রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিনে গত ২২ মে ‘বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের প্রয়োগ ও প্রভাব’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বণিক বার্তা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় আলোচনার সূত্রপাত করেন মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও অংশীজনরা
ড. আহসান এইচ মনসুর
গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক
ডলারের দাম বাড়তে পারে—এ আশায় প্রবাসী বাংলাদেশী ও অ্যাগ্রিগেটরদের কেউ কেউ রেমিট্যান্সের ডলার ধরে রাখছেন। এ কারণে গত এক সপ্তাহে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমেছে। এ পরিস্থিতিতে দাম বাড়ার আশায় ডলার ধরে রাখলে ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলেও ডলারের দর স্থিতিশীল থাকবে। কারণ দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই প্রবাসীদের বলব, আপনার পরিবারের যখন প্রয়োজন তখন রেমিট্যান্স পাঠান। দাম বাড়ার আশায় ডলার ধরে রাখলে পরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। অ্যাগ্রিগেটররা সর্বোচ্চ পাঁচদিন ডলার ধরে রাখতে পারেন। এ সময়ের মধ্যে তাদের ডলার বিক্রি করতেই হবে। এ পাঁচদিনের ডলার ব্যবস্থাপনা করার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে। যথাসময়ে ডলার বিক্রি না করলে প্রবাসীদের পাশাপাশি বাংলাদেশে রেমিট্যান্স নিয়ে আসা মানি ট্রান্সফার ও অ্যাগ্রিগেটর প্রতিষ্ঠানকেও ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করতে সামষ্টিক অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। ডলারের দাম বাজারে ছেড়ে দেয়ার পর আমরা ব্যাংকগুলোয় কোনো হস্তক্ষেপ করছি না। সকালে ও বিকালে আমাদের কাছে সব ব্যাংকের লেনদেনের তথ্য আসছে, আমরা তা পর্যবেক্ষণ করছি। আমি মনে করি, এটিই যথেষ্ট। হঠাৎ করে যদি ডলারের দাম বেড়ে যায় তাহলে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য আমাদের কাছে ৫০ কোটি ডলারের তহবিল আছে। তবে আমি মনে করি, এ তহবিল আমাদের ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না। নিরাপত্তার জন্য এটি রাখা হয়েছে। আমাদের এখানে ফরওয়ার্ড মার্কেট ডেভেলপ করেনি। এটা করলে ভালো হতো। দেশে একটি দক্ষ ও উন্নত ফরওয়ার্ড মার্কেট থাকা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। এখন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি ৩-৪ শতাংশে নিয়ে আসা। আমি মনে করি, আগস্টের মধ্যে আমাদের মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের মধ্যে চলে আসবে। বছর শেষে এটি ৫ শতাংশের মধ্যে চলে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কম থাকায় আমাদের অনেক সুবিধা হচ্ছে। আমরা কিন্তু আমদানি সংকুচিত করছি না। বিলাসপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আমি নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষপাতী নই। উচ্চ হারে কর পরিশোধ করে কারো সামর্থ্য থাকলে তাহলে সে বিলাসপণ্য কিনবে। এতে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে যার সামর্থ্য আছে সে তখন বিদেশে গিয়ে বিলাসপণ্য কিনবে। এতে তো আমাদের কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে দেশে খরচ করা ভালো। ব্যবসায়ীদের বিনিময় হারের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই যদি অর্থ পরিশোধ করে দেয়া হয় তাহলে বিনিময় হারের ঝুঁকি ব্যবসায়ীদের ওপর আর থাকে না, সেটি ব্যাংকের ওপর চলে যায়। কিন্তু আপনি যদি ছয় মাস পর এলসির অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বিনিময় হারের কারণে লোকসানে পড়েন, তখন তো কাউকে দোষ দেয়া যায় না। বাংলাদেশীদের শত শত বিলিয়ন ডলার সম্পদ দেশের বাইরে আছে। আমি যদি হিসাব করি, কেবল নর্থ আমেরিকায় বাংলাদেশীদের কত শত বিলিয়ন ডলার রয়েছে। কথা হলো, কেন তারা বিদেশে টাকা রাখতে চায়। উত্তর হলো সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও সম্পদের ভ্যালু। সিকিউরিটি যেকোনো মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার সম্পদ বাংলাদেশে নিরাপদ কিনা, সেটি বড় প্রশ্ন। এটি যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, তাহলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হবেই।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল
কান্ট্রি ম্যানেজার মাস্টারকার্ড
বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পর আমরা ব্যাংক ও মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছি। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাজার স্থিতিশীল রাখতে হবে। আমরা দেখছি, গত এক সপ্তাহ বাজার স্থিতিশীল ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া সিদ্ধান্তটি খুবই সময়োপযোগী। সবার দায়িত্ব হবে ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখা। প্রবাসীরা ভাবছেন ডলারের দর হয়তো বেড়ে যাবে। এ কারণে কারো কারো মধ্যে ডলার ধরে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্পষ্টভাবে এ বার্তা পৌঁছানো দরকার যে ডলারের বাজার স্থিতিশীল থাকবে। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পরও ডলারের দর বাড়বে না। প্রবাসী ভাই-বোনেরা ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত আমরা যে প্রবণতা দেখছি, তাতে মে মাসে ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন
নির্বাহী পরিচালক
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা নিয়ে অনেক শঙ্কা ছিল। অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার দিক থেকে বিবেচনা করলে আমাদের একটা না একটা সময় বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের দিকে যেতেই হতো। কবে আমরা বাজারভিত্তিক করব সেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্তমানে রিজার্ভ স্থিতিশীল আছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমতির দিকে, এটা অনেক দিন থাকবে। নিত্যপণ্যের দামও এখন আন্তর্জাতিক বাজারে কম। গত আগস্টের পর থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ অনেক ভালো, রফতানি একটা শক্ত ভিত্তি পাচ্ছে, টাকা পাচার বন্ধ হয়েছে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই। অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার করা যাচ্ছে, অনেক নীতি গ্রহণ করা যাচ্ছে। ব্যাংক ঋণের সুদের ওপর থেকে সীমা তুলে দেয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার এটাই সুবর্ণ সময়। এতে রফতানিকারকরা অসুবিধার মধ্যে পড়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমে গিয়েছিল। বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে দেশে অনেক দিন ধরে বিনিময় হার ধরে রাখা হয়েছিল। এতে রফতানিকারকরা অসুবিধার মধ্যে পড়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমে গিয়েছিল। এ পরিস্থিতি থেকে এখন বের হয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। তবে এখন ভালোভাবে মনিটরিং করতে হবে, যেন ঘন ঘন দাম ওঠানামা না করে। তাহলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাবেন। তাছাড়া টাকার দাম অনেক বেশি কমে গেলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। ব্যাংকগুলো তাদের ওয়েবসাইটে বৈদেশিক মুদ্রার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বিনিময় হার প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষ সহজে জানতে পারবে। পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীদের আরো বেশি জামানতবিহীন ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। সামনে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমাদের অনেক সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। ফলে সেদিকে খেয়াল রেখে বাজার স্থিতিশীল করতে হবে। শ্রীলংকার উদাহরণ বারবার দেয়া হচ্ছে। তারা কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। আমাদেরও একই পথে যাওয়া উচিত। কারণ শ্রীলংকাও আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক নানা সংস্থার সঙ্গে আমাদের মতোই যুক্ত ছিল, নানা বিধিনিষেধ মেনে চলেছে। তার মধ্যেই তারা নিজেদের অর্থনীতির উন্নয়ন করতে পেরেছে। ভৌগোলিক রাজনীতির কারণে এ অঞ্চলে যে নতুন অর্থনৈতিক মেরুকরণ হচ্ছে সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। কারণ এর আঘাত যেন আমাদের অর্থনীতিতে না লাগে। এই যে ট্যারিফ বাড়ানো হলো সেটি যদি কমানোও হয় তারপরও আরো অনেক চিন্তার বিষয় আছে। যেহেতু আগামী বছর বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ করবে সেখানেও কিন্তু ট্রেড নিয়ে রফতানির বিষয়ে একটা পদক্ষেপ নিতে হবে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
চেয়ারম্যান
জিপিএইচ ইস্পাত ও ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপ
বিনিময় হার যদি ২০১৮-১৯ সালের মতো করা যেত তাহলে আমরা যারা কাঁচামাল আমদানি করি তারা বিপদে পড়তাম না। আমাদের যে হাজার হাজার কোটি টাকা মুদ্রা বিনিময়ে হারের কারণে ক্ষতি হয়েছে সেটি আর হতো না। আমরা ১০৫ টাকা হিসাব করে আমাদের পণ্য বিক্রি করে ফেলেছিলাম। সেটা পরবর্তী সময়ে ক্ষতির মাধ্যমে আমরা ১২২ টাকা, ১২৩ টাকা হিসেবে ডলার কিনে ব্যবসা করতে হয়েছে। আমার নিজেরই ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি। আর্থিক খাতে বড় একটা সংস্কার প্রয়োজন ছিল। যেটা বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে হয়েছে। জ্বালানি তেলসহ বিশ্ববাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম এখন কম। আইএমএফসহ দাতা সংস্থাগুলোর ঋণও আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে। ফলে আমি মনে করি, আগামী কয়েকদিন বিনিময় হার নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। ২০২০-২১ সালেও আমাদের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেটি ২২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ওই সময় জ্বালানি তেলসহ প্রতিটি পণ্যের দাম দ্বিগুণ কিংবা তার চেয়েও বেশি হয়ে গিয়েছিল। বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫০ কোটি ডলারের তহবিল গঠন করেছে। আমি মনে করি, আগামীতে কোনো বড় দুর্যোগ এলে এত ছোট তহবিল দিয়ে কিছু হবে না। এটি বাড়িয়ে ৫-৬ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে ডলারের দাম যেন বাজার দেখে সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করা হয়। যদি বাড়ে বাড়িয়ে দেয়া, যদি কমে কমিয়ে দেয়া দরকার। টাকার ভ্যালু যতটুকু হওয়া উচিত ঠিক ততটুকুই যেন হয়। আমাদের এখানে দুইটা ইকোনমি আছে। একটা রুরাল ইকোনমি, আরেকটা আরবান ইকোনমি। রুরাল ইকোনমি কিন্তু টোটাল ইকোনমিটাকে টিকিয়ে রেখেছে। কারণ তাদের আত্মীয়স্বজন বিদেশ থেকে টাকা পাঠান। ফলে তাদের যদি বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয়, যেমন সামাজিকভাবে সম্মান দেয়া, কোনো জায়গায় কোনোভাবে সম্মানিত করা ইত্যাদি; তখন তাদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর আগ্রহ বাড়বে।
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ
চেয়ারম্যান
অগ্রণী ব্যাংক
আমাদের এখানে বিদেশ থেকে অনেক বিলাসপণ্য আমদানি করা হয়; যেমন গাড়ি, বিস্কুট, কসমেটিকস ইত্যাদি। এটি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। তাহলে ডলারের চাহিদা এমনিতেই কমে আসবে। দেশে রফতানির অর্থ সময়মতো আসে না। তারা কী ভেবে এটা করেন আমি জানি না। বাংলাদেশ ব্যাংক যেন এটা তদারকি করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানির অর্থ দেশে না আনলে জরিমানার বিধান করতে হবে। পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে যেন কোনো প্রভাব না পড়ে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। যারা রেমিট্যান্স পাঠান তারা সবসময় একটু বেশি দাম পেতে চান। এটা স্বাভাবিক। কারণ তারা বিদেশে কষ্ট করে টাকা পাঠান। প্রবাসীদের জন্য দেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে। রেমিট্যান্স সংগ্রহের কাজ যে কেউ করতে পারে, কিন্তু সেটি যাতে ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এর আগে ডলারের দাম কয়েক মাসের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেড়েছিল। এতে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিনিময় হার এখন বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ায় এভাবে লাফ দেয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রাও রাখা প্রয়োজন, যাতে একক কোনো মুদ্রার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীলতা না থাকে।
উজমা চৌধুরী
ডিরেক্টর (ফাইন্যান্স)
প্রাণ আরএফএল গ্রুপ
ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের দিকটা যদি একেবারে সংক্ষেপে বলি তাহলে দেখা যায় ডিমান্ড আসছে আমদানির কাছ থেকে এবং সাপ্লাই আসছে রফতানি আর রেমিট্যান্সের কাছ থেকে। এখন বাস্তবতা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর বাংলাদেশের কোনো কিছুর হাত নেই। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের যে চাহিদা সেটি আমরা কমাতে পারব না। যেমন বেসিক ফুড বা শিল্পের কাঁচামাল ইত্যাদি। যেসব জিনিসকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব সেসব জায়গায় যদি আমরা কাজ করি তাহলে বাজারের বিনিময় হারটা আমরা একদম ছেড়ে দিতে পারি। যেমন এলসি ভ্যালুগুলোকে যদি আমরা আন্ডার-ওভারের জায়গায় হাত না দিই, দেশের থেকে যদি ডলার খুব বেশি না চলে যায়, যেসব কারণে যাচ্ছে সেসব কারণ বন্ধ করে রাখতে পারি তাহলে মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে সমস্যা নেই। এখন হঠাৎ করে যদি কোনো একটি মাসে এলসি অস্বাভাবিক বেড়ে যায় এবং পেমেন্টগুলো তিন মাসের মধ্যেই পড়ে তখন জটিলতা দেখা দেবে। একটা হিসাব করে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।
শিহাবুল হাসান
রিজিওনাল অপারেশন ম্যানেজার, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন
আমরা আসলে সাপ্লাই সাইডকে রিপ্রেজেন্ট করছি। আমাদের কাজ হচ্ছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স তাদের পরিবারে পৌঁছে দেয়া। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করে দেয়ায় সবচেয়ে ভালো হয়েছে। একটা ভয় ছিল বাজারভিত্তিক করে দিলে লাফ দিয়ে দাম বেড়ে যাবে, এটা হয়নি। এটা একটা ভালো সাইন। অনেক সময় ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় অনেকে কারেন্সি ধরে রাখে। কিন্তু গত এক সপ্তাহে আমরা চাহিদা ও জোগান ঠিকভাবে চলতে দেখছি। ফলে দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আমরা সবসময় গ্রাহকদের বলি, কেন তাদের ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো উচিত। অনেক প্রচারণা চালাচ্ছি। অনেকেই আমাদের কাছে জানতে চান, দাম বাড়বে কিনা, আমরা বলি না এমন কোনো আশঙ্কা নেই।
ড. এম মাসরুর রিয়াজ
চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ
ব্যাংকগুলো হচ্ছে প্রাইস গিভার। তারা টেকার না। ফলে তাদের ব্যাংকগুলোকে নৈতিক আহ্বান বা অনুরোধের মাধ্যমে পারব না। তাদের মনিটরিং টুল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমাদের বিনিময় হারকে ২০১৮-১৯ সাল থেকে চেপে ধরা হয়েছিল। সেখান থেকে একটা ফিক্সড জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে বিনিময় হারকে চাপিয়ে রাখা যায় না। এটা বেশিদিন রাখার কারণে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়াটা একটি কঠোর সিদ্ধান্ত। এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঠিক কোনো সময় নেই। সাহস করে শুরু করতে হয়। আগামী জুনের মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারের মতো আসবে। ফলে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করাটা সঠিক হয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কম। ফলে সামনে পণ্য আমদানিতে আমাদের বেশি অর্থ ব্যয় হবে না। অভ্যন্তরীণ বাজারে আমাদের চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে কমোডিটি প্রাইস আন্তর্জাতিক বাজারে কমে আসছে। ফলে এ কারণে আমাদের ডলারের ওপর চাপ পড়বে না। মাঝে একবার ৬ বিলিয়ন ডলারে গেছে আমদানি। তবে আমার মনে হয় এটা আর এতটা হবে না। বিনিয়োগ শ্লথ হওয়ার কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও কম থাকবে, যা ডলারের ওপর চাপ কমাবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানির দামও নিম্নমুখী থাকবে। বৈশ্বিক বাজারে আমাদের তৈরি পোশাকের চাহিদা রয়েছে। ফলে আমরা তৈরি থাকলে রফতানি বাড়বে। বাজারে ছেড়ে দেয়ার পর তদারকির নামে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপাচাপি করা যাবে না।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক
বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ায় খুবই ভালো হয়েছে। টাকার সঠিক মূল্যায়ন হলে আমাদের এখানে রফতানি বৃদ্ধি পাবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে রেমিট্যান্স এখন আরো বাড়বে। কারণ হুন্ডির প্রবণতা কমে আসবে। কাগজে-কলমে আমরা দেখছি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ আসছে। কিন্তু আদতে এটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স নয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন অ্যাগ্রিগেটরদের সংগৃহীত রেমিট্যান্সই যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে দেখানো হচ্ছে। পরিসংখ্যানের এ ত্রুটি সংশোধন করা দরকার। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র যদি রেমিট্যান্সের ওপর ৫ শতাংশ কর আরোপ করে তাহলে আমাদের এখানে প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা না কমে উল্টো বাড়তেও পারে। পণ্যের দাম বেড়ে গেলে ভোক্তারা একটু কম দামি পণ্যের দিকে ঝুঁকবে। আর আমরা কিন্তু সে দেশের মধ্যবিত্তদের জন্যই পণ্য তৈরি করি। একটু কম দামের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে বেশি পাঠাই। ফলে এই বাজারটা বাংলাদেশ থেকে অন্য কোথাও যাবে না। তাই আমার কাছে মনে হচ্ছে বিনিময় হার বাজারের ওপর ছাড়ার সময়টা বেশ ভালো হয়েছে।
মো. রুহুল আলম আল মাহবুব
চেয়ারম্যান
ফেয়ার গ্রুপ
একবার আমরা প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে এলসি খোলার পর পেমেন্ট করতে গিয়ে দেখি ডলারের দাম ১০৫ থেকে ১১০ টাকা হয়ে গেছে। মানে ছয় মাসের কম সময়ে কয়েকশ কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়লাম। আমরা ব্যবসায়ীরা কত সামর্থ্য রাখি? ৫ থেকে ১০ শতাংশ সর্বোচ্চ। কিন্তু বেড়ে গেল ২০ শতাংশের বেশি। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণের ফলে ডলার হঠাৎ করে এমন লাফ দেয়ার সুযোগ নেই। আমি মনে করি, এটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারক করতে হবে, যাতে ডলার নিয়ে কারসাজি না হয়।