শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পদ্ধতির পরিবর্তন করতে হবে

শিক্ষায় অগ্রগতি মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আমার একটা মিশ্র মূল্যায়ন রয়েছে। একেবারেই যে কিছু হয়নি, তা নয়। কিছু কাজ হয়েছে। আমরা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছি ৭-৮টি।

স্বাধীনতার পর অর্ধশতকের বেশি সময়ে আমাদের শিক্ষা খাত কতটা এগিয়েছে?

শিক্ষায় অগ্রগতি মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আমার একটা মিশ্র মূল্যায়ন রয়েছে। একেবারেই যে কিছু হয়নি, তা নয়। কিছু কাজ হয়েছে। আমরা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছি ৭-৮টি। কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখিনি। এর মধ্যে ২০১০ সালের কিছু নীতি হয়েছে। তবে তার বাস্তবায়নও ঠিকমতো হয়নি। আমরা পাঠ্যপুস্তকে এর প্রমাণ দেখেছি। যতগুলো অসংগতি আছে তার অন্যতম হলো ইতিহাস অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন বা ইতিহাস বিকৃতিও বলা যেতে পারে। এখানে যে ব্যাপারটি আসে যে শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা যে অর্ধডজনের বেশি কমিশন গঠন করেছি। নীতিমালা একবারই হয়েছে। প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার সঙ্গে প্রয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই। এ ধরনের বিচ্যুতিগুলো শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের প্রধান অন্তরায়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদেশের অনেকগুলো ব্যাপার যা চর্চিত হচ্ছে তা নিতে পারছি না। যেমন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর রেশিও এবং বেতন। সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা। এর কারণ শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেট। অন্যান্য দেশে মোট জিডিপির ৬ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা সবসময় ২-এর আশপাশে। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে কমিশন হলেও নীতিমালা নেই, নীতিমালা হলেও প্রয়োগ নেই।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?

আমি আপনার প্রথম প্রশ্নটিতে যাচ্ছি না। কিন্তু আমি বলতে চাই মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের দুটি বাধা রয়েছে। একটি উপযুক্ত প্রার্থী তৈরি বা সাপ্লাই চেইনের যে ব্যাপারটা। আরেকটি হলো অসম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রথমটি হচ্ছে আমাদের যে সিস্টেম তাতে উপযুক্ত প্রার্থী তৈরি হচ্ছে না। এদিকে নিয়োগ ঘাটতির কারণে আমরা একজনকে হয় লিখিত না হয় মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছি। এখানে ডেমোনেস্ট্রেশনসহ অন্য বিষয়গুলো দেখছি না। এর মানে আমাদের আপস করতে হচ্ছে। আপসটা করতে হচ্ছে কোথায়, দল বিবেচনায় বা আর্থিক কারণে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস মেধার ক্ষেত্রে আপস করা হচ্ছে। আমাদের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পদ্ধতির পরিবর্তন করতে হবে। একই সঙ্গে যোগ্য প্রার্থী তৈরিতেও জোর দিতে হবে। একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এখানে জরুরি।

ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের আলাপটি কয়েক বছর ধরে জোরদারভাবে উঠে আসছে। বলা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের কথা...

এখানে সবচেয়ে বড় ব্যাপার আমাদের লক্ষ্যটা কী? এটা আমার আগের উত্তরগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একাডেমিয়ার যে সম্পর্ক সেটা একটা সদিচ্ছার ব্যাপার। প্রথমত, গ্র্যাজুয়েটদের দেশের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করতে পারছি কিনা, আরেকটি ব্যাপার হলো তৈরি করতে দিচ্ছি কিনা। আমরা দেখতে পাচ্ছি এখানে একটা সমন্বয়হীনতা। দেশে এত বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও প্রতিবেশী দেশের কয়েক লাখ বিদেশী এসে এখানে কাজ করে। তাহলে আমাদের কি সক্ষমতা নেই। আসলে যেটা দরকার পরিকল্পনাহীনতা ও সদিচ্ছার অভাব। আমরা সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত যে হায়ার এডুকেশন কনক্লেভ করেছিল সেখানে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মাঝে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা নীতি পর্যায়ে ইনকরপোরেট করে বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা চালু করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ব্যাপ্তি ও মান উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আগ্রহের ঘাটতির কথাটিও শোনা যাচ্ছে। পরিস্থিতি বদলাতে কী করা যেতে পারে? আপনারা গবেষণাকে কতটা মনোযোগ দিচ্ছেন?

গবেষণার প্রতি আগ্রহটা আসে যখন একজন গবেষক তার গবেষণার জন্য সামাজিকভাবে মর্যাদা পান, তার পদোন্নতিতে কাজে লাগে। যদি এতে তার কোনো ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। এটি তার জন্য এক ধরনের প্রণোদনা। কিন্তু আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখি গবেষণার চেয়ে দলীয় বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য আগ্রহ পায় কম। ফলে আমাদের নীতি পর্যায়ে এবং অভিপ্রায়গত জায়গায় একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর এক্ষেত্রে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়িয়েছে। আরেকটা হলো যে গবেষকদের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অনলাইন অ্যাকসেস বাড়ানো। এরই মধে আমরা অটোমেশনের দিকে যাচ্ছি, যাতে একজন শিক্ষককে আরেকটি বিভাগের জার্নালের জন্য ইন-পারসন/সশরীর যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। এতে একই সঙ্গে লিটারেচার রিভিউয়ের মতো কাজ সহজ করবে, আবার র‍্যাংকিংয়েও ভূমিকা রাখতে পারবে। এর পাশাপাশি এটি প্লেজারিজম চেক করার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে।

যেসব প্যারামিটার বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখে সেগুলোয় আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

র‍্যাংকিংয়ে যেসব প্যারামিটার গুরুত্বপূর্ণ সেসব প্যারামিটার নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত থেকে আবাসন ব্যবস্থা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, গবেষণার বাজেট বৃদ্ধি এসব নিয়ে কাজ চলমান। গবেষণা ও জ্ঞান চর্চার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটিও যদি কোনো র‍্যাংকিংয়ে প্যারামিটার হিসেবে কাজ করে তাহলে সেখানেও আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে। গবেষণা ও গবেষক দুটোর জন্যই প্রাকৃতিক পরিবেশ জরুরি। সেজন্য এটাকেও আমলে নেয়া দরকার বলে মনে করি।

বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?

এখানে মূল সংকটটা আমাদের কারিকুলামে। আপনি দেখবেন যে অনেক দেশ আছে যাদের কারিকুলামটা আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু আমরা এখানেই পিছিয়ে আছি। তাদের কারিকুলামে এমপ্লয়াবিলিটিটা গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে যাতে প্রতিযোগিতা করতে পারে এমনভাবে সাজানো হয়। এ জায়গা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কারিকুলামগুলো রিডিজাইন করা দরকার। সামনের দিনে আমরা পারব বলে মনে করি।

আরও