এফএমসিজি খাত: দৈনন্দিন জীবন থেকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি

বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। এই পণ্যগুলো ছাড়া এখন আমাদের একটা দিনও কল্পনা করা যায় না। গত কয়েক দশকে ফাস্ট মুভিং কনজ্যুমার গুডস বা এফএমসিজি শিল্প শুধু ভোক্তার জীবন সহজ করেনি, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন এবং সুসংহত সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এই বিকাশ একদিনে হয়নি। বহুজাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজার সম্প্রসারণের ফলে এই শিল্প আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান এত দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে সক্রিয় যে তাদের ইতিহাস বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারের ইতিহাসেরই অংশ। ইউনিলিভার বাংলাদেশ তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান, যার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একটি কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের ৩৯ দশমিক ২৫ শতাংশ অংশীদারিত্বে যৌথ মালিকানায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি হোম কেয়ার, বিউটি অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং, পার্সোনাল কেয়ার এবং ফুড এই চারটি প্রধান খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোম্পানির তথ্যমতে দেশের প্রতি ১০টি পরিবারের ৯টিতে তাদের পণ্য পৌঁছে যায়।

এই বিস্তৃত উপস্থিতির পেছনে রয়েছে শক্তিশালী স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯৫ শতাংশ পণ্য দেশেই উৎপাদিত হয়, যা স্থানীয় শিল্প, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সহযোগী ব্যবসাগুলোকে সরাসরি শক্তিশালী করছে।

কালুরঘাটের উৎপাদনকেন্দ্র সময়ের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন হাবে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অটোমেশন, ইন্টিগ্রেটেড ম্যানুফ্যাকচারিং সিস্টেম এবং ডেটা ভিত্তিক অপারেশনাল মনিটরিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে, যা শিল্পখাতের চলমান রূপান্তরেরই প্রতিফলন।

এই রূপান্তর কর্মক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনছে। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের তথ্যমতে, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজারের বেশি মানুষের জীবিকা এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার খুচরা ব্যবসায়ী তাদের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার অংশ। এর মাধ্যমে গড়ে উঠেছে একটি অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম।

এত বড় অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত রয়েছে রাজস্ব অবদান। ইউনিলিভার বাংলাদেশ ২০২৫ সালে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার কর ও ভ্যাট পরিশোধ করেছে বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ করদাতার স্বীকৃতি এবং অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর মর্যাদা অর্জন এই খাতের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক নির্দেশ করে।

তবে এফএমসিজি খাতকে শুধু রাজস্ব বা উৎপাদনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এখন আর যথেষ্ট, পরিবেশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা শিল্পখাতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতা এবং কমিউনিটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

চট্টগ্রামে ইউনিলিভার বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং ইপসার যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত ভ্যালু চেইনভিত্তিক প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এ ধরনের একটি উদাহরণ। এখানে বর্জ্য সংগ্রহের পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও কমিউনিটি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। কোম্পানির তথ্যমতে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের মাধ্যমে ১৫ লাখের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটকালীন সময়ে এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়তামূলক ভূমিকা পালন করেছে।

এই সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইউনিলিভার বাংলাদেশ ২০২৫ সালে মোস্ট সাসটেইনেবল কোম্পানি অব দ্য ইয়ার বাংলাদেশ এবং মোস্ট সাসটেইনেবল এফএমসিজি কোম্পানি অব দ্য ইয়ার বাংলাদেশ স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রাজস্ব এবং সামাজিক প্রভাব সব মিলিয়ে এই শিল্প এখন দেশের অর্থনীতির একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে যে রূপান্তর চলছে, তা বাংলাদেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।

আরও