শারদীয় দুর্গা পূজা

উৎসবের অর্থনীতিতে সম্প্রীতির আয়োজন

বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উৎযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌সর্বজনীন দুর্গোৎসব যুগ যুগ ধরে এদেশের সব ধর্মীয়, শ্রেণী ও পেশার মানুষের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে আয়োজিত একটি উৎসব।

দুর্গা পূজায় সাধারণত সরকারি ছুটি থাকত একদিন। ২০২৪ সাল থেকে পূজার ছুটি বাড়ানো হয়। চলতি বছর দুদিনের ছুটির পাশাপাশি নির্বাহী আদেশে আরো একদিনের বাড়তি ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক দুদিনের ছুটি যুক্ত হয়েছে। ফলে পাঁচদিনের টানা সরকারি ছুটিতে এবারের দুর্গোৎসব সর্বজনীন অবকাশ, ভ্রমণ, কেনাকাটার আনন্দময় উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ছুটি পেয়ে শহর ছেড়ে অনেকেই পরিবারসহ বাড়ি যাচ্ছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবারের দুর্গোৎসব। দেশব্যাপী পর্যটন স্পটগুলোয় বেড়েছে বুকিং। বাস, লঞ্চ-স্টিমার, ট্রেন ও বিমানে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ট্রিপ। এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় সব ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে ঢাকা-কক্সবাজারসহ কয়েকটি রুটে বিশেষ ট্রেনসহ, প্রতিটি ট্রেনে বাড়তি কোচ সংযোজন করেছে।

দেশে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসব মূলত পাঁচদিনের। তবে পূজার উৎসবকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আচার-আয়োজন এবং অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ শুরু হয় কয়েক মাস আগে থেকেই। বিশেষ করে বর্ষার মাঝামাঝি পূজামণ্ডপ ও প্যান্ডেলের নকশা, পরিকল্পনা, বাজেট হয়ে যায়। বিশেষ বিশেষ প্রতিমা শিল্পী ও প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করে দেয়। মণ্ডপ, প্রতিমা, প্রতিমার অলংকার ও পোশাক, মণ্ডপের লাইটিং, সাউণ্ড সিস্টেম, ডেকোরেশনে বড় বাজেট ব্যয়।

পূজা আয়োজনের এ বাজেটের বড় অংশ সংগ্রহ হয় সর্বজনীন চাঁদা, দান ও বড় দাতাদের মাধ্যমে। মণ্ডপ ও প্রতিমা তৈরির আগেই পূজা কমিটির সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণচাঁদা সংগ্রহ করেন। আর বিত্তবান ও কমিটির সদস্যদের নির্দিষ্ট চাঁদার সমন্বয়ে বাজেট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন আয়োজকরা। পাশাপাশি সরকারিভাবে দেশের সব পূজামণ্ডপ কর্তৃপক্ষকে অনুদান দেয়া হয়। সব মিলিয়ে দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে মণ্ডপকেন্দ্রিক প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়।

পাঁচদিনের উৎসবে প্রসাদ বিতরণ হয়। বিশেষ করে মহাপ্রসাদের আয়োজনে এলাকাভিত্তিক সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ অংশ নেয়। কোনো কোনো মণ্ডপ একদিনে দুই বেলা, কেউ কেউ টানা কয়েকদিন মহাপ্রসাদ বিতরণ করেন। পাড়া, গ্রাম এমনকি দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী-ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত এ নিরামিষ মহাপ্রসাদের আয়োজনে সবজিসহ ভোগ্যপণ্য বাজারে অর্থ প্রবেশ করে, যা দেশের নিত্য ভোগ্যপণ্যের বাজারে চাঙ্গাভাব এনে দেয়।

বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উৎযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌সর্বজনীন দুর্গোৎসব যুগ যুগ ধরে এদেশের সব ধর্মীয়, শ্রেণী ও পেশার মানুষের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে আয়োজিত একটি উৎসব। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পেশার মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি স্রোতে যুক্ত হন। আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের পাশাপাশি সামাজিক ব্যয় দেশের গ্রামীণ ও শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান রেখে যায়।’

বাংলাদেশ পূজা উৎযাপন পরিষদের তথ্যমতে, ২০০৭ সালে দেশে দুর্গা পূজার সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ১৭০। চলতি বছর সারা দেশে মোট পূজার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৮১৫। অর্থাৎ ২০ বছরে দেশে পূজা মন্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ১৯ হাজার ৬৮১ বা ১৩৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ পূজা উৎযাপন পরিষদের তথ্যমতে, গ্রামের একটি ছোট পূজামণ্ডপেও ন্যূনতম ৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়। আবার বড় মণ্ডপে ৩০-৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেন আয়োজকরা। দেশের প্রায় ৩৪ হাজার পূজামণ্ডপের ৭-৮ শতাংশ বৃহৎ পূজা হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে বাকি মণ্ডপগুলো গড়ে ৬-৭ লাখ টাকা ব্যয় করে। সব মিলিয়ে দেশের সবগুলো পূজা উৎযাপনে আয়োজকদের ব্যয় প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা।

পূজাকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ একটি চক্রাকার অর্থনীতিতে যুক্ত হন। বিভিন্ন আয়োজনে ডেকোরেশন, সাউন্ড সিস্টেম, লাইটিং, পরিবহন, শ্রমিক, ফলমূল, মিষ্টি, সবজি, ভোগ্যপণ্যের সরাসরি চাহিদা রয়েছে। পূজায় পারিবারিকভাবে আত্মীয়স্বজন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অর্থ ও পোশাক উপহার দেয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তাছাড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতিটি পরিবারে নতুন পোশাক, তৈজসপত্র, ইলেকট্রনিকস পণ্য, হোম টেক্সটাইল পণ্য কেনা; আমিষ-নিরামিষ, মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরি হয়, যা সপ্তাহব্যাপী দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে।

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল চন্দ্র নাথ বলেন, ‘‌দুর্গা পূজার জন্য সারা বছরই সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। পবিত্র ও শুচিভাবে মায়ের পূজা-অর্চনার জন্য নতুন পোশাক পরিধান, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মায়ের আগমনকে স্বাগত জানানো হয়। এ আয়োজনে শহরকেন্দ্রিক মণ্ডপগুলোয় ন্যূনতম ৪ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪০-৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেন আয়োজকরা। এখানে পূজাকে ঘিরে যুক্ত ও স্থানীয়দের গণপ্রণামি ছাড়াও আর্থিক সংগতির বিবেচনায় নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দেয়া হয়। সরকারি ও সমাজের রাজনৈতিক ও গণমান্যরাও পূজায় আর্থিক সহায়তা দেয়। সব মিলিয়ে সনাতনীদের দুর্গোৎসব একটি সর্বজনীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে।’

চলতি বছর দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র দেশে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। শহর কিংবা গ্রামের দোকানে বিক্রি হচ্ছে শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও উপহারসামগ্রী। একই সঙ্গে ফুল, ফলমূল, বেলপাতা, ধূপ, প্রদীপ, ঘি, মধু, প্রসাদ ও মিষ্টির বাজারেও বাড়তি বেচাকেনা চলছে। এ সময় প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ডেকোরেটর, বৈদ্যুতিক কর্মী, প্রিন্টিং, পরিবহনশ্রমিক ও অস্থায়ী কর্মীদের জন্য তৈরি হয় বাড়তি কর্মসংস্থান এবং আয়ের সুযোগ।

প্রতিটি মণ্ডপকেন্দ্রিক ছোট ও মাঝারি মেলার আয়োজন হয়। স্থানীয় ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা পূজার আশপাশে অস্থায়ী হোটেল-রেস্তোরাঁ, খেলনাসহ বিনোদনমূলক ব্যবসার পসরা সাজিয়ে বসেন। এছাড়া এলাকাভিত্তিক খাবারের দোকান, ক্যাটারিং, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, পর্যটন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল প্রচার খাতেও অর্থের লেনদেন বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী একটি বিস্তৃত মৌসুমি অর্থনীতি গড়ে ওঠে, যা সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও চক্রাকারে ছড়িয়ে যায়।

আরও