ব্র্যাক ব্যাংকের এমএসএমই ঋণের ৮৫ শতাংশই দেয়া হয়েছে মর্টগেজ ছাড়া

এখন পর্যন্ত সিএমএসএমই খাতে ব্র্যাক ব্যাংক কী কী সাফল্য অর্জন করেছে? আপনারা আরো কি ভালো করতে পারতেন? আমাদের দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে থাকা ‘‌মিসিং মিডল’ বা মাঝারি স্তরের বঞ্চিত উদ্যোক্তাদের কাছে এ সেবা নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

সে চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকেই ২০০১ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের জন্ম। যাত্রার শুরু থেকে বাংলাদেশে এসএমই ব্যাংকিংয়ের প্রবর্তক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় সহজে ঋণ পাওয়া নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

ব্র্যাক ব্যাংক এখন কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে (সিএমএসএমই) বাংলাদেশের বৃহত্তম মর্টগেজ বিহীন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত আমরা ২০ লাখের বেশি গ্রাহককে ২ লাখ কোটি টাকা সিএমএসএমই ঋণ দিয়েছি। এসব ঋণের ৮৫ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে কোনো মর্টগেজ নেয়া হয়নি। এভাবেই আমরা ২০ লাখ পরিবারের কোটি মানুষের জীবন স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছি, যা আমাদের কাছে সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়েও বড় কিছু। আমরা দেশের প্রতিটি তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তার পরিপূর্ণ ব্যাংকিং ও আর্থিক অংশীদার হতে চাই।

সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে আমরা নানামুখী সেবা দিয়ে থাকি। ‘উদ্যোক্তা ১০১’ ও ‘আমরাই তারা’-এর মতো আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সাফল্য পেতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং দক্ষতা এনে দেয়। পাশাপাশি আমরা উদ্ভাবনী ডিজিটাল লোন প্রডাক্ট যেমন ’সাফল্য’, ’জীবিকা’ ও বৈদেশিক রেমিট্যান্সকে উৎসাহিত করতে ’স্বাবলম্বী’ চালু করেছি।

এসএমই খাতের উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত, আধুনিকায়ন ও উদ্যোক্তা বিকাশের লক্ষ্যে দেশের সর্বপ্রথম ব্যাংক হিসেবে সম্প্রতি ‘‌এসএমই ইনোভেশন ল্যাব’ চালু করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। ফলে আগামী দিনগুলোয় উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন নতুন উদ্ভাবনী সেবা চালু করা সম্ভব হবে।

আগামী পাঁচ বছরে ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই ব্যবসা কোথায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? আপনি এ নিয়ে কতটা আত্মবিশ্বাসী?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী (ইমপ্যাক্টফুল) ব্যাংক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ পথে আমাদের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এসএমই ব্যাংকিং। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৭ শতাংশই এসএমই খাতে। কয়েক বছরে এ এসএমই খাত প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

ব্র্যাক ব্যাংক সবসময় তৃণমূল পর্যায়ের সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের সহজে অর্থায়নের সুযোগ দিতে চায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে আমাদের এসএমই ঋণ পোর্টফোলিও ৩৪ হাজার ৯১১ কোটি টাকা এবং আমানত পোর্টফোলিও ১৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে; যা আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১৪ ও ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। দেশের চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আমাদের এ অর্জন। আমরা আগামী বছরগুলোয়ও এ ধরনের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে চাই। বর্তমানে দেশে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট এসএমই অর্থায়নের ২২ শতাংশই আমাদের, যা আগামী পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

ব্যাংকগুলো ডিজিটাল দিক থেকে অনেক অগ্রসর হয়েছে, কিন্তু এসএমই খাত এ দিক থেকে পিছিয়ে। এসএমই ডিজিটাইজেশন সম্পর্কে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

ব্র্যাক ব্যাংক প্রথমবারের মতো এসএমই খাতেও ডিজিটাইজেশন নিয়ে এসেছে। ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ করতে চালু হয়েছে ডিজিটাল অনবোর্ডিং। এক বছরে ৫০ হাজার এসএমই উদ্যোক্তার অ্যাকাউন্ট ডিজিটালি খোলা হয়েছে। উদ্যোক্তারা এখন আস্থা অ্যাপ ব্যবহার করেই তাদের লেনদেন সম্পন্ন করছেন, যেখানে মোট লেনদেনের ৬৫ শতাংশেরও বেশি এসএমই গ্রাহক করেন। পাশাপাশি বিজ’পে ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং সলিউশন চালু হয়েছে, যা বাল্ক পেমেন্ট, ই-চালান, ইউটিলিটি বিল, এক ক্লিকে বেতন প্রদান এবং বৃহৎ অংকের লেনদেনকে আরো সহজ করেছে। এসএমই ব্যাংকিংয়ের বিকাশে উন্নত প্রযুক্তি অপরিহার্য। ব্র্যাক ব্যাংক এরই মধ্যে ই-ল্যাপ সিস্টেমের মাধ্যমে ডিজিটাল এসএমই ঋণ প্রক্রিয়াকরণ চালু করেছে, যা ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে, উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে এবং ঋণ পাওয়ার সময় কমিয়েছে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য চালু হয়েছে দেশের প্রথম ডকুমেন্ট-লেস রিয়েল-টাইম ডিজিটাল এসএমই ই-ঋণ ‘সাফল্য’ ও ‘জীবিকা’। ফলে অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলা কিউআর সেবা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের কাজ চলছে, যাতে সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা সহজে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারেন। একই সঙ্গে বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের ক্যাশ ক্রাঞ্চ সমস্যা সমাধানে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং প্রডাক্ট আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে।

গত এক বছরে আপনারা কি নতুন কোনো প্রডাক্ট নিয়ে এসেছেন? আগামী পাঁচ বছরে প্রডাক্ট ইনোভেশনে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

গত এক বছরে এসএমই ব্যাংকিং সেবাকে আরো সহজ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে আমরা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের ডিজিটাল লোন প্রোগ্রাম এরই মধ্যে ২৩ হাজারেরও বেশি ব্যাংক-বহির্ভূত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে কাগজবিহীন ই-ঋণ ও জীবিকা ঋণ প্রদান করেছে।

নৌপথ পরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে চালু হয়েছে বিশেষ ঋণ প্রডাক্ট ‘তরঙ্গ’, যা ভেসেল ফাইন্যান্সিংকে ত্বরান্বিত করে দেশের সাপ্লাই চেইনকে আরো সুসংহত করছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতায় এসেছে ‘স্বাবলম্বী’—রেমিট্যান্সভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য রিয়েল-টাইম ঋণ সুবিধা। পাশাপাশি কুটির ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল কালেকশন ও কিউআর কোড পেমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারণ হয়েছে।

আমরা চালু করেছি ডিজিটাল অনবোর্ডিং, যা এসএমই অ্যাকাউন্ট খোলাকে দ্রুত ও সহজ করেছে। এছাড়া বিজ’পে ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং প্লাটফর্ম এসএমই লেনদেনকে আরো ত্বরান্বিত করেছে।

আগামী পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য আরো বড়—আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ডেটা-ভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিংয়ের মাধ্যমে এসএমই ব্যবসায় রূপান্তর। উদ্যোক্তাদের ক্যাশ-ফ্লো ও ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মুহূর্তেই ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণ সম্ভব হবে।

আমরা এগিয়ে যাচ্ছি গ্রিন ফাইন্যান্সিং, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আধুনিক ‘তারা’ পোর্টফোলিও এবং দেশের প্রথম ‘এসএমই ইনোভেশন ল্যাব’-এর মাধ্যমে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিংয়ে নতুন ডিজিটাল সমাধান নিয়ে।

আরও