জামালপুরের প্রতিটি ঘরই যেন হস্তশিল্পের একটি কেন্দ্র

জামালপুরের হস্তশিল্প বলতে মূলত সুই-সুতার নিখুঁত ফোঁড়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা, নকশা করা শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর এবং কুশন কভারকেই বোঝায়।

প্রায় চার দশক ধরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের জেলাটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও হস্তশিল্পের প্রসারে দারুণ ভূমিকা পালন করছে।

গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরের নারীরা সুই-সুতার কাজ করেন। অবসরেই তারা সূক্ষ্ম কাজটি করে থাকেন, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে। জামালপুরের প্রায় প্রতিটি ঘরই হস্তশিল্পের পণ্য তৈরির কারখানা। শহরের প্রতিটি মহল্লায় চোখে পড়বে সারি সারি হস্তশিল্প পণ্যের দোকান। চলার পথে রাস্তার দুই ধারে শোরুমে বিক্রেতাদের হস্তশিল্প পণ্য বেচাকেনার দৃশ্য মিলবে। জামালপুর সদরের আশেক মাহমুদ কলেজ রোড ও মাদরাসা রোড হস্তশিল্প পণ্যের বিপণিবিতানগুলোর প্রধান কেন্দ্র। এছাড়া দেশীয় বুটিক ব্র্যান্ড যেমন আড়ং, ক্ল্যাসিক এবং বিভিন্ন অনলাইন পেজেও জামালপুরের হস্তশিল্পে তৈরি পণ্য পাওয়া যায়।

গ্রামীণ নকশি সূচি শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসার জামালপুরে শুরু হয় আশির দশকের শুরুর দিকে। বর্তমানে জামালপুর সদরসহ পুরো জেলায় প্রায় ২৫ হাজার নারী এ পেশায় জড়িত। তাদের অনেকেই দরিদ্র। হস্তশিল্পের কল্যাণেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে অনেক হতদরিদ্র নারী। সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা ঘরে বসেই নকশিকাঁথা, নকশি চাঁদর, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কোটি, ওয়ালম্যাট, কুশন কভার, শাড়ির নকশি পাড়, থ্রি-পিস ওড়নাসহ নানা রকম নিত্য ব্যবহার্য ও ঘর সাজানোর মতো উপকরণে নকশা করেন তারা।

জামালপুর শহরে প্রতিষ্ঠিত হস্তশিল্প ব্যবসায়ীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শতদল, কারুকলা, দীপ্ত কুটির, সূচিকা, মীম কুটির শিল্প, জীবিকা হস্তশিল্প, দোলন হস্তশিল্প, পুষ্প হস্তশিল্প, বাংলার উৎসব, রিক্তা হস্তশিল্প, মুম হস্তশিল্প ইত্যাদি।

শহরে প্রতিষ্ঠিত হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠাগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘শতদল’-এর স্বত্বাধিকারী মাকসুদা হাসনাত বলেন, ‘১৯৯৭ সালে মাত্র ১০ হাজার টাকা নিয়ে কোটি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর, নকশিকাঁথার কাজ শুরু করি। শহরের সওদাগর ম্যানসনে দোকান নিয়েছিলাম। এখন আমার মূলধন ১ কোটি টাকার ওপরে। আমার প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন লিডারের অধীনে দুই হাজার কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। এছাড়া স্টাফ আছেন ১৫ জন। যারা সবসময় আমার নিজস্ব কারখানায় কাজ করেন। এখন বিদেশী বায়ারদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে নিজেকে কষ্ট করতে হয় না। বায়াররা এসে পণ্য পছন্দ করে নিয়ে যান এবং অর্ডার দিয়ে যান। তারাই আমাদের পণ্য বিদেশে পাঠিয়ে থাকেন। জামালপুর পৌর শহরে আমাদের দুটি শো-রুম আছে এবং একটি এমব্রয়ডারি, ১৫টি সেলাই মেশিনের একটি কারখানা রয়েছে।’

তিনি জানান, তারা ঢাকার ইসলামপুর, বাবুর হাট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। তারা প্রতি মাসে বিক্রি করেন ৬-৭ লাখ টাকার পণ্য। নকশিকাঁথা পাইকারি ও খুচরা ৩-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ মোড়ে ‘পুষ্প হস্তশিল্প’র স্বত্বাধিকারী চামিলি হাসান। তিনি ১৯৯৮ সালে নিজের ঘর থেকেই ব্যবসা শুরু করেন। শুরু হয়েছিল একটি সেলাই মেশিন ও ৫০০ টাকা দিয়ে। শুধু কুশন কভারের কাজ দিয়ে এ ব্যবসায় তার পথচলা শুরু। প্রথমে এনজিও ও পরে ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা বড় করার চেষ্টা করেছেন।

আশার বিষয়, জামালপুরের নকশিকাঁথা জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ অঞ্চলের হস্তশিল্পের সুনাম বিদেশেও ছড়িয়েছে। আড়ংসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প, নকশিকাঁথা জামালপুর থেকে তৈরি ও সংগ্রহ করে। ফলে হস্তশিল্পের একটি বড় ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এ জেলায়। এখন প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহযোগিতা। তাহলেই আরো এগিয়ে যাবে জামালপুর ও সেখানকার শিল্প।

আরও