ভাষা
আন্দোলনের ইতিহাসে শামসুল হক উপেক্ষিত একটি নাম; যদিও তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক, পাকিস্তান আন্দোলনের বলিষ্ঠ নেতা এবং ভাষা আন্দোলনের একজন শীর্ষ নেতা। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে বিশেষ করে যুবসমাজকে সংগঠিত করতে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। অপার সম্ভাবনার এই রাজনীতিবিদ উল্কাপিণ্ডের মতো আবির্ভূত হয়ে আপন দ্যুতি ছড়াতে ছড়াতে আকস্মিকভাবে নিষ্প্রভ হয়ে গেছেন।
দুই.
শামসুল হক অল্প বয়সেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। টাঙ্গাইলে কোনো রাজনৈতিক নেতার আগমনের সংবাদ পেলে তার বক্তৃতা শুনতে ছুটে যেতেন। ছাত্রজীবনেই নেতৃত্বগুণে সবার মন জয় করেন। ১৯৩৯ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় করটিয়া সা’দত কলেজের ভিপি নির্বাচিত হন। তার কালে অন্যান্য মুসলমান যুবকের মতোই তিনিও মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির স্বপ্নে বিভোর হয়ে মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হন। মুসলিম লীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সভায় যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পড়ালেখা এবং ঢাকায় বসবাসের পর থেকে তার চিন্তা ও কর্মের জগৎ প্রসারিত হয়। ঢাকার আহসান মঞ্জিলকেন্দ্রিক নবাব-জমিদারদের রাজনীতির বাইরে গণমুখী রাজনীতির ধারা পরিপুষ্ট করতে মাঠে নামেন। আবুল হাশিম মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সংগঠনটিকে গণমুখী করার উদ্যোগ নিলে পূর্ববঙ্গে সে উদ্যোগ সফলে দায়িত্ব বর্তায় শামসুল হকের ওপর। ১৯৪৫ সালে আবুল হাশিম এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় মুসলিম লীগের আঞ্চলিক অফিস (পার্টি হাউস) স্থাপন করে তা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করেন শামসুল হককে। শামসুল হকের জীবনীকার জুলফিকার হায়দার বলেছেন: ‘শামসুল হক পার্টি হাউসের প্রধান সংগঠক এবং কর্মাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগকে একটি গণসংগঠনে পরিণত করার সমস্ত কৃতিত্ব তার।’ ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে পূর্ববঙ্গে এ রাজনৈতিক দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পেছনে শামসুল হকের বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবুল হাশিম এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কোণঠাসা হয়ে পড়লে শামসুল হক রাজনীতির মাঠে হোঁচট খান। ফলে খুঁজতে থাকেন মুসলিম লীগের পশ্চাত্পদ, সাম্প্রদায়িকতাপুষ্ট, গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতির বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারার গণমুখী রাজনীতি। প্রগতিশীল যুবনেতারা ১৫০ মোগলটুলীতে সমবেত হয়ে ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ গঠন করেন, প্রতিশ্রুতিশীল ও উদীয়মান রাজনীতিবিদ শামসুল হক ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং কলকাতা থেকে আসা প্রগতিশীল তরুণ ও যুব রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন গণতান্ত্রিক যুবলীগ। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর এ সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে কলকাতায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় যুব সম্মেলনে যোগদানকারী প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। পূর্ববঙ্গের রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর। তাকে এ রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
শামসুল
হক ছিলেন খাঁটি বাঙালি। বাংলা ভাষা এবং বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির প্রতি তার গভীর দরদ ছিল। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সংস্কৃতির ওপর খড়্গহস্ত হলে তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষাবিষয়ক সংশোধনী প্রস্তাব অগ্রাহ্য হলে পূর্ববঙ্গের রাজপথে প্রকাশ্য আন্দোলন শুরু হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে ওঠা এ আন্দোলনে শামসুল হক সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে আয়োজিত এক সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হলে তিনি তার সদস্য হন। ১১ মার্চ ধর্মঘটে পিকেটিং করার সময় গ্রেফতার হন। শামসুল হকের ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদান এবং গ্রেফতার হওয়া প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘কারাগারের রোজনামচা’য় লিখেছেন: ‘প্রথম
ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, জনাব শামসুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেফতার হই এবং আব্দুল ওয়াদুদসহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেফতার হয়।’ এ সময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের আট দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে কারাবন্দি শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতাদের দেখিয়ে তা অনুমোদন করা হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক অন্য বন্দিদের সঙ্গে শামসুল হক ১৫ মার্চ মুক্তিলাভ করেন। চুক্তির কিছু অংশে অসংগতি লক্ষ করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতারা ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসভা করেন এবং পরে মিছিল নিয়ে আইন পরিষদ ভবন ঘেরাও করেন। পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে শওকত আলীসহ অনেকে গুরুতর আহত হন। এ খবর শুনে শামসুল হক সেখানে ছুটে যান। পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নাইমউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় শামসুল হক, অলি আহাদ প্রমুখ নেতা বক্তৃতা করেন। পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গ সফরে এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ জিন্নাহর সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের যে বৈঠক হয়, তাতে শামসুল হক যোগ দেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তার সঙ্গে গভর্নর জেনারেলের তুমুল বাগিবতণ্ডা হয়। শামসুল হক জিন্নাহকে নামাজের সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ায় জিন্নাহ চটে ওঠেন এবং একপর্যায়ে জিন্নাহ বৈঠক থেকে উঠে যান। পূর্ববঙ্গ সফরে এসে জিন্নাহ চট্টগ্রামের ছাত্র ও যুবকদের ক্ষোভ প্রশমনের জন্যে সেখানে যান। তার সফরের সময় বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং তার রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানোর জন্যে ছাত্রদের সংগঠিত করতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নির্দেশে শামসুল হক চট্টগ্রামে যান। গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি সস্ত্রীক চট্টগ্রামে পৌঁছে একটি বাসায় ওঠেন এবং ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জিন্নাহর ভাষাবিষয়ক বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানোর জন্য একটি রূপরেখা প্রস্তুত করে দেন। আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলন ক্রমে থেমে গেলে সরকার আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং স্কুলে উর্দু শিক্ষা চালুর অপপ্রয়াস চালায়। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের আন্দোলন, মূলনীতিবিরোধী আন্দোলন এবং খাদ্য আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন।
তিন.
শামসুল
হক পূর্ববঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে বিজয়ের কারণে। এ নির্বাচনে শামসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নী। নির্বাচনে শামসুল হক বিপুল ভোটে জয়ী হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই বছরের মাথায় মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসনের জবাব দিয়েছিল টাঙ্গাইলের জনগণ। বস্তুত উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা এবং আরবি হরফে বাংলা চালুর অপপ্রয়াসসহ মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এ নির্বাচনেই প্রথম প্রত্যক্ষ রায় দেন। ফলে এ নির্বাচন ছিল পূর্ববঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরাট মাইলফলক। একে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগের পতনের অভিযাত্রা শুরু হয়।
টাঙ্গাইলের
উপনির্বাচনে বিজয়ের পর শামসুল হক পূর্ববঙ্গের রাজনীতির এক অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর বিরোধী দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে চলে আসেন রাজনীতির মাঠের আরো অগ্রভাগে। মুসলিম লীগ সরকার আরবি হরফে বাংলা প্রচলনসহ বিভিন্নভাবে বাংলা ভাষাবিরোধী তত্পরতা চালালেও তাতে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন মেলেনি। তাছাড়া খাদ্য সংকটসহ নানা সমস্যায় পূর্ববঙ্গের জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটান পাকিস্তানের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি পূর্ববঙ্গ সফরে এসে ১৯৫২ সালের ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে মুসলিম লীগের সম্মেলন ও জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা ব্যক্ত করলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। শামসুল হক এ আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। আন্দোলন সুসংগঠিতভাবে পারিচালনার জন্য ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে যে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তিনি তার সদস্য মনোনীত হন। একুশে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণার পর তার পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে শামসুল হকসহ অন্য নেতারা জেলায় জেলায় সফর করেন। আহমদ রফিক বলেছেন: ‘এ
সময় মওলানা ভাসানী ও শামসুল হক প্রদেশের সর্বত্র ঘুরে ঘুরে সভা করছেন আওয়ামী মুসলিম লীগকে তৃণমূল স্তরে সংগঠিত করতে। এই সাংগঠনিক তত্পরতাও দেশের সর্বত্র ভাষা আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছিল।’
চার.
ভাষা
আন্দোলন প্রবল রূপ ধারণ করলে সরকার তা স্তব্ধ করে দিতে ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে ওইদিন রাতে নবাবপুর রোডে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে তাঁর যুক্তিগুলো ছিল—প্রথমত, আওয়ামী লীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, দ্বিতীয়ত, গোলযোগের সুযোগ গ্রহণ করে সরকার প্রস্তাবিত সাধারণ নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করবে এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্রবিরোধী এবং ধ্বংসাত্মক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। একইভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশেও তিনি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তার ওই বক্তব্য শুনে সমাবেশে উপস্থিত ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে তিনি দ্রুত বক্তব্য শেষ করেন। এরপর সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হলে শামসুল হক তা মেনে নেন এবং আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এ প্রসঙ্গে ওই সভার সভাপতি গাজীউল হক লিখেছেন: ‘একটি
কথা এখানে বলা প্রয়োজন। না বললে অন্যায় করা হবে। এ কথা সত্য, শামসুল হক সভায় ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। কিন্তু যখনই ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তখনই শামসুল হক আমাকে বললেন, এ সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিলাম এবং আমি এ সংগ্রামের সঙ্গে আছি।’ পুলিশের হামলা এবং গুলিতে হতাহতদের দেখতে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে শামসুল হক সকলের আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। হাসপাতাল থেকেই অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পরবর্তী করণীয় বিষয়ে বৈঠকে বসার আহ্বান জানান। এ সময় আবুল হাশিম, শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমদ, কাজী গোলাম মাহবুব, আবদুল গফুর প্রমুখ এক বৈঠকে মিলিত হয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করেন। এরপর ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পর পর দুটি সভায় শামসুল হক অংশগ্রহণ করেন।
ভাষা
আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্তে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একটি বিবৃতি প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন বলে প্রচার হয়। তাঁর ওই বিবৃতির তীব্র সমালোচনা করে পাল্টা বিবৃতি দেন শামসুল হক। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘যদি
প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি উপরোক্ত মর্মে বিবৃতি দিয়া থাকেন, তবে উহাতে তাঁহার ব্যক্তিগত অভিমতই প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া বুঝিতে হইবে এবং আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিতেছি যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগ বাংলাকেই পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার দাবী করে এবং পাক গণপরিষদে বাংলা রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত এবং সরকার কর্তৃক কার্যকরী না করা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালাইবে।’ ফেব্রুয়ারির শেষদিন পর্যন্ত এমনকি মার্চের প্রথম সপ্তাহেও তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালের ২ মার্চ তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে পাঁচ দফা নির্দেশনা জারি করেন, তার ১ ও ২ নং নির্দেশনায় বলা হয়: ‘রাষ্ট্রভাষা
আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চালিয়ে যেতে হবে। দেশের আইন ও শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক বা সহযোগিতা করা চলবে না। এ-আন্দোলন এ-পর্যন্ত সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে ও শৃঙ্খলার সঙ্গে চালিয়ে নেয়া হয়েছে এবং আমাদের বিশ্বাস, এ আন্দোলনের সঙ্গে কমিউনিস্ট বা বিদেশীদের কোনো সংযোগ বা সংস্রব নেই।’
পাঁচ.
ভাষা
আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে তিনি রাজরোষে পড়েন। ২৮ ফেব্রুয়ারি শামসুল হকসহ ভাষা আন্দোলনের শীর্ষ নয় নেতার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ১৯৫২ সালের ১৯ মার্চ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির হলে তাঁকে গ্রেফতার দেখিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে প্রেরণ করা হয়। তাঁর গ্রেফতার সম্পর্কে সাপ্তাহিক
ইত্তেফাক (২৫ মার্চ ১৯৫২) পত্রিকায় বলা হয়: ‘পূর্ব্ব-পাক আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শামসুল হক বিগত ১৯শে মার্চ্চ বুধবার ঢাকা জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির হন। তাঁহাকে গ্রেফতার করিয়া ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে প্রেরণ করা হইয়াছে। ... গ্রেফতারের
প্রাক্কালে জনাব হক বলেন, “রাষ্ট্রভাষা
আন্দোলন ছাত্র-যুবক ও জনসাধারণের মিলিত আন্দোলন। ইহা তাঁদের বাঁচিবার আন্দোলন। এই আন্দোলনের পিছনে কাহারও উস্কানী নাই কিংবা কোন কুচক্রীরা ইহার সুযোগ লইতেছে এই অভিযোগও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ... সত্যকে
প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে বহু জুলুম ও হয়রানি সহ্য করিতে হইবে। কিন্তু সত্যের জয় অবধারিত”।’
শামসুল
হককে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৫ নং সেলে রাখা হয়। বায়ান্নর কারাগারের সেই বেদনাবহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে অলি আহাদ লিখেছেন: ‘৫
নং ওয়ার্ডে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, শামসুল হক, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, খান সাহেব ওসমান আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, অধ্যাপক মোজাফফার আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক অজিত গুহ, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নেওয়াজ খান, আজিজ আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, শওকত আলী, হাশিমুদ্দীন আহমদ, আবদুল মতিন, ফজলুল করিম ও আমি একত্রে বাস করিতাম।’ শামসুল হকের কারাজীবন দুর্বিষহ ছিল। কারানির্যাতনে তার শরীর ও মন উভয়ই খারাপ হতে থাকে। ক্রমে অবনতি ঘটে মানসিক স্বাস্থ্যের। ফজলুল করিম ‘বায়ান্নর কারাগার’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘হক
সাহেব জেলখানায় মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন।...ঢাকা
জেলে প্রথম এর প্রকাশ ঘটে। তিনি নিজের খাটের পাশে পশ্চিমমুখী হয়ে একটানা ৭-৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। সমস্ত গা বেয়ে গরমের দিনে দরদর করে ঘাম ঝরত। গেঞ্জি পায়জামা ভিজে চুপচুপে হয়ে যেত। সেই দিকে তার কোন খেয়াল নেই। তিনি বলতেন তার কাছে আল্লাহর অহি আসত।...তিলে
তিলে জেলে এভাবে শেষ হতে লাগলেন। মুসলিম লীগ সরকার তার চিকিৎসারও কোন ব্যবস্থা করল না এবং জেল থেকেও মুক্তি দিল না। সরকার অবশ্য এটাই চেয়েছিল।’
রাজনৈতিক
প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে নূরুল আমীন সরকার রাজবন্দিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালান। মুসলিম লীগ সরকারবিরোধী দলের নেতাদের ‘শের কুচাল দেঙ্গে’ নীতি গ্রহণ করে জেলের অভ্যন্তরে নির্যাতন চালিয়ে তিলে তিলে শেষ করার অপচেষ্টা চালায়। এরই অংশ হিসেবে জেলখানায় শামসুল হকের ওপর ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। অল্প দিনের মধ্যে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। চার মাসের মধ্যে বিশ কেজির মতো ওজন কমে যায়। সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপে জেল কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। এমতাবস্থায় শামসুল হকের কারামুক্তির জন্যে তার স্ত্রী আফিয়া খাতুন পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সঙ্গে ছিলেন আতাউর রহমান খান এবং কামরুদ্দীন আহমদ। তারা শামসুল হকের মুক্তি এবং সুচিকিৎসার ব্যাপারে নূরুল আমীনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। জবাবে নূরুল আমীন বলেন, আপনাদের কথামতো কাজ করলে সরকার চালানো অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর এমন রূঢ় জবাবে আফিয়া খাতুনসহ অন্য দুই নেতা মর্মাহত হয়ে ফিরে আসেন। শামসুল হককে বিনা বিচারে আটক রেখে এভাবে নির্যাতন চালিয়ে মুসলিম লীগ সরকার তাকে রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় করার ষড়যন্ত্র করে। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়েছে। এদিকে শামসুল হকের উচ্চাভিলাষী সহধর্মিণী আফিয়া খাতুন স্বামীর দুর্দিনে তাকে ত্যাগ করেন। জুলফিকার হায়দার লিখেছেন: ‘ভবিষ্যতে
স্বামী এমপি-মন্ত্রী হবেন, স্বামীর সাফল্যে সকলের ঈর্ষা উৎপাদন করবেন এই কল্পনায় তিনি একজন ছাত্রনেতাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তাঁর উদগ্র অভিলাষ ধীরে ধীরে কর্পূরের মতো মিলিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে তাঁর দুঃখ, হতাশা আর অসন্তোষের সীমা রইল না। বন্ধু-বান্ধবীদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও ঐশ্বর্যের কথা স্মরণ করে নিজগৃহের অসচ্ছলতা ক্রমশ তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। স্বামীর লাঞ্ছনা ও দুরবস্থা দেখে তার প্রতি দিনে দিনে অশ্রদ্ধা ও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। স্বামীর সীমাহীন ব্যর্থতা দেখে আপন উদ্যোগ ও আয়োজনে আফিয়া স্বপ্ন পূরণের পথ খুঁজতে শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি একটি সরকারি বৃত্তি পান। এরপর দুই শিশুকন্যা শাহীন (জন্ম ৯ এপ্রিল ১৯৫১) এবং সায়কাকে (জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫২) তাঁর মা সফুরা খাতুনের কাছে রেখে নিউজিল্যান্ডে চলে যান।’ জানা যায়, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদ আফিয়া খাতুনকে সরকারি বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন এবং এ কাজটি করেন পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনের ইশারাতেই।
ছয়.
১৯৫৩
সালের ১৩ মার্চ শামসুল হক কারামুক্ত হন। তার কারামুক্তির পরও সাপ্তাহিক
সৈনিক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়: ‘গত
১৩ই মার্চ শুক্রবার আওয়ামী মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি জনাব শামসুল হক দীর্ঘদিন কারাবাসের পর মুক্তি লাভ করেছেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং মুক্তির দিন পর্যন্ত বিনা বিচারে আটক রাখা হয়। বর্তমানে তিনি অসুস্থ।’ কারাগার থেকে মুক্ত হলে শামসুল হককে নেতা-কর্মীরা সংবর্ধনা দেন। এরপর তাঁতিবাজারের বাসায় গিয়ে দেখেন স্ত্রী-সন্তান কেউ নেই। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জানতে পারেন তাঁর স্ত্রী দু সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে দেশের বাইরে চলে গেছেন। তখন তিনি সন্তানদের দেখার জন্য নারিন্দায় শাশুড়ি সফুরা খাতুনের বাসায় যান। সেখানে গেলে শ্যালক আমিনুল হকের সঙ্গে তাঁর বাগিবতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। আমিনুল হক তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ির নিচে ফেলে দিলে মারাত্মকভাবে আহত হন। স্ত্রী এবং স্বজনদের এই নির্মমতায় শামসুল হক আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এমন যন্ত্রণা ও দুর্বিষহ জীবনের মধ্যেও কিছুটা সুস্থ হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন। দু মাস পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে তাঁকে পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়িত্ব চালিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেখ মুজিবকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এর কিছুদিন পর ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের এক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে বক্তৃতাকালে তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন এবং নিজেকে সারা পৃথিবীর খলিফা দাবি করেন।
১৯৫৪ সালে আফিয়া খাতুন দেশে ফিরে আসেন এবং শামসুল হককে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু ততদিনে অনিদ্রা, অনাহার, অপুষ্টি, উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠায় তিনি দুরারোগ্য মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছেন। নানা রকম ওষুধ সেবনের পরও কোনো প্রতিকার মেলে না। ১৯৫৪ সালের ২০ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগদানের এক সপ্তাহ পরে শামসুল হককে উন্নত চিকিৎসার জন্যে করাচি মানসিক হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। এর দেড় বছর পর আফিয়া খাতুন এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী আনোয়ারা খাতুন শামসুল হককে দেখতে করাচি মানসিক হাসপাতালে যান। কিছু সময় সেখানে অবস্থান করে তারা চলে আসেন। এরপর ১৯৫৬ সালে অফিয়া খাতুন লিডারশিপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। ১৯৫৭ সালে দেশে ফিরে তিনি শামসুল হককে দেখতে যান। কিন্তু ডাক্তাররা তার সুস্থ হওয়ার কোনো বার্তা শোনাতে না পারায় আফিয়া খাতুন হতাশ হয়ে তাকে জীবন থেকে বিদায় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৫৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তাকে ডিভোর্স দেন। ১৯৫৯ সালে আফিয়া খাতুন পিএইচডি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন এবং সেখানকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ওই সময় পাঞ্জাবের জলন্ধরের বাসিন্দা আনোয়ার দিলের সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক
গড়ে ওঠে। ১৯৬০ সালে তিনি আনোয়ার দিলকে বিয়ে করেন। উভয়েই সেখানে অধ্যাপনা ও গবেষণা করে জীবন কাটান। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আফিয়া দিল ভাষাসংগ্রামী স্বামী শামসুল হককে ত্যাগ করলেও ভাষা আন্দোলন তার চেতনায় স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। এর প্রমাণ বাংলা ভাষা এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে পরবর্তীকালে করা তার উচ্চতর গবেষণা। কেবল তিনি নিজেই নন, তার পাঞ্জাবি স্বামীকেও এ পথে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা যৌথভাবে রচনা করেন Bengali Language Movement and Creation of Bangladesh নামক গ্রন্থ।
সাত.
১৯৫৭
সালে
করাচি
মানসিক
হাসপাতাল
কর্তৃপক্ষ
শামসুল
হকের
আরোগ্য
লাভের
আশা
ছেড়ে
দিলে
শামসুল
হককে
সেখান
থেকে
রিলিজ
দেয়া
হয়।
ওই
অবস্থায়
হযরত
আলী
শিকদারের
সঙ্গে
তিনি
ঢাকায়
ফিরে
আসেন।
এরপরে
যে
জীবনযাপন
করেন
তা
খুবই
করুণ।
১৯৬৪
সালে
অসুস্থ
মাকে
দেখতে
গ্রামে
গেলে
ছোট
ভাই
আনোয়ারুল
হক
তাকে
দেখে
ক্ষিপ্ত
হন
এবং
প্রহার
করেন।
এই
অনাকাঙ্ক্ষিত
ঘটনার
পর
শামসুল
হক
সেখান
থেকে
চলে
যান।
এরপর
আর
সন্ধান
মেলেনি
তার।
১৯৫৮
সাল
থেকে
১৯৬৪
সাল
পর্যন্ত
ঢাকা
ও
টাঙ্গাইলের
বিভিন্ন
রাস্তায়
নিরুদ্দেশ
ভ্রমণ
করেছেন।
১৯৬৪
সালের
পর
আর
কোথাও
দেখা
যায়নি
তাকে।
মূলত,
ভাষা
আন্দোলন
তথা
মুসলিম
লীগ
সরকারবিরোধী
আন্দোলনে
নেতৃত্ব
দানের
কারণে
শামসুল
হক
রাজরোষে
পড়েন
এবং
খাজা
নাজিমুদ্দিন
ও
নূরুল
আমীনের
প্রচ্ছন্ন
ইঙ্গিতে
নিষ্ঠুর
কারানির্যাতন
ভোগ
করে
ধীরে
ধীরে
শারীরিক
ও
মানসিক
রোগে
আক্রান্ত
হন।
যথাসময়ে
উপযুক্ত
সেবা
ও
চিকিৎসা
না
পাওয়ায়
রোগের
বিস্তারে
তার
শরীর-মন
বিপর্যস্ত
হয়ে
পড়ে।
ফলে
কারামুক্তির
পর
তিনি
আর
স্বাভাবিক
জীবনে
ফিরে
আসতে
পারেননি।
এর
ফলে
ইহজাগতিকতা
অপেক্ষা
আধ্যাত্মিকতার
দিকে
ঝুঁকে
পড়েন।
পূর্ব
পাকিস্তান
আওয়ামী
মুসলিম
লীগের
রাজনীতি
থেকেও
ছিটকে
পড়েন
এবং
পৃথিবীতে
আল্লাহর
রাজত্ব
প্রতিষ্ঠার
অলীক
স্বপ্নপূরণের
লক্ষ্যে
কাজ
শুরু
করেন।
এ
সময়
তিনি
‘খেলাফত পার্টি’
নামে
একটি
রাজনৈতিক
দল
গঠন
করেন।
তার
রাজনৈতিক
আদর্শ
প্রচার-প্রসারের
লক্ষ্যে
বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে ইসলাম
নামে
একটি
পুস্তিকাও
রচনা
করেন।
এমতাবস্থায়
রাজনৈতিক
সহকর্মী
এবং
আত্মীয়স্বজনেরা
তাঁকে
উপেক্ষা
করতে
থাকেন।
এক
পর্যায়ে
তার
রাজনৈতিক
ও
ব্যক্তিজীবন
বিপর্যয়ের
শেষ
সীমায়
এসে
পৌঁছে।
ছন্নছাড়া,
দুর্বিষহ,
নিঃসঙ্গ
জীবনে
মানসিক
ভারসাম্য
হারিয়ে
পথে
পথে
ঘুরতে
থাকেন।
এভাবেই
পূর্ববঙ্গের
রাজনীতির
ইতিহাসের
এক
উজ্জ্বল
অধ্যায়ের
নির্মাতা
শামসুল
হকের
জীবনে
ট্র্যাজেডি
ঘনিয়ে
আসে।
তিনি
চলে
যান
লোকচক্ষুর
অন্তরালে।
রোগজর্জর
শরীরে
বিনা
চিকিৎসা
ও
সেবাযত্নহীন
অবস্থায়
১৯৬৫
সালের
১১
সেপ্টেম্বর
পৃথিবী
ছেড়ে
চলে
যান।
তবে
তার
মৃত্যু
কোথায়
হয়েছে
এবং
কত
তারিখে
হয়েছে,
তা
আজও
জানা
যায়নি
বলে
মনে
করেন
তার
জীবনীকার
জুলফিকার
হায়দার।
পূর্ববঙ্গের
রাজনীতির
ইতিহাসের
ট্র্যাজিক
হিরো
শামসুল
হকের
শেষজীবনের
করুণ
অধ্যায়
সম্পর্কে
মন্তব্য
করতে
গিয়ে
জুলফিকার
হায়দার
লিখেছেন
: ‘এ সময়
তিনি
শারীরিকভাবে
ভীষণ
দুর্বল
ও
মানসিক
আঘাতে
চরম
বিপর্যস্ত।
নিজের
সংসারে
তাঁর
স্থান
হয়নি,
স্বজনরা
তাঁকে
দেখে
অপরিসীম
অবজ্ঞায়
ওষ্ঠাধর
বিকৃত
করেছে,
অবাঞ্ছিত
বলে
দূরে
ঠেলে
দিয়েছে।
সুতরাং
বৈরী
এ
জনপদ
থেকে
সম্ভবত
অজানা-অচেনা
কোনো
জনারণ্যে
তিনি
মিশে
গেছেন।
আর
তাঁর
মতো
শারীরিক
ও
মানসিক
ব্যাধিতে
আক্রান্ত
একজন
মানুষ
সেখানেই
হয়তো
অন্তিম
পরিণতি
বরণ
করেছেন।
রোগাক্রান্ত
ললাটে
হয়তো
পড়েনি
কোনো
করস্পর্শ,
কোনো
কপোল
থেকে
গড়িয়ে
পড়েনি
একবিন্দু
অশ্রু,
কোনো
পীড়িত
হূদয়ে
বাজেনি
একটু
ব্যথা।’
দুরারোগ্য
ব্যাধি,
অবজ্ঞা
আর
অবহেলায়
পৃথিবী
থেকে
বিদায়
নিলেও
ইতিহাস
থেকে
তার
নাম
মুছে
ফেলা
যাবে
না।
নবপ্রতিষ্ঠিত
পাকিস্তানের
অসাম্প্রদায়িক
ও
প্রাগ্রসর
রাজনীতির
বীজ
বপনে
তিনি
অগ্রপথিকের
ভূমিকা
পালন
করে
গেছেন।
সর্বোপরি
পূর্ব
পাকিস্তান
আওয়ামী
মুসলিম
লীগের
প্রতিষ্ঠাকালীন
সাধারণ
সম্পাদক
হিসেবে
ভাষা
আন্দোলনে
তিনি
যে
অবদান
রেখেছেন,
তাতে
এই
ট্র্যাজিক
হিরো
ইতিহাসের
এক
উজ্জ্বল
অধ্যায়ের
নায়ক
হিসেবে
স্মরণীয়
হয়ে
থাকবেন।
ড. এম আবদুল আলীম: ভাষা আন্দোলন গবেষক এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক