মানবসম্পদের উন্নয়ন হয় এমন সব প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নিয়েছি

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর সংসদের আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালে উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্ছিত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে তোলা।

তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থী সংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেশের সর্বস্তরে শিক্ষা বিস্তারে বিশ্ববিদ্যালয়টি কীভাবে ভূমিকা পালন করছে?

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর সংসদের আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালে উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্ছিত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে তোলা। অদক্ষ বা অর্ধদক্ষ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তোলা বা দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে মানব সম্পদে পরিণত করা। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এখানে এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স, মাস্টার্স, পিএইচডি ডিগ্রিসহ অন্যান্য প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছে। সুতরাং আমাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করা। সে ব্রত নিয়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নয়; বরং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন মানবগোষ্ঠী তৈরিতে প্রতিনিয়ত ভূমিকা রেখে চলছে।

একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়টি কতটুকু সফল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

এটি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার। যে পরিমাণ ভূমিকা রাখার জন্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ৩২ বছরে সে পরিমাণ ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রতিষ্ঠার যে মিশন ও ভিশন ছিল, একপর্যায়ে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কেননা, শুরুর দিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মিশন ও ভিশনকে অনুসরণ করলেও গত সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কয়েকজন কর্তাব্যক্তি লক্ষ্যচ্যুত হন। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে থেকে দূরে সরে যায়।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কত? ৩২ বছরের হিসাবে শিক্ষার্থী সংখ্যায় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?

বর্তমানে আমাদের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো বেশি ছিল। পরে কমে গেছে। কারণ প্রতিষ্ঠাকালে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা সেবা দেয়ার যেসব উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ বিভিন্ন কারণে ঝরে পড়া বয়স্ক শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলা। ফলে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত ছিল, কারো জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক বন্ধ ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট) পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করায় নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর পক্ষে নবম শ্রেণীতে ভর্তির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় ওভার মার্কিংসহ নানাবিধ কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমতে থাকে।

শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

বর্তমানে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন প্রমোশনার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। দেশব্যাপী ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র ও ৮০টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। অসংখ্য স্টাডি সেন্টার রয়েছে। আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর এ কয়েক দিনে অধিকাংশ কেন্দ্র পরিদর্শন করে সেগুলোকে সক্রিয় করা হয়েছে। এছাড়া মানবসম্পদের উন্নয়ন হয় এমন সব প্রোগ্রাম আমরা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি, যেন শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হয়। এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কারিগরি, ভোকেশনাল, সফট স্কিল-সংক্রান্ত বিভিন্ন কোর্স চালু করার উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সাড়াও পেয়েছি।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে সাতটি একাডেমিক অনুষদ বা স্কুল এবং ১১টি প্রশাসনিক বিভাগ। এগুলোর মধ্যে কোন কোন বিভাগ ও অনুষদের প্রতি জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের চাহিদা বেশি?

কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের আওতায় বিএ ও বিএসএস অনুষদের বিভাগগুলোয় শিক্ষার্থীদের চাহিদা বেশি। কেননা আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরকারি-বেসরকারি চাকরিরত। তাই পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি তারা এ বিষয়গুলোয় ডিগ্রি অর্জনে বেশি আগ্রহী।

বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে অবস্থানের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। সে বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্কুল তথা অনুষদের অধীনে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও আমাদের পিএইচডি কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি নেয়া হয়েছে। এর বাইরে আমাদের শিক্ষকরাও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বমানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মতো অবকাঠামোগত ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা আমাদের নেই। তবে আমাদের সাধ্যমতো যতটুকু সম্ভব গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে নিতে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর এসব বিষয় মাথায় রেখে কাজ করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা উচ্চ শিক্ষা সেল গঠন করে সেখানে সেন্টার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা চাকরি বাজারে বা কর্মক্ষেত্রে কেমন প্রভাব রাখছে?

এ একটি জায়গায় আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের শিক্ষার্থীদের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় চাকরির বাজারে ভালো করতে না পারা খুব স্বাভাবিক। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। কেননা এরই মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োজিতরা কাজের পাশাপাশি উচ্চতর ডিগ্রি ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করছে। ফলে তাদের পদোন্নতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা মানসম্মত শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আপনি সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ একজন মানুষ। গত ১৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আপনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন দিকের উন্নয়ন সাধন জরুরি বলে আপনার মনে হচ্ছে?

গত দেড় দশক আমরা অনেক প্রতিকূল পরিবেশে বসবাস করেছি। এ সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। একটি জাতিকে পিছিয়ে রাখতে হলে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করাই যথেষ্ট, যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। বিগত সময়ে আমরা জিপিএ-৫ দেয়ার প্রতিযোগিতা দেখেছি। সবাইকে গণহারে পাস করানোর মাধ্যমে কৃতিত্ব নেয়ার চিত্র দেখেছি। অনেক বাবা শঙ্কায় ছিল যে তাদের সন্তানরা সঠিক শিক্ষা পাবেন কিনা! অনেকে সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে না পড়িয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে নিয়ে যেত। সে প্রেক্ষপটে ৫ আগস্ট ঘটেছে। আমরা নতুন করে স্বাধীনতা পেয়েছি। ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে উদ্ধার করার দায়িত্ব পেয়েছি। আমি কতটুকু দায়িত্ব পালনে সক্ষম হব জানি না। তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। আমার সাংগঠনিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানো, শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো, গবেষণায় গুরুত্ব দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নতি সাধন করব। দূর শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করব, যার অংশ হিসেবে সংসদ টিভির সঙ্গে এরই মধ্যে আমরা সমঝোতার পরিকল্পনা করছি। এভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে নতুন করে বিনির্মাণে আমরা ভূমিকা রাখতে চাই।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুর রহমান

আরও