আয়রন স্বাস্থ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়রনের ঘাটতি আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতার মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে, যা বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ সমস্যা। আয়রন পাকস্থলী থেকে শুরু করে ডুডেনামের মধ্য দিয়ে শোষিত হয় এবং ক্ষুদ্রান্ত্রে শেষ হয়। আমাদের শরীর ফেরিক অক্সাইড শোষণ করে না, শুধুমাত্র ফেরাস আয়রন শোষণ করে। তাই হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) শরীরের দ্বারা সহজেই শোষণের জন্য ফেরিক অক্সাইড থেকে ফেরাস অক্সাইডে রূপান্তরের জন্য দায়ী।
আয়রন শোষণ দুটি কারণে নিয়ন্ত্রিত হয়। একটি আয়রন পরিবহনের জন্য এবং অপরটি শরীরে আয়রন সঞ্চয়ের জন্য। আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতায় বেশিরভাগ আয়রন অন্ত্রের অভ্যন্তরে রক্তের প্রবাহে এবং পোর্টাল শিরায় শোষিত হয়। আবার আয়রনের আধিক্য থাকলে অন্ত্রের আস্তরণে শোষিত আয়রনের পরিমাণ কমে যাবে। অন্ত্রের মিউকোসাল কোষের সাইটোপ্লাজমে ফেরিটিন গঠনের জন্য অতিরিক্ত আয়রন অ্যাপোফেরিটিনের সঙ্গে একত্রিত হয়। অবশেষে ফেরিটিন অন্ত্রের লুমেনে নির্গত হবে এবং অন্ত্রের এপিথেলিয়াম বের হয়ে যাবে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক, আয়রন শোষণে কোন খাদ্যের কী প্রভাব।
ক্যাফেইন
বর্তমানে ক্যাফেইনযুক্ত খাবার এবং পানীয় বাজারে খুবই জনপ্রিয় এবং বৈচিত্র্যময়। ক্যাফেইন একটি প্রাকৃতিক উদ্দীপক, যা সাধারণত মানুষ চা, কফি পান করে থাকে। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে ক্যাফেইন আয়রন শোষণে বাধা দেয়। কফি বা চা যত শক্তিশালী, ক্যাফেইনের পরিমাণ তত বেশি, শরীর তত কম আয়রন শোষণ করে। একই সঙ্গে ক্যাফেইন এবং আয়রনযুক্ত খাবার খাওয়ার সময় আয়রন শোষণকে বাধা দেয়ার পাশাপাশি আয়রন স্টোরকে প্রভাবিত করে।
আপনি যখন রুটি দিয়ে এক কাপ কফি পান করবেন, তখন এটি আয়রন শোষণকে ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ বাধা দেয়। কফি ছাড়াও চা আয়রন শোষণে বাধা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সঙ্গে এক কাপ চা পান করলে ৬৪ শতাংশ আয়রন শোষণ কমে।
তাহলে ক্যাফেইন কি একমাত্র কারণ, যে আয়রন শোষণকে বাধা দেয়?
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফেইন একমাত্র কারণ নয়। কারণ ক্যাফেইন নিজেই ৬ শতাংশ খাদ্যতালিকাগত আয়রনের সঙ্গে আবদ্ধ হয়। তবে গবেষকরা আয়রন শোষণে বাধা দেয়ার একটি বড় কারণ খুঁজে পেয়েছেন। সেটি হলো কফি ও চায়ে পলিফেনল রয়েছে, যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আয়রন শোষণকে বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। সাধারণত পলিফেনলগুলোর মধ্যে রয়েছে কফি, কোকো এবং কিছু ভেষজে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড। কালো চা ও কফিতেও ট্যানিন পাওয়া যায়।
এ পদার্থগুলো হজমের সময় আয়রনের সঙ্গে আবদ্ধ হয়, যা আয়রন শোষণ করা কঠিন করে তোলে। আবার আয়রন শোষণকে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের পাশাপাশি পলিফেনলের ক্ষমতা ডোজের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ খাবারে পলিফেনলের পরিমাণ বেশি কিনা, তার ওপরও নির্ভর করে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি পরিবেশনে ২০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম পলিফেনলযুক্ত পানীয় খাবার থেকে আয়রন শোষণকে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বাধা দেয়। অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সঙ্গে ৫ মিলিগ্রাম ট্যানিন গ্রহণ করলে ২০ শতাংশ আয়রন শোষণকে বাধা দেয়। আবার ১০০ মিলিগ্রাম ট্যানিন গ্রহণ করলে ৮৮ শতাংশ আয়রন শোষণকে বাধা দেয়। এজন্য আপনার খাওয়ার ৩০ মিনিট বা আধা ঘণ্টা আগে, মধ্যাহ্নভোজে বা রাতের খাবারের ২ ঘণ্টা পরে চা বা কফি পান করলে আয়রন শোষণে কোনো সমস্যা হবে না।
উদ্ভিদ ও প্রাণীর উৎস
আবার উদ্ভিদ ও প্রাণীর উৎস থেকে আসা খাবার আয়রন শোষণকে প্রভাবিত করে। আয়রন শোষণের বাধার ধরনও শরীরের আয়রনের খাবারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। খাদ্যে আয়রন দু’প্রকার—হিম আয়রন ও নন-হিম আয়রন। হিম আয়রন বেশিরভাগ প্রাণীজ খাবারে পাওয়া যায়। আর নন-হিম আয়রন উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে পাওয়া যায়। আমাদের শরীর ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ ভালো হিম আয়রন শোষণ করে, যেখানে নন-হিম আয়রন ২ থেকে ১৫ শতাংশ শোষিত হয়। হিম আয়রন অক্ষতভাবে শোষিত হয় বা আয়রন শোষণকে বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। হিম আয়রন নন-হিম আয়রন থেকে শক্তিশালী।
এছাড়া উদ্ভিজ্জ প্রোটিনগুলো দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রোটিন, যাতে এক বা একাধিক অ্যামিনো অ্যাসিডের অনুপস্থিতি থাকে। যেমন ডালে মেথিওনিন, ট্রিপটোফ্যান এবং সিস্টাইনের ঘাটতি রয়েছে। এজন্য আয়রনের শোষণ বাড়াতে হিম ও নন-হিম আয়রন একত্রে খেলে আয়রন শোষণ বাড়বে। এছাড়া দুটি উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের সংমিশ্রণে ডায়েটে অ্যামিনো অ্যাসিডের সংমিশ্রণ আয়রন শোষণ বাড়াতে সহায়তা করবে।
ফাইটেট
ফাইটেট আয়রণ শোষনের উপর একটি শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। ফাইটেট হলো একটি যৌগ যা সয়া প্রোটিন এবং ফাইবারযুক্ত খাবারে পাওয়া যায়। ফাইটেটের উৎসগুলো হলো বাদাম, তিল, মসুরডাল, শুকনো মটরশুটি, সিরিয়াল ও পুরো শস্যগুলিতে পাওয়া যায়। ফাইটেট যৌগগুলো আয়রন শোষনকে ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ কমাতে পারে। এজন্য ফাইটেট সামগ্রী বিশেষ করে সিরিয়াল ও ডাল রান্নার আগে অতিরিক্ত ২ থেকে ৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে ফাইটেট সামগ্রী ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এছাড়া খাবারের গাজন প্রক্রিয়াতে ফাইটেট কমাতে পারে। খাবারে ভিটামিন সি যোগ করলে ফাইটেট কমাতে পারে। ডাল ও বাদামগুলোকে অঙ্কুরোদগম করলে আয়রন শোষন বাড়ানো যায়।
অক্সালেট
অক্সালেট অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবারগুলো আয়রন শোষনকে বাধাগ্রস্থ করে। এসব খাবারগুলো হলো পালংশাক, বীট, বাদাম, চকলেট, চা, গমের ভূষি, স্টবেরি তুলসী পার্সলে ইত্যাদি। তবে খাবারে অক্সালেট কমাতে কয়েকটি উপায়ে কমানোর উপায় রয়েছে। যেমন ফুটন্ত পানিতে খাবার রান্না করলে ৩০ থেকে ৮৭ শতাংশ হৃাস করতে পারে। আবার বাষ্প করলে অক্সালেট সামগ্রী থেকে ৫৩ শতাংশ হৃাস করে।
অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি এর প্রভাব
অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি প্রাকৃতিকভাবে শাকসবজি এবং ফলমুলে দেখা যায়, বিশেষ করে সাইট্রাসে। আয়রন শোষনে অ্যাসকরবিক অ্যাসিড প্রভাব সম্পর্কে গবেষনায় জানা যায় ১০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি বা অ্যাসকরবিক অ্যাসিড একটি নিদিষ্ট খাবার থেকে আয়রন শোষনকে ৪.১৪ গুন বাড়িয়ে তোলে।
পুষ্টিবিদ লিনা আকতায়
রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর