এস ফোর্সের ধর্মগড় বিওপি আক্রমণ বদলে দিয়েছিল যুদ্ধের বাঁক

‘আগস্টের শেষের দিকে মুজিবনগর হেডকোয়ার্টার থেকে আমার কাছে এক নির্দেশ এসেছিল যে গেরিলা বাহিনীর সাথে সাথে নিয়মিত বাহিনী গড়ে তোলার জন্য যেন প্রস্তুত হই।

‘আগস্টের শেষের দিকে মুজিবনগর হেডকোয়ার্টার থেকে আমার কাছে এক নির্দেশ এসেছিল যে গেরিলা বাহিনীর সাথে সাথে নিয়মিত বাহিনী গড়ে তোলার জন্য যেন প্রস্তুত হই। সেপ্টেম্বরের প্রথম তারিখে আমি আমার সেক্টরকে (৩ নং সেক্টরকে) তিন ভাগে ভাগ করি এবং আমার বাহিনীকে পুনর্গঠিত করি। ৩ নং সেক্টরে যেসব লোক ছিল তাদের দ্বারাই এটা করা হয়। ৩ নং সেক্টরে, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এ দুই বাহিনীতে পরিণত করা হয়। একটি হলো ৩ নং সেক্টর বাহিনী যা ১০টি কোম্পানি দ্বারা গঠিত। সেক্টর হেডকোয়ার্টার থাকে হেজামারাতে, আর একটি “‍এস” ফোর্স হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় ফটিকছড়াতে। এই “‍এস” ফোর্স হেডকোয়ার্টারের অধীনে ২ এবং ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল।’

‘এস’ ফোর্সের গঠন নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এমনটাই দাবি করেছেন কে এম সফিউল্লাহ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গড়ে ওঠা আলোচিত তিন ব্রিগেডের একটি এস ফোর্স। ব্রিগেডের নামকরণ করা হয়েছে ৩ নং সেক্টরের কমান্ডার কে এম সফিউল্লাহর নাম থেকে। ব্রিগেডের নেতৃত্ব ছিল তার হাতেই। ৩ নং সেক্টর গড়ে উঠেছিল হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অধিকাংশ এলাকাসহ নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের অংশবিশেষ নিয়ে। পুরো অঞ্চলেই ছিল এস ফোর্সের তৎপরতা। মূলত বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টারের পরিকল্পনা মোতাবেক ৭ জুলাই গঠন হয় প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড। ১২-১৫ জুলাই কলকাতায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আরো দুটি নতুন ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জুলাইয়ের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৩ নং সেক্টর এলাকায় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে পুনর্গঠন করে একটি নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের জন্য কে এম সফিউল্লাহর কাছে নির্দেশ আসে। কে এম সফিউল্লাহ প্রাথমিকভাবে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন গেরিলা পদ্ধতিতে। সামরিক দিক থেকে অঞ্চলটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত এলাকা। এখান থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব তুলনামূলক কম। কাজেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিপত্য খর্ব করা গেলে মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমে রাজধানীর দিকে এগিয়ে যেতে পারবে এটা মুক্তিযুদ্ধের সেনাসদরের পারিকল্পনা। [বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ব্রিগেডভিত্তিক ইতিহাস, ২০০৬]

লেফটেন্যান্ট কর্নেল সফিউল্লাহ জুলাই থেকেই নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের পূর্বাভাস পেয়েছিলেন। ফলে অনেকটা আগে থেকেই তিনি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তিনি সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১ হাজার ২০০ সৈন্য সংগ্রহ করেন। এস ফোর্স গঠন হলে ২ এবং ১১ নং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্রিগেডটির অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে উল্লেখ্য, এস ফোর্স সেক্টর বাহিনী থেকে পৃথক থাকে। এস ফোর্স গঠনের পর সেক্টর কমান্ডার কেএম সফিউল্লাহ ‘এস ফোর্স’-এর দায়িত্ব নিলেন এবং সেক্টরের দায়িত্ব পড়ল মেজর নূরুজ্জামানের ওপর। দায়িত্ব পাওয়ার পর তৎপরতাও বাড়তে থাকে। সিপাই আফতাব হোসেন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মেজর শফিউল্লাহ (৩ নং সেক্টর কমাণ্ডার) ও ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামান শত শত ছাত্রকে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের অধীনে পাঠাতে থাকেন। তখন আমরা ময়মনসিংহের দক্ষিণাঞ্চলে। ঢাকা-ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ এলাকা মিলিয়ে গঠিত ৩ নং সেক্টরের অধীনে একটি সাবসেক্টর গঠন করি এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিই।’

ফোর্স গঠনের পর অপারেশন শুরু করার আগে এস ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত সৈন্যদের জন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ ও পুনর্বিন্যাস করা হয়। পরবর্তী দুই মাস তাদের চলতি পদ্ধতির রণকৌশল প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজে নিয়োজিত করা হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ। সেক্টর বাহিনী থেকে পৃথক করে তাদের যুদ্ধ এলাকা নির্ধারণ করা হয়। সেক্টর বাহিনীর অপারেশন এলাকা পুরো ৩ নং সেক্টর এলাকা এবং এস ফোর্সের অপারেশন এলাকা নির্ধারিত হয় ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট উত্তরে সিংগারবিল থেকে দক্ষিণে আখাউড়া ও তার পশ্চিমের এলাকা এবং ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুকুন্দপুর ও হরশপুর এলাকায় নিয়োজিত থাকে।

এস ফোর্সের সদর দপ্তর ছিল ফটিকছড়া আর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কেএম সফিউল্লাহ। এছাড়া ব্রিগেড মেজর ছিলেন ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান, ডি কিউ ক্যাপ্টেন আবুল হোসেন এবং সিগন্যাল অফিসার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আব্দুর রউফ। এস ফোর্সে দুটি রেগুলার ব্যাটালিয়ন ছিল ২ ও ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। দুটি রেজিমেন্ট আলাদাভাবে পরিচালিত হতো।

আখাউড়ার যুদ্ধ। ৩০ নভেম্বর-৫ ডিসেম্বর ১৯৭১

ধর্মগড় বিওপি আক্রমণ

২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী। এছাড়া অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ সাইদ আহমেদ, মেডিকেল অফিসার লেফটেন্যান্ট আবুল হোসেন, এ কোম্পানি কমান্ডার মেজর মতিউর রহমান, কোম্পানি অফিসার লেফটেন্যান্ট আনিসুল হাসান, বি কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান, কোম্পানি অফিসার লেফটেন্যান্ট সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান, সি কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম ও ডি কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট গোলাম হেলাল মুর্শেদ খান।

১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন মেজর এএসএম নাসিম। এছাড়া অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন কোম্পানি অফিসার নাসের, মেডিকেল অফিসার লেফটেন্যান্ট ডা. মইনুল হোসেন, এ কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট শামসুল হুদা (বাচ্চু), বি কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া, সি কোম্পানি কমান্ডার সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট নজরুল ইসলাম ভুইয়া, ডি কোম্পানি কমান্ডার সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আবুল হোসাইন, এস ফোর্স গঠনের পর ৩ নং সেক্টরকে পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস করা হয় এবং সেক্টরটিকে এস ফোর্স থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করা হয়।

পাশাপাশি ৩ নং সেক্টরকেও পুনরায় বিন্যস্ত করা হয়। সেক্টর কমান্ডার হন লে. কর্নেল নূরুজ্জামান এবং স্টাফ অফিসার নুরুদ্দিন মাহমুদ ও এমএ মহিউদ্দিন। কোম্পানি যারা কমান্ড করেছেন তারা হলেন ক্যাপ্টেন আবদুল মতিন, ক্যাপ্টেন এজাজ আহমদ চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট মনসুরুল ইসলাম মজুমদার ও লেফটেন্যান্ট জাহাঙ্গীর। এরা প্রত্যেকেই দুটি করে কোম্পানি কমান্ড করেছেন। বেসামরিক অফিসারদের মধ্যে আকলাস মিয়া ও আশেক হোসেনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এস ফোর্সের দায়িত্বপূর্ণ এলাকা ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সরাইল ও আশুগঞ্জ থানা ও হবিগঞ্জ মহকুমা। কিন্তু নভেম্বরের শেষ দিকে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলে এস ফোর্স ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার আশুগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের ভৈরব হয়ে নরসিংদী মহকুমার রায়পুরা-নরসিংদী দখলপূর্বক নারায়ণগঞ্জ মহকুমার রূপগঞ্জ থানা হয়ে তারাবো ও ডেমরা এলাকা দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। মুক্তিযুদ্ধে এস ফোর্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অক্টোবর থেকে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত এস ফোর্সের উল্লেখযোগ্য অপারেশন হচ্ছে ধর্মগড় এলাকায় মর্টার আক্রমণ (অক্টোবর প্রথম সপ্তাহ), মনোহরদী অবরোধ, কলাছড়া চা বাগান অপারেশন, বামুটিয়া এলাকায় আক্রমণ, আশুগঞ্জে মেঘনা ব্রিজ ধ্বংস, বিলোনিয়া বিজয়, মুকুন্দপুর বিওপি যুদ্ধ, আখাউড়া যুদ্ধ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আক্রমণ, সরাইলের পতন, ভৈরব ও আশুগঞ্জ যুদ্ধ, ভৈরব যুদ্ধ, কিশোরগঞ্জ সদর আক্রমণ, হরশপুর রেলসেতু এলাকায় যুদ্ধ, নরসিংদী দখলের যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মেজর এসএ ভূঁইয়া বলেন, ‘আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন শত্রুর অবস্থান ছিল খুবই সুদৃঢ়। ফলে এখানকার যুদ্ধ হয় ব্যাপক এবং মারাত্মক। বাংলাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আখাউড়ার লড়াইয়ের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এখানকার যুদ্ধে উভয় পক্ষই সর্বাধিকসংখ্যক আর্টিলারি ব্যবহার করে। কয়েকটি আক্রমণ চালিয়ে ২ নং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাল্টা অক্রমণের মুখে পাঞ্জাবি সৈন্যরা তাদের মনোবল হারিয়ে ফেলে। এমতাবস্থায় মিত্র বাহিনী আমাদের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়ার পর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে তারা আর দাঁড়াতে পারেনি। বলা বহুল্য, আখাউড়ার পতনের পর শত্রুবাহিনী আর কোথাও ভালোভাবে অবস্থান নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধে এস ফোর্সের সদূরপ্রসারী ভূমিকা এ বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান হয়। ব্রিগেডটির তৎপরতা ছিল ডিসেম্বর পর্যন্ত, যেমনটা মেজর এসএ ভুঁইয়া বলেন, ‘১৩ হইতে ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা পর্যন্ত এস ফোর্স ডেমরা ও শহরের বিভিন্ন উপকণ্ঠে লড়াই করে। এরপর তারা ডেমরার পরবর্তী এলাকা মাতুয়াইলে একবার বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। পরে লে. কর্নেল শফিউল্লাহ জোনারেল অরোরার সঙ্গে ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। এরই মধ্যে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও সেক্টর ট্রপস ঢাকা স্টেডিয়ামে পৌঁছে যায়।’

আরও