কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশীদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবি অনির্বাণের

কম্বোডিয়ায় বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে আটকে পড়া ১ হাজার ৮০০-এর বেশি বাংলাদেশীকে বিশেষ ফ্লাইটে দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন। আগামী ৩১ অক্টোবরের সময়সীমার আগে তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের বিচার, ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সংগঠনটির সভাপতি আল আমিন নয়নের স্বাক্ষর করা একটি বিবৃতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়।

এতে বলা হয়, অনেক বাংলাদেশী বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত চাকরির বদলে তাদের অনেককে বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে নিয়োগ, জবরদস্তি, ভয়ভীতি, চলাচলে বাধা, পাসপোর্ট আটকে রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তির বিনিময়ে অর্থ দাবির মতো ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।

সংগঠনটির মতে, এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত প্রতারণার বিষয় নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন, মানবপাচার প্রতিরোধ, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং নিয়োগব্যবস্থার জবাবদিহি সরাসরি জড়িত।

বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলা হয়, সরকারি ছাড়পত্র ও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশে যাওয়ার পরও একজন বাংলাদেশী মানবপাচারের শিকার হলে নিয়োগ, ঝুঁকি নিরূপণ ও নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল।

সংগঠনটি জানায়, এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগাম দায়ী করা নয়। বরং প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, কম্বোডিয়ায় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে আরোপিত জরিমানা মওকুফের সুযোগ থাকলেও আর্থিক সংকট, বিমান টিকিটের উচ্চমূল্য, পাসপোর্ট ও ট্রাভেল পাসসংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক বাংলাদেশী দেশে ফিরতে পারছেন না।

অনির্বাণের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে জরিমানা মওকুফের আওতায় দেশে ফেরার আবেদন করা ১ হাজার ৭৯৭ জনের তালিকা কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে বলে জানানো হয়েছিল। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে আবেদন করতে না পারা আরো চার শতাধিক বাংলাদেশী একই ধরনের সংকটে রয়েছেন।

সংগঠনটি বলেছে, ৩১ অক্টোবর সময়সীমা সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আর বিলম্ব করা উচিত নয়। আটকে পড়া বাংলাদেশীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি সংগ্রহে সহায়তার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে জরুরি কূটনৈতিক সমন্বয় করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরতে না পারা ব্যক্তিদের জন্যও বিকল্প প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা নেয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন প্রত্যাবাসিত প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, বাধ্যতামূলক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অন্য কোনো ধরনের শোষণের শিকার হওয়ার বিষয়টি যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে।

সংগঠনটির মতে, জবরদস্তি বা পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে থেকে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করলে মানবপাচারের প্রকৃত চিত্র উপেক্ষিত হতে পারে। তাই তাঁদের ক্ষেত্রে মানবপাচারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তদন্ত, যথাযথ আইনি মূল্যায়ন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অপরাধে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিকে শাস্তি না দেয়ার নীতি অনুসরণ করতে হবে।

দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে নিরাপদ অভ্যর্থনা, খাবার, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা, প্রয়োজনীয় যাতায়াত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশে সক্রিয় সম্ভাব্য মানবপাচারকারী চক্রের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়োগকারী সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

অনির্বাণ আরো বলেছে, যেসব ব্যক্তি বৈধ সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় গিয়ে মানবপাচারের শিকার হয়েছেন, তাদের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নিয়োগকর্তা যাচাই, কর্মস্থল পরিদর্শন, চাকরির চুক্তি, বেতন, আবাসন এবং গন্তব্য দেশের ঝুঁকি নিরূপণে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।

ভবিষ্যতে কম্বোডিয়া ও অন্যান্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের নেতৃত্বাধীন সংগঠন হিসেবে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, তাদের প্রয়োজন নিরূপণ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পাঠানো, পুনর্বাসন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং নীতিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করতে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।

সংগঠনটির সভাপতি আল আমিন নয়ন বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নাগরিকদের বৈধভাবে পাঠানোই যথেষ্ট নয়। তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নাগরিক বিদেশে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা, সুরক্ষা দেয়া, পুনর্বাসন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বিবৃতিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁদের মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি হিসেবে যথাযথ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যেসব ব্যবস্থাগত দুর্বলতার সুযোগে বাংলাদেশিরা পাচারের শিকার হয়েছেন, সেগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

সংগঠনটির আহ্বান, আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে এনে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাংলাদেশী একইভাবে মানবপাচারের শিকার না হন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

—বিজ্ঞপ্তি

আরও