আশির দশকের শুরু থেকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বময় তাত্পর্যপূর্ণ সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অতীতে সরকারগুলো ভূমি সংস্কার প্রক্রিয়ার কর্মকাণ্ড বা মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় নির্বাহজনিত সমস্যার প্রতি অধিক মনোযোগী ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত নীতিমালা মুক্তবাজার এবং বেসরকারি খাতকে অপ্রচলিত ধারার একটি উন্নয়ন কৌশল হিসেবে অর্থনীতির প্রধান স্রোতপ্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত করছে। বেসরকারীকরণ ও বাজারমুখী নীতিমালা প্রণয়নের তিনটি প্রধান অংশ হচ্ছে— (১) ব্যাপকভাবে বেসরকারি খাতের ব্যবহার, (২) নিয়ন্ত্রণমুক্ত, বিধিমুক্ত, মুক্ত বিনিয়োগ এবং উদার বহির্বাণিজ্য নীতি গ্রহণের দ্বারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারকে উৎসাহ প্রদান এবং (৩) সরকারি ভর্তুকির ব্যবহার হ্রাসকরণ। এসব পরিবর্তন আইএমএফ নির্দেশিত স্থিতিকরণ ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাংকের নির্দেশিত কাঠামো সমন্বয় নীতিমালা উভয়কেই জড়িত করে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতে সামষ্ঠিক অর্থনীতিকে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য সমষ্টিগত চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সজীব ও সবল ভারসাম্য পাওয়াই হচ্ছে সামষ্ঠিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য। যেহেতু সামষ্ঠিক অর্থনীতির অসমতার কারণগুলো অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত, তাই রাজস্ব ও আর্থিক নীতিমালার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দ্বারা দীর্ঘকালীন উঁচু প্রবৃদ্ধির হার অর্জন সম্ভব নয়। এ অবস্থায় মূল্য নীতিমালা সংস্কারের মাধ্যমে উৎসাহ কাঠামোয় পরিবর্তন সাধন করে অর্থনীতির বিকৃতিগুলো দূরীভূতকরণ দরকার। এতে অধিকতর দক্ষতা অর্জিত হবে এবং এক খাত থেকে অন্য খাতে সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে বেশি প্রবৃদ্ধির হার অর্জন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে। এভাবে নতুন নীতিমালায় বাজার এবং বেসরকারি খাতের ওপর অত্যাবশ্যকভাবে জোর দেয়া হয়, যাতে মূল্যসূচক পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক প্রতিনিধিগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত সাড়া পাওয়া যায়।
বেসরকারি খাতের প্রতি এই ঝোঁক অতীতের ৩০ বছর বহাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা— রাষ্ট্রতন্ত্রবাদের এক বিপরীত সাড়া হিসেবে গণ্য করা যায়। ওই সময় রাষ্ট্রের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে সরকারের ভূমিকাকে নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি করা হয়। সরকারি খাতের সম্পদের এ বিশাল সমাবেশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি নীরব বিপ্লব হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। এতে ১৯৭০ সালের শুরুতে যেখানে ১৩টি দেশ তাদের জিএনপির প্রায় ৩০ শতাংশ সরকারি খাতে ব্যয় করছিল, ১৯৭০ সালের শেষ দিকে ওই সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায় এবং ৯০টি দেশের প্রায় অর্ধেকাংশে (আইএমএফের কাছে যাদের পরিসংখ্যান আছে) তাদের জিএনপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরকারি খাতে খরচ করে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় খাতের পক্ষে অতিবৃহৎ বা অতিক্ষুদ্র কোনো কিছুই অকরণীয় নয় বলে প্রতীয়মান হয়। তা খনি থেকে লোহা আহরণ করা হোক বা রুটি তৈরি করা কিংবা হোটেল পরিচালনার কথাই ধরা হোক না কেন।
উপরের এ প্রবণতাকে বিপরীতমুখী করে বেসরকারি খাতকে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ করার পেছনে কতগুলো লক্ষ্য কাজ করছে, যার চালিকাশক্তি হচ্ছে— বাস্তববাদিতা, আদর্শবাদিতা, বাণিজ্যিক মনোভাবসম্পন্ন বা গণমুখী হওয়া। বাস্তববাদীদের লক্ষ্য হচ্ছে ভালো সরকার এবং বেসরকারি খাতের প্রতি তাদের আগ্রহ এজন্য যে, যদি বিচক্ষণতার সঙ্গে চর্চা করা যায়, তবে সরকারি সেবার ফলে খরচের দিক দিয়ে অধিকতর দক্ষ বিবেচিত হবে। যারা আদর্শবাদী, তারা সরকারের সীমিতকরণ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ পছন্দ করেন, কারণ মুক্তবাজারে সিদ্ধান্ত সরকারি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য। বাণিজ্যিক মনোভাবাপন্ন লোকেরা সরকারি বিনিয়োগ তাদের দিকে চায় অধিকতর ব্যবসা পাওয়ার জন্য এবং তাদের মতে সরকার নিয়ন্ত্রিত সম্পদ বেসরকারি খাতেই অধিকতর লাভজনকভাবে ব্যবহার করা যায়। সর্বশেষে গণমুখী মতবাদ অনুসারীরা সরকারি ও বেসরকারি আমলার ক্ষমতা খর্ব করে ‘জনগণের পুঁজিবাদ’ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে, কারণ তাদের মতে জনগণের সাধারণ চাহিদা পূরণে জনগণই অধিকতর দক্ষ। উপরে বর্ণিত সব শক্তির মধ্যে বাস্তববাদীরাই বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী, কারণ সবার আদর্শের সরকারই এখন মনে করে যে বেসরকারি খাতের দিকে সব প্রধান কর্মকাণ্ডকে প্রবাহিত করে যে শীর্ণকায় কিন্তু দক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব শুধু তার মাধ্যমেই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করে জীবনধারণের মান উঁচু করা যাবে। বস্তুতপক্ষে, সত্তরের দশকে প্রায় সব দেশেরই সরকার প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাজেট সমস্যায় পতিত হয়। ঋণ পরিশোধে, সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতিপূরণে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য চিরাচরিত যে পন্থা, যেমন— রাজস্ব ও আর্থিক নীতিমালার সম্প্রসারণ, দেউলিয়া শিল্প কোম্পানিগুলোর জাতীয়করণ এবং প্যারাস্টাটালের বেতন বিল বৃদ্ধি করা— এসবের দিন এখন ফুরিয়ে গেছে। অধিকন্তু জাতীয় অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্য খাতকে আরো মূল্য সংস্কার ও উৎপাদনে প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটা অন্যদিকে কাঠামো সমন্বয় করা এবং বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য বাধা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করায়।
বেসরকারি খাতের সপক্ষে সংস্কারের নীতিমালা
বাজারের বিকৃতি সরানো এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার নীতিমালাকে বিশ্লেষণের সুবিধার্থে নিম্নলিখিত তিনটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা— (১) চাহিদা ব্যবস্থাপনার নীতিমালা, (২) কাঠামোগত নীতিমালা এবং (৩) প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত নীতিমালা।
চাহিদাজনিত ব্যবস্থাপনার মুখ্য বিধান হওয়া উচিত সমষ্টিগত সরবরাহের প্রতি লক্ষ্য রেখে চাহিদার সমন্বয়সাধন। সরকারি ব্যয় হ্রাস ও ধার-দেনায় বাধানিষেধ আরোপিত করে শক্ত ধরনের আর্থিক ও রাজস্ব নীতিমালা প্রণয়নের সাহায্যে এটা সম্ভব। বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন এ প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে এবং এসব কর্মকাণ্ড কঠোর কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাধ্যমে সমষ্টিগত চাহিদা হ্রাস করে।
কাঠামোগত নীতিমালা বণ্টন পদ্ধতি ও উৎপাদন দক্ষতাকে উন্নত করাসহ ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও বিনিয়োগে সম্ভাবনা বাড়ানোর লক্ষ্যে সুদের হার সংস্কার, রাজস্ব বিষয়াদি উদারীকরণ, খাদ্যে ভর্তুকি প্রত্যাহার, স্থিতিশীলতা আনয়ন, আয়-ব্যয়ের ব্যবধান সরিয়ে দিয়ে সরকারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের মূল্যনীতি যুক্তিসিদ্ধ করা, শুল্ক তফশিল কমিয়ে বাণিজ্য উদারীকরণ, আমদানি বিকল্পের প্রতি পক্ষপাতিত্ব কমিয়ে রফতানিকে উৎসাহ প্রদান এবং সব শেষে নমনীয় বিনিময় হার নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা অর্থনীতি, সামাজিক নীতি, বস্তুগত নীতি ও অবকাঠামোগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং উৎপাদন সম্পদের ওপর সরকারি-বেসরকারি মালিকানার নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পন্থাগুলো এ নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত। বিরাষ্ট্রীয়করণ ও বেসরকারীকরণ শুধু যে সরাসরি উৎপাদন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা নয় বরং এর সঙ্গে রাজস্ব-সংক্রান্ত বিধিবিধানেরও সম্পর্ক রয়েছে। পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সেবা ইত্যাদি উন্নত করার জন্য আছে সামাজিক অবকাঠামোগত নীতিমালা। অনুরূপভাবে ভৌত অবকাঠামোর রাস্তা, পুল, বাঁধ, সেচ, ব্যাংক, বিদ্যুৎ ইত্যাদি উন্নয়নে এ নীতিমালা সম্পৃক্ত। তাছাড়া আরো অন্য ধরনের সাংগঠনিক নীতিমালা আছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগকৃত ব্যবসায় উন্নয়নে সাহায্য করে এবং বাণিজ্য ও শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেসরকারি চেম্বার ও সংস্থাকে অধিকতর দায়িত্ব অর্পণ করে।
যেসব মুখ্য অর্থনৈতিক সংস্কার বাজার সহায়ক এবং বেসরকারি খাত পরিচালিত প্রবৃদ্ধির কৌশলকে এগিয়ে নেয়, তা সারণি ১-এ সন্নিবেশ করা হলো। এ তালিকা সুস্পষ্টভাবে অসম্পূর্ণ এবং এর শ্রেণীবিন্যাসকৃত নকশা উপরে বর্ণিত শ্রেণীবিভাগ থেকেও আলাদা। কিন্তু এতে একনজরে নীতিমালা সমষ্টিকে দেখা যাবে, যা প্রকৃতপক্ষে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবান্বিত করে। উদাহরণস্বরূপ, উৎপাদন ও পণ্যবাজার, শিল্প বিধিবিধান এবং ব্যবসায়ী আইন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজস্ব নীতিমালা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমসহ সরকারি খাত এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
সারণি—১
অর্থনৈতিক সংস্কার ব্যবস্থাগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা
১। উপাদান বাজার: অর্থ শিল্প: সুদের হারে নিয়ন্ত্রণ অপসারণ, শেয়ারবাজার উদারীকরণ; জ্বালানি শিল্প: রাষ্ট্রীয় প্রাকৃতিক গ্যাস সন্ধান/বিতরণ স্বার্থ বিক্রি; বিদ্যুৎ উৎপাদন, চালান ও বিতরণের জন্য করপোরেশন গঠন ও পুনর্গঠন; পরিবহন শিল্প: রাষ্ট্রীয় রেল, বিমান ও বাস সার্ভিসের জন্য করপোরেশন গঠন, বেসরকারি বিমান চলাচল শিল্প স্থাপন, বন্দরের জন্য করপোরেশন; গবেষণা ও উন্নয়ন: গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য রেয়াত প্রদান বন্ধকরণ এবং সব বিনিয়োগের মতো একই সমান্তরালে অবস্থান, সরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর জন্য করপোরেশন গঠন; শ্রমিক বাজার: স্বেচ্ছাসেবী সমিতি গঠন, শিল্প-সম্পর্কীয় আইনের অধীনে অধিকতর বাজারভিত্তিক মজুরি নির্ধারণ পদ্ধতি।
২। শিল্প: পণ্যবাজার: কৃষিজাত পণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য পদ্ধতি বাতিলকরণ, কৃষি কর রেয়াত প্রদান বন্ধ করা, কৃতিত্বপূর্ণ রফতানির জন্য কর রেয়াত ক্রমান্বয়ে তুলে নেয়া; শিল্প-সংক্রান্ত বিধি: সব শিল্প-কারখানা থেকে উৎপাদন পরিমাণের ওপর লাইসেন্স প্রথা রহিতকরণ এবং বেশির ভাগ শিল্প থেকে মান সম্পর্কীয় বিধির পরিসমাপ্তি, সব সরকার নিয়ন্ত্রিত একচেটিয়া অধিকার খর্বকরণ, দোকানের বাণিজ্য সময়কালের ওপর বিধিনিষেধের সমাপ্তি; ব্যবসা-সংক্রান্ত আইন: উদার দক্ষতাভিত্তিক বাণিজ্য আইন প্রণয়ন, যার আওতায় ব্যবসা প্রণালি ও ব্যবসা একত্রীভূতকরণ পদ্ধতি নির্ধারিত হতে পারে, উপযুক্ত মহাজনি আইন প্রণয়ন, যা ক্রেতার অধিকার সংরক্ষণ করে, বুদ্ধিপ্রসূত সম্পত্তির আইন প্রণালি পুনঃপরীক্ষা করা (পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও নকশা-সংক্রান্ত আইন)।
৩। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক নীতিমালা আমদানি সংরক্ষণ: আমদানি লাইসেন্সের ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে তুলে নেয়া, শুল্কের সাহায্যে সংখ্যাত্মক বিধিনিষেধে পরিবর্তন, আমদানি শুল্ক হ্রাসকরণ, আন্তর্জাতিক মূলধন নিয়ন্ত্রণ, বহির্বিনিয়োগ/ঋণের ওপর নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নেয়া, বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের মুক্ত প্রবেশ, পোর্টফোলিও বিনিয়োগ এবং লভ্যাংশ ফেরত প্রদানে অতি উদার বিধিবিধান; বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ: ‘মূল্য অপরিবর্তনশীল’ রাখার সংকল্প নিয়ে মুদ্রা সংকোচনের দিকে আর্থিক নীতিমালা প্রণয়ন, আঁটসাঁট আর্থিক নীতিমালা।
৪। সরকারি খাত: রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড: প্রায় সব রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত একচেটিয়া অধিকার সরিয়ে নেয়া, রাষ্ট্র মালিকানাধীন শিল্পগুলোকে করপোরেশনে রূপান্তর করা, সম্পত্তি, অধিকার, শেয়ার বিক্রি ইত্যাদির মাধ্যমে বেসরকারীকরণ; করনীতি: ব্যক্তিগত আয়কর হার কমিয়ে সমান্তরালকরণ, করপোরেট করের সরলীকরণ, যাতে ফাঁকি কমানো যায় এবং প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস পায়, সঞ্চয় ইত্যাদির জন্য কর রেয়াত তুলে নেয়া; ব্যয় নিয়ন্ত্রণ: সরকারি ব্যয় কমানোর চেষ্টা, বিশেষ করে প্রশাসনিক এবং শিল্প উন্নয়ন ক্ষেত্রে, সরকারি দেনা পরিশোধে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প সম্পত্তির বিক্রয়লব্ধ আয় হস্তান্তরকরণ, সামাজিক খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ, বার্ধক্য হেতু অবসরকালীন বৃত্তি) ব্যয় হ্রাসে উদ্যোগ গ্রহণ; সামাজিক সেবামূলক কাজ: নির্বাচিত বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ওপর ভিত্তি করে বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করা।
বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন কৌশল
যদিও প্রধানত ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের নির্দেশেই যাত্রা শুরু, তবুও প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি খাতের উন্নয়নে এবং বাজার উন্নয়নে নীতিমালা সংশোধন ও গ্রহণে বাংলাদেশ অগ্রগামীদের অন্যতম। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের শর্তাবলি কার্যত অর্থনৈতিক নীতিমালার সব দিক এবং অর্থনীতির প্রায় সব খাতকে পরিবৃত করে, যথা— সরকারি ব্যয়, সুদের হার, বিনিময় হার, ঋণের সীমা, কর ও শুল্কের আইন, বাজার কাঠামো, কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পের মূল্যের নীতিমালা এবং সরকারি শিল্প ইত্যাদি। শুরুতে অবশ্য বাংলাদেশে এসব শর্তের ব্যাপারে অনেক দ্বিধা ও আপত্তি ছিল, যার ফলে দাতা দেশগুলোর সঙ্গে অনেক সময় গরম বাক্য বিনিময় পর্যন্ত ঘটে। শুরুতে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের পক্ষ থেকে অঙ্গীকারের অভাব সংস্কার বাস্তবায়নের গতি ও মানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়া খুব ধীর ও মন্থর ছিল এবং ফলাফল অনেক সময় পরস্পরবিরোধী ছিল।
সময়ের বিবর্তনে, বিশ্বময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশও নিজের অবস্থান অনেক নমনীয় করেছে এবং সাম্প্রতিককালে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অনেক ক্ষেত্রে এককভাবে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার গ্রহণ করেছে; যথা ভ্যাট প্রবর্তন, অপেক্ষাকৃত নমনীয় সুদের হার ব্যবস্থা, বাণিজ্য উদারীকরণ এবং চলতি হিসাবে টাকাকে বিনিময়যোগ্য ঘোষণা ইত্যাদি। যদিও কিছু উগ্র সমালোচকের মতে সরকারের উচিত ছিল ‘প্রচণ্ড বিস্ফোরণ’-এর নীতি মোতাবেক আরো দ্রুত বেগে চলা। যা হোক, এটা এখন সুস্পষ্ট যে, এ পর্যন্ত যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভবত কয়েক বছর আগেও যেগুলোর বাস্তবায়ন প্রায় সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল। এতে বেশ সুফল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উল্লেখ করা যায় বর্তমানে নজিরবিহীন ম্যাক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, রাজস্ব ঘাটতির সংকোচন, মুদ্রাস্ফীতির নিম্নহার, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অপেক্ষাকৃত উদার বাণিজ্য ও শিল্প পরিবেশ ইত্যাদি।
একটি আকর্ষণীয় কৃতিত্ব, যা অবশ্য কিছু সমালোচনারও সম্মুখীন হয়, তা হলো বেসরকারীকরণ কার্যক্রম। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি শিল্পের ব্যাপক বেসরকারীকরণ করা হয়েছে। যদিও হস্তান্তরিত শিল্পের মোট সংখ্যা, শিল্পের আকার ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বিভিন্নভাবে হিসাব করা হয়েছে, তবুও মোটামুটিভাবে এক হাজারেরও বেশি শিল্প ইউনিট এবং তিন থেকে চার হাজারের মতো ছোট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণ হয়েছে বলা যায়। দেশের অপেক্ষাকৃত উল্লেখযোগ্য ৫৬৭টি শিল্প ইউনিট ক্রমান্বয়ে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সারণি ২ থেকে দেখানো হয়েছে, যার ফলে সরকারি মালিকানায় শিল্প সম্পত্তি স্বাধীনতা-উত্তর কালের ৯০ থেকে বর্তমানে ৪০ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তীকালে এ পুুঁজি প্রত্যাহার প্রক্রিয়া বাংলাদেশে সব সরকারের কাছ থেকেই সমর্থন পেয়েছে। আমরা জানি, এর আগ পর্যন্ত একটি সমাজতান্ত্রিক আদর্শভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছিল।
যেভাবে বাংলাদেশের শিল্প খাতে বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তা নিম্নরূপ:
ক) পরিত্যক্ত ও রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প থেকে ক্রমান্বয়ে পুঁজি প্রত্যাহার এবং এসব শিল্প থেকে বাংলাদেশী মালিকদের কাছে হস্তান্তর করে, অথবা বিজ্ঞপ্তি, প্রচার বা আলোচনার মাধ্যমে বিক্রি করে বাংলাদেশী মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
খ) রাষ্ট্র কর্তৃক স্থাপিত যেসব শিল্প ইউনিট ক্রমাগত লোকসানের সম্মুখীন বা বেসরকারি খাতের শিল্পের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অপারগ, সেসব ইউনিট থেকে পুঁজি প্রত্যাহার।
গ) পাট ও বস্ত্র মিলগুলো তাদের প্রাক্তন বাংলাদেশী মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা, যাতে বিনিয়োগের একটি সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং ভবিষ্যৎ পুঁজি বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস ফিরে পায়।
ঘ) শেয়ারবাজারকে পুনঃচালু ও অধিক ইকুইটি মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্যে স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সরকারি শিল্প-কারখানার ৪৯ শতাংশ শেয়ার জনগণের কাছে এবং তার ১৫ শতাংশ কারখানার কর্মচারীদের মধ্যে বিক্রি। সর্বশেষ শিল্পনীতিতে এ শেয়ার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে।
ঙ) সরকারি করপোরেশনগুলোকে হোল্ডিং করপোরেশনে এবং সরকারি খাতের শিল্প-কারখানাগুলোকে সরকারি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা।
চ) বেসরকারি শিল্প খাত উন্নয়নের জন্য উদার ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা।
লক্ষ করা যায়, ১৯৯২ সালের শুরুতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পুঁজি প্রত্যাহার-বিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির সুপারিশক্রমে বর্তমান সরকার ৪২টি শিল্প-কারখানা বেসরকারীকরণের জন্য চিহ্নিত করেছিল (যার প্রায় সবগুলোই লোকসানি খাতে)। এগুলোকে তিনটি প্রধান গ্রুপে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে: (১) প্রথম গ্রুপে আছে আটটি শিল্প, যেগুলো ১৯৮৭ সালের ৫১:৪৯ শতাংশ পুঁজি প্রত্যাহার পরিকল্পনার আওতায় পূর্বে হোল্ডিং করপোরেশনে রূপান্তরিত হয়েছিল। এর বাকি ৫১ শতাংশ শেয়ার জনগণের কাছে বিক্রি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। (২) দ্বিতীয় গ্রুপে আছে ২৮টি শিল্প, যেগুলো প্রতিষ্ঠিত হিসাব পরীক্ষক দল দ্বারা সুপারিশকৃত বিক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে বেসরকারি খাতে সম্পূর্ণরূপে বিক্রি করা হবে। (৩) তৃতীয় গ্রুপে আছে ছয়টি শিল্প, যেগুলো থেকে হোল্ডিং করপোরেশনের নীতিতে আংশিক পুঁজি প্রত্যাহার করা হবে; অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়া হবে, যার ৩৪ শতাংশ জনগণের ও ১৫ শতাংশ কর্মচারীদের মধ্যে শেয়ারের ইস্যুকৃত মূল্যে বিক্রি করা হবে।
যাহোক, বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে কখনো সম্পূর্ণ মসৃণভাবে চলেনি বা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত ছিল না। শুরুতে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহল এর ঘোর বিরোধিতা করে। তাছাড়া ওইসব আমলা ও শ্রমিক ইউনিয়ন, যাদের শিল্প-কারখানায় সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে, তারাও প্রবল আপত্তি তোলে। পরবর্তীতে অবশ্য যখন প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে, তখন বেসরকারীকরণের প্রতি আপত্তি কমে আসে। তথাপি, সর্বশেষ তালিকা দেখে বোঝা যায় অগ্রগতি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরে চলছে। এত ধীরে যে, বিশ্বব্যাংকের মতে বেসরকারি খাত এ সরকারি খাতে বিনিয়োগের সঙ্গে সমতায় আসতে ৪০ বছরেরও ঊর্ধ্বে সময় নেবে। অধিকন্তু বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সম্পর্কেও অভিযোগ আছে। কারণ এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার, যাতে পুঁজি প্রত্যাহারকৃত শিল্প ইউনিটগুলো নবজীবন পেয়ে মুক্তভাবে বেঁচে থাকতে পারে। বাস্তবে বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবমতে, বাংলাদেশে পুঁজি প্রত্যাহারকৃত শিল্পের ৪৯ শতাংশ কোনো না কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। আবার বেসরকারীকরণের পরও দেখা যায় যেমন— পাট, বস্ত্র, কিছু প্রক্রিয়াজাত শিল্প, বাণিজ্যিক ব্যাংক ইত্যাদির ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। উৎপাদনের উপাদান মূল্যে নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ও মজুরি নিয়ন্ত্রণ, জাতীয়করণকৃত বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে পাট মিলগুলোকে (এদের আর্থিক কর্মকাণ্ড যা-ই হোক না) ক্রমাগত ঋণ প্রদান এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণে মিল বন্ধ করার ওপর বিধিনিষেধ ইত্যাদিতে প্রতীয়মান হয় যে, বিরাষ্ট্রীয়কৃত শিল্পগুলো প্রায় সরকারি শিল্পের মতোই পরিচালিত হচ্ছে।
উপরে বর্ণিত বেসরকারীকরণ প্রচেষ্টা শুধু শিল্প-কারখানা থেকে পুঁজি প্রত্যাহার সম্পর্কে বিবৃত। অবশ্য বাংলাদেশ কৃষি ও আর্থিক ক্ষেত্রেও বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিক্ষেত্রে সার বিক্রি ও বিতরণের কথা বলা যায়। এতে সরকারি ব্যবস্থাপনার পরিসমাপ্তির সঙ্গে বেসরকারি খাতে— খুচরা ও পাইকারি বাজারে, এবং গুদামজাতকরণে এবং আমদানি পয়েন্টে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। অনুরূপ, কিছুসংখ্যক বাণিজ্যিক ব্যাংকের বেসরকারীকরণসহ কিছু ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিকে বেসরকারী খাতে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আবশ্যক ভোগ্যপণ্য সরবরাহ, যা আগে রাষ্ট্র কর্তৃক উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল, তা এখন বেসরকারি খাতে ফলপ্রসূভাবে পরিচালিত হয়। এছাড়াও সরকার বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ, পেট্রোলিয়াম, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ ও পরিবহন খাতে প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করেছে। এসব জায়গায় সরকারের অদ্যাবধি আধিপত্য ছিল। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বিভিন্নভাবে হতে পারে, যেমন— ব্যবস্থাপনা চুক্তি, ইজারা, তৈরি করো ও পরিচালনা করো এবং তৈরি করো ও হস্তান্তরিত করো— এসবের ভিত্তিতে। টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে যা অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে, এরই মধ্যেই বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া জাগিয়েছে।
অনুরূপভাবে, গ্যাস সেক্টরের পুনর্গঠনেও কিছু উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে। যেসব ব্লক আগে রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোবাংলার অনুসন্ধানের জন্য নির্দিষ্টকৃত ছিল, সেগুলো এখন বেসরকারি নিলাম ডাককারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আবার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ঢাকা বিদ্যুৎ করপোরেশনকে পুনর্গঠন করে বেসরকারি সেক্টরকে বিদ্যুৎ খাতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেয়া হয়েছে। এমনকি বিমান খাতেও বেসরকারি খাতের ভূমিকা মেনে নেয়া হয়েছে।
এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও উৎসাহব্যঞ্জক বেসরকারি খাত পরিচালিত প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে আরো অধিক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। যদিও ম্যাক্রো দৃশ্যাবলি এখন অধিকতর আকর্ষণীয়, তবুও মাইক্রো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পিছিয়ে আছে। এ দুরবস্থার একটি ব্যাখ্যা এটা হতে পারে যে, কাঠামোগত সমন্বয় পূর্ণোদ্যমে কার্যকর করার জন্য বেশি সময় প্রয়োজন। তাছাড়া সঞ্চয় ও বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ এখনো হতাশাব্যঞ্জকভাবে কম। যাহোক, নীতিমালা বাস্তবায়নে আরো অন্য ধরনের সমস্যাও আছে।
বাংলাদেশে বেসরকারি খাত পরিচালিত প্রবৃদ্ধির বাধাগুলো
এ বিষয়ে সমস্যাগুলো হচ্ছে— (১) তাত্ত্বিক প্রকৃতির, (২) টেকনিক্যাল বিষয় সম্পৃক্ত, (৩) বিরূপ ফলাফলের আশঙ্কা এবং (৪) এ ধরনের কর্মসূচিতে সরাসরি বাধা।
তাত্ত্বিকভাবে কিছু কিছু ধারণা এখনো পরিষ্কার নয় বা যথাযথ নয়। উদাহরণস্বরূপ, বেসরকারীকরণকে সংকীর্ণভাবে মালিকানার বদলি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, অথবা ব্যাপকভাবে বলা যায় যে, অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়ছে এবং সরকারের ভূমিকা কমছে। অবশ্য আরো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে কর্মসূচির গতি এবং এর প্রবর্তনের ধারাবাহিকতা নির্দিষ্ট করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনেকে কাঠামো সমন্বয় নীতিমালা প্রবর্তনের আগে স্থিতিকরণ পছন্দ করবে। অনেকে আবার লেনদেনে সমতা দেখতে চাইবে। কেউ কেউ ‘প্রচণ্ড আওয়াজের’ মতো দ্রুত ব্যবস্থা, আবার কেউ ‘ধীরে চলা’ নীতি পছন্দ করবে। দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা এখনো এমন যথেষ্ট বা চূড়ান্ত নয় যে, এ বিষয়ে একটি আদর্শ কার্যপদ্ধতি স্থির করা যায়। বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি খাত উন্নয়নের একই লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন ব্যক্তি বিকল্প রাস্তা বা পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারে।
কিছু টেকনিক্যাল সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, বেসরকারীকরণ নীতি আর্থিক সমস্যা বা কোন বিশেষ বেসরকারীকরণ লক্ষ্য অর্জনে কোন আর্থিক কৌশল অনুসরণ করা উচিত, এ ধরনের প্রশ্নের অবতারণা করে। এতে সম্পত্তির অধিকার এবং আইন-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে, বিশেষ করে সম্পত্তির অধিকার-সংক্রান্ত ধারাগুলো সাফল্যজনকভাবে বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া সমর্থনের জন্য যথেষ্ট কিনা? কর কাঠামোর ব্যাপারেও সমস্যা আছে। যেমন উদাহরণস্বরূপ, কর প্রথা ব্যক্তিগত ইকুইটি মালিকানা উৎসাহিত করে কিনা? এছাড়াও কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পর্যায়ক্রমে পরিচালনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্টকরণ, মূল্য নির্ধারণ, আলোচনাসহ সর্বশেষ অনুসন্ধান ও ফলাফল নিশ্চিতকরণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, বেসরকারি খাত উন্নয়ন মোটেও একটি সরল অনুশীলন নয়।
যদিও বাজারমুখী করার প্রচেষ্টা প্রধানত দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে, তবুও এ সংস্কার কর্মসূচি কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্থিতিশীলতার কর্মসূচি বেকার সমস্যার তীব্রতা বাড়াতে পারে, কারণ সমষ্টিগত চাহিদার স্তরকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ নীতিমালা কাজ করে। রুগ্ণ শিল্পকে পুনর্গঠন, বেসরকারীকরণ এবং আমদানি উদারকরণও স্বল্পকালীন মেয়াদে অর্থনীতিকে কোণঠাসা করতে পারে। তবে রফতানি এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের বৃদ্ধি এর বিপরীতে কাজ করে, যদিও তা বহিঃচাহিদার ওপর নির্ভরশীল বিধায় অনিশ্চিত।
সবশেষে এ ধরনের সংস্কার কর্মসূচির বিরুদ্ধে কোনো বিশিষ্ট গ্রুপ বা সমাজের কিছু লোক সরাসরি বাধা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, রাজনৈতিক দল, সরকারি পণ্যের ভোক্তা, বেসামরিক কর্তাব্যক্তিসহ সরকারি চাকরিজীবী এবং দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীরাও এর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে নীতিমালা সংস্কারের ক্ষেত্রে বর্তমানে রাজনৈতিক বিরোধিতা বস্তুতপক্ষে স্তিমিত হয়ে গেছে, তবে কিছু গ্রুপ সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে।
এগুলো ছাড়াও দেশে আরো অনেক বাধার প্রাচীর আছে। একটি জটিল সমস্যা হলো নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে অবস্থিত ফারাক। আমলাতন্ত্র এ প্রক্রিয়াকে খুব মন্থরগতি সম্পন্ন করে, যাতে হতাশার সৃষ্টি হয় এবং ব্যক্তিগত খাতে ঝুঁকিবহুল ব্যবসার প্রতি আগ্রহ অবদমিত করে। বাংলাদেশে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির এটাও একটা অন্যতম কারণ। আরেকটি বড় কারণ, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের অভাব, যা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা/ভ্রমের সৃষ্টি করে। আবার যদিও অর্থনৈতিক নিয়মবিধি সংশোধনের জন্য একটি তাত্পর্যপূর্ণ প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে, কিন্তু তা প্রায়ই (এসআরও) সংবিধিবদ্ধ নিয়ামক আদেশের বহুল ব্যবহার দ্বারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সবশেষে এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, নীতিমালা শূন্যতার ভেতর পরিচালিত হতে পারে না। সর্বশ্রেষ্ঠ নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্যও দরকার উপযুক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান, আর্থিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, মুদ্রাবাজারের উন্নত পরিবেশ, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য। দুর্ভাগ্যবশত এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এ গুণাবলির অবস্থান আদর্শ স্থান থেকে অনেক দূরে।
বেসরকারি খাত পরিচালিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশলকে বিগত দিনের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের অদক্ষতার এক বাস্তব প্রতিক্রিয়া হিসেবে গণ্য করা যায়। অবশ্য শুধু বেসরকারি খাত উন্নয়নই শেষ কথা নয়। অধিক দক্ষ, অধিক প্রতিযোগিতামূলক, উত্তম সুষম ব্যবস্থাযুক্ত একটি বহুমুখী স্পন্দনশীল অর্থনীতি অর্জনই জাতির লক্ষ্য হওয়া উচিত। এবং এ প্রক্রিয়ায় মুক্তবাজার ও উন্নত বেসরকারি খাত অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত। এ কৌশলের ফ্রেমে সরকারের অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে, যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং এ পদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। সুতরাং বেসরকারি খাত পরিচালিত কৌশল সরকারকে অস্বীকার করা নয় বা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পার্ক প্রভৃতির মতো সরকারি পণ্য উৎপাদন অস্বীকার নয় বরং এগুলো বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের মাধ্যমে কম দামে আরো উত্তম সেবা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। যাহোক, দক্ষ ও উত্তম প্রশাসন চালানোর জন্য সরকারকে কমপক্ষে শ্রমিকদের শৃঙ্খলা, শিক্ষা, সাধারণভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অবশ্যই নিতে হবে। তবেই বাংলাদেশে বেসরকারি খাত পরিচালিত প্রবৃদ্ধির সুফল আশা করা যাবে।
[বিআইডিএস প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা, ১৯৯৩’ থেকে পুনঃমুদ্রণ]
লেখক: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক