জনপ্রতিনিধিদের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের আলোকে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কার প্রয়োজন

‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে পলিসি এডভোকেসি ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন, নেটওয়ার্ক, ইনস্টিটিউট, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের প্লাটফর্মকে সাথে নিয়ে গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত ‘শক্তিশালী স্থানীয় সরকার জাতীয় কনভেনশন’ আয়োজনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।

‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে পলিসি এডভোকেসি ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন, নেটওয়ার্ক, ইনস্টিটিউট, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের প্লাটফর্মকে সাথে নিয়ে গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত ‘শক্তিশালী স্থানীয় সরকার জাতীয় কনভেনশন’ আয়োজনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত ‘স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন’ বরাবর স্থানীয় পর্যায়ের জনগণের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৫০টির অধিক নাগরিক সমাজের সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে।

এ প্রস্তাবনার আলোকে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল ও খুলনায় ৫টি সংলাপ আয়োজন করা হয়। এসব বিভাগীয় সংলাপ থেকে প্রাপ্ত মতামত ও সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সদস্যদের উপস্থিতিতে উপস্থাপন করা হয় ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ঢাকার জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট (এনআইএলজি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জন-আকাঙ্ক্ষার আলোকে স্থানীয় সরকার সংস্কার’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ এ কার্যক্রমটি বাংলাদেশস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাস -এর সহায়তায় এবং গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইএনডিপি)র স্ট্রেংদেনিং ইনস্টিটিউশনস, পলিসিজ অ্যান্ড সার্ভিসেস প্রকল্পের যৌথ আয়োজনে বাস্তবায়িত হয়।

ড. তোফায়েল আহমেদ
চেয়ারম্যান,স্থানীয় সরকার
সংস্কার কমিশন

গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ও ইউএনডিপির এ যৌথ উদ্যোগ সংস্কার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করছে এবং আমরা একটি চিন্তার ঐক্য দেখতে পাচ্ছি। সরকার ঐকমত্য কমিশন গঠন করায় ইতিমধ্যে আমরা ২১০টি সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। আমরা প্রস্তাব করতে যাচ্ছি, ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য, যেটা জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০টি পর্যন্ত হতে পারে। পার্বত্য এলাকার জেলা পরিষদের নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবা সংক্রান্ত অভিযোগ সেল গঠন করতে হবে। আমরা প্রদেশ গঠনের পক্ষে নই। কমিশন জেলা পরিষদ আরো শক্তিশালী করার প্রস্তাব করেছে। জেলার অধীনে সকল সরকারি সেবা দপ্তরগুলো হস্তান্তর করতে হবে। জেলা হবে পরিকল্পনা ইউনিট, যার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে জাতীয় পরিকল্পনার। উপজেলা ও ইউনিয়ন হবে বাস্তবায়নকারী ইউনিট। সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো একইরকম হবে। বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে নিম্ন আদালত উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়ের আদালতে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলাগুলো আমলে নেয়া হবে। আমরা যদি স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে পারি তাহলে দেশের ৫০% শতাংশ দুর্নীতি হ্রাস পাবে।

কানিজ ফাতেমা
উপ-পরিচালক,ওয়েভ ফাউন্ডেশন

বিভাগীয় পর্যায়ে সংলাপে আমরা চেষ্টা করেছি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে। সমাজে যারা পিছিয়ে আছে বা পিছিয়ে রাখা হয়েছে সেসব মানুষের কণ্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করা হয়েছে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য জন-আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে যে ধরনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আমরা চাচ্ছি তার একটি প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের সমন্বিত সুপারিশমালায়। সুপারিশ করা হয়েছে নারী প্রতিনিধিদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, এনআইএলজির কাজের পরিধি বৃদ্ধি করা ও বিকেন্দ্রীকরণ করা, সমন্বয়ের সুবিধার্থে কাছাকাছি সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন করার জন্য। সার্বিক সমন্বয়ের জন্য একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন ও কার্যকর করা আবশ্যক।

আমানুর রহমান
সদস্য,গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম

বৈষম্য কমাতে হলে স্থানীয় মানুষের শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নই নয়, আর্থিক ক্ষমতায়নেরও প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার কমিশনের রিপোর্ট দাখিল পরবর্তী সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সিভিল সোসাইটি এবং স্থানীয় পর্যায়ে যেসকল নেতৃবৃন্দ রয়েছেন, তাদের দায়িত্ব সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এর জন্য রাজনৈতিক পক্ষসহ আরও যেসকল পক্ষ রয়েছে, তাদেরকে নিয়ে একসাথে কাজ করতে হবে।

মহসিন আলী
সমন্বয়কারী,গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ও নির্বাহী পরিচালক
ওয়েভ ফাউন্ডেশন

ইতিমধ্যে ফোরাম ৫টি বিভাগীয় শহরে সব পক্ষের মানুষের প্রতিনিধির সাথে আলোচনা করেছে। সেই আলোকে তাদের কাছ থেকে যে মতামত ও দিকনির্দেশনা পাওয়া গিয়েছে, সে বিষয়গুলো আজ সুপারিশ আকারে তুলে ধরার জন্য এই চূড়ান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০৭ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম যে ৪০ দফা সুপারিশ দিয়েছিলো, পরবর্তীতে প্রণীত আইনগুলোতে তা প্রতিফলিত হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার কমিশন কার্যকর না করা এবং সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা রাখার বিধানের ফলাফল ভালো হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার সংস্কার উদ্যোগে সহায়তা করার জন্যই ফোরামের এ প্রয়াস। স্থানীয় সরকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। তাই সংস্কার কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, কমিশন এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য হওয়া জরুরি। না হলে সরকার পরিবর্তন হলে কোনো সংস্কারই আর বহাল থাকবে না। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার সংস্কারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, তার কারণে আবার নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমরা আশা করবো, আমাদের প্রস্তাবিত সুপারিশসূহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেখবে, শুনবে এবং বিবেচনা করবে। তাহলে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আরেক ধাপ অগ্রসর হবে। তবে শুধু প্রশসনিক সংস্কার নয়, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব অর্পণ বা ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা অর্থাৎ কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টি আমরা সুপারিশমালায় উল্লেখ করেছি।

মাশহুদা খাতুন শেফালী
সদস্য,স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধিদের আসন বিন্যাস সঠিক নয়, ফলে তাদের সুনির্দিষ্ট কাজ ও ভূমিকা নাই। অনেকেই বলছেন, সংরক্ষিত আসন কার্যকর না হওয়ায় তার বিলোপ করতে। কিন্তু বিকল্প কী হবে সেটি কেউ বলছেন না। আমি একমত যে, এক-তৃতীয়াংশ আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী সদস্যদের নির্বাচন হতে হবে। গত ৩০ বছরে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় দেশের নারীরা কার্যকরী ও দৃষ্টান্তমূলক কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ বিষয়গুলো সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম
সদস্য
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন

সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা সংস্কার প্রক্রিয়াকে ৩টি ভাগে দেখতে চাই। আমরা এখন যে সুপারিশ প্রস্তাব করছি এগুলো প্রস্তুতিমূলক কাজ। জন-আকাঙ্ক্ষার আলোকেই আমাদের সংস্কার কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে ৫০টির মতো আলোচনা সভা করেছি বিভিন্ন অংশীজনের সাথে। ৪৬ হাজার ৬৮০টি জনমত জরিপ করেছি বিবিএসের সহায়তায়। পরের ধাপ ঐকমত্যে পৌঁছানো আর কমিশনের প্রস্তাবনা জমা দেয়ার পরের ধাপে গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম নিশ্চয়ই ফলোআপ কার্যক্রম রাখবে। সেখানেও আমরা ভূমিকা রাখতে চাই।

আনোয়ারুল হক
সহকারী আবাসিক

প্রতিনিধি,ইউএনডিপি বাংলাদেশ

ইউএনডিপি এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় দুইভাবে সহায়তা করছে। সংস্কার কমিশনকে বিভিন্ন জায়গায় কনসালটেশনের কাজে সহায়তা করা এবং গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের আওতায় একটি স্পেস তৈরি করে দেয়া, যাতে সব পক্ষের মানুষ মতামত দিতে পারেন। তবে আমরা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা প্রণয়ন করতে চাই এবং যেটা হবে জনবান্ধব। একইসাথে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংস্কারে তরুণদের চাওয়া, মতামত এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন থাকতে হবে। একইসাথে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কারে টেকনোলজির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একটি সক্রিয় ওয়েব প্লাটফর্ম বা অ্যাপস তৈরি করা হলে জনগণের মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ ঘটবে না। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় ইউএনডিপি ও অন্যান্য দাতা সংস্থার পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি গত ত্রিশ বছরে নারীর ক্ষমতায়নের যে অগ্রগতি ঘটেছে সেখানে পিছিয়ে না পড়ে যাতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারি, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা আশা করি কমিশন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে। আমরা সব সময়ই বলে আসছি স্থানীয় সরকারের আর্থিক স্বাধীনতার কথা। এটি আমাদের ঠিক করতে হবে।

অনিরুদ্ধ রায়
ফ্যাসিলিটেটর,গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম

গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম দেশের ৫০টির অধিক নাগরিক সমাজের সংগঠনের মতামতের আলোকে একটি সম্মিলিত প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে। প্রস্তাবনা আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে চার শতাধিক অংশগ্রহণকারীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় ৫টি বিভাগীয় সংলাপ। সংলাপে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা ও সম্প্রদায়গতভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর (দলিত সম্প্রদায়, সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসী, হিজড়া, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, চা বাগান শ্রমিক) ৭৭ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। ফোরামের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় মোটা দাগে ছয়টি সীমাবদ্ধতা বা চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হলো: প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অভাব ও দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জেন্ডার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সীমিত সুযোগ।

সাহানাজ পারভীন
সদস্য
ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন পরিষদ, গাজীপুর

সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচিত প্রার্থীদের অবশ্যই যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। তবে সরকারের সব স্তরে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করার মাধ্যমে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের যে বিধান প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তা করতে পারলে সেটাও অনেক ভালো এবং ফলপ্রসূ হবে।

স্থানীয় সরকার সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব

প্রস্তাব ১: স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও দায়িত্ব বিভাজন

১.১ ইউনিয়ন পরিষদের ৯টি ওয়ার্ড জনসংখ্যা অনুপাতে বৃদ্ধি বা পুনর্নির্ধারণ করা এবং সকল ইউনিয়ন পরিষদে সহকারী হিসাব কর্মকর্তা কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা।

১.২ উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টার ভূমিকা সম্বলিত বিধান বাতিল করা। উপজেলার প্রধান হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যানের ভূমিকা সুনির্দিষ্ট করা এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাচিবিক দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানদের ভূমিকা, দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর করা।

১.৩ সকল স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের সম্মানী ভাতার পরিমাণ বাজারমূল্য বিবেচনায় সম্মানজনকভাবে বৃদ্ধি করা।

১.৪ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের ভূমিকা ও দায়-দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা।

১.৫ পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা জনসংখ্যার ভিত্তিতে বৃদ্ধি/পুনর্নির্ধারণ করা।

১.৬ সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে সকল অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা সমন্বয়ের মূল দায়িত্ব প্রদান করে ‘নগর সরকার’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

১.৭ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে রূপান্তর করা। এক্ষেত্রে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তথা জেলা পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবেন একজন জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

১.৮ জেলা পরিষদকে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে যুব ও নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (মাইক্রো এন্টারপ্রেনিয়র) হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ, কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি মার্কেটিংয়ের জন্য সহায়তা প্রদান করা।

১.৯ অত্যাবশ্যকীয় গণ-পরিষেবা যেমন-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে ন্যস্ত করা।

১.১০ স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও জনসেবার মান বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় সরকার ক্যাডার সার্ভিস চালু করা।

প্রস্তাব ২: স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন

২.১ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে সরাসরি ও নির্দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজন করা।

২.২ নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে একই ব্যক্তি যাতে দুই বা তিনবারের বেশি নির্বাচিত না হন সে ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

২.৩ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সমন্বয়ের সুবিধার্থে কাছাকাছি সময়ে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

২.৪ পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির (হেডম্যান-কারবারি) সাথে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সমন্বয় করা।

২.৫ স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা।

প্রস্তাব ৩: কর-রাজস্ব ব্যবস্থার স্থানীয়করণ

৩.১ স্থানীয় সরকারের মডেল ট্যাক্স শিডিউল হালনাগাদ করা। কর-ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানীয় সরকারে বিদ্যমান অন্যায্য ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য ফি/ ট্যারিফ সংশোধন করা। স্থানীয় সরকারের জন্য সম্পদ আহরণের নতুন উৎস অনুসন্ধান করা।

৩.২ আঞ্চলিক বৈষম্য ও অসমতা দূর করতে জাতীয় বাজেটে সকল স্তরের স্থানীয় সরকারের জন্য সুনির্দিষ্ট ’বাজেট বন্টন কাঠামো’ বা ’রিসোর্স ডিস্ট্রিবিউশন ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করা। বাজেটের যথাযথ ব্যবহারে উৎসাহিত করার জন্য ম্যাচিং গ্রান্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা।

প্রস্তাব ৪: স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

৪.১ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত পরিষদের কাছে তাদের আওতাধীন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কার্যক্রম মনিটরিং এবং তাদের বার্ষিক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এপিআর) লেখা কার্যকর করা।

৪.২ ই-গভার্নেন্স ব্যবস্থা ও ওয়েব ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থার প্রচলনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর করা এবং স্থানীয় সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৪.৩ স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে গণতান্ত্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তগ্রহণ করা এবং সিদ্ধান্তের অনুলিপি ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা।

৪.৪ ওয়েবসাইটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা।

প্রস্তাব ৫: স্থানীয় উন্নয়নের সকল স্তরে জনঅংশগ্রহণ ও তৃণমূল মানুষের অন্তর্ভুক্তি

৫.১ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডিং কমিটিসহ সকল কমিটিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গ-বয়স-প্রতিবন্ধিতা-জাতি-সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব এবং অধিকসংখ্যক নাগরিক, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও যুব প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।

৫.২ স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে একশন প্ল্যান প্রণয়ন এবং এটার বাস্তবায়নে রাজস্ব খাতে বরাদ্দ রাখা।

৫.৩ সামাজিক নিরীক্ষা ও গণশুনানি পরিচালনা এবং ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট ইত্যাদি কার্যক্রমে জনঅংশগ্রহণ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।

৫.৪ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে সামাজিক নিবন্ধন (সোশাল রেজিস্ট্রি) প্রস্তুত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

প্রস্তাব ৬: প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি

৬.১ স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি নিবেদিত গবেষণা, ডকুমেন্টেশন ও নীতি তথ্য ভান্ডার স্থাপন করা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে এনআইএলজির কাজের পরিধি বৃদ্ধি করা ও বিকেন্দ্রীকরণ করা।

৬.২ উপরিউক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সরকারের আর্থিক মঞ্জুরি, অডিট, তদারকি ও মনিটরিংসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যপরিধি নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়নের জন্য অবিলম্বে একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন ও কার্যকর করা।

আরও