তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করলেও একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে নানা বাধার কারণে তারা নেতৃত্বের কেন্দ্রে পৌঁছতে পারেন না। তাই নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং কাঠামোগত উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
আবার রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সামগ্রিক সমাজের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নারী যেন নিজ দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্য অবস্থানে পৌঁছতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ সমাজের সবার দায়িত্ব।
গত প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আন্দোলনের মাঠে তারা পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সমানভাবে অংশ নিয়েছেন, নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। এমনকি অনেকেই সহিংসতার শিকারও হয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে নারীরা পরিবার সামলানোর পাশাপাশি রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। তাই তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতেই নেতৃত্বের জায়গায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।
নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়কে গুরুত্ব দেয়া দরকার। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করলে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারীদের নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্বে আসার সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের কমিটিগুলোয় নারীর বাধ্যতামূলক উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। অনেক নারী কর্মী বিভিন্ন আন্দোলন, সংগঠন এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে তারা আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে যেতে পারেন না। ফলে তাদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এজন্য সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে আরো বেশি নারীকে সংসদে আসার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার। যেসব নির্বাচনী এলাকায় নারীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন এবং নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছেন, তাদের নির্বাচন ঘিরে অন্তত দুই-তিন বছর আগে থেকেই প্রস্তুত করার সুযোগ দিতে হবে। দলগুলোর উচিত এসব নারী নেত্রীকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ করার জন্য উৎসাহ দেয়া এবং প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করা। এতে তারা জনগণের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং নেতৃত্বের অবস্থানে পৌঁছতে পারবেন।
পেশাগত জায়গায় দেশের নারীরা এখন অনেক ভালো করছেন। দেশের কূটনৈতিক সেবায় এরই মধ্যে অনেক নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মিশনে তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে আরো বেশি নারী যাতে তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে এ খাতে নেতৃত্বের সুযোগ পান, সেদিকেও দৃষ্টি দেবে বিএনপি। শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সব মন্ত্রণালয়েই নারীরা যেন তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ পান, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বিশ্বের সব নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে নানা সংঘাত ও সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, আর এসব পরিস্থিতিতে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে নারী ও শিশুরা বিশেষভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
এ বাস্তবতায় নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে যেখানে নারীরা নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবেন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা তরুণীরা যেন তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
একটি সত্যিকারের নারীবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে হলে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ—সবার সহযোগিতার মাধ্যমেই নারীর সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব।
শামা ওবায়েদ, এমপি: প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়