নাগরিক সমাজকে নতুন করে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে ভাবতে হবে

স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রে সুশাসন, সংবিধান রক্ষা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে নাগরিক সমাজ। কখনো কখনো আবার নাগরিকের চাওয়া ও অধিকারগুলো এড়িয়ে গিয়ে ফ্যাসিস্টদেরও অংশ হতে দেখা গেছে।

স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রে সুশাসন, সংবিধান রক্ষা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে নাগরিক সমাজ। কখনো কখনো আবার নাগরিকের চাওয়া ও অধিকারগুলো এড়িয়ে গিয়ে ফ্যাসিস্টদেরও অংশ হতে দেখা গেছে। তাই এখন সময় এসেছে নাগরিক সমাজকে নতুন করে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে ভাবার। ক্ষমতাকাঠামোকে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখার। ‘নাগরিক সমাজ ও সুশাসন: বর্তমান ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে বক্তারা এ অভিমত তুলে ধরেন। দি এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বণিক বার্তার যৌথ আয়োজনে গত ১৮ ডিসেম্বর এ বৈঠক বসে রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায়

ড. ফাহমিদা খাতুন,নির্বাহী পরিচালক
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ

বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের ইতিহাস আসলে দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দুর্বল অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থা থেকে পুনর্জাগরণে বেসরকারি সংস্থা এবং এনজিওগুলোই এগিয়ে এসেছিল। বিষয়টা যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমন নাগরিক সমাজের কাজ করার ও কথা বলার জায়গা সংকুচিত হতেও আমরা দেখেছি। বিশেষ করে গত ১৫ বছরে আরো বেশি সংকুচিত হতে দেখেছি। কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, কাউকে বন্ধ করে দিয়ে আবার কারো নীতিনির্ধারণী জায়গায় জোরপূর্বক পরিবর্তন এনে বিষয়গুলো করা হয়েছে। সরকার প্রণীত নীতিমালা যদি সাধারণ জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজনের পরিবর্তে শুধু বিশেষ গোষ্ঠীকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়, তাহলে সে নীতির কোনো কার্যকারিতা থাকে না। নীতিমালা প্রণয়নকারী ও সাধারণ নাগরিক যাদের জীবন নীতিমালার ফলে প্রভাবিত হয়—এ দুই পক্ষের মাঝে ফারাকটা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কারণ নাগরিক সমাজের কণ্ঠ ছাড়া কোনো সমাজ এগোতে পারে না। যে সমাজে যত বেশি মত ও আলাপ আলোচনা হয়, সে সমাজ তত বেশি সচল ও প্রগতিশীল।

রোখসানা খন্দকার
নির্বাহী পরিচালক
খান ফাউন্ডেশন

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে নাগরিক সমাজ ও এনজিওগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। তারা সবসময় সক্রিয় ছিল। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে সরকার নাগরিক সমাজ ও এনজিওদের সঙ্গে নিয়েই কাজ করেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবেশটা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। নাগরিক সমাজ যখন মানবাধিকার বা সুশাসন নিয়ে কথা বলতে যায়, তখনই তারা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের শিকার হয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো নাগরিক সমাজ বিশেষভাবে দাতাদের ওপর নির্ভরশীল। এ নির্ভরশীলতা অনেক জায়গায় ভূমিকা রাখতে দেয় না। আগে আমরা সমাজ সংস্কারে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করতে দেখেছি। কিন্তু স্বাধীনতার পর এনজিওগুলো শুধু দাতা ও সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

তালাত মামুন
নির্বাহী পরিচালক
চ্যানেল 24

নাগরিক সমাজের কাজ হলো সরকারের সুরে সুর না মেলানো। দেশে একটা কার্যকর নাগরিক সমাজ ছিল না বলেই গত সরকারের আমলে করুণ পরিস্থিতি হয়েছে। গণমাধ্যমও এখানে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে পারেনি। গণমাধ্যম নিয়েও একটা যথাযথ আলোচনা হওয়া জরুরি। এর মধ্যেও কিছু গণমাধ্যম হয়তো চেষ্টা করেছে। কিন্তু সংখ্যা হিসেবে সেটা খুবই গৌণ ছিল। সেজন্য গণমাধ্যমে নাগরিক সমাজের ভূমিকা খুব একটা দেখা যায়নি। এখনো নাগরিক সমাজকে সমালোচনার ভূমিকায় দেখছি না। নাগরিক সমাজের প্রতি একটা আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। যেটার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন দেখেছি আমরা বর্তমান সরকারে। শক্তিমান প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা কিংবা পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সামনের চ্যালেঞ্জটা আরো ভয়াবহ হতে পারে।

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
বণিক বার্তা

গত ১০০ বছরের পৃথিবীর ইতিহাসের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নাগরিক সমাজ অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্রকাঠামোর দিক থেকে সুশাসন, সংবিধান কিংবা মানবাধিকার রক্ষাসংক্রান্ত সমস্যা যখন লঙ্ঘন হয়েছে, তখনো নাগরিক সমাজ সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও নাগরিক সমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মানুষের অধিকার নিয়ে বলা ও বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আবার গত ৫৩ বছরের ইতিহাসে নাগরিক সমাজের একটি অংশ ফ্যাসিস্ট, অভিজাত ও অনেক সময় সরকারের অংশ হয়ে গিয়ে নাগরিকের চাওয়া ও অধিকারগুলোকে এড়িয়ে যেতে দেখেছি। এ বিষয়গুলো মোকাবেলা করে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের নাগরিকদের পাশে থাকার ও সবার অধিকার নিয়ে কথা বলে রাষ্ট্রের ওপর নিয়মিত চাপে রাখার অবস্থান ধরে রাখতে হবে।

কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ
কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ
দি এশিয়া ফাউন্ডেশন

গত ৫ আগস্টের ঘটনাবলি ও বহু মানুষের প্রাণদান আমাদের জীবনকে অনেকটাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত নাগরিক সমাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অর্জন যেমন আমাদের গর্বিত করে, তেমনি আমরা এটাও শিখেছি কিছু জিনিস অতীত হিসেবে ভুলে যেতে হয়। সংকোচনশীল নাগরিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন চাপ ও পরিস্থিতির ফলে নাগরিক সমাজের পরিপূর্ণভাবে যা করতে পারার কথা, তা করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। পরিস্থিতির কারণে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়েছে। এখন আমাদের এ অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এমনভাবে তৈরি হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বিষয়গুলোর পুনরাবৃত্তি না হয়। ভবিষ্যতে যদি নতুন করে আবার নাগরিক সমাজকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের পদক্ষেপ কী হতে পারে তাও আলোচনায় আসা উচিত।

ড. কাজী মারুফুল ইসলাম
অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সিভিল সোসাইটির বাংলা আমি নাগরিক সমাজ না করে জনসমাজ বলছি। জনসমাজ সংঘগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকা স্বাধীনতার পর থেকেই দেখা গেছে। গত ১৫ বছরে এমন অনেক জনসমাজ দেখেছি, যারা গত শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় বৈধতা উৎপাদনে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে ওই শাসন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে অনেক কর্মসূচি ও পদক্ষেপও দেখেছি। সেজন্য জনসমাজ সম্পর্কে আমি পবিত্রতম কিংবা শত্রুতাপূর্ণ কোনো ধারণা রাখতে চাই না। অনেকেই ভাবতে পারেন বর্তমান সরকারে জনসমাজ সংগঠনগুলো হয়তো প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ আছে। যে মুহূর্তেই এ অনুভূতি তৈরি হবে, তখনই সংগঠনগুলোর গঠনগত দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। রাষ্ট্র তো রাষ্ট্রই। যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ। সেজন্য রাষ্ট্রকে সবসময় চ্যালেঞ্জ করতে হবে। সে আমার বন্ধু, সহকর্মী যে-ই হোক। এর ব্যত্যয় ঘটলে আবার আরেকটা ফ্যাসিস্ট রেজিম তৈরি হবে।

বর্তমান জনসমাজ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মূল কাজের পাশাপাশি গণতন্ত্রিক রূপান্তরের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। সেজন্য গণতন্ত্র চর্চার মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্নবায়নকৃতে মনোযোগ দরকার।

মো. জাহিদুল ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক
রিসো

নাগরিক সমাজ একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সাহায্য ও সুশাসন চর্চায় বাধ্য করে। বর্তমানে আমাদের নাগরিক সমাজ কিংবা সুশাসন কোনোটাই নেই। আমরা সব নষ্ট করে ফেলেছি। নাগরিক সমাজে জনগণের অংশগ্রহণটা খুব জরুরি। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা চব্বিশের আন্দোলন, সব জায়গায়ই জনগণের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু নাগরিক সমাজে তাদের অংশগ্রহণ আমরা দেখি না। স্থানীয়ভাবে আমাদের চায়ের দোকান, মসজিদ, ঈদগাহ আলাদা হয়ে গেছে। নাগরিক সমাজকে আমরা ভাগ করে ফেলেছি, নষ্ট করে ফেলেছি। আমাদের সামাজিক উদ্যোগগুলো শুধু নষ্ট নয়, সেখানে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। নাগরিকদের দলীয় ট্যাগ দেয়া হয়েছে। ফলে যারা নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারত, তারা ভয়ে ঘরে ঢুকে গেছে। সংকুচিত হয়ে গেছে। কথা বলার সাহস পায় না। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক, বিভিন্নভাবে তাদের নিষ্পেষণ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় আমাদের সুযোগ এসেছে মোসাহেবি বাদ দিয়ে যারা নাগরিক সমাজকে নিয়ে কথা বলে, তাদের নিয়ে একটি জনসমাজ সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া।

মনিরা শারমিন
যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক কমিটি

এ অনুষ্ঠানে যে ধরনের সুন্দর কথাবার্তা, ধারণা ও দাসত্ব থেকে বের হওয়ার প্রবণতা শুনতে পেলাম, এটা যদি আজ থেকে ছয় মাস আগে দেখতে পেতাম, তাহলে হয়তো একটা অভ্যুত্থান ও এত মানুষের প্রাণ দেয়ার প্রয়োজন হতো না। নাগরিক সমাজের বড় ধরনের ব্যর্থতা ও ফলই হলো চব্বিশের অভ্যুত্থান। রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিস্ট হয়ে যাওয়ার পেছনে নাগরিক সমাজের অন্যতম ভূমিকা আমরা দেখেছি। আমাদের এনজিও মধ্যস্থতাকারীই নেই। দাতানির্ভর কাজ করতে গেলে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্প তৈরি করতে পারি না। দাতা আমাদের কী কী দেবে এবং কীভাবে করলে অনুদানটা পাব, সেটা ভেবেই আমরা প্রকল্প তৈরি করি। এনজিওগুলোয় অভিজ্ঞতার একটা বাধ্যবাধকতা দেখা যায়। অভিজ্ঞতার জালে আটকে দিয়ে তরুণদের এখানে বাধা দেয়া হয়। ফলে এনজিও ও নাগরিক সমাজ খাতটা একটা বিম্বের মধ্যে ঘুরপাক খায়।

এখানে যে মানুষ আছে, তাদের মধ্যে নিজেদের জায়গা ছাড়তে না চাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। ফলে সেখানে তরুণদের অংশগ্রহণের জায়গা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়।

মহসিন আলী
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক
ওয়েভ ফাউন্ডেশন

নাগরিক সংগঠনগুলোর বৈশ্বিক প্লাটফর্ম সিভিকাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী একটা জায়গায় (স্বৈরাচার) আমাদের উত্তরণ হলেও সামনে বড় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে আমাদের দেখতে পাওয়া পরিবর্তন। ছাত্রদের পাশাপাশি নিজেদের বৈষম্য ও অধিকার নিয়ে সারা দেশের নাগরিকই সচেতন হয়ে উঠেছে। করোনার সময় থেকে মানুষ আরো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে খাদ্যের অধিকার নিয়ে। পাশের দেশ ভারতে খাদ্য অধিকার আইন আছে, নেপালে রয়েছে খাদ্য সার্বভৌমত্ব আইন, পাকিস্তানে এ নিয়ে নীতি রয়েছে, শ্রীলংকায় এ-সংক্রান্ত আইন রয়েছে। তাহলে বাংলাদেশেও কেন থাকবে না? এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো আইন বাস্তবায়ন করতে পারিনি আমরা। দেশের সব নাগরিকের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এখনই সে নীতমালা তৈরি করা দরকার।

কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে নাগরিক সমাজ, এনজিও কিংবা অন্যরা কাজ করতে পারে। কিন্তু কাজ তো আসলে করা দরকার যখন সংকট থাকে। এ সময়ে কীভাবে কাজ করতে পারি, সেখানে আমাদের দৃষ্টি নেই। বারবার পরিবর্তন এসে আবার হোঁচট খাওয়া, প্রয়োজনীয় কাজটা না হওয়া কিংবা সংকটে কাজটা করতে না পারার প্রধান কারণ আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান পন্থায় কাজ করি না। এবারের সংস্কার কমিশনগুলোও রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক পন্থাগুলো নেয়নি। ফলে দুদিন পর পর হোঁচট খায়, আবার শেখে। আবার হোঁচট খায়, আবার শেখে। এ জায়গাগুলোকে কেন আমরা টেকসই অবস্থায় আনতে পারছি না, জিনিসগুলো আমাদের মনোযোগ দিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান উভয় দেশেই ৪৬টা করে থিংক ট্যাংক আছে। এটার কারণ হলো থিংক ট্যাংকগুলো কাজ করছে তহবিলনির্ভর হয়ে। তহবিলনির্ভর থিংক ট্যাংক নাগরিকদের জন্য কাজ করতে পারবে না।

বাংলাদেশসহ সব উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা হলো সংকটকে রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক পন্থায় দেখা হয় না। গত সরকার, এনজিও ও নাগরিক সমাজগুলোও কিন্তু মুখস্ত বক্তৃতার ওপর কাজ করেছে। এ অংশীদারগুলো সংকট সময়ে কীভাবে কাজ করতে পারে, সে বিষয়গুলো ভাবা জরুরি।

রফিকুল ইসলাম খোকন
নির্বাহী পরিচালক
রূপান্তর

এক ধরনের রাষ্ট্রীয় মাস্তানি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চরম আধিপত্য বিস্তারের কারণে আমাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। এ কারণে কোনো সাংবাদিক, শিক্ষক কিংবা বেসরকারি সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেনি। যে দেশের প্রধান বিচারপতিকে চলে যেতে হয়, সে দেশের নতুন ভাবনায় পরিবর্তন হবে কিনা জানি না। ২০১৬ সালের একটি কালো আইন (বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন) রয়েছে। সেটা এখনো বাতিল করা হয়নি। ফলে আগের মতোই চলছে এনজিওগুলোর কার্যক্রম। অ্যাডভোকেসিতে দি এশিয়া ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে উন্মুক্ত সরকারি অংশীদারত্বের (ওজিপি) অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। পৃথিবীর ৭৬টি দেশ ওজিপির অন্তর্ভুক্ত। তাহলে হয়তো বা একটা পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে, যেখানে মাস্তানি থাকবে না, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আধিপত্য থাকবে না। তখন এনজিওগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্ভয়ে কাজ করতে পারব।

ড. ইমরান মতিন
নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট

গবেষকদের বিশেষ একটা দৃষ্টি দেয়া দরকার যে এ জায়গায় (স্বৈরাচারী ব্যবস্থা তৈরিতে) আমাদের দায় কী? মুশকিল হলো গবেষণার জায়গায় এসে সবাই সবকিছু করতে চায়। যে শৃঙ্খলা-কাঠামোর মধ্যে আমাদের কাজ করতে হয়, সেটা অনেক বেশি জটিল প্রক্রিয়া। এখানে বিশেষজ্ঞতা ও দক্ষতার দরকার আছে। যারা জ্ঞান সৃষ্টিতে কাজ করবে, তাদেরই যদি আবার অ্যাডভোকেসি কিংবা একজন আরেকজনের কাজ করতে হয়, তাহলে সমস্যাগুলো সমাধান করবে কে? এগুলোর আরো গভীরে যাওয়ার দরকার আছে। আমাদের রাজনৈতিক ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে বলা হয়। আমাদের জ্ঞান-সংস্কৃতিও খুব একটা ভালো বলে মনে হয় না। এ জায়গাগুলো আরো গভীরভাবে অনুধাবন করা দরকার। ফ্যাসিজমের একটা বড় জায়গা হচ্ছে ডাটা (তথ্য) কারসাজি ও গণমাধ্যম। এ দুই জায়গায় আমাদের স্বাধীনতা দরকার আছে। নতুন করে ডাটা স্বতন্ত্রীকরণ ও পরিচালনের কথা চিন্তা করতে হবে।

অন্যদিকে নানা ধরনের প্রকল্প তৈরি করা হয়, যেগুলোর সঙ্গে তথ্য-উপাত্তের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

তালেয়া রেহমান
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডেমোক্রেসিওয়াচ

আমি আজ এখানে বসে কথা বলছি এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। এনজিও ও সরকারের মাঝে সবসময় কেন যেন একটা দ্বন্দের সুর দেখতে পাই। আমরা যা-ই করি, সরকারের তা পছন্দ হয় না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তো সরাসরিই বলতেন, তিনি এনজিওদের পছন্দ করেন না। আমাদের সবকিছুই বর্তমানে পরিবর্তন হওয়ার কথা। সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাব দেয়া উচিত, যেন সরকার এনজিওদের সঙ্গে নিয়েই এখন থেকে কাজ করে। নীতিমালা প্রণয়নে এনজিওদের সাহায্য নিয়ে জনবান্ধব উপায়ে যেন কাজ করা হয়। পরবর্তী যে-ই নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের সরকার আসবে, তারাও যেন বিষয়টি চালু রাখে। সরকারের জনবান্ধব হওয়ারই কথা ছিল।

অথচ সবসময় দেখা গেছে, সরকার জনবান্ধব নয়। ছাত্রদের অবদানে শুরু হওয়া নতুন এ বাংলাদেশে এনজিও আর সরকারের মাঝে বৈরিতা থাকা উচিত না।

সাইয়েদ আবদুল্লাহ
ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী

সুশাসন নিয়ে আমরা যখনই কথা বলি, তখন আইন, আদালত, পুলিশ ইত্যাদির গাঠনিক দিক নিয়ে কথা বলি। সুশাসনের ধারণা গঠনগত দিক থেকে পরিবার ও সমাজ থেকে বিন্যস্ত থাকে। সে জায়গা বাদ দিয়ে আমরা শুধু প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলি। ফলে আমরা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা করি, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনায় আমাদের মূল বিষয়টা হারিয়ে যায়। যেটা দেখিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নাগরিক সমাজের। ক্ষমতার কাঠামোকে যে নাগরিক সমাজ প্রশ্ন করতে পারে না, আর ক্ষমতার তোষামোদি করে যারা চলে, উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। শেখ হাসিনা স্বৈরাচার থাকার কারণ হচ্ছে, তাকে তোষামোদ করার মতো বহু নাগরিক সমাজ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, প্রতিটি জায়গায়ই এ রকম সমাজ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অনেক এনজিও ছিল, যারা তাদের মূল কাজটা বাদ দিয়ে এ দেশকে গণতন্ত্রহীনতার পথে নিয়ে যেতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিল। আমাদের নাগরিক সমাজে সেবাকেন্দ্রিক কোনো পরিবেশ তৈরি হয়নি। নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে যাবে। এজন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা উচিত। একই সঙ্গে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

মো. হামিদুজ্জামান
সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট

আমাদের দেশের নাগরিক একটা সুন্দর সমাজ চায়। এজন্য নাগরিকদের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সক্রিয় নাগরিকরা নিজেদের অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে জানবে। কোনটা করা যাবে, কোনটা করা যাবে না, সে বিষয়ে তাদের সম্মুখ ধারণা থাকবে। এনজিওদের জন্য এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নাগরিকদের যত সক্রিয় করা যাবে, তত অন্য কর্মকাণ্ড করতে সুবিধা হবে। এ বিষয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা দরকার।

কল্পনা আক্তার
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি

আমরা একটা পরিবর্তিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। শুধু শ্রমিকই নয়, প্রায় প্রতিটি খাতেই মজুরি সমস্যা আছে। আমরা যদি অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারতাম, তাহলে হয়তো এ সমস্যার শূন্যতা পূরণ করতে পারতাম।

জায়গাটা বরাবরই একটা বাধা ছিল। আমরা চাইলেও কথা বলতে পারতাম না। শ্রমিকরা চাইলেও ইউনিয়নে যোগ দিতে পারেন না। যোগ দিলেও তাদের অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এটা শুধু গত ১৬ বছরই নয়, এর আগের রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা যে খুব শ্রমিকবান্ধব ছিল, তা নয়। আমরা আশা করব, শ্রমিক সংস্কার কমিশন ওই বাধাগুলো দূর করতে কাজ করবে। আরেকটা বিষয় হলো সৃষ্টির শুরু থেকেই সব ধরনের প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের সবচেয়ে বড় শিকার নারী ও শিশুরা। নারী কমিশন ধরে ধরে প্রত্যেকেটি সমস্যা দূরীকরণে প্রচেষ্টা চালাবে বলে আশা করি। যুদ্ধটা আমাদের কারো একার নয়। নাগরিক সমাজ ও শ্রমিক সমাজে সুশাসন আনতে চাইলে আমাদের সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে হবে।

মোহাম্মদ জাকারিয়া
প্রোগ্রাম ডিরেক্টের
দি এশিয়া ফাউন্ডেশন

দি এশিয়া ফাউন্ডেশন শুরু থেকেই অন্য অনেক কাজের পাশাপাশি সুশাসন ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে উৎসাহিতকরণ, রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে শক্তিশালীকরণ, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে নারী শ্রমিকদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণ সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গত দুই দশকে বাংলাদেশে উন্নয়নের জয়জয়কার ও প্রবৃদ্ধির যে গল্পগুলো তৈরি হয়েছে তার বিপরীতে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও চর্চা, সামাজিকভাবে একত্রিত হওয়ার পরিসর ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমে প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে।

আরও