নির্বাচনী ইশতাহার থেকে আইন সংস্কার: প্রতিবন্ধী নাগরিকদের পক্ষে রাজনৈতিক অঙ্গীকার

গণতন্ত্রের সফলতা নির্ভর করে সব নাগরিকের সমান ও অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর। কিন্তু বাস্তবতায় বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এখনো নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মূলধারা থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পিছিয়ে রয়েছেন।

গণতন্ত্রের সফলতা নির্ভর করে সব নাগরিকের সমান ও অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর। কিন্তু বাস্তবতায় বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এখনো নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মূলধারা থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পিছিয়ে রয়েছেন। এমতাবস্থায় তাদের ক্ষমতায়নে দেশের জাতীয় সংসদ থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি করা জরুরি। কারণ দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবন্ধীবান্ধব ইশতাহার ঘোষণাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বাস্তবতা সামনে রেখে ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ‘‍প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন: আগামীর বাংলাদেশে করণীয়’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের আয়োজন করা হয় বণিক বার্তার প্রধান কার্যালয়ে। বি-স্ক্যান ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ইউরোপিয়ান পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (ইপিডি)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এ জাতীয় সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। বি-স্ক্যানের কো-অর্ডিনেটর মাহফুজুর রহমানের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বি-স্ক্যানের পরিচালক ইফতেখার মাহমুদ। তার প্রবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের চিত্র, বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা, সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকগুলো তথ্যভিত্তিকভাবে তুলে ধরা হয়। বাংলা ইশারা ভাষায় দোভাষী হিসেবে ছিলেন আরাফাত সুলতানা লতা

মো. আশরাফুল আলম

সহকারী সচিব (জনসংযোগ শাখা)

নির্বাচন কমিশন

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত ভোট কেন্দ্র এবং পুনর্নির্মাণাধীন কেন্দ্রগুলোতে পূর্ণ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা জাতীয় নির্বাচনে বর্তমানে কার্যকর না হলেও ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে কেবল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য গাইড বা সহায়ক নেয়ার বিধান রয়েছে। তবে শারীরিকভাবে ভোট প্রদানে অসক্ষম কেউ গেলে তাদের আমরা যথাযথভাবে সহায়তা করি এবং এ বিষয়ে কর্মরত সবাইকে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া কমিশন আশা করছে যে ভোট কেন্দ্রের অবকাঠামো আরো উন্নত ও নিরাপদ করা হবে, যাতে প্রতিবন্ধী ভোটাররা স্বাচ্ছন্দ্যে ও মর্যাদার সঙ্গে ভোট দিতে পারেন।

ভবিষ্যতে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।

মাইকেল লিডাউর

সিনিয়র ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজার

ইপিডি

ইপিডির মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি বৃহত্তর ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নাগরিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সমর্থন জোরদার করা। বর্তমানে এই প্রক্রিয়ায় আমাদের সাতটি ভিন্ন পর্যবেক্ষণ অংশীদার যুক্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে বি-স্ক্যান আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশীদার। বি-স্ক্যানের সঙ্গে অংশীদারত্ব করতে পেরে আমরা গর্বিত এবং এই সহযোগিতাকে ভবিষ্যতে আরো সুদৃঢ় ও ফলপ্রসূ করতে আগ্রহী। আমরা বিশ্বাস করি, এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সক্ষমতা ও অংশগ্রহণ আরো শক্তিশালী হবে বলেও আমরা আশাবাদী।

আনাস্তাসিয়া এস উইবাওয়া

প্রকল্প পরিচালক

ইপিডি

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের গণতন্ত্রের কোনো ফুটনোট নন। তারা ভোটার, নাগরিক এবং জনগণের প্রতিনিধি, নির্বাচনের অংশীদার। তাদের বাধাগুলো দৃশ্যমান করতে হলে আমাদের প্রয়োজন পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ—আর সেটাই বি-স্ক্যান করছে। প্রবেশগম্য নির্বাচন কোনো দয়া নয়; এটি একটি যৌথ দায়িত্ব এবং এর মাধ্যমে নির্বাচন আরো শক্তিশালী হয়। আমরা আশা করি আজকের এই সংলাপ বাস্তব কার্যক্রমে রূপ নেবে।

রোবায়েত ফেরদৌস

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের মূল শর্ত হলো বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানো এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সেই সংবেদনশীলতার বড়ই অভাব দেখা যায়। ক্ষমতার সিংহাসনে বসার পর অনেক সময় রাজনৈতিক ইশতাহারের অঙ্গীকার কর্পূরের মতো উবে যায়, আর অবহেলিতই থেকে যায় প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের মৌলিক ও ন্যায্য দাবিগুলো। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র তথা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সবাইকে এসব প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের প্রতি আরো সংবেদনশীল, দায়বদ্ধ ও আন্তরিক হতে হবে। কেবল কথার প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব নীতি, বাজেট ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।

খন্দকার জহুরুল আলম

নির্বাহী পরিচালক

সিএসআইডি

বিগত ১৬-১৭ মাসে আমরা লক্ষ করছি, প্রতিবন্ধী মানুষদের ‘মেধাসম্পন্ন মানুষ’ বলে অভিহিত করার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। আমরা বরাবরই এই প্রবণতার বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করে আসছি। বাংলাদেশের আইনেও স্পষ্টভাবে বলা আছে—তারা ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’। নামকরণ বা পরিভাষার এই বিভ্রান্তি মূল সমস্যাকে আড়াল করে দেয় এবং বাস্তব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি পিছিয়ে পড়ে। আসলে পরিবার যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, রাষ্ট্রও কখনো পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের পরিবারগুলোতেও সমস্যা রয়েছে—অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান চোখে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এর পাশাপাশি ১৯৯৭ সালে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি দেখবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এর ফলে অন্যান্য মন্ত্রণালয় কার্যত এই দায়িত্ব এড়িয়ে যায় এবং আমাদের বিষয়গুলোকে নিজেদের এজেন্ডার অংশ বলে মনে করে না।

অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক

বিএনপি

আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। সেই নতুন বাংলাদেশের ইশতাহারে অবশ্যই নারীবান্ধব, শিশুবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ গড়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। আমরা সংবেদনশীল মানুষ; যেকোনো সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মূল্য আমরা অনুধাবন করতে পারি। এবারের গণ-অভ্যুত্থানে ৫০০-এর বেশি মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে প্রতিবন্ধী হয়েছেন। তাদের এই ত্যাগ আমাদের দায়বদ্ধতাকে আরো গভীর ও শক্তিশালী করে। রাজনীতি একটি কঠিন পথ, কিন্তু এই পথেই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। গণপরিবহন, সরকারি ও বেসরকারি ভবনে কেন র‍্যাম্প থাকবে না? আমাদের দেশে মোট কতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন—তার সঠিক পরিসংখ্যান কেন থাকবে না? একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে হলে এসব বিষয়ের নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্য অবশ্যই থাকতে হবে। পরিশেষে, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলো আমি আমার দলের কাছে তুলে ধরার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি, যাতে নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় এসব বিষয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।

ড. হেলাল উদ্দিন

কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

দীর্ঘ স্বৈরশাসন ও সীমিত গণতান্ত্রিক চর্চার কারণে দেশে এখনো একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠেনি। তবে সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণরা বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে অনেক সচেতন ও সোচ্চার হয়েছে, যা ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করবে। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, কাউকে বঞ্চিত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সহজ হবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা দেখতে পাই, গুরুতর প্রতিবন্ধিতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। এটি প্রমাণ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সঠিক সুযোগ ও সমর্থন পেলে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে পূর্ণ অংশগ্রহণ করতে সক্ষম। আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী একটি ইশতাহার প্রকাশ করবে, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টি বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে, যাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তাসলিমা আক্তার

পলিটিক্যাল কাউন্সিল মেম্বার ও শ্রমিক নেত্রী

গণসংহতি আন্দোলন

গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে আমরা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘বৈষম্যহীন’—এই দুটি শব্দ সবচেয়ে বেশি শুনেছি। আমাদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও এই শব্দ দুটি অন্তর্ভুক্ত। নতুন বাংলাদেশে আমরা যা চাই তা হলো নাগরিক হিসেবে মর্যাদা। শ্রমিক, নারী, কৃষক বা প্রতিবন্ধী—যে-ই হোক না কেন, তার মর্যাদা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়, পরিবার ও সমাজের বাইরে রাষ্ট্রের মধ্যেই ‘প্রতিবন্ধিতা’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়। রাষ্ট্র যেভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেখে, সেই মনোভাবই ঘরে ও সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাই রাষ্ট্রকাঠামো থেকেই সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করতে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এই কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে রাজনীতি, বিশেষ করে সংসদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপস্থিতি অনিবার্য। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।

আবদুল্লাহ আল কাফি রতন

মহাসচিব

সিপিবি

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বাধা হতে পারে না। একটি মানুষ যদি তার মস্তিষ্ক এবং চিন্তার শক্তি দিয়ে দেশের জন্য ভাবতে পারে, তবে তাকে সেই ক্ষমতা ও অধিকার প্রদান করা উচিত। এই অধিকার কীভাবে কার্যকরভাবে প্রদান করা হবে, তা নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রই ঠিক করবে কীভাবে প্রত্যেক নাগরিক—শারীরিক প্রতিবন্ধী হোক বা না হোক—তার ভোটাধিকারের পূর্ণ সুযোগ পাবে।

দিদার ভূইয়া

অর্থ সম্পাদক

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন

প্রত্যেক নাগরিকের সমান স্বীকৃতি থাকা উচিত। পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের জীবন, সম্মান এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা। যেমন আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার বিষয়টি নজরদারি করি, তেমনি রাজনৈতিক কারণে যেন নতুন করে কোনো মানুষকে ‘প্রতিবন্ধী’ হিসেবে বঞ্চিত করা বা প্রান্তিক করা না হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। আমাদের দেশে বিভিন্ন সংখ্যালঘু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজ থেকে অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে সংসদের উচ্চকক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১০টি আসন বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

নাভিদ নওরোজ শাহ

যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক

এনসিপি

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েই আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছি। এনসিপি বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে সহযোগী সংগঠন ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী গণশক্তি’ গঠন করেছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উদযাপন করেছে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না হলে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়। আমাদের দলও নির্বাচনের সময়ে এ বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখবে এবং নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে সংযুক্ত রাখবে।

নাসরিন সুলতানা মিলি

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক

এবি পার্টি

বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনাে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য র‍্যাম্প বা প্রাপ্য অবকাঠামো নেই। বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে এই বিষয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এমনকি এই আলোচনাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও পৌঁছায় না। রাষ্ট্রের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতোই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। প্রতিটি নতুন নীতি, আইন ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় তাদের চাহিদা ও অধিকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা উচিত। কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণই নিশ্চিত করবে যে একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে উঠছে।

জাহিদুল কবির

লিড, জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিফিকেশন

ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশন, ব্র্যাক

একটি সমাজে মানুষ নানা প্রকৃতির ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। প্রত্যেকেই আলাদা চরিত্র এবং ভিন্ন ধরনের চাহিদা নিয়ে জীবনযাপন করে। কিন্তু অনেক সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে দেখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, শুধু একটি র‍্যাম্প থাকলেই ভাবা হয় যে প্রতিবন্ধীদের জন্য সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। প্রকৃত বাস্তবতা হলো কারো চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কেউ দেখতে পারে না, কেউ শুনতে সমস্যায় ভোগে, আবার কারো বুদ্ধিগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। একেক ধরনের বৈশিষ্ট্যের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। তাই রাষ্ট্র, সামাজিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বৈচিত্র্যপূর্ণ চাহিদা অনুযায়ী আরো কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

সগীর হুসাইন খান

সহকারী শিক্ষক

কার্তিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

ভোট কেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে শারীরিক পরিশ্রম ও পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ। একবার আমাকে একটি ভবনের তিনতলায় উঠে ভোট দিতে হয়েছিল। আবার ভোট কেন্দ্রের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে গিয়ে আমি ভীষণভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য সাধারণত কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে না। আর যদি কেউ সাহায্য করতেও এগিয়ে আসে, অনেক সময় তারা সরাসরি ভোট কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পড়ে, ফলে প্রতিবন্ধী ভোটারের গোপনীয়তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। এর ওপর ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানে ‘অপ্রকৃতিস্থ’ শব্দটির উল্লেখসহ আরো নানা ধরনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা রয়েছে, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সীমিত করে।

রুহুল কুদ্দুস খান রিপন

সাবেক সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা (বিএনএফডি)

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা স্বল্প কথায় বা জটিল ভাষায় বলা বিষয় সহজে বুঝতে পারেন না। তাই সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র—সবারই এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমরা চাইলেই কাউকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারি না, কিংবা ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতার অজুহাতে তাদের বাইরে ঠেলে রাখতে পারি না। বিশেষ করে ইশারা ভাষার অনুবাদক না থাকলে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তথ্য বোঝা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচনের সময় অনেকেই প্রচারণার বক্তব্য বুঝতে পারেন না, এমনকি ভোট কীভাবে দিতে হবে বা ভোট কেন্দ্রে কী ধরনের নির্দেশনা দেয়া আছে—সেটাও তাদের কাছে স্পষ্ট থাকে না। যদি ইশারা ভাষার অনুবাদ ও সহজবোধ্য নির্দেশনা নিশ্চিত করা যায়, তবে তাদের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেক বেশি সহজ, বোধগম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।

এটি কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়, বরং একটি ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত। সব নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়।

জাহাঙ্গীর আলম

সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর

সিডিডি (সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি এন ডেভেলপমেন্ট)

আমি সমাজকে জানাতে চাই যে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে আমি বৈচিত্র্যের অংশ—আমি বিচ্ছিন্ন বা অবহেলিত নই। আমাদের বৈচিত্র্যকেও সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা উচিত। বাংলাদেশে প্রায় ৩৭ লাখ প্রতিবন্ধী ভোটার রয়েছেন। প্রথমত, আমরা সমন্বিত ও পূর্ণ প্রবেশযোগ্যতা চাই, যাতে ভোট কেন্দ্রে স্বাচ্ছন্দ্যে পৌঁছে ভোট দিতে পারি। এছাড়া ভোট কেন্দ্রে গিয়ে আমাদের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে—এটি সব রাজনৈতিক দলের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি। কেবল অধিকার প্রদানের কথা নয়, সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশও অপরিহার্য। 

আরও