জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ

পরিবার পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের অগ্রগতি

বাংলাদেশের আজকের উন্নয়নের পেছনে ভূমিকা রেখেছে, এমন কয়েকটি খাতের উল্লেখযোগ্য একটি হলো পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। যদিও এ কার্যক্রম বর্তমানে সমালোচনার সম্মুখীন। সত্তরের মাঝামাঝি ও আশির শুরুতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনা বেশ চ্যালেঞ্জ হলেও এ কাজে ছিল তখন বেশ গতিময়তা। ফলে সাফল্যও পায় বাংলাদেশ। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের স্বর্ণযুগ বলা যায় আশির দশককে। মনে পড়ে, আমি তখন বেশ ছোট। আমার মা পরিবার কল্যাণ সহকারী বা ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তখন কাজ করতেন। মা আমাকে এক গৃহপরিচারিকার কাছে রেখে পরিবার পরিকল্পনাসংক্রান্ত কাজে যেতেন। সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই এ কাজে যেতে হতো। আমার চেয়ে তিন বছরের বড় বোন স্থানীয় প্রাথমিক স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে আমার সঙ্গে খেলা করত। ১৯৭৬-৮০-এর সময়ের কথা। আমরা তখন নরসিংদীর শিবপুরে দাদার বাড়ি খড়িয়া গ্রামে থাকি। মা তার পরিবার পরিকল্পনা কর্ম এলাকা ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণে দম্পতিদের উৎসাহ দিতে বাড়ি বাড়ি যেতেন। তিনি কাজ করতেন তার এক সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে। ১৯৭৬-৮০ সাল পর্যন্ত এ কাজ করেছেন মাসিক ৩০০ টাকা বেতন স্কেলে। বাবা তখন বাড়ি থেকে ৮-১০ মাইল দূরের আরেকটি গ্রামের হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আমার মা অবশ্য পরবর্তী সময়ে পরিবার পরিকল্পনার কাজ থেকে অব্যাহতি নিয়ে ১৯৮০ সালে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। মা বলতেন, এ এলাকায় তিনিই প্রথম নারী, যিনি ব্যাংকে কাজ শুরু করেন ওই সময়ে। একজন নারী ব্যাংকে কাজ করেন, ব্যাপারটি স্বাভাবিক ছিল না। অনেকে নাকি ব্যাংকে আসত আমার মাকে দেখার জন্য। বেশ সংগ্রামময় জীবন ছিল আমার মায়ের, যিনি ২০১১ সালে সিনিয়র অফিসার হিসেবে ওই ব্যাংক থেকেই অবসরে যান। মায়ের ব্যাংকের চাকরির সুবাদে মনে পড়ে, আমরা তখন গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শিবপুর উপজেলা সদরে চলে আসি। আমরা তখন দুই ভাই-বোন। আমি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আমার বোন হাইস্কুলে পড়ি। বাবা গ্রামের পূর্বের হাইস্কুলেই হেডমাস্টারি করতেন। মা একদিন আমাদের সঙ্গে নিয়ে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক অনুষ্ঠানে নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখি, সেখানে আমার মাকে সম্মানিত করা হচ্ছে পুরস্কার দিয়ে। আশির দশকের সেই স্লোগান— ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ জনপ্রিয় করতে এ উদ্যোগ। মনে পড়ে, আমার মাকে সংবর্ধনার পাশাপাশি একটি পিতলের কলসি দেয়া হয়েছিল উপহার হিসেবে। এ ঘটনা থেকেই শুরু করি। আশির দশকে কেমন ছিল এ পরিবার পরিকল্পনা। কেন পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে আজ স্থবিরতা লক্ষণীয়?

বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ১৯৫৩ সালে বেসরকারিভাবে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে শুরু হলেও কর্মসূচির গুরুত্ব অনুধাবনপূর্বক ১৯৬৫ সালে সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং সীমিত আকারে ক্লিনিকভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম আরম্ভ হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সব সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব এবং কর্মসূচিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়াস চালায়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যোৎপাদনে গুরুত্বারোপ করা হয়। তখনই যাত্রা হয় বহুমুখী ও দেশব্যাপী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। ১৯৭৬ সালের জুনে জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিলের সভায় জনসংখ্যাকে দেশের ১ নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ওতোপ্রতোভাবে জড়িত বলে জরুরি গুরুত্ব দেয়া হয়। এ কার্যক্রমকে বর্ধিত করে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মাঠকর্মী নিয়োগ ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ, এমআর সার্ভিসের প্রচলন, মোবাইল স্টেরিলাইজেশন টিম গঠন, উপজেলা, সাব-জেলাভিত্তিক মা ও শিশুস্বাস্থ্য ক্লিনিক স্থাপন, আইইসি কার্যক্রম জোরালোকরণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, এনজিও ও বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্তকরণ ছিল সে সময় বেশ জোরালো। ছোট পরিবার সুখী পরিবার, ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট, কুড়ির আগে বিয়ে নয় কিংবা কুড়িতে বুড়ি নয়— এসব স্লোগান জনপ্রিয় হয়েছে সে সময় মূলত পরিবার পরিকল্পনাসচেতনতা কার্যক্রমে। পরিবার পরিকল্পনা সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শকদের মাধ্যমে পরিচালিত আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ কার্যক্রমের পাশাপাশি টেলিভিশন, বেতার ও প্রিন্ট মিডিয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহার করেছিল। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশ বেতারে ও আশির শুরুতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পৃথক জনসংখ্যা সেল খোলা হয়। বলা যায়, ১৯৮০-৮৫ সময় ছিল কার্যকর সমন্বিত প্রোগ্রাম গ্রহণের সময়। সে সময় মাতৃ-শিশুস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসেবা স্বাস্থ্যের সঙ্গে সমন্বিত করে উপজেলা ও নিম্নপর্যায়ে প্রসার ঘটানো হয়। শিশুস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসেবা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দায়িত্বের আওতায় আনা হয়। রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিল, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যামন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একজন সচিবের আওতায় স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যার দুটি বিভাগকে একীভূত করে সমন্বিত একক কমান্ড বাস্তবায়ন করা হয়। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে উপজেলা পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কমিটি গঠন করা হয় স্থানীয় পর্যায়ে প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের জন্য। পরে ১৯৮৫-১৯৯০ সাল পর্যন্ত নিবিড় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চলে। বৃহৎ পরিসরে বহুমুখী নিবিড় মাতৃ-শিশুস্বাস্থ্যভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি শুরু হয়। অধিকতর উন্নত পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃ-শিশুস্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। স্যাটেলাইট ক্লিনিক, দূরবর্তী দুর্গম-গ্রামীণ এলাকায় পরিষেবা প্রদান শুরু হয়। স্থানীয় কমিউনিটি লিডার ও এনজিওর অংশগ্রহণ বাড়ে। প্রত্যেক জেলায় জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিলের শাখা স্থাপন করা হয়। বলা যায়, পরিবার পরিকল্পনা মাতৃ-শিশুস্বাস্থ্যভিত্তিক একটি সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়, যার প্রভাব আমরা লক্ষ করেছি।

বলা যায়, ১৯৯০-৯৫ পর্যন্ত এ কার্যক্রমে গতি ছিল, যেখানে পরবর্তী সময়ে স্থবিরতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির অভাব পরিলক্ষিত হয়। ১৯৯৪ সালের পর জনসংখ্যা ও উন্নয়ন ভাবনায় প্যারাডাইম শিফট হয়। গুণগত দিক গুরুত্ব পায়। অধিকারের বিষয়বস্তু সামনে আসে, যা বেশ ভালো দিক, কিন্তু জনসংখ্যাকে সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনায় অধিকতর গুরুত্ব প্রদানে ঘাটতি লক্ষ করা যায়। ১৯৯৮-২০০৩ সময়ে এইচপিএসপি স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সেক্টর প্রোগ্রাম চালু হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার রিভিউ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা জানুয়ারি ২০০৩ থেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, যা স্বতন্ত্র সাংগঠনিক কাঠামো আকারে জুলাই ১৯৯৮-এর আগেই ছিল। ২০০৩-১১ সময় ছিল এইচএনপিএসপি (স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর প্রোগ্রাম)। এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কাঠামো স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় কাজ শুরু করে। পরিবারকল্যাণ সহকারী রেজিস্টার ও বাড়ি পরিদর্শনের কাজ পুনরায় সূচনা করা হয় পাঁচ বছর বিরতিতে। ২০১১-১৬ সালে এসে দেখতে পাই, এইচএনপিএসডিপি (স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর উন্নয়ন প্রোগ্রাম) ও বর্তমানে চলছে এইচএনপিএসপি (স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর প্রোগ্রাম), যা অব্যাহত থাকবে ২০২১ সাল পর্যন্ত।

ওই সময় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে যুক্ত হয় মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা, যা দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায়ে পরিচালিত হয়। ১৯৭৫ সালে যেখানে প্রজনন হার ছিল ৬ দশমিক ৩, তা ১৯৮৯ সালে নেমে আসে ৫ দশমিক ১-এ এবং ১৯৯১ সালে ৪ দশমিক ৩-এ। একই সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ১৯৭৫-এ ৫ শতাংশ থেকে ১৯৮৩-এ ১৩ দশমিক ৮, ১৯৮৯-এ ২৩ দশমিক ২ ও ১৯৯১-এ ৩১ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২১ সালের মধ্যে ‘মধ্যম আয়’ ও ২০৪১ সালের মধ্যে ‘উন্নত’ দেশের কাতারে পৌঁছতে হলে সরকারকে জনসংখ্যার বিভিন্ন ইস্যুকে বিবেচনায় নিয়ে পরিবার পরিকল্পনায় মানবাধিকার নিশ্চিত করে সাফল্য, প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ মূল্যায়ন করতে হবে। তাছাড়া জনগণের ক্ষমতায়নে পরিবার পরিকল্পনার কী ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে এ লেখায় স্বল্পপরিসরে কিছুটা আলোকপাত করার প্রচেষ্টা নিচ্ছি। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাল্যবিবাহ, দ্রুত সন্তানধারণ, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় স্থানীয় ও পরিবর্তিত বিশ্ববাজার মাথায় রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া। উদাহরণ হিসেবে বাল্যবিবাহ বা শিশুবিবাহের কথাই বলি, বাল্যবিবাহ আমাদের উন্নয়নে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। পরিবার পরিকল্পনা ও তার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাল্যবিবাহ ও তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্তি, প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা। ফলে সম্ভব দেশের জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন। মনে রাখতে হবে, পরিবার পরিকল্পনা মানে শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার হয়, পর্যাপ্ত ব্যবধানে সন্তান নেয়া, বাল্যবিবাহকে নিরুৎসাহিত করা, কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে বৈঠক, নববিবাহিতদের ভবিষ্যৎ জীবন ও সন্তানধারণ ইত্যাদি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করার কাজও অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো জন্মনিয়ন্ত্রণসেবা ও তথ্যের সেবা নিশ্চিত করা। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে সুযোগ, পূর্ব-সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তির সক্ষমতা সংরক্ষণ এবং কিশোরীদের সেবা প্রদানে গোপনীয়তা বজায় রাখা।

বর্তমানে জাতিসংঘের পপুলেশন ডিভিশনের ২০১৭-এর তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬৫ মিলিয়ন, যা ২০৫০ সালে পৌঁছে যাবে ২০২ মিলিয়নে, মানে ২০ কোটি ২০ লাখে। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করছে ১ হাজার ২৬৫ জন, যা কিনা ২০৪০ সালে বেড়ে হবে ১ হাজার ৫০৮ জনে। ছোট ছোট নগর রাষ্ট্রের কথা বাদ দিলে বাংলাদেশই পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। দেশে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ হার নিম্নমুখী রাখার প্রয়াসে পরিবার পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বর্ধিত জনসংখ্যা চাষযোগ্য জমি, শিক্ষা, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতিতে প্রভাব ফেলবে, যা উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১৯৭০-৭৫ সালে সমগ্র প্রজননহার ছিল ৬ দশমিক ৯১, যা ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস ২০১৪) তথ্যানুযায়ী এসে পৌঁছেছে ২ দশমিক ৩-এ। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাফল্য, যেখানে ২০১৫ সালেও দক্ষিণ এশিয়ায় সমগ্র প্রজননহার ছিল সবচেয়ে বেশি আফগানিস্তানে ৫ দশমিক ২৬ ও পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৭২ও ভারতে ২ দশমিক ৪৪। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, শিক্ষা ও সচেতনা বৃদ্ধি এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখলেও ২০১১ সালের পর থেকে প্রজননহার হ্রাসে লক্ষণীয় সাফল্য দেখছি না। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো থাকলেও ২০১১ ও পরবর্তী সময়ে সমগ্র প্রজননহার হ্রাসে তেমন আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। অর্থাৎ ২ দশমিক ৩-এ স্থিত হয়ে আছে। বিভাগীয় কিংবা অঞ্চলভিত্তিক ক্ষেত্রেও বেশ পার্থক্য লক্ষণীয়, বিশেষ করে সিলেট (২ দশমিক ৯) ও চট্টগ্রামে (২ দশমিক ৫) সমগ্র প্রজননহার হচ্ছে অপেক্ষাকৃত বেশি। গ্রাম এলাকা, দরিদ্র গৃহস্থালি সম্পদ, শিক্ষা নেই বা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেনি, এমন মায়েদের মধ্যে সমগ্র প্রজননহার বেশি। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, ২০১১-১৪ সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহারে নেই তেমন অগ্রগতি। ২০১৪ সালের বিডিএইচএস জরিপ অনুযায়ী ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৬২ শতাংশ, যার ৫৪ শতাংশ ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতি। স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারে নেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ২০১১-১৪ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহারের হার বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ২০১২’ অনুযায়ী আমরা এখনো জনসংখ্যা নীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। জনসংখ্যা নীতির লক্ষ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে সমগ্র প্রজননহার (টিএফআর) ২ দশমিক ১-এ পৌঁছার কথা। ২০০৪ সালের জনসংখ্যা নীতিতেও একই লক্ষ্য ছিল। জন্মনিরোধের হার ২০১৫ সালের মধ্যে ৭২ শতাংশে পৌঁছার কথা। সরকারের বাংলাদেশ রূপকল্প (২০১০-২১) অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে টিএফআর ১ দশমিক ৭-এ আর জন্মনিরোধের ৮০ শতাংশে পৌঁছার কথা। কিন্তু সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে উভয় হারের লক্ষ্যমাত্রা হলো ২ ও ৭৫ শতাংশ। ফলে নীতি-কর্ম কৌশলে এক ধরনের অসামঞ্জস্য ও সমন্বয়ের অভাব লক্ষণীয়। সেই সঙ্গে কেন এখন আর পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সাফল্য পাচ্ছে না? কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারছে না। অথচ এ পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমই একদিন ছিল বিশ্বে বিশেষভাবে সমাদৃত। বলতে গেলে আজকের বাংলাদেশের জনসংখ্যা ইস্যুতে যা কিছু অর্জন, তার মূলে রয়েছে এই পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। তবে বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে এ কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করা অত্যাবশ্যক। অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত তিনটি কারণে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না বর্তমান সময়ে এসে। প্রথমত. জনবলে ঘাটতি রয়েছে। চার-পাঁচ হাজার পরিবারকল্যাণ মাঠকর্মীর পদ ফাঁকা রয়েছে বলে জানা যায়। অথচ সময় পরিক্রমায় জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে আন্ডার কাভারেজ এরিয়া থেকে যায়। এখন মাঠকর্মীর তিন জায়গায় কাজ করতে হয়। যেমন— কমিউনিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে তিনদিন, ইপিআইতে একদিন। দ্বিতীয়ত. প্রশাসনিক জটিলতা বিশেষ করে ক্যাডার, নন-ক্যাডার ও মেডিকেল অফিসার— এ তিনে দ্বন্দ্ব। বলা যায়, চেইন অব কমান্ডে সমন্বয় হচ্ছে না। এর সঙ্গে অ্যাডমিন ক্যাডার থেকে আসেন পরিচালক, উপপরিচালক, যিনি প্রোগ্রাম সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নন কিংবা গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। কী করলে প্রোগ্রাম আরো সচল হবে, তা নিয়ে ভাবেন না। তৃতীয়ত. পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যক্তিদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। পদোন্নতিতে সমস্যা রয়েছে। ফলে পরিবার পরিকল্পনাকে যেন কেউ সত্যিকার অর্থে নিজের বলে মনে করে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ছে সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি। যেমন— ভাসমান জনগোষ্ঠী ও এলাকা, পার্বত্য এলাকা, চর এলাকা অর্থাৎ যে এলাকাগুলো ‘হার্ড টু রিচ’ নামে পরিচিত, সেসব স্থানে জোরালো প্রোগ্রাম না নেয়া। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহার কমে যাওয়া। এক্ষেত্রে মেডিকেল যে উপকরণ দরকার হয় তা নিম্নমানের, আপগ্রেড হয়নি, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়নি, লজিস্টিকে ঘাটতি রয়েছে— এ রকম অনেক কারণেই স্থায়ী পদ্ধতি জনপ্রিয়তা পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া আইইএম ইউনিটের প্রেষণামূলক কর্মের ঘাটতি রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে।

বাংলাদেশে বর্তমানে এখনো জন্মনিয়ন্ত্রণে ১২ শতাংশ নারী পরিবার পরিকল্পনায় অপূর্ণ চাহিদার মধ্যে রয়েছেন, যারা বিরতিতে সন্তান নিতে চান (৫ শতাংশ) কিংবা সীমাবদ্ধ রাখতে চান (৭ শতাংশ)। সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে টিএফআর প্রতিস্থাপনযোগ্য মাত্রার কাছাকাছি থাকলেও ১৫-১৯ বছরের নারীদের বয়স নির্দিষ্ট প্রজননহার বেশি, এমনকি তা বাড়তে লক্ষ করা গেছে সর্বশেষ বিডিএইচএস ২০১৪ জরিপে। কিশোরীদের (১৫-১৯ বছর) যাদের সন্তান রয়েছে বা বর্তমানে গর্ভবতী, তাদের প্রজননহার ২০১১-এর ৩০ শতাংশ থেকে ২০১৪ সালে বেড়ে হয়েছে ৩১ শতাংশ। অধিকন্তু বাল্যবিবাহ আমাদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। দেশে এখনো বাল্যবিবাহের হার অনেক বেশি। 

ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৪ অনুযায়ী, ২০-৪৯ বছর বয়সের নারীদের অর্ধেকের বেশির বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরে পৌঁছার আগেই। ১৫-৪৯ বছরকে গণনায় নিলে এ হার পৌঁছে যাবে আরো বেশি। আমি আমার নিজ গবেষণায় বিডিএইচএস ২০১১-এর উপাত্ত ব্যবহার করে দেখেছি, বাল্যবিবাহের কারণে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নারী প্রথম সন্তানের মা হয়ে যায় ১৮ বছরের আগে। সেই সঙ্গে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হলে কোনো নারীর সন্তান সংখ্যা পাঁচ বা তার বেশি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় বেশি, ঝুঁকি থেকে যায় গর্ভপাত বা প্রেগন্যান্সি টারমিনেশনের ক্ষেত্রে (দ্য ল্যানসেট জার্নালে গত অক্টোবরে সারমর্ম প্রকাশিত)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় (যেখানে আমি নিজেও ওই গবেষণা দলের একজন সদস্য) দেখা গেছে বাল্যবিবাহ বা শিশুবিবাহের ফলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব। বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরা স্কুল বা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। ফলে তাদের উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে। সেই সঙ্গে তাদের সন্তানদের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হারও বেড়ে যাচ্ছে। অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, বাল্যবিবাহের ফলে মাতৃমৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারটি হয়ে পড়ে দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের শিকার। শুধু বাল্যবিবাহ বা শিশুবিবাহই নয়, দ্রুত সন্তান ধারণও বাংলাদেশে বেশ প্রকট। বাংলাদেশে কিশোরী মাতৃত্ব নিয়ে একটি গবেষণা গত বছর (২৭ নভেম্বর ২০১৭) ‘প্লস ওয়ান’ নামে সুপরিচিত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যেটিতে আমি প্রধান গবেষক হিসেবে রয়েছি, তাতে দেখতে পেয়েছি, বাংলাদেশের প্রতি তিনজন কিশোরীর একজনই ১৯ বছরের মধ্যে মা হন। সমগ্র প্রজননহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এলেও কিশোরী মাতৃত্ব তেমনভাবে হ্রাস ঘটেনি। গ্রামীণ এলাকা, দরিদ্র পরিবার ও মেয়েদের অধিকতর শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য নীতি-কৌশল এক্ষেত্রে প্রয়োজন। তবে এখানে উল্লেখ্য, পরিবার পরিকল্পনার কারণে একদিকে যেমন প্রজননহার কমেছে, অন্যদিকে শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুহারও কমে এসেছে এবং আয়ুষ্কালও বেড়েছে দেশে। বাংলাদেশে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ১৯৭৫-৮০ এ ছিল ৫২ দশমিক ২১ বছর। তা বেড়ে এখন হয়ছে ৭২ বছর। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়স কাঠামোয় আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন লক্ষণীয়। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। কারণ জনসংখ্যার পরিমাণগত ও কাঠামোগত মানদণ্ডে বাংলাদেশ এমন একটি সময় পার করছে, যেখানে নির্ভরশীলতার হার সবচেয়ে কম এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াদি-সংক্রান্ত পপুলেশন ডিভিশনের প্রক্ষেপণ তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৫ সালে যেখানে ১৫-৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ছিল ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ, তা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ১৯৯০ সালে ৫৪ দশমিক ৫, ২০০৫ সালে ৬১ দশমিক ৩ আর ২০১৫ সালে হয় ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন নির্ভর করে তার সুযোগ সৃষ্টি, সুযোগের সদ্ব্যবহার ও তা দীর্ঘায়ন করার ওপর। এ লক্ষ্যে সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল প্রয়োজন। এ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে হবে আমাদের, যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০৪০ সালে পৌঁছাবে ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ক্রমেই কমবে। ফলে আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। তবে চিন্তার বিষয় হলো, এ বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পরিবার পরিকল্পনাকে দেখতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ ও কর্মসূচি হিসেবে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটি বেশ স্পষ্ট যে, পরিবার পরিকল্পনা জীবন রক্ষা করে এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটায়। পরিবার পরিকল্পনায় বিনিয়োগে কম সন্তান নেয়া অনেক নারীকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেয়। বাংলাদেশে সম্পাদন করা গবেষণায়ও দেখা গেছে, পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রেখেছে। কম সন্তান নেয়া ও সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ আয়, উচ্চশিক্ষা অর্জনও সম্ভব হয়েছে। কম সন্তানবিশিষ্ট পরিবারে উচ্চ আয়ের সঙ্গে অধিকতর সঞ্চয় সম্ভব হয়েছে, যা জীবনের গুণগত মানকে বৃদ্ধি করেছে। ফলে পরিবার পরিকল্পনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের ব্যক্তি ও দেশের কল্যাণে; বজায়ক্ষম উন্নয়ন (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে।

 

লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও