেক কর্মী গড়ে তোলা হয়েছিল, তাদের ওপরই দেশের মা ও শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রম নির্ভর করত। তখনকার জনসংখ্যা আর বর্তমান জনসংখ্যার মধ্যে বিশাল পার্থক্য তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে স্বাস্থ্যকর্মী বাড়েনি। এখন একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়। শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরো ভিন্ন। সেখানে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। শহরের প্রায় ৯৫ শতাংশ মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো দিচ্ছে। আমাদের অর্জন থাকলেও এখনো শিশুর অপুষ্টি অনেক বেশি। গত ১২ বছরে নবজাতক মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ইমিউনাইজেশন কাভারেজ ৮০-৮২ শতাংশে স্থির হয়ে আছে এবং পরিবার পরিকল্পনা কভারেজও ৬৪-৬৫ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের ক্ষেত্রে আমার কিছু সুপারিশ রয়েছে। তার মধ্যে প্রথমত, ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার স্ট্রেনদেনিং’ নয়ম আমরা ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিস’ চাই। দ্বিতীয়ত, ইমিউনাইজেশন কর্মসূচিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ সরকারের একার পক্ষে সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সিএসও, এনজিও ও বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে কাজে লাগাতে হবে।
ডা. লেলিন চৌধুরী
চেয়ারম্যান
হেলথ অ্যান্ড হোপ হসপিটাল
বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি মধ্যম সারির (৫০ থেকে ২৫০ শয্যা) বেসরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে যায়। কারণ এগুলো তুলনামূলক সহজলভ্য এবং করপোরেট হাসপাতালের তুলনায় খরচও অনেক কম। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যয় করপোরেট হাসপাতালের তুলনায় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কম। বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল ভরকেন্দ্রই এই মধ্যম সারির হাসপাতালগুলো। এ কারণেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র দপ্তর বা অধিদপ্তর গঠন করা প্রয়োজন। নজরদারি, সহযোগিতা ও জবাবদিহিতা—এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত না হলে এত বড় একটি খাতকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সরকার তার জনগণের জন্য কী করতে চায়, বাজেট সেটিরই অর্থনৈতিক ভাষ্য। আমাদের বাজেট ও পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রায় পুরোপুরি চিকিৎসাসেবাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সবকিছু ডাক্তার, হাসপাতাল, আইসিইউ—এ জায়গায় সীমাবদ্ধ। আমরা চাই, অন্তত এবার থেকে পূর্ণাঙ্গ ‘হেলথকেয়ার’ বা সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার ধারণাকে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হোক।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাবি
বলা হচ্ছে জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে তার আগে আমাদের ভাবা উচিত বাজেট ব্যয় করার জন্য আমাদের সক্ষমতা আছে কিনা। উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ হয় না। আবার প্রকল্প পরিচালক বা পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। যাদের পাওয়া যায়, তাদের মধ্য থেকেও সবসময় সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। যেমন পিডিরা যখন কাজ করতে যান, তখন তারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না। আর বরাদ্দকৃত অর্থের কত টাকা খরচ হচ্ছে, সেটা আমরা বলতে পারি। কিন্তু কত টাকা কার্যকরভাবে খরচ হচ্ছে, সেই হিসাব পাওয়া যায় না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, যে অর্থ ব্যয় হয়, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অদক্ষতা ও অপচয়ের কারণে কার্যকর ফল দেয় না। এর একটি বড় কারণ হলো স্বাস্থ্য খাতের ভেতরের বিভাজন ও সমন্বয়হীনতা। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় আমরা এটি স্পষ্টভাবে দেখি।
ড. রুমানা হক
অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ, ঢাবি
প্রতি বছর বাজেট বইয়ে আমরা খুব সুন্দর ও আকর্ষণীয় কিছু দর্শন বা ফিলোসফির কথা দেখি। যেমন ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ অর্জনের কথা বলা হয়, সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনের কথা বলা হয়। কিন্তু এ দর্শনগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মকাণ্ডে কীভাবে রূপান্তর করা হবে, সেখানেই আমাদের মূল ঘাটতি রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ে আমাদের প্রথম সীমাবদ্ধতা হচ্ছে আমরা স্বাস্থ্য খাতের পরিসরটিকেই সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করি না। সাধারণত স্বাস্থ্য খাত বলতে আমরা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বুঝি। অথচ স্বাস্থ্য খাতের পরিধি আরো অনেক বিস্তৃত। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা ‘সোশ্যাল ডিটারমিন্যান্টস অব হেলথ’ বা স্বাস্থ্য খাতের সামাজিক প্রভাবক নিয়ে কথা বলে আসছি। অর্থাৎ স্বাস্থ্যের বাইরের নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উপাদান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। স্থানীয় সরকার, পানি ও স্যানিটেশন, শিক্ষা, কৃষি—এসব খাত মানুষের স্বাস্থ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা করতে হলে অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে কীভাবে একসঙ্গে কাজের আওতায় আনা যায়; কীভাবে একটি ‘ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচে’ যাওয়া যায়—সেই আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমাদের আলোচনায় বিষয়টি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
আহমদ দাউদ
সিইও
ল্যাবএইড হাসপাতাল
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবির সঙ্গে করনীতি ও রাজস্ব আহরণের বাস্তবতার একটি প্যারাডক্স রয়েছে। একদিকে সবাই সরকারের কাছে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবি করে. অন্যদিকে সরকার যখন অর্থায়নের জন্য কর বাড়াতে চায়, তখন আবার কর কমানোর দাবি ওঠে। তবে এর সমাধান রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ ব্যয় হওয়া উচিত অথচ বাংলাদেশে তা এখনো ১ শতাংশেরও নিচে। সর্বশেষ হিসাবে আরো কম, প্রায় দশমিক ৬৭ শতাংশ। সরকার ধীরে ধীরে এ বরাদ্দ ১ শতাংশে নেয়ার পরিকল্পনা করছে, যা ইতিবাচক। স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বরাদ্দের অংকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর সুশাসন ও কার্যকর বাস্তবায়ন। এ অর্থ প্রকৃত অর্থে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও জনগণের প্রয়োজনীয় সেবায় ব্যয় হচ্ছে কিনা, সেটি নিশ্চিত করা। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫-১৬ হাজার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। তবে এর বাইরে আরো দুই-তিন হাজার অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছে, যাদের সেবার মান বা জবাবদিহি নেই। সরকার ও এনবিআরকে এসব প্রতিষ্ঠানকে কর নেটওয়ার্ক ও নিবন্ধনের আওতায় আনার আহ্বান করি। বর্তমানে যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপরই চাপ বেশি পড়ে, কিন্তু করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ তুলনামূলক কম।
সরকার স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে এবং সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্যশিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। সেই বাস্তবতায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো একই হারে কর আরোপ করা উচিত নয়।
ডা. আরিফ মাহমুদ
গ্রুপ মেডিকেল ডিরেক্টর, এভারকেয়ার হাসপাতাল
প্রথমেই আমি একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলতে চাই—বাংলাদেশে আমরা স্বাস্থ্যসেবার মান কীভাবে পরিমাপ করি? দুঃখজনক হলেও সত্য, এ মান পরিমাপের জন্য আমাদের দেশে এখনো কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা জাতীয় কাঠামো নেই। একটি সংস্থা আছে—বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি)। কিন্তু তারা মূলত শিল্প খাত ও ল্যাবভিত্তিক কিছু বিষয়ে কাজ করে। স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক মান নিয়ন্ত্রণে তাদের কার্যকর ভূমিকা নেই। বর্তমানে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করি, কিন্তু সেটি একটি পূর্ণাঙ্গ মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নয়। হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরিগুলোর জন্য একটি স্বাধীন অ্যাক্রেডিটেশন বডি গঠন এখন অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণ না করতে পারলে, সরকারি বা বেসরকারি কোনো খাতেই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সবশেষে আমি বলতে চাই, স্বাস্থ্যকর্মীর এ ঘাটতি পূরণ করতে হলে আমাদের তিন ধাপে পরিকল্পনা নিতে হবে—একটি তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা, একটি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। যেহেতু স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বরাদ্দ ধীরে ধীরে বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, সেহেতু এ পরিকল্পনাগুলোও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই হয়তো আগামী পাঁচ বছরে আমরা একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারব।
মো. ইসাম ইবনে ইউসুফ সিদ্দিক
সিইও, স্কয়ার হাসপাতাল লি.
স্বাস্থ্যসেবা এমনিতেই ব্যয়বহুল। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা আরো ব্যয়বহুল। আর মানসম্পন্ন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সবচেয়ে বেশি ব্যয়বহুল। কারণ এখানে প্রয়োজন উচ্চদক্ষ মানবসম্পদ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি—যেগুলোর সবই অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আমাদের প্রত্যাশা হলো স্বাস্থ্য খাতকে একটি মৌলিক মানবিক সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হোক। অথচ বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতকে অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতোই প্রায় ৩০ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত এ করের বোঝা গিয়ে পড়ে রোগীদের ওপর। এরপর আসে ট্যাক্স হলিডে বা করছাড়ের বিষয়টি। আগে সরকারের একটি ট্যাক্স হলিডে স্কিম ছিল। গত বছর সেটি ছিল না, তবে সংবাদপত্রে দেখলাম আগামী বাজেটে হয়তো আবার চালু হতে পারে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ মানবসম্পদ। স্বাস্থ্য খাতের যেসব সহায়ক পেশা পুরো ব্যবস্থাকে সচল রাখে—যেমন রেসপিরেটরি থেরাপিস্ট, ফিজিসিস্ট, ল্যাব সায়েন্টিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট—এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নে মানসম্মত কোনো সরকারি উদ্যোগ আমরা দেখি না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যবীমা বা হেলথ ইন্স্যুরেন্স। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যব্যয়ের চাপ কমাতে জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা প্রয়োজন।