স্মার্ট আবাসনের মূল শক্তি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও সাশ্রয়ী রক্ষণাবেক্ষণ

কেএম মুজিবুল হক

চেয়ারম্যান

বাক্কাহ হোল্ডিংস লিমিটেড

ভবিষ্যৎ নগরায়ণ নিয়ে বাক্কাহ হোল্ডিংস লিমিটেডের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর কাছাকাছি প্রায় ১০০ একর জমিতে একটি সমন্বিত স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার উদ্যোগ। প্রকল্পটি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে।

টেকসই নগরায়ণে পরিকল্পনা ও বিকেন্দ্রীকরণ কতটা জরুরি?

বাংলাদেশের নগরায়ণকে টেকসই করতে হলে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে রাজধানীকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কারণে ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এ চাপ কমাতে ঢাকার বাইরে সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোকে পরিকল্পিত আবাসন, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

যেমন পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসন উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আবাসিক ভবন নির্মাণ করে একটি কার্যকর নগর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবকাঠামো পরিকল্পনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক, গণপরিবহন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো প্রকল্পের শুরু থেকেই পরিকল্পনায় রাখতে হবে। পাশাপাশি জলাশয়, খাল, সবুজ এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

স্মার্ট আবাসন বলতে কি শুধু আধুনিক প্রযুক্তি ও নাগরিক সুবিধা বোঝায়?

স্মার্ট আবাসনকে কেবল স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ডিজিটাল নিরাপত্তা কিংবা আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রকৃত স্মার্ট আবাসন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে নিরাপত্তা, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশগত ভারসাম্য, বাসিন্দাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়—সবকিছুর সমন্বয় থাকে।

প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের পর্যাপ্ত প্রবাহ, বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ একটি আবাসন প্রকল্পের মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ভবনের নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি এর পুরো জীবনচক্রের ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্মাণের সময় ব্যয় কম হলেও পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ, পানি ও ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ব্যয় হলে সেই আবাসন দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী থাকে না।

বাক্কাহ হোল্ডিংস লিমিটেডের আবাসন উন্নয়ন পরিকল্পনায় এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্পগুলোতে নকশার মান, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, নিরাপত্তা, কাঠামোগত স্থায়িত্ব এবং পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এর একটি উদাহরণ পূর্বাচলসংলগ্ন ‘বাক্কাহ লেক ভিউ’ প্রকল্প। এখানে বহুতল ভবনের নকশার সঙ্গে প্রকৃতির উপাদান যুক্ত করার ধারণা রয়েছে। প্রতিটি তলায় পদ্মপুকুরের আদলে ছোট জলাধার ও সবুজের সমন্বয়ের মাধ্যমে আবাসিক পরিবেশে প্রকৃতির উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে জলসিঁড়ি এলাকায় ‘বাক্কাহ লিজা’স ক্যাসেল’, ‘বাক্কাহ সুমি প্যালেস’ ও ‘বাক্কাহ জেডএস টাওয়ার’ প্রকল্পে কাঠামোগত নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও নকশাগত উৎকর্ষের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

আধুনিক আবাসন নির্মাণে স্থপতি, কাঠামো প্রকৌশলী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সমন্বিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। শুরু থেকেই নির্মাণের গুণমান ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া গেলে ভবনের স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ভবিষ্যতের নগরায়ণে সমন্বিত স্মার্ট সিটির ভূমিকা কী?

ভবিষ্যৎ নগরায়ণ নিয়ে বাক্কাহ হোল্ডিংস লিমিটেডের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর কাছাকাছি প্রায় ১০০ একর জমিতে একটি সমন্বিত স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার উদ্যোগ। প্রকল্পটি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। এর সম্ভাব্য উন্নয়ন কাঠামো, মাস্টারপ্ল্যান ও ধারণাগত নকশা প্রণয়নে দেশী-বিদেশী পরামর্শকদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া ঢাকার ১০০ ফুট সড়কসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জমিতে আধুনিক কন্ডোমিনিয়ামভিত্তিক আবাসন উন্নয়নের বিষয়টিও প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি এলাকায় একটি সমন্বিত স্যাটেলাইট হাইটেক সিটি গড়ে তোলারও প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রাথমিক পরিসর প্রায় ১০০ একর বা ৩০০ বিঘা; দীর্ঘমেয়াদে তা প্রায় ২৫০ একর পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

এসব পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য শুধু আবাসিক ভবন নির্মাণ নয়; বরং আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা, বিনোদন ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার সমন্বয়ে একটি কার্যকর নগর পরিবেশ গড়ে তোলা। কর্মস্থল ও প্রয়োজনীয় সেবা আবাসনের কাছাকাছি নিশ্চিত করা গেলে মানুষের যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপ হ্রাসের সুযোগ তৈরি হবে।

সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে কোন বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে?

বাংলাদেশে সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জমির উচ্চ মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর ব্যয়, অর্থায়নের খরচ এবং ক্রেতাদের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে আবাসন খাতের টেকসই বিকাশের জন্য সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়নকারীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আর সেজন্য পরিকল্পিত নতুন নগর কেন্দ্র গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী গৃহ ঋণের সুযোগ সম্প্রসারণ, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্থানীয় উপকরণের কার্যকর ব্যবহার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। উপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রিফ্যাব্রিকেটেড ও মডুলার নির্মাণ পদ্ধতির ব্যবহারও বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে খরচ কমাতে গিয়ে ভবনের নিরাপত্তা, নির্মাণের মান ও পরিবেশের বিষয়গুলোতে ছাড় দেয়া যাবে না। বরং ভালো নকশা, মানসম্মত নির্মাণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ক্রেতার দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

আগামী দিনের আবাসন খাত কতটা পরিবেশবান্ধব ও মানুষকেন্দ্রিক হবে বলে মনে করেন?

আগামী ১০-২০ বছরে বাংলাদেশের আবাসন খাতে পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বসম্পন্ন উন্নয়নের গুরুত্ব আরো বাড়বে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানির পুনর্ব্যবহার, জ্বালানিসাশ্রয়ী ভবন এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যৎ আবাসন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে গণপরিবহননির্ভর উন্নয়ন, হাঁটার উপযোগী সড়ক, সবুজ এলাকা ও কমিউনিটি সুবিধার সমন্বয় নগরজীবনকে আরো কার্যকর করতে পারে।

এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হবে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গণপরিবহন, কার্যকর নীতিমালা এবং স্বচ্ছ অনুমোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে বেসরকারি খাতকে শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিরাপত্তা, গুণমান, পরিবেশ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রেতার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

স্মার্ট আবাসনের প্রকৃত সাফল্য শুধু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। ভবনটি কতটা নিরাপদ, রক্ষণাবেক্ষণে কতটা সাশ্রয়ী, পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কতটা কম এবং বাসিন্দাদের জীবনযাপন কতটা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ—এসব বিষয়ই এর প্রকৃত মান নির্ধারণ করে। তাই বাংলাদেশের নগরায়ণের পরবর্তী ধাপের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ভবন নির্মাণ নয়; বরং আবাসনকে একটি টেকসই, মানবিক ও বসবাসযোগ্য নগরজীবনের ভিত্তিতে রূপান্তর করা।

আরও