প্রাইম ব্যাংক কতটা টেকসই?
ব্যাংক খাত সামগ্রিকভাবে একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এর মধ্যেও কিছু ব্যাংক তুলনামূলকভাবে ভালো করছে এবং সুনামের সঙ্গে লাভজনক অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রাইম ব্যাংকে গভর্ন্যান্সের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা উভয় পর্যায়ে সহযোগিতামূলক গভর্ন্যান্স থাকলে অনেক কিছুই সঠিকভাবে করা সম্ভব হয়। বিপরীতে নিয়মনীতি মানার বিষয়ে শৈথিল্য থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
দেশের ব্যাংক খাতে যে অনিয়ম ঘটেছে, তার বড় অংশই এসেছে অবৈধ চাপের কারণে। অথচ আপনি বলছেন, স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
প্রাইম ব্যাংক একটি ৩০ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠান। বহু ঝড়ঝঞ্ঝা পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে আলোচনায়ও ছিল। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত একটি বড় সংস্কারের মধ্য দিয়েও গেছে। ওই কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতাই ব্যাংকের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে এসেছে। গ্রাহক নির্বাচন থেকে শুরু করে ঋণ মনিটরিংসহ সব ক্ষেত্রেই আগের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগানো হয়েছে। ব্যাংকের ছয়টি মৌলিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সূচকে আমরা সন্তোষজনক অবস্থানে রেটিং ধরে রেখেছি। অর্থ পাচার প্রতিরোধ (এএমএল) সূচকেও আমাদের অবস্থান ভালো। এসব অর্জন একদিনে হয় না—প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হয়। পর্ষদ সভায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রতি প্রান্তিকের ঝুঁকি পরিস্থিতি ও রেটিং মনিটরিং প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। কর্তৃপক্ষের দিক থেকে সহযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাও তুলনামূলক সহজ হয়।
আমরা সাফল্যের এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই। শুধু মুনাফা অর্জনই আমাদের লক্ষ্য নয়, বরং এ অর্জনকে টেকসই করাই আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা মুনাফার পাশাপাশি স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধিকেও গুরুত্ব দিয়ে থাকি। গভর্ন্যান্স, প্রক্রিয়া ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক উন্নতি থাকলেই একটি ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক খাত যে সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে সব ব্যাংকেরই এসব বিষয়ের ওপর আরো গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করি।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেকোনো ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) সাড়ে ১২ শতাংশ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। অথচ ব্যাংক খাতের গড় মাত্র ৩%। প্রাইম ব্যাংকের অবস্থান কেমন?
কোনো ব্যাংকের সিএআর ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে ব্যাংকটি মূলধন সংকটে আছে বলে ধরা হয়। গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী প্রাইম ব্যাংকের সিএআর ছিল ১৮ শতাংশেরও বেশি, যা দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই সঠিক নিয়মে সিএআর বজায় রেখে চলেছি। প্রতি বছরের মুনাফার একটি অংশ রিজার্ভে সংরক্ষণ করা হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মূলধন পর্যাপ্ততায়। প্রাইম ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মূলধন ব্যবস্থাপনায় সবসময় সতর্ক থাকে। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা ও যথাযথ বাস্তবায়নের ফলে তারল্য বা আর্থিক চাপে পড়তে হয় না।
শুরু থেকে প্রাইম ব্যাংক করপোরেট ফোকাসড ছিল। এখনো কি তা-ই আছে? এ মুহূর্তে আপনাদের ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর বৈচিত্র্য কেমন?
বর্তমানে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৮০ শতাংশ করপোরেট। ২০২৬ সাল থেকে বড় পরিসরে কনজিউমার ও সিএমএসএমই ব্যাংকিংয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি, যার জন্য কাঠামো, নীতি ও জনবল এরই মধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এ খাতে আমরা বিনিয়োগ বাড়াতে চাই। চলতি বছরে আমরা পরিকল্পিতভাবে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে খুব বেশি জোর দিইনি, বরং কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এক্সপোজার কমিয়ে এনেছি।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এক্ষেত্রে প্রাইম ব্যাংকের অবস্থান কী?
চার-পাঁচ বছর ধরে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সাড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে ছিল। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে গত বছরের শেষদিকে এটি সাময়িকভাবে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে ওঠে। তবে বর্তমানে তা কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা আশা করছি, ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ এটি ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে রিকভারি, মনিটরিং ও রাইট অফ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন করে এনপিএল তৈরি না হওয়া ও শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় উভয় দিক নিয়েই আমরা কাজ করেছি। রাইট অফ করতে হলে যে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে, সেটা আমরা আগে থেকেই মেইনটেইন করেছি। শুধু লাভজনক অবস্থান নয়, কমপ্লায়েন্স, গভর্ন্যান্স ও প্রক্রিয়া অনুসরণ—সব জায়গায়ই প্রথম সারিতে থাকতে চাই আমরা।
বর্তমান সুদহার কাঠামো এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে প্রাইম ব্যাংক কীভাবে ঝুঁকি ভারসাম্য রক্ষা করছে?
দুই বছর আগের তুলনায় এখন ব্যাংক খাতে সুদহার অনেক বেশি, এটা সত্য। এখানে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আছে। কিন্তু আমাদের ভারসাম্য রক্ষার বড় জায়গা হচ্ছে ব্যাংকের সুনাম। একটা সময় মানুষ আধা শতাংশ বেশি মুনাফার আশায়ই ভিন্ন ব্যাংকে আমানত সরিয়ে নিত। কিন্তু একীভূতকরণসহ কিছু ব্যাংকের নানা অনিয়মের কারণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষ তুলনামূলক কম মুনাফা হলেও নিরাপদ ব্যাংকে টাকা রাখতে চাচ্ছে। এর সুফল আমরা পেয়েছি। চলতি বছরে আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৮-২০ শতাংশ। গত বছরের ৩৬ হাজার কোটি টাকা থেকে আমানত এখন প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আমরা সবসময় কম সুদের কিন্তু স্থিতিশীল আমানতের ওপর জোর দিয়েছি, যার ফলে ঋণের সুদহারও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। বাজারে যেখানে ১৩-১৪ শতাংশে ঋণ দিচ্ছে, সেখানে আমাদের গড় সুদহার ১২ বা এর কাছাকাছি।
প্রাইম ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের পরিস্থিতি কেমন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা মুলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু খাতে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করে থাকি। নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি আমরা ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমেও সিএসআর অর্থ ব্যয় করে থাকি। আমরা প্রতি বছর নিট মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সিএসআরের জন্য বরাদ্দ রাখি। বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা জলবায়ু কার্যক্রমে জোর দিয়েছি। আমরা স্কুল ও হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোলার প্রজেক্টে গিয়েছি। ২০২৬ সালেও একটি বড় ক্লাইমেট প্রজেক্ট করার পরিকল্পনা আছে। আমরা সিএসআরকে কেবল প্রচারের মাধ্যম হিসেবে দেখি না। আমাদের বিশ্বাস, সিএসআরের ক্ষেত্রে প্রচারের চেয়ে কার্যকারিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রভাব তৈরি করাটাই আমাদের লক্ষ্য।
সবুজ ফাইন্যান্স বা টেকসই বিনিয়োগে ব্যাংকের ভূমিকা কতটা বাড়াতে চাইছেন?
গ্রিন ফাইন্যান্স ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স নিয়ে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সদিচ্ছা আছে। তবে বাস্তবতায় যে গতিতে এগোনো দরকার, সে গতিতে এগোচ্ছে না। সচেতনতার ঘাটতি এখনো আছে। ধরুন আমরা যখন গ্রাহকদের এনার্জি-এফিশিয়েন্ট মেশিন ব্যবহার করতে কিংবা গ্রিন বিল্ডিং কনসেপ্টে যেতে বলি, তখন শুরুতে খরচ একটু বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে লাভ যে অনেক বেশি—এ সচেতনতা তৈরি করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবু আমরা চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী গ্রিন প্রজেক্টে অর্থায়ন করছি এবং রেটিংয়ের দিক থেকেও আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো অবস্থানে আছি।
প্রাইম ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
প্রাইম ব্যাংকের লক্ষ্য হলো নিজেকে একটি শক্তিশালী, কমপ্লায়েন্ট ও টেকসই ব্যাংক হিসেবে আরো সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। ডিজিটালাইজেশন, এসএমই ও কনজিউমার ব্যাংকিংয়ে আমাদের উদ্যোগগুলো আগামী দিনে আরো দৃশ্যমান হবে। সুনাম অর্জনের চেয়ে সেটিকে ধরে রাখা অনেক কঠিন—আর সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে চলেছি।