অধিকারভিত্তিক এনজিওগুলোর তহবিল বণ্টনে পক্ষপাত বন্ধের দাবি

মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিওগুলোর সরাসরি অর্থায়ন বাড়ানো এবং তহবিল বণ্টনে পক্ষপাত বন্ধের দাবি জানিয়েছেন মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, স্থানীয়করণ, মানসম্মত তহবিল, সমতার ভিত্তিতে অংশীদারত্ব ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দেশে গ্র্যান্ড বার্গেইন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।

২০১৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবিক সম্মেলনে গ্র্যান্ড বার্গেইন প্রতিশ্রুতিগুলো গৃহীত হয়। চুক্তির এক দশক পূর্ণ হতে চললেও বাংলাদেশে এর বাস্তবায়নে অগ্রগতি সামান্য বলে মনে করেন বক্তারা। তাদের মতে, কম খরচে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত এবং প্রয়োজনে মানুষের কাছে আরো বেশি সহায়তা পৌঁছাতে সক্ষম, এমনভাবে মানবিক কার্যক্রম পুনর্গঠন করা উচিত।

কোস্ট ফাউন্ডেশন, বিডিসিএসও প্রসেস ও কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরামের আয়োজনে ‘গ্র্যান্ড বার্গেইন ২০২৬-পরবর্তী স্থানীয় মানবিক সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা’ শীর্ষক অনলাইন সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএম) নিতাই চন্দ্র দে সরকার। সভাপতিত্ব করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী। সেমিনার সঞ্চালনা করেন ইক্যুইটিবিডির মোস্তফা কামাল আকন্দ। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিডিসিএসও প্রসেসের মো. ইকবাল উদ্দিন।

আলোচনায় অংশ নেন টিয়ারফান্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ক্লারেন্স সুতারশান, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের মো. আবদুল আলীম, সাতক্ষীরার সংগ্রামের পরিচালক মো. ইউসুফ, নাটোরের সাথীর নির্বাহী পরিচালক মো. শিবলী সাদিক, সাতক্ষীরার গণচেতনা ফাউন্ডেশনের শিবু বৈদ্য, কক্সবাজারের শুশীলনের উপদেষ্টা মুজিবুর রহমান, বরগুনার জাগো নারীর হাসান শাহরিয়ার এবং ঢাকার পপির পরিচালক মো. খলিলুর রহমান।

মূল বক্তব্যে মো. ইকবাল উদ্দিন বলেন, স্থানীয়করণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দেশে মাত্র কয়েকটি স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সরাসরি তহবিল পেয়েছে। রোহিঙ্গা সহায়তা কার্যক্রমের সমন্বয় কাঠামোয় আটটি খাত রয়েছে। সব কটির নেতৃত্বে আছে জাতিসংঘের সংস্থা। একটি খাতের একটি উপখাতে সহ-নেতৃত্বে রয়েছে মাত্র একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা। কোনো খাতের নেতৃত্বে জাতীয় বা স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নেই।

তিনি বলেন, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার মোট তহবিলের ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো। আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো পেয়েছে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং জাতীয় সংস্থাগুলো পেয়েছে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। স্থানীয় সংস্থাগুলো কোনো তহবিল পায়নি।

প্রধান অতিথি নিতাই চন্দ্র দে সরকার স্থানীয় সংস্থাগুলোকে দোষারোপ না করে তাদের মধ্যে সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি স্থানীয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সরাসরি অন্তত ২৫ শতাংশ অর্থায়ন দেয়ার আহ্বান জানান।

টিয়ারফান্ডের ক্ল্যারেন্স সুতারশান স্থানীয় নেতৃত্বে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থানীয় অংশীজনদের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে তার সংস্থার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত সহায়তা ও সমন্বয় করা। আর মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে স্থানীয় সংস্থাগুলো।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের মো. আবদুল আলীম বলেন, জাতিসংঘের কিছু সংস্থা মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থায়ন করে। পরে এ ব্যবস্থাকে স্থানীয়করণের একটি ধাপ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি স্থানীয়করণের একটি দেশভিত্তিক সংজ্ঞা নির্ধারণের আহ্বান জানান। এ সংজ্ঞায় জাতিসংঘের সংস্থা, আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

মো. জাহাঙ্গীর আলম কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়ন কক্সবাজারের একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানান। তার তথ্য অনুযায়ী, ওই সংস্থার অধীনে ৩৪টি প্রকল্প রয়েছে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের চর্চা পক্ষপাত, অর্থায়নের কেন্দ্রীভবন ও মেরুকরণের প্রতিফলন। নির্দিষ্ট কিছু সংস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করার এই গোষ্ঠীকেন্দ্রিক অর্থায়ন বন্ধেরও আহ্বান জানান তিনি।

সংগ্রামের পরিচালক মো. ইউসুফ স্থানীয় নেতৃত্বে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নাগরিক সংগঠনগুলোকে ধারাবাহিক প্রচার ও পক্ষে জনমত তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্থানীয়করণ এগিয়ে নিতে সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জাগো নারীর হাসান শাহরিয়ার স্থানীয় সংস্থাগুলোকে সরাসরি অর্থায়নের বিষয়ে দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পপির পরিচালক মো. খলিলুর রহমান মাসুদা বেগম রত্না দুর্যোগের সময় দ্রুত স্থানীয় সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত ও কাজে যুক্ত করার সুবিধার্থে জেলা পর্যায়ে তাদের একটি তালিকা তৈরির প্রস্তাব দেন। তিনি সংস্থাগুলোর যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সহজ ও সমন্বিত করারও সুপারিশ করেন।

শুশীলনের উপদেষ্টা মুজিবুর রহমান স্থানীয়করণ এগিয়ে নেয়ার পথে জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

—বিজ্ঞপ্তি

আরও