নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ‘বিকল্প’ না ভেবে ‘প্রকৃত জ্বালানি’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কেননা মানুষ শুরুতে এ জ্বালানিই ব্যবহার করত, কিন্তু সে তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানির ইতিহাস অল্পদিনের। বর্তমান বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। বণিক বার্তা ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় এ কথা বলেন অংশীজনরা। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে বৈঠকটি গত ২৪ মে বণিক বার্তা কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রামের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান
উপদেষ্টা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে নারীর একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশে ২০০২ সালে সোলার ব্যবস্থা প্রকল্প শুরু হয়। তখন দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে দেখা যেত, ঘরে সৌরবিদ্যুৎ নেয়া হতো ৯০ শতাংশ নারীর মতামতের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে নারীরা সৌরবিদ্যুৎ নিতে স্বামীকে জোর করেছে। শুধু তা-ই নয়, সৌরবিদ্যুতের প্লেট পরিষ্কারসহ রক্ষণাবেক্ষণে নারীরা ভূমিকা রেখেছে। সারা দেশে সৌরবিদ্যুতের সূচনা এসেছে নারীদের হাত ধরে। বাংলাদেশসহ বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে একটি নতুন ও বিকল্প জ্বালানি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এটি ভ্রান্ত একটি ধারণা। সৃষ্টিলগ্ন থেকে পৃথিবীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছিল এবং এটি থাকবে। এখন যে জীবাশ্ম জ্বালানির কথা আমরা বলছি এটির বয়স সর্বোচ্চ ৩০০ বছর। যখন থেকে কয়লা উৎপাদন শুরু হয়েছে তখন থেকে এ জ্বালানি এসেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নতুন কিছু নয় এবং বিকল্পও নয়, এটিই প্রকৃত জ্বালানি। জীবাশ্ম জ্বালানিই বিকল্প জ্বালানি। কয়লা তো মাটির নিচ থেকে উৎপাদন হচ্ছে। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি সূর্য থেকে। সূর্য তো সব শক্তির উৎস। এখানে আমাদের একটা মানসিক ভ্রান্ত ধারণা আছে। এ দেশের প্রকৌশলীরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কোনো প্রকল্প নিতে চান না। কারণ গ্রিডে প্রকল্প হলে জার্মানি যাওয়া যায়, দুর্নীতি করা যায়। এসব জায়গায় কাজ করছে সরকার। সরকার চায়, বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো আছে সেগুলো দূর করা। এখানে একটি সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে। সবাইকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে তুলে ধরতে হবে। বিকল্প খাত থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের মূল সমস্যা দুর্নীতি আর অপচয়। এ দুটি কমাতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ স্বয়ংক্রিয় পছন্দের জায়গা করে নেবে। দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থায় আসতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ হবে প্রাকৃতিক পছন্দ। কাউকে সৌরবিদ্যুৎ নিতে বলতে হবে না। সৌরবিদ্যুতে যাওয়া কোনো অপশন নয় বরং বাধ্যতামূলক। অনেকেই এটাকে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প মনে করতে পারেন। আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে। আর প্রচেষ্টা থাকলে চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা সম্ভব হবে। সে প্রচেষ্টা থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির নীতিমালা ২০২৫-এ হাত দিয়েছি। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যাপারে আমরা মুখে বলি কিন্তু এটি করার ক্ষেত্রে আমাদের একটা অনীহা আছে। তবে সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেষ্ট।
প্রকৌশলী মো. সেলিম ভূঁইয়া
ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব)
রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। জামালপুর ও পটুয়াখালীসহ মোট চারটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। আমরা চেষ্টা করছি, এখন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাতে কয়লা কিনতে না হয়। তাই সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তারমধ্যে সোলার প্যানেল স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নারী ও প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ দেয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মশক্তিতে আদিবাসী যুবকদের প্রবেশের জন্য বৃত্তি ও ইন্টারশিপের সুযোগ করে দেওয়া, যেখানে আমরা সিএসআর ফান্ড ব্যবহার করতে পারি। প্রযুক্তিগত এবং নেতৃত্বে নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রবেশযোগ্য করতে ভর্তুকির জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করছি। আশা করি, সরকার এখানে ভর্তুকি দেবে। এনজিওর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে গ্রামে জ্বালানি সমবায় বা জ্বালানি সমিতি করা যেতে পারে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করতে কর্মসূচি হাতে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক সম্প্রদায়ের জন্য গবেষণা করতে পারি। নতুন যেসব প্রকল্প আমাদের আছে সেখানে নারী ও স্থানীয়দের আরো বেশি অন্তর্ভুক্ত করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী।
মোহাম্মদ নূরে আলম
চিফ অপারেটিং অফিসার
বিএলআইএল (সোলার অ্যান্ড পাওয়ার), প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ
সোশ্যাল হাব নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ভালো একটা বিজনেস মডেল হতে পারে। গ্রাম, ইউনিয়ন অথবা উপজেলাভিত্তিক একটা হাব তৈরি করার পর একজন নারী উদ্যোক্তা নিজের বাড়িতে থেকেও সেটা পরিচালনা করতে পারবেন। এটা একটা খুব ভালো বিজনেস মডেল হতে পারে।
শাহীন আনাম
নির্বাহী পরিচালক
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
সোলার প্যানেলের দাম কমে আসাটা আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক। কিন্তু এখানে বিনিয়োগের দরকার আছে। আমাদের অনেক সম্ভাবনা আছে। দায়িত্বরত সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিগত জায়গায় অনেক পরিবর্তন চলে আসে। যার ফলে অনেক সময় সে প্রকল্পগুলো থেমে যায়। এবং সেই সঙ্গে সম্ভাবনাগুলোও থেমে যায়। তাই যতই আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলি, এর সঙ্গে নারীর বিষয়টি যোগ করার কোনো বিকল্প নেই। কারণ ব্যক্তিগত জীবনে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি ভুক্তভোগী হয়। জ্বালানির অভাবে নারী প্রতিদিন যে সময় ব্যয় করে, সেখান থেকে যদি তাকে মুক্ত করা যায়, তাহলে সে অনেক কার্যকরভাবে তার সময় ব্যবহার করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত যা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগবে।
হাসান মেহেদী
প্রধান নির্বাহী
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন)
বাংলাদেশে ৫৬ শতাংশ বিদ্যুৎ আবাসিকে ব্যবহার করা হয়। আর আবাসিক খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ নারীরা ব্যবহার করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় সামগ্রিক ভ্যালু চেইনে প্রাথমিকভাবে ৩০ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ অংশগ্রহণ নিশ্চিতে সহজ ও কম খরুচে কিছু কর্মপরিকল্পনা নেয়া দরকার। এক্ষেত্রে ‘ফিড-ইন-ট্যারিফ’ (বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে) দেয়ার চেষ্টা করা উচিত। সুদবিহীন অথবা কম সুদে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নারীদের জন্য একটা ঋণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। জ্বালানি খাতের করপোরেট গভর্ন্যান্সে গড়ে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ নারী আছে। সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য একটা নির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। সব জ্বালানি প্রকল্পে স্থানীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএম) এবং পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা (ইএসএম) কমিটি করতে হয়। এই জিআরএম ও ইএসএমে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে আমরা যতই তৃণমূল পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করতে চাই না কেন, আদৌতে কোনো লাভ হবে না।
এসএম মনিরুল ইসলাম
ডেপুটি সিইও ও সিএফও, ইডকল
শিল্প-কারখানার ছাদগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ তৈরির চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ মেগাওয়াটের জন্য অর্থায়ন করেছি। আমরা শুধু এ লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছি না। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির ছাদগুলো ব্যবহার নিয়েও ভাবছি। এখানে অনেক সম্ভাবনা আছে। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি।
তাহরিম চৌধুরী আরিবা
গ্লোবাল লিড গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ লিড স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস (জিএসসিসি)
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকল্প কিছু নয়, এটিই প্রকৃত জ্বালানি। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি বা পাওয়ার প্লান্টে প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশুরা। তাই জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে জাতীয় পর্যায়ে আমাদেরকে একটি জেন্ডারভিত্তিক জোট তৈরি করতে হবে। এটি যদি করতে না পারি তাহলে আমাদের আওয়াজ জোরালো করতে পারব না। আমরা জানি নারীদের অনেক সংগঠন, জোট আছে। এর জন্য এমন একটি নীতিমালা প্রয়োজন যার মাধ্যমে নারীদের এ ভয়েসটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়া যায়।
অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী
পরিচালক
সিইআর, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্টেম বিভাগগুলোয় মেয়েদের খুব বেশি অংশগ্রহণ দেখি না। কিন্তু মেডিকেলে আবার উল্টো। নারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সেজন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ অনেক বেশি। প্রচলিত জ্বালানির প্লান্টে খুব কম নারী প্রকৌশলী পাওয়া যাবে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বেশ সুযোগ আছে। কারণ এখানে মাঠে লোক লাগে কম। ডেস্কে বসেই অনেক কাজ করা হয়। অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এগুলোয় বেশি নজর দেয়া জরুরি। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমরা চাই বা না চাই, বাজারে চলে আসবে। কারণ এটা সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতামূলক।
বনশ্রী মিত্র নিয়োগী
পরিচালক, রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রাম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে নতুন যে নীতিমালা এসেছে সেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে কিনা এবং সেখানে জেন্ডার দৃষ্টিকোণ দেখা হয়েছে কিনা সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে সে নীতিমালার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা আছে কিনা সেটিও পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। নবায়নযোগ্য শক্তির যে প্রযুক্তিগুলো আছে সেখানে সব পর্যায়ের নাগরিকরা অংশগ্রহণ করতে পারছে কিনা, পারলে সে সুযোগ কতটুকু- আমরা দেখতে চাচ্ছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও ব্যবহারে নারীদের ভূমিকার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছতে পারছে কিনা। নারীরা পরিকল্পনায় অংশ নিতে পারছে কিনা, উদ্যোক্তা তৈরি কী সুযোগ পাচ্ছে? জ্বালানির দারিদ্র্যের জন্য নারীদের কী কী সমস্যা হচ্ছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে নারী ও প্রান্তিক মানুষের কী অবস্থা সেটি দেখতে চাই। গ্রীন চাকরিতে নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে কী কী ব্যবস্থা আছে। নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ কতটুকু আছে। এসব প্রশ্ন আমরা করতে চাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-এ। আমাদের লক্ষ্য নীতিমালায় সব পর্যায়ের নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এ বিষয়গুলোয় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের মধ্যে একটি পারস্পরিক সহযোগিতা তৈরি করতে হবে। জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫-এ কৌশলগত বিষয়টিকে বড় করে দেখা হয়েছে। জেন্ডার বিভাগ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে ঘাটতি রয়ে গেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি দেশের মোট জ্বালানির ২০-৩০ শতাংশ পূরণ করার যে টার্গেট নেওয়া হয়েছে, সেটি উচ্চাভিলাষী। এটি আদৌ পূরণ কঠিন হয়ে যেতে পারে। এখানে একটি পরিকল্পনা ও মাস্টারপ্ল্যান থাকতে হবে। এছাড়া নীতিমালা ও মাস্টারপ্ল্যানের মধ্য একটি মিল থাকতে হবে। নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
শফিকুল আলম
লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস, বাংলাদেশ
নারীরা একটি হাউজহোল্ডের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারা সবকিছু ম্যানেজ করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আগে হয়তো এতটা সুযোগ ছিল না। এখন সামনের দিনগুলোয় তারা কীভাবে যুক্ত হতে পারে সেটা ভাবতে হবে। কারিগরি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নারীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। নারীদের জন্য এসএমই ফান্ডসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তারা যদি উদ্যোক্তা হতে চায় তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক এখানে আরো কাজ করতে পারে। তার আগে চিন্তা করতে হবে—এটা কতটুকু প্রয়োজন। ফান্ড আছে পাশাপাশি চাহিদার জায়গা থেকেও বিষয়টিকে দেখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রীন ফাইন্যান্সে বড় অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু সেই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত ব্যবহার, এনার্জি এফিশিয়েন্সি ও কারিগরি বিষয়গুলোয় বড় আকারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে অনেকে ভাবছেন চাকরি চলে যেতে পারে। আসলে সেটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ গ্রিডের বিদ্যুতের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ থেকে কিছুটা অংশ রুফটফে ব্যবহার করবে। এতে তার ব্যয় কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে। সুতরাং চাকরি যাবে না বরং আরো কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কারণ ভ্যালু চেইন এবং ইকোসিস্টেমের কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক লোক প্রয়োজন হবে।
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
বণিক বার্তা
বাংলাদেশ একটি নিম্নমধ্য আয়ের দেশ যেখানে জ্বালানির দাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্রীন এনার্জি বা ক্লিন এনার্জি প্রমোট করার মাধ্যমে পরিবেশকে বাঁচানো ও ভোক্তাকে কিভাবে সাশ্রয়ী করা যায়, সে বিষয়টি আমাদেরকে ভাবতে হবে। জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে আমাদেরকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক দিন ধরেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করে একটি সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা যায় ।
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন
রেক্টর বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা ৫ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। এখন সেটিকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে কীভাবে উন্নীত করা সম্ভব সেটি আমাদের ভাবতে হবে। এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমাদের যে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন ছিল সেটি এখন হয়ে গেছে। এখন এটিকে স্কেলআপ করা। নবায়নযোগ্য খাতে প্রসার শুধু সরকারের এককভাবে সম্ভব নয়, এ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে একটা বিজনেস মডেল দিতে হবে। কারণ এটি না হলে বেসরকারি খাত কিন্তু আসবে না। বিজনেস মডেলের বিষয়টি বিবেচনা করলে রুফটপ সোলার কিন্তু দাঁড়িয়ে গেছে। সাধারণ বাসাবাড়িতে মিটারপ্রতি সাড়ে ৬ টাকা এবং কর্মাশিয়াল ভোক্তাদের ১১ টাকা পর্যন্ত বিল দিতে হয়। কিন্তু রুফটপে নিজের খরচে করলে ৩ টাকা ৫৭ পয়সা। এখন সেটি আড়াই টাকায় নেমে এসেছে। টেকনোলজি এগিয়ে যাওয়ার কারণে সোলারে খরচ এখন অনেক কমে গেছে। এখন এ খাতকে প্রসার করতে হলে স্কিল ডেভেলপমেন্ট বাড়ানো দরকার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নবায়নযোগ্য খাতের অনেক প্রকৌশলী কাজ করছেন কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। তাদের অনেকের ভেতরেও স্কিল গ্যাপ রয়েছে, এটা প্রধান অন্তরায়। এটা বাড়ানো প্রয়োজন। এখানে সরকারিভাবে যারা এসব করবেন তাদের নিয়েও কাজ করার দরকার আছে। এছাড়া আরেকটি কাজ করা যেতে পারে, সোলার সিস্টেমে যে পিও-গুলো ছিল তাদের আবারো ফিরিয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সোলার প্যানেলকে সেচ ব্যবস্থায় যুক্ত করা। কিন্তু এখনো সেখানে বিজনেস করা যায়নি। এ জায়গায় কাজ করা গেলে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।
আবুল কালাম আজাদ
ম্যানেজার
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আমরা যে কথাবার্তাগুলো বলি, সেগুলো শুনতে সুন্দর মনে হলেও চর্চার জায়গাটা গতানুগতিক পর্যায়েই রয়ে গেছে। আমাদের জ্বালানি নীতিগুলো একটির সঙ্গে আরেকটির মিল নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি আরেকটা বিতর্ক তৈরি করছে জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের মধ্যে। এটা ইতিবাচক কিছু হয়নি। আবার নীতিমালাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি রূপান্তরের আলোচনা পুরোটাই অনুপস্থিত। একটা জাতীয় নীতি যখন করা হয়-বাংলাদেশের যে নিজস্ব চরিত্র, সংস্কৃতি, নারীদের জীবন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আছে, সে জিনিসের ছাপ আমরা আমাদের কোনো নীতিমালায় দেখি না। আমাদের জাতীয় মহাপরিকল্পনা আইইপিএমপি বা পিএসএমপিতে আমাদের কোনো অবদান নেই। এগুলো বাইরের মাথা থেকে সরাসরি এসেছে, স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়নি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন থেকে আরো উপস্থিত ছিলেন
ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর (ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট ইউনিট)
মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন, ম্যানেজার (প্রোগ্রাম)
মৌসুমী ইয়াসমিন, অ্যাডভোকেসি অফিসার
ফাহিম রেজা শোভন, কমিউনিকেশন ও ডকুমেন্টেশন অফিসার