বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা

ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি তার সুফল টেকসই করার জন্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা করতে হবে

লেখক বলেন, নারীরা এ বইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ড. ইউনূস দেখিয়েছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা নারীদের বিরুদ্ধে, দরিদ্রদের বিরুদ্ধে এবং অশিক্ষিতদের বিরুদ্ধে। তিনি এর পাল্টা ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন। আরো একটা কারণ, নারীরা ছিল ভালো গ্রহীতা, তাদের দ্বারা ঋণ পরিশোধের হার বেশি।

ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের জন্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করতে পারেন। কাউকে টাকা দিলেই তাকে ক্ষুদ্রঋণ বলা যাবে না, সে অর্থকে কাজে লাগিয়ে জীবনমানের উন্নত করার ব্যবস্থা করা ক্ষুদ্রঋণের লক্ষ্য।

ইউপিএল প্রকাশিত ক্ষুদ্রঋণ, বড় স্বপ্ন: মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক এবং বৈশ্বিক ক্ষুদ্রঋণ বিপ্লব বইটির প্রকাশনা উৎসবে এসব কথা বলেন বক্তারা। আজ সোমবার (৩০ জুন) বিকালে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ে এ বই নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রকাশনা উৎসবে আলোচক পিকেএসএফের প্রাক্তন পর্ষদ সদস্য এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন পারভীন মাহমুদ বলেন, এই বইয়ে যেসব মূল্যবোধ তুলে ধরা হয়েছে আমার কাজের সূত্রে তার মিল দেখতে পাই। ক্ষুদ্রঋণ আগের পর্যায়ে নেই। প্রাথমিক অবস্থা থেকে ঋণ কর্মসূচি এখন অনেক বদলেছে। পিকেএসএফের কাজের সূত্রে দেখেছি এর কার্যকারিতা আছে। আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক নারী ঋণ নিয়ে ভালোভাবে উন্নতি করেছেন। ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থাও করা দরকার। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির ভেতরে বীমার ব্যবস্থা করা জরুরি।

এ আলোচক বলেন, যদিও এর সমালোচনা আছে যে এটি পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নিয়ে নেন। তবে সেগুলো পরিবারের স্বার্থেই ব্যবহার করা হয়। এ কারণে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা দরকার।

পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, ক্ষুদ্র ঋণের কয়েকটা পরিপ্রেক্ষিত আছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে দেখেছি, মেয়েরা ভালো ঋণ গ্রহীতা, তারা ঘরে থাকে, আর তাদের ধার দেয়া সহজ হয়। তারা পরিবারের জন্য তুলনামূলক ভালো অর্থ ব্যবস্থাপনাকারী। তিনি বলেন, মাইক্রোক্রেডিট একটি দর্শনের নাম। এটি একটি প্রতিষ্ঠান তৈরির কথা বলে। দরিদ্র মানুষের জন্যও প্রতিষ্ঠান দরকার। তবে কেউ কাউকে কিছু টাকা দিলেই তা ক্ষুদ্র ঋণ বলে গণ্য হবে না। এটি দরিদ্র মানুষের অবস্থার উন্নয়নে টেকসইভাবে অর্থায়ন করতে পারবে। পিকেএসএফ প্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য একটি পদ্ধতিগত ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করছে।

গ্রামীণ ব্যাংক, বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরদার আকতার হামিদ বলেন, ড. ইউনূস গ্রামীণের সমালোচনাগুলোকে একেবারে ফেলে দেননি। গ্রামীণ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে খালেদা নামের একজনের প্রোফাইল আছে। তিনি একজন ঋণগ্রহীতা ছিলেন। তিনি একজন ডিরেক্টরও। তিনি এর ওনারশিপ ও শেয়ার হোল্ডার। এটিকে একজন নারীর ক্ষমতাবান হওয়া বলব। গ্রামীণ ব্যাংক একজন ঋণ গ্রহীতাকে সঞ্চয় করার বিষয়ে উৎসাহ জোগাচ্ছে। এখানে ২ লাখের বেশি স্টাফ কাজ করছে। এগুলো অপারেশনাল প্রবলেম। এত বেশি মানুষ যেখানে কাজ করে সেখানে অল্প কিছু সমালোচনার কথা শোনা যেতে পারে। তবে যারা এ বিষয়ে জানতে চান তারা শুনে বা ধারণা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। একটি মাইক্রো ফাইন্যান্স শাখায় গিয়ে ঘুরে আসুন।

বইটির লেখক অ্যালেক্স কাউন্টস বলেন, ইউপিএল অক্লান্ত পরিশ্রম করে এ বই বের করেছে। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি গান্ধীকে দেখি। তখন থেকে আমি একজন বড়-মহান আদর্শের ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলাম। তখন আমি প্রফেসর ড. ইউনূসের কথা শুনি। তখন উনাকে আমি চিঠি লিখেছি। তার সঙ্গে কাজ করতে চাই বলেছি। ড. ইউনূস আমাকে তার উত্তর দিলেন, আমাকে আসতে বললেন। ১৯৮৮-এর ডিসেম্বরে আমি বাংলাদেশে আসি। বইটা আমি মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের শাখার ওপর কাজ করে লিখেছি।

লেখক বলেন, নারীরা এ বইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ড. ইউনূস দেখিয়েছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা নারীদের বিরুদ্ধে, দরিদ্রদের বিরুদ্ধে এবং অশিক্ষিতদের বিরুদ্ধে। তিনি এর পাল্টা ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন। আরো একটা কারণ, নারীরা ছিল ভালো গ্রহীতা, তাদের দ্বারা ঋণ পরিশোধের হার বেশি।

অ্যালেক্স বলেন, মানুষের জীবন উন্নত করার জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের এ ক্ষুদ্রঋণের প্রকল্প। তবে যদি কোনো ঋণ গ্রহীতার ক্ষতি হয়, তাহলে তার পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রয়োজন বোধ করেছেন ড. ইউনূস। তার মতো পাবলিক ফিগার ও গ্রামীণের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা থাকবে। কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এ বইকে ড. ইউনূসের জীবনীর একটি অংশ বলতে পারি। ড. ইউনূসকে বুঝতে গ্রামীণ ব্যাংককে বুঝতে হবে। উল্টোদিকের কথাও সত্য, গ্রামীণ ব্যাংককে বুঝতে হলে ড. ইউনূসকে বুঝতে হবে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উন্নয়ন বিষয়ক গবেষক এবং ইনোভিশন কনসাল্টিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াৎ সারোয়ার।

ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দীন বলেন, আমরা সাধারণত বেশি সময় নিয়ে অনুবাদ সম্পাদনা ও বই প্রকাশের কাজটি করি। তবে অ্যালেক্স কাউন্টসের এ বইটি তুলনামূলক দ্রুত বের করা হয়েছে। কারণ আমরা মনে করি ইউপিএল-এর ইংরেজি গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর বাংলা সংস্করণ বের করা দরকার। এতে বাংলাভাষী পাঠকের জন্য বইটি সহজলভ্য হবে।

আলোচকেরা আরো বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের হাত ধরে বাংলাদেশে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্রঋণের জন্ম ও বিকাশের একটি অনন্য বিবরণ হলো ক্ষুদ্র ঋণ, বড় স্বপ্ন গ্রন্থ। এর লেখক গ্রামীণ ফাউন্ডেশন, ইউএসএ-র প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স কাউন্টস ক্ষুদ্রঋণের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন, অর্থনৈতিক মন্দা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে গ্রামীণ ব্যাংক কীভাবে নিজেদের পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে সেসব নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রামীণ মডেলের মূল্যবোধ ও তাৎপর্য নিয়ে সমালোচকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি ড. ইউনূসের অসাধারণ দূরদর্শিতার দীর্ঘমেয়াদি পরম্পরাও বর্ণনা করেছেন।

এ গ্রন্থে লেখক বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম ও শিকাগোর শহরতলীর কয়েকজন নারীর জীবনের প্রাঞ্জল উপাখ্যান তুলে ধরেছেন। এরা সবাই ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই নিজেদের উদ্যোগে ছোট ব্যবসা গড়ে তুলে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। শিকাগোর এ প্রকল্পটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে গ্রামীণ মডেলের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প। গ্রামীণ আমেরিকার সাফল্যের হাত ধরে কীভাবে গ্রামীণ পদ্ধতি আমেরিকায় বিস্তৃত হলো সে বর্ণনা তিনি তুলে এনেছেন।

আরও