এর মধ্যে ব্যবহার অযোগ্য ইস্পাতের একটি অংশ ব্যবহার হয় গলিয়ে ইস্পাত তৈরিতে। জাহাজটির বাকি সিংহভাগ পণ্যই পুনর্ব্যবহার হয় দেশে। আর পুরনো জাহাজের পণ্যকে ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি ও বিপণনে সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন শহরে গড়ে উঠেছে এসএমই খাতের জাহাজ ভাঙা শিল্পসংশ্লিষ্ট লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ এক বৃহৎ সার্কুলার অর্থনীতি। পুরনো জাহাজের পণ্য সরবরাহ কমে এলেও চাহিদার প্রয়োজনে সমজাতীয় পণ্য তৈরির ছোট ও মাঝারি শিল্প খাত দেশের এসএমই খাতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক গতিশীলতায় ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, একটি জাহাজের জীবনাবসানের মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন এক অর্থনৈতিক চক্র। জাহাজটি ভাঙার পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসে প্রায় ২০-২৫ ধরনের পণ্য ও কাঁচামাল। এসব পণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাজারো ব্যবসা এবং বিশাল এক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত। ফলে সীতাকুণ্ড আজ শুধু দেশের শিপ ব্রেকিং শিল্পের কেন্দ্র নয়, বরং বাংলাদেশের বৃহত্তম সার্কুলার অর্থনীতি ও পুনর্ব্যবহারভিত্তিক শিল্প ক্লাস্টারে পরিণত হয়েছে।
সীতাকুণ্ডের মেসার্স সিফাত ডোর অ্যান্ড ফার্নিচার হাউজের স্বত্বাধিকারী মো. অহিদুল হক বণিক বার্তাকে জানান, পুরনো জাহাজে হাজারেরও বেশি ডোর থাকে। শুরুতে এসব দরজা সংগ্রহ ও বিক্রি করা হলেও এখন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের প্রতিষ্ঠান নিজেরাই কাঁচামাল সংগ্রহ করে প্রস্তুত করছি। জাহাজ ভাঙা শিল্পের দরজাসহ বিভিন্ন আসবাবের চাহিদা বেশি থাকায় অনেকেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কারখানা তৈরি করে ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাহাজভাঙা শিল্প থেকে সরবরাহ কমলেও নিজস্ব কারখানার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। দেশীয় ও বিদেশী নানা সংকটে পুরনো জাহাজের আমদানি কমে সংকট তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে নিজস্ব উৎপাদনই সীতাকুণ্ডের জাহাজকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১৭৭টিরও বেশি এমএসএমই ক্লাস্টার রয়েছে। স্থানীয় সম্পদ, দক্ষতা ও বাজারকে ঘিরে এসব ক্লাস্টারের বিকাশ ঘটেছে। তবে সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ক্লাস্টার অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। এখানে একটি শিল্পকে কেন্দ্র করে অসংখ্য উপখাতের বিকাশ ঘটেছে। জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ড থেকে শুরু করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কারখানা, যন্ত্রাংশ মেরামত কেন্দ্র, দেশের শিল্প অর্থনীতির বিভিন্ন কাঁচামালের সরবরাহ, বাসাবাড়ি ও অফিশিয়াল আসবাব, কারখানা, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কশপ, ধাতু প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান এবং খুচরা বিপণন কেন্দ্রসহ সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে।
সরজমিনে সীতাকুণ্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, একটি জাহাজে লাখ লাখ ফুট বৈদ্যুতিক কেবল থাকে। দেশের কেবল শিল্প বর্তমানে সমৃদ্ধ হলেও জাহাজের ভালোমানের কেবলগুলো কম দামে সরবরাহের ফলে সারা দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পুরনো জাহাজে ভালোমানের এসব কেবল রয়েছে, যা দেশে কিংবা বিশ্ববাজার থেকে সংগ্রহ করতেও অনেক অর্থ ব্যয় করতে হতো। এসব কেবল ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা বড় শিল্প-কারখানার নির্মাণকাজে ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ সাশ্রয় করতে পারছেন ব্যবসায়ীরা। আবার জাহাজের ব্যবহৃত আসবাবকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ড এলাকায় নান্দনিক ডিজাইনের ফার্নিচার তৈরির শিল্প গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাহাজভাঙার পর প্রথমে স্ক্র্যাপ স্টিল, প্লেট ইস্পাত, পাইপ মেশিনারিজ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্যানিটারি পণ্য, কাঠ, তামা, অ্যালুমিনিয়াম পণ্য, প্লাস্টিক, রাবার, রশি ও অন্যান্য উপকরণ আলাদা করা হয়। পরে এগুলো বিভিন্ন খাতে সরবরাহ করা হয় কিংবা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্যে রূপান্তর করা হয়। বিশেষ করে পাইপ ফিটিংসের মতো পণ্য বা কাঁচামাল দেশের বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্প কারখানা তৈরি ও মেরামতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিটি গেট থেকে কুমিরা পর্যন্ত একসময় প্রায় দুই শতাধিক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল। শিপ রিসাইক্লিং শিল্পকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক হাজারেরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মহাসড়কের দুই পাশে সারি সারি মেশিন শপ, স্ক্র্যাপ ইয়ার্ড, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রীর দোকান, আসবাবের কারখানা এবং রিকন্ডিশনিং প্রতিষ্ঠান এখন স্থানীয় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। এ করিডোর দেশের অন্যতম বৃহৎ পুনর্ব্যবহারভিত্তিক শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
দেশের ইস্পাত শিল্পের জন্য শিপ ব্রেকিং শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস। জাহাজ থেকে প্রাপ্ত স্ক্র্যাপা স্টিল ও ব্যবহার অনুপযোগী প্লেট ইস্পাত দেশের বিভিন্ন রোলিং মিলের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব স্ক্র্যাপ গলিয়ে বিলেট ও রড তৈরি করা হয়, যা দেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম ভিত্তি। আবার পুরনো জাহাজের অনেক প্লেট ইস্পাতই সরাসরি না গলিয়ে বিক্রির উপযোগী করা হয় ওয়ার্কশপে। রিকন্ডিশনড প্লেট হিসেবে বিক্রি করা হয়। এসব প্লেট দিয়ে ট্রলার, কার্গো জাহাজ, শিল্প-কারখানার শেড, স্টোরেজ ট্যাংক এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি জাহাজে ব্যবহৃত ইঞ্জিন, জেনারেটর, পাম্প, মোটর, ক্রেন, কম্প্রেসার, বয়লার এবং বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতিরও বিশাল বাজার রয়েছে। এসব যন্ত্রাংশ স্থানীয় ওয়ার্কশপে মেরামত ও রিকন্ডিশনিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জাহাজ নির্মাণ কারখানা, কৃষি ও পরিবহন খাতে এসব যন্ত্রপাতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং শিল্প দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে। আবার একটি জাহাজে শত শত কাঠ, স্টিল ও প্লাস্টিকের দরজা, জানালা, পার্টিশন এবং ক্যাবিনেট থাকে। জাহাজের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত উচ্চমানের কাঠ সংগ্রহ করে নতুন আসবাব তৈরি করা হয়। দরজা, জানালা, আলমারি, টেবিল ও অন্যান্য কাঠজাত পণ্যের জন্য সীতাকুণ্ডের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। স্থানীয় কারিগররা এসব পুরনো উপকরণকে নতুন নকশায় রূপান্তর করে বাজারজাত করছেন।
পুরনো আসবাবের পাশাপাশি স্যানিটারি, সিরামিকস ও স্টেইনলেস স্টিল পণ্যও জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে সারা দেশের বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। জাহাজের আবাসিক অংশে ব্যবহৃত কমোড, বেসিন, বাথটাব, শাওয়ার ইউনিট, টাইলস ও বিভিন্ন সিরামিকস পণ্যেরও উল্লেখযোগ্য বাজার রয়েছে। পাশাপাশি স্টেইনলেস স্টিলের পাইপ, রেলিং, কিচেন ফিটিংস এবং রান্নাঘরের বিভিন্ন সরঞ্জাম পুনরায় ব্যবহার করা হয়। জাহাজ থেকে শুধু ভারী যন্ত্রাংশই নয়, মোটা সামুদ্রিক রশিও দেশের অভ্যন্তরীণ জাহাজ কিংবা মৎস্য শিকারি জাহাজ শিল্পে ব্যবহারের জন্য বিক্রি করা হয়। একইভাবে রাডার, জিপিএস, কম্পাস, রেডিও ট্রান্সমিটার, স্যাটেলাইট যোগাযোগ যন্ত্রসহ বিভিন্ন নেভিগেশন সরঞ্জাম, অগ্নিনিরাপত্তায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম, লাইফবোট দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহারের জন্য চাহিদা রয়েছে।
জানতে চাইলে জাহাজ ভাঙা শিল্প ব্যবসায়ী শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিপ ব্রেকিং শিল্প নানা সংকটের মধ্যেও দেশের শিল্প অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। স্ক্র্যাপ ছাড়াও এখানকার পণ্য ওয়ার্কশপে মেরামত ও ব্যবহার উপযোগী হয়ে কম দামে সরবরাহ হচ্ছে। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পার্টস, পাইপসহ বিভিন্ন পণ্য পুরনো জাহাজ থেকেই আসে। একটি জাহাজ থেকে পাওয়া শত শত পণ্যকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ড অঞ্চলে হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আগে জাহাজ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করলেও এখন অনেকেই ওয়ার্কশ তৈরি করে নিজেরাই সহজলভ্য কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি করছেন। সীতাকুণ্ড পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে।