সবুজ ও স্মার্ট আবাসনকে মধ্যবিত্তের নাগালে আনতে হবে

হাউজিং লোন একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক। ইউনাইটেড ফাইন্যান্সে আমাদের হোম লোনের গড় মেয়াদ প্রায় ১০ বছর। এ সময়ে গ্রাহকের আয়, সুদহার, পারিবারিক প্রয়োজন, এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতিও বদলে যেতে পারে।

দ্রুত নগরায়ণ ও আবাসনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের হাউজিং ফাইন্যান্স বাজারের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের হাউজিং ফাইন্যান্স বাজারকে আমি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখি। দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ এখন শহরে বাস করে। দুই দশকেরও কম সময়ে শহুরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২০২৪ সালে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখে দাঁড়িয়েছে। আইএফসির হিসাবে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু শহরেই সাশ্রয়ী আবাসনের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ ইউনিটে। অথচ আমাদের মর্টগেজ-টু-জিডিপি অনুপাত মাত্র ২ শতাংশের আশপাশে। ভারতে এ অনুপাত ১০-১২ শতাংশ, আর মালয়েশিয়ায় ৩০ শতাংশের বেশি। অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামো যত এগোচ্ছে, মানসম্মত আবাসনের চাহিদাও তত বাড়ছে। উচ্চ সুদহার ও নির্মাণ ব্যয়ের কারণে স্বল্পমেয়াদে বাজারে কিছুটা স্থবিরতা থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আবাসন খাত ও হাউজিং ফাইন্যান্সের চাহিদা বহু বছর ধরে বাড়তেই থাকবে।

জমি ও নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির সময়ে মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন অর্থায়নকে আরো সহজলভ্য এবং টেকসই করতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

হাউজিং লোন একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক। ইউনাইটেড ফাইন্যান্সে আমাদের হোম লোনের গড় মেয়াদ প্রায় ১০ বছর। এ সময়ে গ্রাহকের আয়, সুদহার, পারিবারিক প্রয়োজন, এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতিও বদলে যেতে পারে। তাই এখানে শুধু ঋণ সহজলভ্য করাই যথেষ্ট নয়, ঋণকে ফ্লেক্সিবলও হতে হবে। মধ্যবিত্তের জন্য টেকসই সমাধান হলো এমন পণ্য, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সুদহারের ধরন, মেয়াদ ও কিস্তির পরিকল্পনা বদলানো যায় এবং দরকার হলে টপ-আপ নেয়া বা আগাম পরিশোধ করা যায়। ইউনাইটেড ফাইন্যান্সে আমরা ঠিক এ ফ্লেক্সিবিলিটিগুলোই দিচ্ছি। নীতিগত দিক থেকেও কিছু পদক্ষেপ সহায়ক হবে: নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক করা, দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প খরচের তহবিলের উৎস তৈরি করা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে আয় করা মানুষের জন্য বিকল্প আয় যাচাই পদ্ধতি চালু করা।

দীর্ঘমেয়াদি আবাসন অর্থায়নে সুদহার, কিস্তির সক্ষমতা ও গ্রাহকের ঋণঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা যেতে পারে?

ভারসাম্যের শুরু হয় ঋণ দেয়ার আগেই। আগে যে ফ্লেক্সিবিলিটি কথা বললাম, তা গ্রাহককে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার সুযোগ দেয়। তবে তার আগে ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্টের পর্যায়ে আমরা আবেদনকারীকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি। আমরা কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করি: সম্পত্তির দীর্ঘমেয়াদি মূল্য ও বাজারযোগ্যতা, গ্রাহকের আয়ের স্থায়িত্ব এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সুদহার বা আয়ের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা। সবকিছু যাচাইয়ের পর আমরা এমন ঋণকাঠামো প্রস্তাব করি, যা গ্রাহক পুরো মেয়াদে স্বাচ্ছন্দ্যে বহন করতে পারবেন। কিস্তি সক্ষমতার মধ্যে থাকলে গ্রাহকের ঝুঁকি কমে এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মানও ভালো থাকে। এতে দুই পক্ষই লাভবান হয়।

ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন সম্প্রসারণে হাউজিং ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কী হতে পারে?

এ জায়গায় আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত। জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোয় আবাসনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু পরিকল্পনার ঘাটতিও স্পষ্ট। তাই হাউজিং ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা শুধু অর্থায়নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, আমাদের এ শিল্পের অনুঘটক হিসেবেও কাজ করতে হবে। বাজারকে সচেতন করা, অনুমোদিত নকশা ও সঠিক পরিকল্পনা মেনে নির্মাণে উৎসাহ দেয়া এবং টেকসই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা আমাদের দায়িত্বের অংশ। ঢাকার বাইরের গ্রাহকদের জন্য অর্থায়নও সাজাতে হবে তাদের বাস্তবতা অনুযায়ী। জটিল আইনি বা পরিচালনগত প্রক্রিয়ার চেয়ে গ্রাহকের স্বাচ্ছন্দ্য ও সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব আবাসনকে উৎসাহিত করতে ভবিষ্যতে হাউজিং ফাইন্যান্স খাতে কী ধরনের নতুন অর্থায়ন পণ্য বা সুবিধা চালুর সুযোগ রয়েছে?

এখানে বড় সুযোগ রয়েছে এবং আমাদের অঞ্চলের অনেক দেশ এরই মধ্যে পথ দেখাচ্ছে। ভারতে ইউনিয়ন ব্যাংক ও ব্যাংক অব মহারাষ্ট্রের মতো প্রতিষ্ঠান সনদপ্রাপ্ত সবুজ বাড়ির জন্য সুদহারে ছাড় দিচ্ছে, আর কিছু হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানি সরাসরি ভর্তুকিও দিচ্ছে। ভিয়েতনামে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫৫৯টি প্রকল্প সবুজ সনদ পেয়েছে এবং সেখানে গ্রিন মর্টগেজ চালু আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্স স্কিমেও সনদপ্রাপ্ত সবুজ ভবন অন্তর্ভুক্ত। এ ভিত্তির ওপর আমরা কয়েকটি পণ্য চালু করতে পারি:

সনদপ্রাপ্ত সবুজ বাড়ির জন্য কম সুদের ‘গ্রিন হোম লোন’

সোলার প্যানেল, রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ও জ্বালানিসাশ্রয়ী সংস্কারের জন্য টপ-আপ ঋণ

ডেভেলপারদের জন্য সবুজ নির্মাণ অর্থায়নের

পাশাপাশি গ্রিন বন্ড এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার স্বল্প খরচের তহবিল কাজে লাগালে স্মার্ট ও সবুজ আবাসন মধ্যবিত্তের নাগালে আনা সম্ভব।

আরও