একটি ব্যাংকের গ্রাহক টাকা জমা দিলে সে তথ্য হিসাবের খাতায় যুক্ত হয়, ঋণ নিলে সুদ ও কিস্তির হিসাব তৈরি হয়, এক শাখা থেকে অন্য শাখায় অর্থ স্থানান্তর হয়। একই সঙ্গে মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম ও পেমেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয় লাখ লাখ লেনদেন। আধুনিক ব্যাংকিংয়ের এসব কার্যক্রমের পেছনে কাজ করে জটিল সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। বিশ্বের অসংখ্য ব্যাংকের এমন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনায় যুক্ত রয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান টেমেনোস।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত টেমেনোস এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের প্রযুক্তি পৌঁছে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করছে ৯৫০টির বেশি ব্যাংক। ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রযুক্তির গ্রাহক রয়েছে ৬০০টির বেশি। কোর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং, পেমেন্ট, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক অপরাধ শনাক্তকরণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিও সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ব্যাংকের হিসাব পরিচালনা থেকে শুরু করে গ্রাহকসেবা ও আন্তর্জাতিক লেনদেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তাদের ব্যবসা।
সুইজারল্যান্ডের গ্র্যান্ড-ল্যান্সিতে অবস্থিত টেমেনোস এজি বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একটি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার কোম্পানি। ১৯৯৩ সালে জর্জ কুকিস প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যাংকিং প্রযুক্তিতে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে এর ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে আর্থিক খাতের প্রায় পুরো প্রযুক্তিগত পরিসরে। ২০০১ সালের ২৬ জুন সুইজারল্যান্ডের সিক্স সুইস এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি।
২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের শেষে প্রতিষ্ঠানটির জনবল ছিল ৫ হাজার ২০৫ জন। এ হিসাবের মধ্যে কর্মীর পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদার ও ঠিকাদাররাও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন ৮১টি দেশের মানুষ। সেই সঙ্গে ৩৬টি দেশে তাদের ৫১টি কার্যালয় রয়েছে।
টেমেনোসের ব্যবসার মূল ভিত্তি কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার। একটি ব্যাংকের আমানত, ঋণ, সুদ, হিসাব, গ্রাহকের তথ্য, লেনদেন ও বিভিন্ন আর্থিক পণ্য পরিচালনার জন্য এ সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও বিভাগে আলাদা প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে তথ্য সমন্বয় এবং সেবা প্রদানে জটিলতা তৈরি হতে পারে। কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা এসব কার্যক্রমকে একটি কেন্দ্রীয় প্রযুক্তিগত কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসে। ফলে কোনো গ্রাহক একটি শাখায় টাকা জমা দিলে অন্য শাখা বা ডিজিটাল মাধ্যম থেকেও তার হিসাবের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়। ঋণ বিতরণ, কিস্তি আদায়, সুদ গণনা, আমানত ব্যবস্থাপনা ও লেনদেনের হিসাবও একই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করা যায়।
কোর ব্যাংকিং প্রযুক্তির জন্য টেমেনোসের সবচেয়ে পরিচিত পণ্য টেমেনোস কোর। খুচরা ব্যাংকিং, ব্যবসায়িক ব্যাংকিং, করপোরেট ও কমার্শিয়াল ব্যাংকিং, ট্রেজারি এবং ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এর বিভিন্ন সংস্করণ ও সক্ষমতা রয়েছে। ব্যাংক চাইলে একবারে পুরো প্রযুক্তি পরিবর্তন না করে নির্দিষ্ট পণ্য বা বিভাগ থেকে আধুনিকায়ন শুরু করতে পারে। পরে পর্যায়ক্রমে অন্য বিভাগেও তা সম্প্রসারণ করা যায়। এ পদ্ধতিকে তারা প্রগ্রেসিভ মডার্নাইজেশন হিসেবে অভিহিত করে।
কোর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি টেমেনোসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা ডিজিটাল ব্যাংকিং। মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডিজিটাল হিসাব খোলা, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ ও অনলাইন ঋণসেবার জন্য এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। ‘টেমেনোস ডিজিটাল’ প্লাটফর্মের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ব্যক্তিগত গ্রাহক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা ডিজিটাল সেবা তৈরি করতে পারে। তাদের ‘জার্নি ম্যানেজার’ প্রযুক্তি গ্রাহকের হিসাব খোলা, পরিচয় যাচাই ও ঋণের আবেদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ধাপ স্বয়ংক্রিয় করতে সহায়তা করে।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ লেনদেনের জন্য রয়েছে টেমেনোস পেমেন্টস। এর মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর, তাৎক্ষণিক পেমেন্ট, আন্তঃসীমান্ত লেনদেন, পেমেন্ট নির্দেশনা প্রক্রিয়াকরণ এবং বিভিন্ন পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়। অন্যদিকে ‘টেমেনোস ওয়ালেট ম্যানেজমেন্ট’ প্রযুক্তির আওতায় বিনিয়োগ পোর্টফোলিও, সম্পদ মূল্যায়ন, বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবেদন ও গ্রাহকের সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
ব্যাংক খাতে অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণও টেমেনোসের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট’ বা এফসিএম প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কার্যক্রম, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং জালিয়াতি শনাক্তকরণে সহায়তা দেয়া হয়। এছাড়া ‘লাইফসাইকেল ম্যানেজমেন্ট সুইট’-এর মাধ্যমে ঋণের আবেদন গ্রহণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, অনুমোদন, কিস্তি আদায় ও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন ধাপ পরিচালনা করা যায়। ইসলামিক ব্যাংকগুলোর জন্যও শরিয়াহসম্মত আর্থিক পণ্য ও সেবা পরিচালনার বিশেষায়িত প্রযুক্তি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
টেমেনোসের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ক্লাউড কম্পিউটিং। ব্যাংকগুলো নিজেদের সার্ভারে সফটওয়্যার পরিচালনার পাশাপাশি প্রাইভেট ক্লাউড, পাবলিক ক্লাউড, হাইব্রিড ক্লাউড কিংবা সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস (এসএএএস) মডেল বেছে নিতে পারে। এতে ব্যাংকের নিজস্ব প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সক্ষমতা বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। এসএএএস মডেলে সফটওয়্যার পরিচালনা, হালনাগাদ ও রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকে। ফলে ব্যাংকগুলো নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে গ্রাহকসেবা ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশি মনোযোগ দিতে পারে।
এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও এখন টেমেনোসের অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার। ব্যাংকিং কার্যক্রমে গ্রাহকের তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ, গ্রাহকসেবা এবং সফটওয়্যার উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের ‘টেমেনোস কোপাইলট ফোর কোর’ প্রযুক্তিটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং কার্যক্রমে এআই-ভিত্তিক সহায়তা দেয়ার জন্য তৈরি। অন্যদিকে ‘এফসিএম এআই এজেন্ট’ আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ ও নিষেধাজ্ঞা যাচাইয়ের মতো কাজে সহায়তা করে।
প্রযুক্তির এ রূপান্তরে টেমেনোসের সক্ষমতার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ ভিয়েতনামের স্যাকোমব্যাংক। ২০২৬ সালে ব্যাংকটি টেমেনোসের সর্বশেষ কোর ব্যাংকিং প্লাটফর্মে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব সার্ভারভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে হাইব্রিড ক্লাউড অবকাঠামোয় স্থানান্তরিত হয়। ভিয়েতনাম ইনভেস্টমেন্ট রিভিউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পরিবর্তনের পর তাদের অ্যাপ্লিকেশন পারফরম্যান্স ২০০ শতাংশ বেড়েছে, প্রযুক্তি স্থাপনের সময় আগের এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে এবং সার্ভার অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় সক্ষমতা কমেছে ৫০ শতাংশ। নতুন প্লাটফর্মটি প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ লেনদেন পরিচালনায় সক্ষম। ব্যাংকটি আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের সক্ষমতা বাড়াতে টেমেনোসের পেমেন্টস হাবও ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে।
গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ করছে টেমেনোস। গত বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রতি বছর রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়। তাদের কৌশলগত লক্ষ্য হলো কোর ব্যাংকিংয়ের বাজার অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি ক্লাউড, এআই, পেমেন্ট ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মতো সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সেবায় সম্প্রসারণ।
আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক—চারটি অঞ্চলে বর্তমানে টেমেনোসের ব্যবসা পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্বের ২৮ শতাংশ এসেছে ইউরোপ থেকে, ২৬ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে, ২৫ শতাংশ আমেরিকা থেকে এবং ২১ শতাংশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে।
কোর ব্যাংকিং থেকে ক্লাউড, পেমেন্ট থেকে এআই—পুরো এ প্রযুক্তিগত পরিসরকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টাই টেমেনোসকে বৈশ্বিক ব্যাংকিং প্রযুক্তি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতেও ব্যবসাকে বিস্তৃত করছে তারা।