জিরো সয়েল ভাবনায় নগর সবুজায়নে গার্ডেনিং বাংলাদেশ

কোনো খোলা মাটি অনাবৃত রাখা উচিত নয়। ঘাস, লতা বা অন্যান্য উদ্ভিদ দিয়ে প্রতিটি ফাঁকা জায়গা আচ্ছাদিত করা গেলে নগরে সবুজায়ন বাড়বে, তাপপ্রবাহ কমবে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলাও সহজ হবে।

দ্রুত নগরায়ন, কংক্রিটের বিস্তার এবং খোলা সবুজ জায়গা কমে যাওয়ার ফলে দেশের শহরগুলো ক্রমেই পরিবেশগত নানা সংকটের মুখে পড়ছে। এ বাস্তবতায় নগরের প্রতিটি ফাঁকা জায়গা সবুজে আচ্ছাদিত করার ‘জিরো সয়েল’ ধারণা নিয়ে কাজ করছে গার্ডেনিং বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা মো. রাকিবুল আমিনের লক্ষ্য, ছাদ, বারান্দা, অফিস, দেয়াল কিংবা ঘরের ছোট্ট কোণ—যেখানে সামান্য জায়গা রয়েছে, সেখানেই প্রকৃতির ছোঁয়া পৌঁছে দেয়া।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলায় গার্ডেনিং বাংলাদেশের নির্মিত কৃত্রিম সবুজ ও জলাভিত্তিক প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। ঘাস, কৃত্রিম লেক, বাঁশঝাড় ও কাঠের দোলনার সমন্বয়ে তৈরি এ আয়োজন নগরজীবনে গ্রামীণ প্রকৃতির আবহ তুলে ধরেছে।

কুষ্টিয়ায় বেড়ে ওঠা রাকিবুল আমিনের গাছের প্রতি ভালোবাসা শৈশব থেকেই। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাড়ির আঙিনায় গোলাপসহ বিভিন্ন ফুলের বাগান গড়ে তোলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ২০০১ সালে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর নগরের সবুজ সংকট তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। চারপাশে কংক্রিটের বিস্তার এবং খোলা জায়গা হারিয়ে যাওয়ার বাস্তবতা থেকেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার ভাবনা তৈরি হয়।

উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলার শুরুটা সহজ ছিল না। ছাত্রাবস্থায় বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে গোলাপ বিক্রির উদ্যোগ নিলেও বৃষ্টিতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। পরে ২০০৮ সালে বসুন্ধরা সিটিতে ‘একেশিয়া’ নামে একটি ছোট দোকান চালু করেন। ইনডোর প্লান্ট বিক্রিতে ভালো সাড়া পেলেও পরবর্তীতে ফুলের দোকান বন্ধের সিদ্ধান্তে সেটি ছেড়ে দিতে হয়।

এরপর তিনি ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ২০১৯ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রিসোর্ট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইকোপার্ক, লেক এবং ব্যক্তিগত বাসভবনের সবুজায়নে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে তারা শতাধিক ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

রাকিবুল আমিনের মতে, গাছ শুধু শোভাবর্ধনের উপকরণ নয়; এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় গাছের সংস্পর্শে থাকলে মানসিক প্রশান্তি যেমন বাড়ে, তেমনি পরিবেশও উপকৃত হয়।

এ ভাবনা থেকেই তিনি ‘জিরো সয়েল’ ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। তার মতে, কোনো খোলা মাটি অনাবৃত রাখা উচিত নয়। ঘাস, লতা বা অন্যান্য উদ্ভিদ দিয়ে প্রতিটি ফাঁকা জায়গা আচ্ছাদিত করা গেলে নগরে সবুজায়ন বাড়বে, তাপপ্রবাহ কমবে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলাও সহজ হবে।

আগামী দিনে ‘গার্ডেন মিশন’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগর সবুজায়নকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে চান রাকিবুল আমিন। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন ও পলিথিনের ব্যবহার কমানোর বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তার।

দীর্ঘদিনের এ উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন বিভাগে জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার পেয়েছেন রাকিবুল আমিন। তবে তার ভাষায়, এ পুরস্কার গন্তব্য নয়, বরং আরও বড় দায়িত্ব পালনের অনুপ্রেরণা।

তিনি বলেন, আমি চাই আগামী প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ পাক, যেখানে গাছের জন্য আলাদা করে খুঁজতে হবে না। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি স্কুল ও প্রতিটি অফিসে অন্তত কিছুটা সবুজ থাকবে। একটি সবুজ শহর মানেই শুধু সুন্দর শহর নয়, বাসযোগ্য শহরও।

আরও