প্রবাসী বাংলাদেশীদের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার এ সময়োপযোগী উদ্যোগের জন্য শুরুতেই ‘দৈনিক বণিক বার্তা’কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। দ্বিতীয়বারের মতো এ আয়োজন করা হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও দূরদর্শী উদ্যোগ।
আমাদের প্রবাসী ভাইবোনেরা বাংলাদেশের অর্থনীতির এক বিশাল শক্তি। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ডে ও বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত ভিডিওটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় বা বাণিজ্যকেন্দ্রিক নয়, এর সঙ্গে গভীর মানবিক সম্পর্কও জড়িয়ে আছে। দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব এ সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করেছে।
প্রবাসীদের কল্যাণ, নিরাপদ অভিবাসন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বচ্ছ ও ঝুঁকিমুক্ত অভিবাসন, প্রবাসী কার্ড চালু, বিদেশে বিপদগ্রস্ত কর্মীদের সহায়তা ও প্রবাসী সেবা সহজীকরণে কাজ চলছে। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশীদের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং তাদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার বাংলাদেশী সিঙ্গাপুরে নির্মাণ, মেরিন, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করছেন। আপনাদের কঠোর পরিশ্রম একদিকে যেমন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির ভিতও শক্ত করছে। এ অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসীদের পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আজ যারা সম্মাননা পাচ্ছেন, তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। তবে আমার দৃষ্টিতে সিঙ্গাপুরে কর্মরত প্রতিটি সৎ, পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও আইন মেনে চলা বাংলাদেশীই একজন সম্মানিত ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’। আপনারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার অংশীদার। দেশের বাইরে থেকেও আপনারা যে দায়িত্ব ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের জনশক্তি ও কর্মসংস্থান সহযোগিতা এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মীদের পুনর্নিয়োগ, আন্তঃপ্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতার পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশী কর্মীরা যাতে আরো ভালো ও উচ্চতর দায়িত্বের সুযোগ পান, সে বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।
একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং স্বচ্ছ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। বর্তমানে সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে অনেক বাংলাদেশীকে বিদেশ যেতে ১০-১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। অথচ অনেক দেশ থেকে ৩ লাখ টাকার কম খরচে বিদেশে যাওয়া সম্ভব। সরকারের লক্ষ্য অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনা। ফলে বিদেশে যেতে আগ্রহী মানুষ যেমন প্রতারণার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে, তেমনি পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও কমবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো একটি ডেডিকেটেড ‘মাইগ্রেশন উইং’ চালু করেছে। একজন ডেডিকেটেড ডিজি ও বিশেষ টিম প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপও গঠন করা হয়েছে, যাতে প্রবাসীদের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায়। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে আরো যুগোপযোগী করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুনে সিঙ্গাপুরে তিনটি প্রতিষ্ঠান ৪০০-এর বেশি অভিবাসী কর্মীর কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রেখে দেউলিয়া হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ২০০-এর বেশি বাংলাদেশী ছিলেন। বাংলাদেশ হাই কমিশন সিঙ্গাপুরের মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এরই মধ্যে প্রায় ২০০ কর্মীর পুনরায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। অবশিষ্টদের বিষয়েও প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ মানবিক ও দ্রুত সহযোগিতার জন্য সিঙ্গাপুর সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
প্রবাসী ভাইবোনদের কাছে আমার পাঁচটি অনুরোধ—বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাবেন এবং হুন্ডি থেকে দূরে থাকবেন, সিঙ্গাপুরের আইন ও কর্মসংস্কৃতিকে সম্মান করবেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ করবেন, সব ধর্ম ও ভাষার মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সম্প্রীতি বজায় রাখবেন এবং নতুন প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের আরো দক্ষ করে তুলবেন। মনে রাখতে হবে, একজন বাংলাদেশীর ভালো আচরণ ও সাফল্য বিদেশের মাটিতে পুরো দেশের ভাবমূর্তিকে তুলে ধরে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হাই কমিশনের দরজা আপনাদের জন্য সবসময় খোলা। আমরা এমন একটি ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি থাকবে না। আপনারা শুধু রেমিট্যান্স পাঠাবেন না, দেশে বিনিয়োগ করবেন, উদ্যোক্তা হবেন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আপনাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সঞ্চয় দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ হলে এর সুফল আরো বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে।
আজকের আয়োজনের জন্য দৈনিক বণিক বার্তা, বাংলাদেশ হাই কমিশন, ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজের প্রতিনিধিসহ উপস্থিত সব প্রবাসী বাংলাদেশীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের শ্রম, ত্যাগ ও অবদানের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আপনাদের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করছি। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় আপনাদের অবদান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এ প্রত্যাশা রাখছি।