সিরামিক ব্লক

নির্মাণ ব্যয় কমানোর নতুন সম্ভাবনা

ফাঁপা সিরামিক ব্লকের কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রযুক্তিগত গবেষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ১০ তলা আবাসিক ভবনের ওপর একটি পৃথক প্রকৌশলগত মূল্যায়নেও এর ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নির্মাণ ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকায় দেশে নির্মাণ খাতে ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি এখন আর শুধু একটি ইটের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ডেভেলপার, ঠিকাদার ও বাড়ির মালিকদের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, একটি দেয়াল নির্মাণে প্রকৃত খরচ কত, কত শ্রম ও মর্টার প্রয়োজন, দেয়ালটি ভবনের ওপর কতটা অতিরিক্ত ওজন সৃষ্টি করছে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক নির্মাণ ব্যয়ের ওপর কতটা পড়ছে?

এ জায়গাতেই বড় আকারের ফাঁপা সিরামিক ব্লক গুরুত্ব পাচ্ছে।

মিরপুর সিরামিকস দেশের নির্মাণ পরিবেশের উপযোগী আধুনিক ফাঁপা সিরামিক ব্লক বাজারে আনছে, যা প্রচলিত সলিড মাটির ইটের একটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে। বড় আকার ও ফাঁপা কাঠামোর কারণে একই পরিমাণ দেয়াল নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক ব্লক প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি কম ওজনের কারণে ভবনের স্থায়ী কাঠামোগত ভারও কমতে পারে।

ফাঁপা সিরামিক ব্লকের কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রযুক্তিগত গবেষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ১০ তলা আবাসিক ভবনের ওপর একটি পৃথক প্রকৌশলগত মূল্যায়নেও এর ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বড় ব্লক কম মর্টার

সিরামিক ব্লকের অন্যতম সুবিধা এর আকার। প্রকৌশলগত মূল্যায়নে প্রায় ৯×৪.৫×৩ ইঞ্চি আকারের প্রচলিত সলিড ইটের সঙ্গে ২৫০×২০০×২০০ মিলিমিটার এবং ২৫০×২০০×১০০ মিলিমিটার আকারের বড় ফাঁপা সিরামিক ব্লকের তুলনা করা হয়েছে।

বড় ব্লক দিয়ে কম সংখ্যক ইউনিটে বেশি দেয়াল নির্মাণ করা যায়। ফলে শ্রমিকদের কম সংখ্যক ইউনিট বহন, স্থাপন ও সারিবদ্ধ করতে হয়। মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রচলিত সলিড ইটের তুলনায় ফাঁপা ব্লকে মর্টারের প্রয়োজন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।

বড় নির্মাণ প্রকল্পে এর ফলে শুধু মর্টারের ব্যবহারই কমে না, মর্টার প্রস্তুত ও দেয়ালে প্রয়োগের কাজেও দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

সিমেন্ট ও বালুতে ২২ শতাংশের বেশি সাশ্রয়

সিমেন্ট ও বালুর ব্যবহার বিবেচনায় নিলে ফাঁপা সিরামিক ব্লকের অর্থনৈতিক প্রভাব আরো স্পষ্ট হয়।

প্রকৌশলগত মূল্যায়নে প্রচলিত সলিড ইটের ক্ষেত্রে সিমেন্টের প্রয়োজন হয়েছে ৬৪৬ ইউনিট। ফাঁপা ব্লকের ক্ষেত্রে এ প্রয়োজন কমে দাঁড়িয়েছে ৫০৩ ইউনিটে। অর্থাৎ সিমেন্ট ব্যবহারে ২২ দশমিক ১৩ শতাংশ সাশ্রয় পাওয়া গেছে।

একইভাবে, প্রচলিত ইটের ক্ষেত্রে বালুর ব্যবহার ৩ হাজার ৪০ ইউনিট হলেও ফাঁপা ব্লকের ক্ষেত্রে তা ২ হাজার ৩৬৫ ইউনিট। এতে বালু ব্যবহারে ২২ দশমিক ২০ শতাংশ সাশ্রয় পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে মূল্যায়নে সিমেন্ট ও বালুর উপকরণ ব্যয়ে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাসের হিসাব পাওয়া গেছে।

উপকরণের ব্যবহার কমার পাশাপাশি নির্মাণস্থলে এসব উপকরণ পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনও কমে আসতে পারে। এতে সামগ্রিক নির্মাণ দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

হালকা দেয়াল, কম কাঠামোগত ভার

কম ওজন মানেই কম কর্মক্ষমতা নয়। এমআইএসটির প্রযুক্তিগত গবেষণায় পাঁচ ধরনের ফাঁপা সিরামিক ব্লকের পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষিত ব্লকগুলোর ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭৩৬ দশমিক ৪৫ থেকে ১ হাজার ১২৪ দশমিক ৬০ কেজি। গবেষণায় ব্যবহৃত সলিড ইটের ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ১ হাজার ৬৭৫ কেজি।

কম ঘনত্বের কারণে ফাঁপা সিরামিক ব্লক দিয়ে নির্মিত দেয়াল ভবনের ওপর তুলনামূলক কম স্থায়ী ভার সৃষ্টি করতে পারে।

এমআইএসটির জি+মেজানাইন+৮ তলা ভবনের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফাঁপা সিরামিক ব্লক ব্যবহারে মোট উল্লম্ব ভার প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ কমতে পারে। গবেষণার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পাইলের সংখ্যা ৩৮টি থেকে ৩৩টিতে নেমে আসে, যা ১৫ শতাংশ হ্রাসের নির্দেশক।

এ ধরনের ডেড লোড কমানো ভবনের ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য কাঠামোগত উপাদানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

দেয়ালের বাইরেও সাশ্রয়ের সুযোগ

১০ তলা আবাসিক ভবনের পৃথক প্রকৌশলগত মূল্যায়নে পুরো কাঠামোগত ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ব্যয় সাশ্রয়ের হিসাব করা হয়েছে।

মূল্যায়নে ফাউন্ডেশনের ব্যয় ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ, কলামের ব্যয় ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, বিমের ব্যয় ৪ শতাংশ এবং স্ল্যাবের ব্যয় ২ শতাংশ কমেছে।

ফাউন্ডেশন ব্যয় ৮ দশমিক ৫০ মিলিয়ন টাকা থেকে ৭ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন টাকা। কলামের ক্ষেত্রে আনুমানিক সাশ্রয় ৭ লাখ ৫২ হাজার ৫১৮ টাকা, বিমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৫২ টাকা এবং স্ল্যাবে প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৬৩০ টাকা।

তবে এসব হিসাব নির্দিষ্ট ভবন ও গবেষণায় ব্যবহৃত অনুমানের ভিত্তিতে করা। ফলে প্রতিটি প্রকল্পে একই মাত্রার সাশ্রয় নিশ্চিত হবে—এমন দাবি করা যায় না। তবে ফলাফলগুলো দেখায়, দেয়াল নির্মাণের উপকরণ নির্বাচন একটি ভবনের সামগ্রিক কাঠামোগত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

ওজন কম, সক্ষমতা নয়

হালকা হওয়া মানেই কম শক্তিশালী হওয়া নয়। এমআইএসটির গবেষণায় পাঁচ ধরনের ফাঁপা সিরামিক ব্লকের কনফাইন্ড ও আনকনফাইন্ড অবস্থায় কম্প্রেসিভ পারফরম্যান্স পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষিত নমুনাগুলোর গ্রস কম্প্রেসিভ স্ট্রেংথ প্রায় ৯ দশমিক ৪ থেকে ১৩ দশমিক ২ মেগাপ্যাসকেল পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, কনফাইনমেন্টের মাধ্যমে লোড বহনের সক্ষমতা বাড়ে এবং ফাটল ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়। গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, পরীক্ষিত ফাঁপা সিরামিক ব্লকগুলো সলিড ক্লে ব্লকের সঙ্গে তুলনীয় কম্প্রেসিভ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, বিশেষ করে কনফাইন্ড অবস্থায়।

গবেষণায় ফাঁপা ব্লকের তুলনামূলক কম পানি শোষণও লক্ষ্য করা হয়েছে। একটি নমুনায় পানি শোষণের হার ছিল ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। পরীক্ষিত সলিড ক্লে ব্রিকের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ।

ভূমিকম্পে কম কাঠামোগত চাহিদা

এমআইএসটির গবেষণায় ভূমিকম্পজনিত আচরণও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাধীন ভবনে প্রচলিত সলিড ইটের পরিবর্তে ফাঁপা সিরামিক ব্লক ব্যবহারে ভূমিকম্পের সময় সৃষ্ট বেস শিয়ার প্রায় ১২ শতাংশ কম পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ স্টোরি ড্রিফটও তুলনামূলক কম ছিল।

বাংলাদেশের মতো দেশে ভবনের অপ্রয়োজনীয় কাঠামোগত ওজন কমানো গুরুত্বপূর্ণ। এ দিক থেকে হালকা ওজনের ম্যাসনরির ব্যবহারও গুরুত্ব পাচ্ছে।

শুধু একটি ইটের দাম নয়, ভবনের প্রকৃত খরচ

ম্যাসনরির অর্থনীতি শুধু একটি ইটের দামের ভিত্তিতে বিচার করা যায় না। কম দামের ইট ব্যবহার করলেও যদি বেশি ইউনিট, বেশি মর্টার, বেশি শ্রম এবং বেশি কাঠামোগত সহায়তার প্রয়োজন হয়, তাহলে সামগ্রিক নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।

বড় আকারের ফাঁপা সিরামিক ব্লক কম ইউনিট, কম মর্টার ব্যবহার এবং কম দেয়াল ওজনের মাধ্যমে এ হিসাবকে নতুন করে বিবেচনার সুযোগ তৈরি করে। উপলব্ধ প্রকৌশলগত মূল্যায়নে মর্টারের ব্যবহার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, সিমেন্ট ২২ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং বালু ২২ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছে। সিমেন্ট ও বালুর উপকরণ ব্যয়েও ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ হ্রাসের হিসাব পাওয়া গেছে।

একই সঙ্গে কাঠামোগত মূল্যায়নে ফাউন্ডেশনে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ, কলামে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, বিমে ৪ শতাংশ এবং স্ল্যাবে ২ শতাংশ ব্যয় হ্রাসের হিসাব পাওয়া গেছে।

মিরপুর সিরামিকসের জন্য তাই এটি শুধু প্রচলিত ইটের পরিবর্তে নতুন একটি পণ্য ব্যবহারের বিষয় নয়। বরং দেয়ালকে ভবনের সামগ্রিক ব্যয়, কাঠামোগত ভার ও নির্মাণ দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়।

দেশের নির্মাণ খাত যখন ক্রমবর্ধমান উপকরণ ও শ্রম ব্যয়ের মধ্যে আরো দক্ষভাবে নির্মাণের পথ খুঁজছে, তখন কম উপকরণ ব্যবহার, কম কাঠামোগত ভার ও নির্মাণ দক্ষতা বাড়ানোর কারণে সিরামিক ব্লক একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হতে পারে।

প্রশ্নটি তাই শুধু ‘একটি ইটের দাম কত?’ নয়; বরং ‘একটি ভবন নির্মাণের প্রকৃত খরচ কত?’

আরও