আমাদের শিক্ষা খাতকে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিশেষত উচ্চ শিক্ষাকে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি লাভ করেছে। এ সময়ে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারের একটি ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যায়। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয়ে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষায় আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে পারিনি। ২০২৫ সালে এসে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস ও পাঠদানের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে গবেষণার ক্ষেত্রে সব বিশ্ববিদ্যালয় সমানতালে এগোতে পারছে না। এরই মধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিঃসন্দেহে গবেষণায় ব্যাপক কাজ করছে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণার পরিমাণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও মান বৃদ্ধির জন্য যে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্তভাবে হয়নি। তবে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় এসব লক্ষ্য অনেকাংশে পূরণ করতে পেরেছে। আমাদের আগের স্লোগান ছিল ‘সাশ্রয়ী টিউশন ফিতে মানসম্পন্ন শিক্ষা’। আর এ সাশ্রয়ী ফিতেই প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজেদের শিক্ষাজীবন শেষ করেছে।
সময়ের চাহিদায় গবেষণাকে আমরা এখন অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। সেই জায়গায় কাজ করার জন্য আমরা বর্তমানে ‘উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষ’—এ স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা গবেষণাকে উৎসাহিত করতে শিক্ষকদের রিওয়ার্ড দেয়ার ব্যবস্থাও রেখেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে কী করণীয়?
মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব। এখানে শিক্ষার্থীরা সহজেই শিক্ষকের কাছে যেতে পারে, শিক্ষকরা সহজেই ম্যানেজমেন্টের কাছে আসতে পারেন। আমাদের টিম স্পিরিটটা অনেক ভালো, যার ফলে যেকোনো কাজে হাত দিলে সফলতা আসছে। অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এদিক দিয়ে আমরা বিশেষত্ব দাবি করতে পারি। সম্প্রতি বিদেশী ডিগ্রিধারী অনেক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে, তারা গবেষণার কাজও করছেন। শিক্ষক নিয়োগের পর নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান থাকে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মশালা, সেমিনার ও গবেষণা সহযোগিতা প্রদান করা হয় যাতে তারা বৈশ্বিক মানের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।
ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?
ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন বর্তমানে অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞানকে ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে দক্ষতায় রূপান্তর করতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে এ বিষয়ে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিংয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। আমাদের এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিস শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও জব করার সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
সম্প্রতি আমরা এইচআর সামিট আয়োজন করেছি, যেখানে বাংলাদেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের এইচআররা অংশগ্রহণ করেছেন। ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে আমরা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা জেনে কারিকুলাম ডেভেলপের চেষ্টা করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ব্যাপ্তি ও মান উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আগ্রহের ঘাটতির কথাটিও শোনা যাচ্ছে। এটা কতটা সত্য?
গবেষণার মানোন্নয়ন ও প্রসারের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলেও আগ্রহের ঘাটতিও সমানভাবে প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহ কম থাকার মূল কারণ গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব। তবে আমাদের প্রতিষ্ঠানে গবেষণাকে উৎসাহিত করতে অভ্যন্তরীণ গবেষণা তহবিল গঠন, মানসম্মত গবেষণার জন্য ইনসেনটিভ প্রদান ও গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশে সহায়তা করা হচ্ছে। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে রয়েছে। এখন তারা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় রাখছে। সরকারি চাকরি, মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানসহ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের শিক্ষার্থী রয়েছে। আমাদের প্রচুর শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হিসেবেও সমাজকে সেবা দিচ্ছে। আমি মনে করি, এটা আমাদের অনেক বড় অর্জন।
যেসব প্যারামিটার বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখে সেগুলোয় আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?
বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জন করা মানে শুধু গৌরবের নয়, বরং এটা শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়নকেও নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান পেতে নির্দিষ্ট কিছু প্যারামিটারে কাজ করা প্রয়োজন, যেমন গবেষণা প্রকাশনা, ইন্টারন্যাশনালাইজেশন, ইন্ডাস্ট্রি লিংকেজ ও সামাজিক প্রভাব। আমরা এ বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দিচ্ছি এবং নিয়মিতভাবে কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছি। নতুন ক্যাম্পাসে আসার পর অত্যাধুনিক ক্লাসরুম ও ল্যাব সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের বিশাল সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, বিভিন্ন প্রোগ্রাম আয়োজনের জন্য মাল্টিপারপাস হল, খেলাধুলার জন্য মাঠ, সেমিনার-ট্রেনিং-প্রোগ্রাম-খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য যা দরকার, সবই পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। মানসম্মত ক্যান্টিনে সুলভে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য।
এছাড়া ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংস ফর ইনোভেশনে (ডব্লিউইউআরআই) স্থান পেয়েছে। এ র্যাংকিংয়ে বিশ্বের ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ২৭৬তম। রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনটি ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে উত্তরা ইউনিভার্সিটি। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ ইউনিভার্সিটির মধ্যে উরি র্যাংকিংয়ে স্টুডেন্ট সাপোর্ট অ্যান্ড এনগেজমেন্টে ওয়ার্ল্ড ক্যাটাগরিতে ১২তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের উত্তরা ইউনিভার্সিটি। এই ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের মধ্যে উত্তরা ইউনিভার্সিটির অবস্থান প্রথম। উরি র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ১০০ ইউনিভার্সিটির মধ্যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও টেকনোলজি ক্যাটাগরিতে উত্তরা ইউনিভার্সিটি আছে ২২তম অবস্থানে।
বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?
পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে খেলাধুলা, ডিবেট, সামাজিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও জোর দেয়া হয়। আমাদের একটি হিউম্যানিটিজ ল্যাব আছে, যেখানে গেলে যেকোনো মানুষের মন ভালো হয়ে যাবে অল্প সময়েই। এছাড়া ফুল টাইম কাউন্সেলিং করার জন্য কাউন্সিলর ও স্টাফ আছেন, যারা শিক্ষার্থীদের সাপোর্ট দিয়ে থাকেন। বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরা ব্র্যান্ড হিসেবে তৈরি হতে পারেনি—বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্য নয়। এরই মধ্যে আমাদের অনেক গ্র্যাজুয়েট আন্তর্জাতিক খ্যাতিমানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে যে হারে জব পাওয়ার কথা সে সংখ্যাটা তুলনামূলক কম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্স চালু করা হয়েছে ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে।