সীসা শনাক্ত ও দূষণ প্রতিরোধে জাতীয় মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য এসডোর র‍্যালি

আজ সকাল ১০টায় র‍্যালিটি জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়। পরে হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বর হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, লেড এক্সপোজার এলিমিনেশন প্রজেক্ট (এলইইপি) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহযোগিতায় এ আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক সীসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬-এর প্রচারণার অংশ ছিল এই র‍্যালি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ফ্রম ডিটেকশন টু প্রিভেনশন’, অর্থাৎ শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধ।

সীসা দূষণ প্রতিরোধ এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে জাতীয় মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। এ দাবিতে রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় একটি র‍্যালির আয়োজন করে সংস্থাটি। এতে প্রায় ১৮০ জন তরুণ-তরুণী অংশ নেন। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিনিধিরাও র‍্যালিতে যোগ দেন।

আজ সকাল ১০টায় র‍্যালিটি জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়। পরে হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বর হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, লেড এক্সপোজার এলিমিনেশন প্রজেক্ট (এলইইপি) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহযোগিতায় এ আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক সীসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬-এর প্রচারণার অংশ ছিল এই র‍্যালি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ফ্রম ডিটেকশন টু প্রিভেনশন’, অর্থাৎ শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধ। এর মাধ্যমে সীসার বিষক্রিয়া ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আয়োজনে ১৪তম আন্তর্জাতিক সীসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।

বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে সীসার বিষক্রিয়া গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি। বিশ্বে সীসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ছোট শিশুরা শরীরে বেশি সীসা শোষণ করে। এর ফলে তাদের মেধাশক্তি কমে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে শেখার অসুবিধা ও আচরণগত সমস্যা। সীসা শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, যার প্রভাব সারা জীবন থেকে যায়।

প্রসাধনসামগ্রী, সাজসজ্জার রং, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রং, সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করা লেড অ্যাসিড ব্যাটারি, হলুদের গুঁড়া ও শিশুদের খেলনা থেকে সীসা ছড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই।

এসডোর জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, সীসা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শিশুদের মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। তাই ক্ষতি আরো ছড়িয়ে পড়ার আগেই সীসা শনাক্ত করা, এর উৎস খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। বাংলাদেশে রঙের জন্য এরই মধ্যে প্রতি কেজিতে ৯০ পিপিএম সীসার মানদণ্ড রয়েছে। নতুন জাতীয় কৌশলপত্রও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এখন বাজারে এ মানদণ্ড কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং পরিকল্পনাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, সীসা কীভাবে প্রতিদিনের জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, এ র‍্যালির মাধ্যমে তা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সীসার বিষক্রিয়া চোখে দেখা না গেলেও এর ঝুঁকি মারাত্মক। তাই বিষয়টিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তিনি সীসা দূষণকে জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান।

মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বলেন, বাংলাদেশে সীসা দূষণের উৎস, বর্তমান পরিস্থিতি এবং এ জরুরি অবস্থা মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে আগে সঠিক তথ্য জানতে হবে। সচেতনতা ও জনস্বার্থে নীতিনির্ধারকদের কাছে দাবি তুলে ধরার মাধ্যমে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণা কর্মকর্তা সুহান আহমেদ বলেন, সীসার বিষক্রিয়া গুরুতর জনস্বাস্থ্যঝুঁকি হলেও তা প্রায়ই চোখে পড়ে না। এটি শিশুদের বিকাশ এবং পুরো সমাজের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য হুমকি। তাই বিষয়টিকে ছোট সমস্যা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের বড় জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

র‍্যালিতে তরুণ অংশগ্রহণকারীদের হাতে রঙিন তথ্যপত্র, প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন ছিল। এগুলোতে সীসা দূষণ নিয়ে সচেতনতামূলক বার্তা ও গবেষণাভিত্তিক তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছিল ‘৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তে সীসার মাত্রা উদ্বেগজনক’, ‘সীসামুক্ত পণ্য উৎপাদন করুন, জাতীয় মান মেনে চলুন’ এবং ‘বিষাক্ত লেড ক্রোমেট কেন আমদানি হচ্ছে দেশে’।

র‍্যালির মাধ্যমে জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের আরও কঠোর নিয়ম প্রণয়ন ও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব উৎস থেকে সীসা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

এদিকে সরকার সম্প্রতি ‘সীসামুক্ত বাংলাদেশের জন্য জাতীয় কৌশলপত্র ও বহুবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩৫)’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করেছে। এ পরিকল্পনার লক্ষ্য সীসার সংস্পর্শ কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়া এবং দেশে সীসাজনিত দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ধাপে ধাপে নির্মূল করা।

২০২৫ সালের এমআইসিএসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সীসার বিষক্রিয়ার ভিত্তিমাত্রা ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। কর্মপরিকল্পনায় এ ভিত্তিমাত্রার তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা ৫০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীরা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তাদের মতে, শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই হবে না। এর জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত বাস্তবায়ন এবং অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

সীসামুক্ত পরিবেশের দাবি শুধু স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের বিষয় নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও অংশ। সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য এ ক্ষতি থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সীসা শনাক্তকরণ জোরদার করার পাশাপাশি সব উৎস থেকে এর সংস্পর্শ প্রতিরোধ করতে হবে, যাতে শিশুসহ কেউ সীসার ঝুঁকিতে না থাকে এবং সবার জন্য সীসামুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

—বিজ্ঞপ্তি

আরও