গৃহকর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও জীবনমান উন্নয়ন: আমাদের করণীয়

গৃহকর্মীদের শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণ ও আইনি সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইনে তাদের অন্তর্ভুক্তি এবং একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা আজ জন-আকাঙ্ক্ষাতে পরিণত হয়েছে।

গৃহকর্মীদের শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণ ও আইনি সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইনে তাদের অন্তর্ভুক্তি এবং একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা আজ জন-আকাঙ্ক্ষাতে পরিণত হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক গৃহকর্মে যুক্ত আছে, সরকারিভাবে যার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। আবার এসব শ্রমিকের মূল অংশই নারী, যারা শোভন কর্মপরিবেশের অভাব, সাপ্তাহিক ছুটি ও নিয়োগপত্র না থাকাসহ প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এসব গৃহকর্মীকে শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তিকরণ, সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান, তাদের অধিকার সুরক্ষা এবং পেশাগত ও জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর নীতি এবং পথরেখা তৈরির লক্ষ্যে বণিক বার্তা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের যৌথ উদ্যোগে এবং অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের সহযোগিতা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের স্পন্সরশিপে ২৫ জুন, ২০২৫ কারওয়ান বাজারে বণিক বার্তার প্রধান কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে ‘গৃহকর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও জীবনমান উন্নয়ন: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এ আলোচনায় দেশের নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, গবেষক, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক তপন কুমার দাশের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে মূল আলোচনা উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ও এনএসডিসির সাবেক সিইও এবিএম খোরশেদ আলম

এ এইচ এম সফিকুজ্জামান

সচিব

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

প্রতিটি মানুষকে সুরক্ষা দেয়া আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। গৃহকর্মীদের নির্যাতনের জাঁতাকলে রেখে আমরা যতই অধিকার ও উন্নয়নের কথা বলি না কেন, কল্যাণমুখী কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়। গৃহকর্মীদের মধ্যে ৫০ শতাংশের অধিক শিশু শ্রমিক। রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৪৩টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকা করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী গৃহকর্মী শিশুরাও কিন্তু অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে থাকে। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা, ২০১৫ হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক নীতিমালা, যা গৃহকর্মীর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত হয়েছে। এটি মূলত একটি নির্দেশিকা, যা আইন বা বিধির মতো বাধ্যতামূলক নয় বা এ নীতিমালা কোনো আইনের প্রোটেকশন নয়। এটি সরকারের একটি কমিটমেন্ট। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১(৪)(ণ) ধারাটি ১-এর ৪-এর যে ‘ণ’ আছে আমার পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা থাকবে শ্রম আইন থেকে বাদ দেয়ার। আমার বিশ্বাস সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এবং তাদের সুপারিশমালা গ্রহণ সাপেক্ষে সরকার শ্রম আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা এবার আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি থাকবে। তবে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য আলাদা একটি আইন করা দরকার এবং সেটার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার কাজ করা উচিত। নীতিমালায় কী আছে বা না আছে সে বিষয়ে আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং গৃহকর্মীদের সুরক্ষার আইন করার জন্য সিভিল সোসাইটির একটি চাপ তৈরি করা দরকার, যাতে সরকার এ বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়। আমরা সবাই যখন এক সুরেই কথা বলছি সেজন্য এ বিষয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন দরকার। অর্থাৎ গৃহকর্মীদের নিয়ে যেসব সংস্থা কাজ করে তাদের সমন্বয়ে একটি ‘কনসোর্টিয়াম বা মোর্চা’ করা সময়ের দাবি। কারণ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে বরং গঠিত মোর্চার এপেক্স বডির মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েট করে গৃহকর্মীদের অধিকার, সুরক্ষা আদায় করা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, যদি সবাই একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে ‘গৃহকর্মী’ শব্দটি একটি সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে।

ড. হাসনাত এম আলমগীর

অধ্যাপক

সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটি

বড় ধরনের দুর্ঘটনায় গৃহ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলে কেবল তখনই সে খবর পত্রপত্রিকায় আসে। এছাড়া শারীরিকভাবে নারীরা নানা ধরনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যগত সমস্যার মুখোমুখি হন। যেমন আগুনে পুড়ে যাওয়া, কেটে যাওয়া, মচকে যাওয়া, পিছলে পড়ে যাওয়া। এছাড়া পরিচ্ছন্নতার কাজে নানা ধরনের কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করেন, যা তাদের শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। রান্নার ধোঁয়াও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। একই কারণে তাদের নানা রকমের চর্মরোগ হতে পারে। এছাড়া গৃহকর্মীদের স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি তো রয়েছেই। অর্থাৎ বাংলাদেশে হেলথ প্রটেকশন নিয়েই কাজ করার পর্যায়ে রয়েছে। হেলথ প্রমোশন সম্পর্কিত বিষয়ে কাজ করার পর্যায়ে পৌঁছেনি। হেলথ প্রমোশন হলো তাদের ভিটামিনসহ স্বাস্থ্যগত অন্যান্য বিষয়ে কাজ করা। কিন্তু আমরা এখনো তাদের আহত-নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করার সংগ্রামেই আছি। অনেকগুলো সংগঠন দেশের নানা প্রান্তে শ্রমিকদের নানান বিষয়ে কাজ করছে, কিন্তু গৃহ শ্রমিকদের হেলথ প্রমোশনের বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করেনি। এ বোঝা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অনেকে গৃহকর্মীদের আইনের বিষয়টি নিয়ে কথা বললেও গৃহকর্তা ও গৃহকর্মীদের শিক্ষা ও সচেতনতার বিষয়টিতে ঘাটতি রয়ে গেছে। যেটিকে বলা হয় ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টারভেনশন’, যার আওতায় আমরা গৃহকর্মীদের মাস্ক দিতে পারি, স্বাস্থ্যের ঝুঁকি থাকে না এমন কেমিক্যাল ব্যবহারের কথা বলতে পারি। আইনি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এ কাজগুলো থেমে থাকার কোনো কারণ নেই।

খন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত

নির্বাহী পরিচালক

কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর (কাপ)

নগর দরিদ্রদের মধ্যে অন্যতম একটি গ্রুপ হচ্ছে গৃহকর্মী। অনেক বিষয় থাকেলও গৃহকর্মীদের একটি বিষয় নিয়ে আজকের এ গোলটেবিল বৈঠকে আলোকপাত করতে চাই; তা হলো গৃহকর্মীদের রেজিস্ট্রেশন। অনেক সচেতন মানুষই জানেনা না যে গৃহকর্মীদের রেজিস্ট্রেশনের মূল কর্তৃপক্ষ কে? তাই গৃহকর্মীদের আইনগত কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করার বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে একটি পরিপত্র জারি করা প্রয়োজন। তবে গৃহকর্মীদের অবশ্যই তার সংশ্লিষ্ট থানা বা সিটি করপোরেশন এলাকায় রেজিস্ট্রেশনভুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে গৃহকর্মীদের রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা সকলে অবগত নয়। তবে এটি নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কাজ শুরু করলে আমাদের নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করব।

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ

কমিশনপ্রধান

শ্রম সংস্কার কমিশন

গৃহকর্মীদের অধিকার ও আইনি স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা অনেক পুরনো। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত নারী ও শ্রমবিষয়ক দুটি সংস্কার কমিশনই গৃহ শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ করেছে। তার মানে গৃহ শ্রমিকদের আইনের আওতায় আনার জন্য দেশের মধ্যে জন- আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। সেই লক্ষ্যে আমরা এরই মধ্যে জেনেছি যে সরকার আইন সংশোধনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং আশা করা যায় দুই-তিন মাসের মধ্যে আইনটি চূড়ান্ত হবে। তাই আইনের এ সংশোধন প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্টভাবে কী কী প্রস্তাব ও সুপারিশ করা যায় এবং সেক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি। আমরা ধরেই নিয়েছি সরকার এবার বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১(৪)(ণ) ধারাটি বাতিল করবে। তবে আমরা সরকারকে আশ্বস্ত করতে চাই, গৃহকর্মীদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মযজ্ঞ বা পরিবর্তন লাগবে না। একই সঙ্গে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার কাজ ধাপে ধাপে করলেও কোনো সমস্যা নেই। সুতরাং হতাশ হওয়ার কিছু নেই। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় হলো গৃহ শ্রমিকদের থানায় নিবন্ধন করার আইনটি তাদের বিপক্ষের আইন; এটি আমরা চাই না। বরং তাদের মনিটরিং জাতীয় নীতিমালার আওতায় করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

আবুল হোসাইন

ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী

গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক

দীর্ঘ ২৫ বছরে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করে একটি নীতিমালা ছাড়া বেশি কিছু আমরা করতে পারিনি। এবার অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে গৃহকর্মী শ্রমিকদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ এসেছে। তাদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে বড় জায়গাটি হলো বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এ বলা হয়েছে, এই আইন ‘সকল শ্রমিকের জন্য তবে গৃহ শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়।’ এবার এই ‘তবে’-এর অংশটি উঠিয়ে দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি এ মানুষগুলোর জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন তাদের সচেতনতা। এ মানুষগুলোকে সংগঠিত ও সচেতন করতে হবে। এ কাজ আমাদেরই করতে হবে। গৃহকর্মীদের আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হলে বাকি কাজগুলো আমরাই করব। তাদের অধিকার নিশ্চিতের আন্দোলনে অনেক সংগঠন যুক্ত হওয়ায় আমি খুবই আশাবাদী ।

অ্যাডভোকেট সিফাত ই নূর খানম

আইনজীবী

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট

দেশের শ্রম আইনের ধারা-১-এর উপধারা-৪-এর ‘ণ’ অবশ্যই বাতিল করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা আমাদের প্রধান দাবি। এর সঙ্গে গৃহকর্মীকে অবশ্যই নিয়োগপত্র দেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। ১৪ বছরের নিচে গৃহকর্মীদের জন্য শ্রম আইন প্রযোজ্য হয় না। সুতরাং এ আইন তাদের জন্য প্রযোজ্য করার বিধান রাখতে হবে।

আবদুর রহমান

নির্বাহী পরিচালক

আশার আলো সোসাইটি

মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করার পর কিছু অধিকার স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি মানুষের প্রাপ্য। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় থাকে। যেমন গৃহকর্মীরা। তারা তাদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন লড়াই করে আসছেন। গৃহকর্মীকে শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সুতরাং গৃহকর্মীকে স্বাকৃতি দেয়া এবং শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রত্যাশা করি।

এবিএম খোরশেদ আলম

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ও সাবেক সিইও

এনএসডিসি

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নারী গৃহকর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হবে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ শ্রমিক কল্যাণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিয়োগপত্র, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনের জন্য নিয়ম ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে গৃহকর্মীদের জন্য লগ বই চালু করা যায়, যেখানে তাদের কাজের সময় ও অন্যান্য তথ্য লিপিবদ্ধ থাকবে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেট্রোপলিটন এলাকায় গৃহকর্মীদের জন্য পাইলট প্রকল্প হিসেবে গৃহকর্মী উন্নয়ন প্রকল্প চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে গৃহকর্মীদের খাদ্যনিরাপত্তা এবং সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত হবে। রাজউক অনুমোদিত বিল্ডিং ডিজাইনে কর্মজীবী গৃহকর্মীদের সুবিধার্থে দিবাযত্ন কেন্দ্র বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গৃহকর্মীদের নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও আর্থসামাজিকভাবে সহনীয় আবাসন নিশ্চিত করতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন স্বল্পমূল্যের হোস্টেল ও আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষভাবে গৃহকর্মীদের জন্য ২৪/৭ হেল্প লাইন চালু করে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্মীর সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত না হয় এবং সুশিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারে। গৃহকর্মীদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন করা এবং সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের কর্মসংস্থান ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকতে হবে। তাদের বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হলে ক্ষুদ্র স্বাস্থ্য বীমা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

সুমাইয়া ইসলাম

সদস্য, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন এবং

নির্বাহী পরিচালক বিএনএসকে

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের চাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত বড়। কারণ গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অর্থনীতিতে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণের জায়গাটি আমরা দেখেছি। বিশেষ করে বিদেশে যেসব নারী গৃহকর্মী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তারা রেমিট্যান্স প্রেরণে অনেক বড় অবদান রাখছেন। শুধু তা-ই নয়, অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি দেশের মধ্যে গৃহকর্মীরা সেবা প্রদানের মাধ্যমেও পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অবদান রেখে চলেছেন সবসময়। যে গৃহকর্মী আমাদের সন্তানদের, বয়স্কদের দেখভাল করছেন এবং পাশাপাশি গৃহস্থালি কাজে সাপোর্ট দিচ্ছেন, সেই গৃহকর্মীর কাজকে মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের সুরক্ষার জন্য শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তির এ ঐতিহাসিক সুযোগটা আমরা নিতে চাই। কারণ এ গৃহ কর্মীদের কারণেই আমরা ভালো থাকতে পারছি, প্রাত্যহিক পারিবারিক জীবনে চিন্তামুক্ত থাকতে পারছি। তাই দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা গৃহ শ্রমিকদের সম্মান, স্বীকৃতি, উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদানসহ তাদের শ্রম আইনে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সভায় উপস্থিত নীতিনির্ধারকদের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি।

পিয়ারা খাতুন

গৃহকর্মী

কামরাঙ্গীরচর

আমরা তো বাসাবাড়িতে কাজ করি। তাই আমাদের দুটি সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। একটা হলো বাসার ভেতরে, আরেকটা বাইরে। বাসার ভেতরে যেটা তার সবকিছু তো বলা সম্ভব না। তবে এক কথায় বলতে গেলে গৃহকর্মী হিসেবে আমরা কোনো সম্মান পাই না। হঠাৎ করে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়লে বেতন বন্ধ করে দেয়া হয় বা মাস শেষে বেতন কাটা হয় । এটা তো আমরা আশা করি না। আমরা ঠিকমতো বিশ্রাম নিতে পারি না । সকাল থেকে রাত অবধি পরিশ্রম করে বাসার প্রতিটি কাজ করি, অথচ ‘আমাদের কাজটা কাজ হিসেবে’ স্বীকৃতি পাই না। আমরা আমাদের কাজটাকে মনে করতে চাই যে আমরা একটা চাকরি করি, যেখানে সম্মান আছে। আমরা চাই সম্মান, চাই ন্যায্য মজুরি, আর চাই নিরাপদ কাজের পরিবেশ। কাজ করব, খেটে খাওয়ার মর্যাদা নিয়ে বাঁচব—এটুকুই তো চাওয়া। এখানে এসে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা শুনতে পেয়েছি। এগুলোর বাস্তবায়ন হোক—এই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা যেন বাসার ভেতরে-বাইরে অনেক সাহস নিয়ে গর্ব করে বলতে পারি যে আমরা একটি চাকরি করি। আমরা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি চাই। বোঝা হিসেবে না। আমরা পরিশ্রম করে ন্যায়সংগত সম্মান চাই।

একেএম নাসিম

সদস্য, শ্রম সংস্কার কমিশন ও কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সলিডারিটি সেন্টার

প্রস্তাবগুলোর কোনো কোনো বিষয় এখনকার বাস্তবতায় উচ্চাভিলাষী মনে হলেও গৃহ শ্রমিকদের সার্বিক উন্নয়নে এগুলোকে ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। প্রস্তাবে বেশকিছু তথ্য এসেছে, যার মাধ্যমে গৃহ শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে পথনির্দেশনা পাওয়া যাবে। আমরা মনে করি আজকের সভার মাধ্যমে গৃহকর্মীদের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের সমুদয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।

রওশন আরা

পরিচালক

নারীপক্ষ

যাদের জন্য আমরা কাজ করছি তাদের কাছে অর্থাৎ গৃহকর্মীদের কাছে এ বিষয়টি কতখানি পৌঁছাচ্ছে সেটি কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে ২০১৪ সাল থেকে আমরা কাজ করছি কিন্তু সবার কাছে এসব বার্তা পৌঁছায়নি বলে আজকে সবাই বলেছে। আগে যেখানে কোনো আইনই ছিল না, সেখানে এখন অন্তত থানায় গিয়ে একটা মামলা করার মতো আইন আছে। অর্থাৎ কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, কিছু সুযোগ হয়েছে। শ্রমিক হিসেবে কাজ করলে তাদের সুরক্ষা থাকার বিষয়টি আমরা অনেক দিন ধরে বলে আসছি। তাদের স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন ছুটি থাকা দরকার। তবে আমরা যদি তাদের আইনের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি তাহলে এগুলো নিয়ে আমরা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারব। এছাড়া শহরে মনিটরিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামেও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

জাকিয়া সুলতানা

সভাপতি, গৃহকর্মী জাতীয় ফোরাম বাংলাদেশ

অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রামে আমাদের অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়। কিন্তু আদৌ কি সে অধিকার আমরা পেয়েছি? আমরা বিশ্বাস করি সরকারে যারা থাকেন তারা যদি আইন তৈরি করতে পারেন, তাহলে আইন পরিবর্তনও করতে পারবেন। তাই আমরা চাই ২০০৬ সালে প্রণীত আইনের ধারা ‘ণ’ বাতিল করে আমাদের শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণে যে নীতিমালা করা হয়েছে, এখানো বাংলাদেশের ৪০ লাখ গৃহকর্মী সে সম্পর্কে জানে না। একটা নীতিমালা তৈরি করা হলো কিন্তু গৃহকর্মীরা জানল না, তা কী করে হয়! সরকারের উচিত ছিল নীতিমালাটি সম্পর্কে প্রতিটি গৃহকর্মীকে অবগত করা। যাই হোক আমরা শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে শ্রমিকের স্বীকৃতি চাই। এটা আমাদের অধিকার, কোনো আবেদন-নিবেদন নয়!

তপন কুমার দাশ

উপ-পরিচালক

গণসাক্ষরতা অভিযান

গণসাক্ষরতা অভিযান সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিয়ে কাজ করে। এক পর্যায়ে গৃহকর্মীদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ শুরু করে। এ দুটো বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে গণসাক্ষরতা অভিযান কোয়ালিশন ও নেটওয়ার্ক মেম্বারসহ গৃহকর্মীদের অধিকার আদায়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রায় এক দশক ধরে গৃহ শ্রমিকদের সুরক্ষা, অধিকার, আইনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে আমরা বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করে আসছি। কাজ করতে গিয়ে আমরা একটা কনসালটেটিভ ফোরাম গঠন করেছি এ কাজে গাইড করার জন্য। ইডব্লিউসিএসএ প্রকল্পের আওতায় যতগুলো এনজিও কাজ করছে সেসব এনজিও এবং কনসালটেটিভ ফোরামের পক্ষ থেকে আজকের সভায় আমাদের সুপারিশমালা তুলে ধরা হবে। তাই ৮-১০ বছর ধরে আমরা গৃহকর্মীদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের অধিকার নিয়ে অনেক আলোচনা করে আসছি। এখন সময় এসেছে সেটি বাস্তবায়নের। আজকের এ সভার মাধ্যমে সে প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করছি।

আরও