নারী ক্ষমতায়নের সংজ্ঞাটিকে নতুনভাবে বিবেচনা করা দরকার

রাজনীতি একটি বিশাল ক্যানভাস। এখানে মানুষের আবেগ আর অধিকার নিয়ে কাজ করতে হয়। সুতরাং এখানে প্রতিবন্ধকতা তো অবশ্যই আছে।

একজন নারী যখন রাজনীতিতে আসেন, তাকে হাজারো সামাজিক ট্যাবু মোকাবেলা করতে ও বাঁকা কথা শুনতে হয়। আমি নিজেও আজ এসব চড়াই-উতরাই পার করে এখানে এসেছি। এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলার বড় হাতিয়ার হলো ‘মানসিক জেদ’। যারা রাজনীতিতে সাময়িক সুবিধা নিতে আসেন, তারা বেশিদূর যেতে পারেন না। কিন্তু যারা মানুষের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন তৈরি করতে চান, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হয়। আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিতে নারীকে এখনো ঘরকুনো হিসেবে দেখার প্রবণতা আছে। এ ট্যাবুগুলো ভাঙতে হলে আমাদের নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

নারী ক্ষমতায়নের সংজ্ঞাটি আমাদের নতুনভাবে বিবেচনা করা দরকার। এখনো আমাদের সমাজে শুধু সরকারি চাকরিতে কোটা বা রাস্তাঘাটে কিছু সুযোগ দেয়াকেই নারীর ক্ষমতায়ন মনে করা হয়। কিন্তু নারীর ক্ষমতায়ন বলতে শুধু এটুকুই নয়। নারীকে ভেতর থেকে জাগ্রত করতে হবে, আত্মবিশ্বাসী করতে হবে। নারী যেন উঠে আসতে পারে, সেই পরিবেশটা তৈরি করতে হবে। বর্তমানে সাইবার বুলিং এবং কর্মক্ষেত্রে হয়রানি নারীর অগ্রগতির বড় অন্তরায়। আইন অনেক আছে, কিন্তু তার প্রয়োগের জায়গায় আমরা এখনো পিছিয়ে। ​আমরা মন্ত্রণালয় থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছি। তবে নারীর অধিকার নিশ্চিতের শুরুটা হতে হবে পরিবার থেকে। একটি ছেলে শিশুকে যদি পরিবার থেকেই শেখানো হয় যে তার বোন বা মা তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, তবে সমাজ বদলে যাবে। আমরা স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করছি। ক্ষমতায়ন মানে শুধু রাজপথে আন্দোলন নয়, ক্ষমতায়ন মানে নিজের যোগ্যতায় নিজের জায়গাটা ছিনিয়ে নেয়া।

তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো নারীকে ভেতর থেকে জাগ্রত করা। আমরা পলিসি তৈরি করি, সুযোগ-সুবিধা দেই। কিন্তু সে নারী কি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেগুলো গ্রহণ করতে পারছে? আমাদের সমাজ একজন নারীকে ছোটবেলা থেকেই শেখায় যে সে ‘দুর্বল’। আমরা এ জায়গাটায় পরিবর্তন আনতে চাই। নারীদের ভেতরে আমরা এ বিশ্বাস তৈরি করতে চাই যে বাধা বা সংগ্রাম সবার জীবনেই থাকে, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি থাকলে তা জয় করা সম্ভব।

নারীকে যে বৈষম্য বা নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার শেকড় অনেক গভীরে। সরকার হিসেবে আমরা অবশ্যই এ-সংক্রান্ত আইন ও নীতি প্রণয়ন করছি, কিন্তু আমি মনে করি মূল কাজটা হওয়া উচিত নারীর ‘মানসিক ক্ষমতায়ন’ নিয়ে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে যে ফ্যামিলি কার্ডের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, সেটি কেবল একটি কার্ড নয়; এটি নারীর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির একটি দলিল। আমাদের দেশের কোটি কোটি নারী ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সংসারে যে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন, তার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন নেই। জিডিপি সংক্রান্ত পরিসংখ্যানগুলোয়ও এর যথাযথ প্রতিফলন নেই। আমরা এ কার্ডের মাধ্যমে তাদের সেই অবদানের স্বীকৃতি দিতে চাই এবং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে একটি শক্ত ভিত দিতে চাই। ​

এখানে একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন যে এটি বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা খাতের (যেমন বিধবা বা বয়স্ক ভাতা) কোনো বিকল্প নয়, বরং একটি নতুন সংযোজন। এর জন্য পৃথক তহবিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমরা কার্ডটি পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর নামে ইস্যু করার চিন্তাভাবনা করছি, যাতে পরিবারের মূল নিয়ন্ত্রণ ও সম্মান তার হাতে থাকে। আর ​স্বচ্ছতার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করছি না। আমরা একটি ইন্টিগ্রেটেড এমআইএস (এমআইএস) সিস্টেম বা ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করছি। অনেক সময় দেখা যায় একজন ব্যক্তি একাধিক কার্ড দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করে সুবিধা নিচ্ছেন। আমাদের সিস্টেমে প্রতিটি পরিবারের একটি ‘ফ্যামিলি ট্রি’ থাকবে। যদি কোনো নারী ফ্যামিলি কার্ড গ্রহণ করেন এবং তিনি আগে থেকে অন্য কোনো ভাতা পেতেন, তবে তাকে একটি সারেন্ডার করতে হবে। এর মাধ্যমে একই ব্যক্তির একাধিক ভাতা পাওয়ার সুযোগ কমবে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন, এ ধরনের আরো বেশিসংখ্যক মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে। যেহেতু ফ্যামিলি কার্ডের ভাতার পরিমাণ অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি, তাই স্বাভাবিকভাবেই মানুষ হয়তো ফ্যামিলি কার্ডকেই বেছে নেবে। আমরা আপাতত এ নিয়ে পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছি। ধীরে ধীরে পুরো বাংলাদেশে এটি ছড়িয়ে দেব।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেশের নারীদের উদ্দেশে আমার মূল বার্তা হলো—যোগ্যতা অর্জন করুন। আমরা কোটা বা দয়া নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমরা চাই প্রতিটি নারী যেন নিজেকে এত বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলেন যে সমাজ তাকে নিতে বাধ্য হয়। আমি নিজে মন্ত্রণালয় থেকে গতানুগতিক অনুষ্ঠানের বাইরে গিয়ে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছি। নারীরা যেদিন নিজেদের ভেতর থেকে জেগে উঠবে, সেদিনই এ দিবস সার্থক হবে।

ফারজানা শারমিন পুতুল, এমপি: প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়

আরও