প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান নিশ্চিতে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল ও ভৌত অবকাঠামোর প্রবেশগম্যতা, বিদ্যমান আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ চান এ খাতের নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও অধিকারকর্মীরা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বণিক বার্তা কার্যালয়ে ৩০ জুলাই আয়োজিত ‘বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান: নীতি থেকে বাস্তবায়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এ মতামত তুলে ধরেন। বাংলাদেশ বিজনেস অ্যান্ড ডিজঅ্যাবিলিটি নেটওয়ার্ক (বিবিডিএন), ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন। একই মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ ছিলেন বিশেষ অতিথি

ফারজানা শারমীন

প্রতিমন্ত্রী সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

আমাদের দেশে সব থেকে বড় সম্পদ হলো মানবসম্পদ, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা একে যথাযথভাবে কাজে লাগাচ্ছি না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের সম্পদ, তারা কোনো বোঝা নন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে একটি শক্তিশালী স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে নয়টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীরা সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। আমরা চাই আপনারা আমাদের মেধা ও সরকারি কাঠামোকে ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করিয়ে নিন। কেবল আইন দিয়ে পরিবর্তন সম্ভব নয়, বড় প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবারের ভেতর থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আড়াল করে রাখার যে সামাজিক ট্যাবু আছে, তা ভাঙতে হবে। আমি নিজেও লক্ষ করেছি, আমার মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব লিফট বা ওয়াশ ব্লকের অভাব। তাই এখন থেকে সব নতুন ভবন, শপিং মল ও রেস্টুরেন্টে বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা হবে। আমাদের লজিস্টিকস সীমিত হতে পারে, কিন্তু সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ প্রতিবন্ধকতা জয় করা সম্ভব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা ১০টি বিভাগীয় পর্যায়ে ‘শিশু স্বর্গ’ নামে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং রেসিডেনসিয়াল কেস ম্যানেজমেন্ট চালুর পরিকল্পনা করছি। এখানে এনডিডি (নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার) আক্রান্ত শিশুদের শৈশব থেকেই থেরাপি ও বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা হবে, যেন তারা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।

ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ

সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

বর্তমানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত ভাতার পরিমাণ মাসিক ১ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে এবং প্রায় ৩৮ লাখ ব্যক্তি এ সুবিধা পাচ্ছেন। তবে ভাতার পরিমাণ ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা—দুই-ই আরো বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও সরকারের ‘ফিস্কাল স্পেস’ বা আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, জলবায়ু মোকাবেলা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ঋণ পরিশোধসহ সরকারের একাধিক অগ্রাধিকার রয়েছে। ভাতা সামান্য বাড়ালেও রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। ফলে ভাতার পরিমাণ ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা—উভয়ই বাড়ানো আর্থিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। শুধু শারীরিক প্রবেশগম্যতা নয়, ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি, কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা, সহায়ক প্রযুক্তি, অর্থোটিকস ও প্রস্থেটিকসের সহজলভ্যতা এবং সর্বজনীন প্রবেশগম্য অবকাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশে বর্তমানে ১১৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার মানুষকে সেবা দিতে হয়। এ কারণে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন ও পুনর্বাসনে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প এবং সাভারে ৪৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ একর জমিতে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ চলছে।

তারেক রেফাত উল্লাহ খান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং তাদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের কাছে কেবল একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এ ইনক্লুশন আমাদের ডিএনএতে মিশে আছে। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ভাবতেন এবং আমাদের বলতেন, একজন মানুষকে যদি প্রকৃত সুযোগ দেয়া যায়, তবে প্রতিবন্ধকতা নির্বিশেষে যে কেউ নিজের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারেন। আমরাও বিশ্বাস করি, কর্মসংস্থান কেবল একটি চাকরি নয়; এটি একজন মানুষের মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নাম। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বা ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন আমাদের মূল দর্শন। গত ২৫ বছরে আমরা প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করতে পেরেছি, যা প্রায় দুই কোটি পরিবারের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এমনকি করোনার সময়ও আমরা এক কোটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। এ ধারাবাহিকতায় আমরা সেই মানুষদের কাছে পৌঁছাতে চাই, যারা এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে বা অবহেলিত রয়ে গেছেন। ব্র্যাক ব্যাংকে আমরা হাতেকলমে এ অন্তর্ভুক্তির উদাহরণ তৈরি করছি। ২০২১ সালে মাত্র পাঁচজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আনন্দের বিষয় হলো, সেই পাঁচজনের মধ্যে চারজন এখনো আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করছেন এবং অন্য একজন তার দক্ষতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে তিনি বর্তমানে একটি বহুজাতিক ব্যাংকে কর্মরত আছেন। এ সাফল্যের অনুপ্রেরণায় এ বছর আমরা আরো ছয়জন নতুন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছি।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন

অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিতে আইনগত অগ্রগতি হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো কার্যকর বাস্তবায়ন। সংবিধান এবং বিদ্যমান আইনগুলোতে তাদের অধিকার সুরক্ষার সুস্পষ্ট ভিত্তি রয়েছে। শ্রম আইনেও বৈষম্য দূর করে সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশোধন আনা হয়েছে। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নিয়মিত মনিটরিং। শ্রম অধিদপ্তরের মনিটরিং চেকলিস্টে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের অধিকার-সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একই ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থা এরই মধ্যে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। তাছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতা এখনো সীমিত। তাই বেসরকারি খাতের নিয়োগনীতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা, কর্মস্থলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ও যুক্তিসংগত সুবিধা নিশ্চিত এবং একটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদা কার্যকর নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সমাজকল্যাণ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের মাধ্যমে বিদ্যমান আইনগুলোর কার্যকর প্রয়োগ ও পারস্পরিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শ্রম আইনে কোনো বিষয় আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইনে নির্ধারিত বাধ্যবাধকতাগুলো সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য।

ডা. নাজমুন নাহার

সহকারী মহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর

আমরা মূলত শ্রম আইনের ৩৪৫(ক) ধারা অনুযায়ী কর্মস্থলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করি। যদিও ২০০৬ সালের শ্রম আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে খুব বেশি পৃথক ধারা নেই, তবে ধারা ৪৪ অনুযায়ী কোনো প্রতিবন্ধী শ্রমিককে বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। শ্রম আইনের ৯৪(গ) ধারা অনুযায়ী, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আবাসন সুবিধা থাকলে সেখানে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের অগ্রাধিকার প্রদান করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া দুর্ঘটনাজনিত অক্ষমতার ক্ষেত্রে স্থায়ী বা আংশিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, মালিক কোনো শ্রমিককে এমন বিপজ্জনক কাজ করতে বাধ্য করতে পারবেন না, যা তার জীবনের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বর্তমানে শ্রম আইনে কিছু বিষয় এখনো অস্পষ্ট, বিশেষ করে কর্মস্থলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য রÅvম্প, লিফট, আলাদা টয়লেট বা সাইনেজ রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সীমাবদ্ধতা হলো আমরা ২০০৬ সালের শ্রম আইনের বাইরে যেতে পারি না। তবে পরিদর্শকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ নিয়ে আরো সচেতনভাবে কাজ করতে পারেন। অভিযোগ প্রতিকারের জন্য আমাদের একটি আলাদা টোল-ফ্রি নম্বর (১৬৩৫৭) রয়েছে, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিনামূল্যে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করি।

আবু নাসের

পরিচালক অপারেশনস এসিআই লজিস্টিকস

বর্তমানে আমাদের এখানে মোট ১৮১ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কর্মরত আছেন। আমাদের লক্ষ্য হলো মোট কর্মীবাহিনীর ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেয়া। আমাদের এক হাজারের বেশি শোরুম রয়েছে এবং আমাদের সিদ্ধান্ত হলো প্রতিটি শোরুমে অন্তত একজন করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিয়োগ নিশ্চিত করা। কাজের প্রতি তাদের যে ডেডিকেশন ও সততা, তা অনেক সময় অপ্রতিবন্ধী কর্মীদের চেয়েও বেশি। যেমন আমাদের ক্যাশ কাউন্টারে জান্নাতুল ফেরদৌস নামে একজন কর্মী কাজ করেন, যার হিসাবে আজ পর্যন্ত ১ টাকারও গরমিল পাওয়া যায়নি। শুরুতে কাস্টমাররা হয়তো কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন, কিন্তু পরে এ কর্মীদের আন্তরিকতা ও হাসি দেখে কাস্টমাররা তাদের কাউন্টারেই বেশি ভিড় করেন। তারা কাজকে কেবল জীবিকা নয়, বরং আনন্দ হিসেবে নেন এবং কর্মপরিবেশকে একটি পরিবারের মতো মনে করেন।

অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান

সহকারী মহাসচিব মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)

আমাদের প্রচলিত শ্রম আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, যা একটি বড় সীমাবদ্ধতা। আমি প্রস্তাব করছি, ‘‌প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’-এর সংজ্ঞাটি শ্রম আইনেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এছাড়া শ্রম আইনের ২২ ধারা সংশোধন করা জরুরি। বর্তমানে এ ধারায় শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার কারণে শ্রমিককে সরাসরি ছাঁটাই বা ডিসচার্জ করার সুযোগ আছে। আমরা চাই সেখানে ‘রিটার্ন টু ওয়ার্ক’ বা বিকল্প কর্মসংস্থানের বিধান যুক্ত হোক, যাতে দুর্ঘটনায় আহত বা প্রতিবন্ধী হওয়া ব্যক্তিকে বিদায় না দিয়ে তাকে নতুন দক্ষতায় কাজে ফিরিয়ে আনা যায়। কেবল আইন দিয়ে অধিকার নিশ্চিত হয় না। শ্রম আইন মূলত বেসরকারি খাতের অধিকার নিয়ে কাজ করলেও সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি দীর্ঘকাল উপেক্ষিত ছিল। যদিও বর্তমানে বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এর কার্যকর বাস্তবায়ন বা মনিটরিং এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জোরালো সমন্বয় প্রয়োজন।

ডা. তামান্না নাসরিন

সিনিয়র মেডিকেল অফিসার, শ্রম অধিদপ্তর

টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কর্মক্ষেত্রে সৃষ্ট পেশাগত রোগ ও দুর্ঘটনাজনিত প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ধুলাবালি, রাসায়নিক পদার্থ, অতিরিক্ত শব্দ ও কম্পনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে অনেক শ্রমিক কর্মক্ষমতা হারান। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের অংশ হিসেবে পেশাগত রোগ প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিরোধমূলক পেশাগত স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন। শ্রম অধিদপ্তরের ৩২টি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতি বছর গড়ে দুই লাখের বেশি শ্রমিককে চিকিৎসাসেবা, পেশাগত রোগের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই সমন্বিত পেশাগত স্বাস্থ্য, প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একটি সমন্বিত রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে শ্রমিকরা একই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা পান। দুর্ঘটনার পর কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সুপারিশ সহায়ক হবে।

অমৃতা রেজিনা রোজারিও

কান্ট্রি ডিরেক্টর

সাইটসেভার্স বাংলাদেশ

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানে উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্যোগকে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, চাকরির সঙ্গে সংযুক্তকরণ এবং নিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে কাজ করছে। তবে প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী মনিটরিংয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন সব পর্যায়ের কার্যকর সমন্বয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়োগনীতি, যুক্তিসংগত সুযোগ-সুবিধা ও বৈষম্যবিরোধী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সমাজকল্যাণ ও শ্রম মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় এসব বিষয়কে মূলধারায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে তাদের কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, উৎপাদন শিল্প ও ব্যাংকিংসহ চাহিদাসম্পন্ন খাতগুলোয় প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। কর্মীদের কর্মস্থলে টিকিয়ে রাখতেও পুনঃপ্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থা, পদোন্নতির সুযোগ ও ইতিবাচক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

ফারজানা রেজা

ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার, সোশ্যাল প্রটেকশন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কোনো দয়া, অনুগ্রহ বা সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি মৌলিক মানবাধিকার এবং দেশের মানবসম্পদকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার অপরিহার্য অংশ। কর্মসংস্থান নিয়ে রাজনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিগত অঙ্গীকার, বিভিন্ন আইন, নীতি এবং জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসব নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন। এক্ষেত্রে সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অনেক প্রতিবন্ধী শিশু প্রাথমিক বা অষ্টম শ্রেণীর পর পড়াশোনা করার আর সুযোগ পায় না। ফলে তারা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং আধুনিক দক্ষতা অর্জন থেকেও বঞ্চিত হয়। তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজপ্রাপ্য করতে হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সাফল্যের উদাহরণকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা, সমান সুযোগ নিশ্চিত এবং প্রয়োজনভিত্তিক যুক্তিসংগত সুবিধা প্রদান জরুরি।

ভাস্কর ভট্টাচার্য

কনসালট্যান্ট (অ্যাক্সেসিবিলিটি) এটুআই

প্রযুক্তির যুগে প্রতিবন্ধকতা আর সক্ষমতার বাধা নয়। সহায়ক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবার মতো দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। তবে সবচেয়ে বড় বাধা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও সচেতনতার ঘাটতি। একসময় মানুষ বিশ্বাসই করত না যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজেই ই-মেইল ব্যবহার করতে পারেন। চাকরি খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় শুধু প্রতিবন্ধিতার কারণেই ‘অযোগ্য’ বলে বাদ দেয়া হয়েছে, যা সমাজে প্রচলিত বৈষম্যমূলক মানসিকতারই প্রতিফলন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে প্রধান চারটি বাধা সচেতনতার অভাব, শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি, ডিজিটাল ও ভৌত অ্যাক্সেসিবিলিটির সীমাবদ্ধতা এবং নীতির দুর্বল বাস্তবায়ন। তাই সব মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে ২০২২ সালের ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি গাইডলাইন বাস্তবায়ন জরুরি।

ড. মো. শাহিনুল হক রিপন

প্রোগ্রাম হেড

ব্র্যাক হেলথ প্রোগ্রাম

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাজের প্রতি স্পৃহা, আন্তরিকতা অনেক বেশি। ব্র্যাকে বর্তমানে প্রায় ২৬০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কাজ করছেন। যদিও ব্র্যাকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এ সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম। তবে আমরা তাদের জন্য প্রবেশগম্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছি। ব্র্যাকের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির পরিসংখ্যানগুলো বেশ আশাব্যঞ্জক। ২০০৩ সাল থেকে ব্র্যাক স্কুলে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮০ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে। আমাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে ২২ হাজারেরও বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের মধ্যে পাঁচ হাজার সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ হাজার ৫০০টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিবারকে স্বাবলম্বী করার সুযোগ দিয়েছি।

আজিজা আহমেদ

পরিচালক (অপারেশনস) বাংলাদেশ বিজনেস অ্যান্ড ডিজঅ্যাবিলিটি নেটওয়ার্ক (বিবিডিএন)

কাজ করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই লক্ষ করি যে দেশের প্রচলিত শ্রমনীতি, শ্রম বিধিমালা এবং শ্রম আইনের সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা-সংক্রান্ত আইনের কিছু গ্যাপ বা অসামঞ্জস্য রয়েছে। আমাদের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো কীভাবে এ দুই নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করা সম্ভব এবং কীভাবে আমাদের শ্রম আইন ও বেসরকারি খাত আরপিপিডি অ্যাক্টকে গ্রহণ করে তাদের পলিসি ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। আমরা বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এমন একটি কর্মপরিবেশ চাই, যেখানে তাদের জন্য পৃথক কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন পড়বে না, বরং ইকুইটি বা সাম্যের জায়গা থেকে আমরা সবাই যেন কাজ করতে পারি, সে লক্ষ্যেই আমাদের এগোতে হবে।

শফিক আর ভূঁইয়া

ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান

ইন্টারনাল কমিউনিকেশন অ্যান্ড সিএসআর ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আলাদা বা ‘স্পেশাল’ হিসেবে নয়, সমাজের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে উঠলে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থার প্রয়োজনও কমে আসবে। এ বিষয়ে আইন ও নীতিমালা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সেগুলো সম্পর্কে জানেন না। তাই সরকারি সেবাগুলো সহজভাবে তুলে ধরতে একটি ডিজিটাল ‘কমন সিটিজেন চার্টার’ চালু করা যেতে পারে। বেসরকারি খাতে বৈষম্যহীন নিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ শিক্ষা যদি শুধু শহরকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন।

আরও