কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এমএসএমই খাত কী ভূমিকা রাখতে পারে?
বড় আকারের বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এমএসএমই খাতে বাড়তি মনোযোগ ও সহায়তা প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। এ খাতে দুই কোটির বেশি জনবল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মরত। এর মধ্যে শুধু নারী উদ্যোক্তা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮৪ লাখ মানুষ কাজ করেন। এ থেকে বোঝা যায়, এ খাত গ্রাম ও শহর উভয় এলাকায় নারী ও যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অর্থায়ন সংকট, ব্যবসায়িক নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়ার ঝামেলা আর বাজারে প্রবেশের সীমিত সুযোগ এখনো বড় বাধা। তবে ২০২৫-২৬ বাজেটে এ খাতের জন্য কিছু ভালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তা যদি ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়, তাহলে এ খাত আরো শক্তিশালী হবে। এছাড়া সহজ শর্তে ঋণ, নারী ও যুবদের জন্য বিশেষ স্কিম, স্টার্ট-আপ তহবিল আর ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মতো উদ্যোগ দরকার। এসএমই ফাউন্ডেশনের ১৪০টি নীতি বাস্তবায়ন এবং ব্যবসায়িক নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করলে এ খাত আরো গতি পাবে।
এমএসএমই খাতের অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক বিনিয়োগ সুবিধার বাইরে আছেন। তাদের জন্য বিনিয়োগের সুবিধা নিশ্চিত করতে আপনাদের ভাবনা বা উদ্যোগ কেমন?
ইসলামী ব্যাংক এসএমই উদ্যোক্তাদের আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং ব্যবসার সম্ভাবনা বাড়াতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। এসএমই বিনিয়োগকে উৎসাহ দিতে বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ করা হয়েছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ একাডেমির (আইবিটিআরএ) মাধ্যমে উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হয়। যেখানে নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এ প্রোগ্রামগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এছাড়া সারা দেশে উন্নত ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে এমএসএমই খাতের। বাংলাদেশেও কীভাবে এমএসএমই খাতকে আরো বেশি রফতানি আয়ের অংশীদার করতে পারে?
এমএসএমই খাতকে রফতানি আয়ের বড় অংশীদার করতে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের কৌশল থেকে শিক্ষা নিয়ে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। বর্তমানে আমাদের রফতানির বেশির ভাগ তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল, তবে এমএসএমই খাতকে আরো রফতানিমুখী করলে অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী হবে। রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ ও বাণিজ্য চুক্তি জোরদার করা প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কৃষিজাত পণ্য ও হিমায়িত খাদ্য রফতানির বাজার সম্প্রসারণের জন্য নতুন চুক্তি করা যেতে পারে। পাট, চামড়া ও হস্তশিল্পের জন্য ক্লাস্টার তৈরি করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ সাভারের চামড়া শিল্প ক্লাস্টারকে রফতানিমুখী করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে।
উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে আপনাদের এজেন্ট, উপশাখা বা শাখা কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে ৪০০টি শাখা, ২৬৫টি উপশাখা ও ২ হাজার ৭৮৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট। ব্যাংকিং সেক্টরে এসএমই খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী ব্যাংক হিসেবে এ খাতে আমাদের বিনিয়োগ প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট সিএমএসএমই বিনিয়োগের প্রায় ১১ দশমকি ৫ শতাংশ। উৎপাদন, উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ব্যাংক বিনিয়োগের প্রধান অগ্রাধিকার, যেখানে সিএমএসএমই খাত আমাদের প্রধান ফোকাস। বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সুবিধা দিয়ে যাচ্ছি। শাখা ও উপশাখাগুলো জেলা ও উপজেলায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে সহজ শর্তে বিনিয়োগ করছে। ক্লাস্টারভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এমএসএমই খাতের কোন ধরনের পণ্যকে আপনারা সম্ভাবনাময় মনে করেন?
এমএসএমই খাতে পাটজাত পণ্য, হস্তশিল্প, কৃষিজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবা বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। পাটজাত পণ্য যেমন ব্যাগ, পর্দা, প্যাকেজিং উপকরণ ইত্যাদি পরিবেশবান্ধব পণ্য বিধায় বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা বাড়ছে, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। হস্তশিল্প যেমন নকশিকাঁথা, বাঁশ ও বেতের পণ্য ও মাটির তৈজসপত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আকর্ষণীয়। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে কৃষিজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। উদ্যোক্তারা আধুনিক প্যাকেজিং, খাদ্যনিরাপত্তা মান ও কোল্ড চেইন লজিস্টিক ব্যবহার করে এ খাতে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবা যেমন ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং এমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা বহন করে।
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের সহায়তা দিতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
ইসলামী ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ স্কিমটি শুধু নারীদের জন্যই বিশেষায়িত বিনিয়োগমাধ্যম। এছাড়া পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) আওতায় নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে সারা দেশে নয় লাখের অধিক গ্রাহককে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ করা হয় যার ৯২ শতাংশই নারী। আগামীতে বিনিয়োগসহ নতুন নতুন এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এর পরিধি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।