জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি চেয়ারপারসনের পদ শূন্য। কে হবেন নতুন চেয়ারপারসন? এ রকম সংকটজনক পরিস্থিতিতে যেকোনো দলেই বিভাজন দেখা যায়। বিএনপিতেও সেই ঘটনাই ঘটেছিল। দলের মধ্যকার একটি গ্রুপের ইচ্ছা ছিল বেগম খালেদা জিয়াই বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। তারা তাকে উপরাষ্ট্রপতি করার চেষ্টাও করেছিল। মওদুদ আহমদ তার ‘চলমান ইতিহাস’ বইয়ে জানান, একটা পর্যায়ে আবদুস সাত্তার তাকে চেয়ারপারসন হওয়ার জন্য দলের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বলেন। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রীদের চাপে সাত্তার নিজেই প্রার্থী হন এবং দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। খালেদা জিয়াকে উপরাষ্ট্রপতি হওয়ার অনুরোধ করলেও তিনি রাজি হননি। এরপর ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন এবং শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। সাত্তার সরকারকে হটিয়ে দেয়া হয়। বিলুপ্ত হয় জাতীয় সংসদ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেকে সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। স্বাভাবিকভাবেই গ্রেফতার হন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী। বিএনপি পড়ে যায় ভাঙনের মুখে। এমনকি দলটি ভেঙে তৈরি হয় প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দল নামে একটি অংশ। ১৯৮৩ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন সাত্তার খালেদা জিয়াকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন নিয়োগ করেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিন টুকরো হওয়া দলটি সাত্তার ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে মূলধারার বিএনপি হিসেবে পরিচিত হয় এবং টিকে থাকে। পরের বছর বিএনপির বর্ধিত সভায় খালেদা জিয়া ভাষণ দেন। ১০ মে সাত্তার পদত্যাগ করেন এবং খালেদা জিয়া হন বিএনপির চেয়ারপারসন। এভাবেই তার নেতৃত্বে বিএনপির পথচলা শুরু হয়।
রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও খালেদা জিয়া কিছুটা অন্তর্মুখীই ছিলেন। শুরুতে সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারেও তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তবে এরই মধ্যে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। প্রথম দিকেই একটি ১৫ দলীয় ও একটি সাতদলীয় জোট তৈরি হয়। আন্দোলনে গতি আনতে জোটে বিএনপিকে যুক্ত করার চিন্তাও চলছিল। খালেদা জিয়া তখন রাজনীতিতে নতুন। এ সময়ই রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনো খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। তারা খালেদা জিয়াকে তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু বিএনপি সম্মত হয়নি। তখন প্রস্তাব করা হয় দুটো আলাদা মঞ্চ থেকে অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন হোক। ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১৫ দল ও সাতদলীয় জোট যুগপৎ পাঁচ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ দিনই সাতদলীয় জোট আত্মপ্রকাশ করে, যার নেতৃত্বে ছিল বিএনপি। জোটের সমন্বয়ক মনোনীত হন খালেদা জিয়া।
এ সময় থেকেই খালেদা জিয়া পাবলিক প্লাটফর্মে কথা বলা শুরু করেন। তবে দেখা যায় তিনি যা বলার তুলনামূলক সংক্ষেপে বলতেন। পাঁচ দফা কর্মসূচি ও আন্দোলন নিয়ে বিচিত্রায় প্রকাশিত ১৯৮৩ সালের সাক্ষাৎকারে তাকে বিএনপির ভাঙন ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনো ধরনের বিষোদ্গার করেননি। তবে আন্দোলনের শুরুর দিক থেকেই ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে চাপের মুখে ছিলেন খালেদা জিয়া।
২৮ নভেম্বর ১৫ দলের অনশন ধর্মঘট ছিল। ২৯ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়। ৩০ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে ‘নিরাপত্তা হেফাজতে’ নেয়া হয়। এ সময় ঢাকায় ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনের জন্য কাজ চলছিল। ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার আটকাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর সংবাদপত্রে দেয়া এক বিবৃতিতে আটক সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দাবি করেন খালেদা জিয়া।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের চেষ্টা করছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ৩০ ডিসেম্বর তার সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয় খালেদা জিয়ার। শর্ত দিয়ে সংলাপে বসেন খালেদা জিয়া। তার শর্ত ছিল অবাধ রাজনৈতিক তৎপরতা পুনরায় শুরু, সব রাজবন্দির মুক্তি এবং পাঁচ দফা দাবি পূরণ। পরের বছর ৯ এপ্রিল সাত দলের নেতাদের নিয়ে খালেদা জিয়া বঙ্গভবনে যান এরশাদের সঙ্গে আলোচনা করতে। এটি ছিল আনুষ্ঠানিক বৈঠক। কিন্তু আতাউর রহমান খানের উপস্থিতির কারণে আলোচনায় বসেননি খালেদা জিয়া। কেননা তিনি ছিলেন এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী। প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের খালেদা জিয়া জানান যে তারা একটি স্মারকলিপি দিয়ে এসেছেন। সেখানে সামরিক আদালত বিলোপ, সামরিক আদালতের মামলা অসামরিক আদালতে পাঠানো, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেয়াসহ ১২টি প্রস্তাব ছিল।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল এবং এ আন্দোলনে খালেদা জিয়া অন্যতম বড় ভূমিকা রাখেন। বেশকিছু বিষয়ে তার বক্তব্য, নিজ মতে অনড় থাকা ইত্যাদি বিষয়ের কারণে তিনি ‘আপসহীন’ পরিচিতি পান।
১৯৮৫ সালের ১ মার্চ সামরিক সরকার আবারো দেশে সব রকম রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করে। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে নিজ নিজ বাড়িতে অন্তরীণ করা হয়। ৮৫ দিন অন্তরীণ থাকার পর ২৫ মে তারা মুক্তি পান। এ দিনই ৬৪ জেলা সদরে উপজেলা চেয়ারম্যানরা শপথ নেন। পাশাপাশি এ দিনই রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধের আদেশ তুলে নেয়ার পাশাপাশি ‘ঘরোয়া রাজনীতি’র অনুমতি দেয়া হয়।
একই দিনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছিল। উপকূলে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। খালেদা জিয়া দুর্গত এলাকায় সফর করেন। ২৮ মে দুপুরে তিনি মাইজদীকোর্ট পৌঁছেন। সেখান থেকে তিনি যান চর ক্লার্ক। ফেরার সময় সাতজন সফরসঙ্গীসহ কুমিল্লার চার মাইল দক্ষিণে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। ২৯ মে নোয়খালীর উপদ্রুত অঞ্চলে যাওয়ার সময় শেখ হাসিনা কুমিল্লায় রাবেয়া চৌধুরীর বাড়িতে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান।
তবে দুর্ঘটনাটি বিএনপির জন্য আরো সমস্যা তৈরি করে। এরপর অনেকেই এরশাদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। দু-একজন তার মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেন। তবে খালেদা জিয়া শক্ত হাতে দলের হাল ধরেছিলেন।
১৬ আগস্ট পাঁচটি দলের সমন্বয়ে এরশাদ গঠন করেন জাতীয় ফ্রন্ট। রাজনীতি আবারো নিষিদ্ধ করা হয়। খালেদা জিয়া নানা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন। মিলাদ-মাহফিলেও তিনি জনসংযোগের কাজ করেছেন। ২ অক্টোবর বিএনপির কার্যালয়ে যান তিনি। কয়েকটি দল থেকে ৫১ জন বিএনপিতে যোগ দেন। খালেদা জিয়া সমালোচনা করেন ঘরোয়া রাজনীতির।
খালেদা জিয়া ক্রমেই দলীয় রাজনীতি, জনসংযোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক দিকেও এগোচ্ছিলেন। ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোটেল শেরাটনে বৈদেশিক সংবাদদাতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন তিনি।
১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হলে বিএনপি তা বর্জন করে। খালেদা জিয়া বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য দেন। নির্বাচনে যোগ না দেয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। এর মধ্যে সিলেটে জনসভায় তিনি পাঁচ দফার প্রতি জোর দেন। ১৬ এপ্রিল রাজশাহীতে বলেন যে সরকার নীলনকশা করে নির্বাচন করছে। খুলনা, রংপুর ও ফরিদপুরেও একই কথার প্রতিধ্বনি করেন। প্রতিটি জায়গাতেই তিনি অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন।
৭ মে সারা দেশে নির্বাচন হয় এবং ২১০টি আসনে জেতে জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের এ নির্বাচনে ভরাডুবি হয়। ১১ জুলাই বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে জনসভায় খালেদা জিয়া ভাষণ দেন। তিনি নির্বাচনের সমালোচনা করেন।
সপ্তম সংশোধনীর সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া। এদিকে বিএনপির মধ্যে আবারো ভাঙন লাগে। কিন্তু সেই অবস্থাতেও খালেদা জিয়া জারি রাখেন এরশাদবিরোধী আন্দোলন। ’৮৬ সালে আলাদা জনসভায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়ই সরকারকে হটানোর ডাক দেন কিন্তু কোনো কর্মসূচি দেয়া হয়নি। ১৬ ডিসেম্বর বায়তুল মোকাররমে আরেকটি জনসভায় তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন।
’৮৭ সালের নভেম্বরে দেশের পরিস্থিতি উত্তাল হতে শুরু করে। ১০ নভেম্বর বিরোধী দলের হরতাল ছিল। শেখ হাসিনা তোপখানা রোডে সমাবেশে বক্তব্য দেন। ১১টার দিকে শাপলা চত্বরে বিএনপি সমর্থকরা সমবেত হয়। খালেদা জিয়া সেখানে ভাষণ দেন। এরপর তার নেতৃত্বে মিছিল প্রেস ক্লাবের দিকে যায়। প্রেস ক্লাবে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও জামায়াত নেতারা হরতাল সফলের দাবি করেন।
১৯৮৭-৮৯ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো নানাভাবে আন্দোলন করেছে। বিএনপির অভ্যন্তরে নানা রকম সমস্যা ছিল। খালেদা জিয়া সেসবও মেটানোর চেষ্টা করেছেন। বিএনপির ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যাবে এ সময় খালেদা জিয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন আবারো জোরদার হয়। ২৭ নভেম্বর দুপুর থেকে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে শুরু করে। আন্দোলন বরবাদ করার নানা চেষ্টা করেছেন এরশাদ। ২৯ নভেম্বর সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়। ছাত্রদের দাবির মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ৩০ নভেম্বর ভোর থেকে উত্তেজনা আরো বাড়ে। আট, সাত ও পাঁচ দল যৌথভাবে আন্দোলনকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে নেয়ার আহ্বান জানান। ৪ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১৪ মিনিটে পদত্যাগ করেন এরশাদ। এ পুরোটা সময় খালেদা জিয়া নানাভাবে আন্দোলনকে বেগবান রেখেছেন।
এরশাদের পতনের পর সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে নানা রকম দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। তবে এ সময় খালেদা জিয়া সারা দেশেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। জনসভা জনতায় ভরভরন্ত হয়ে থাকত। এসবেরই ফলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি। ১৪০টি আসন পেয়েছিল দলটি। ১৯৮৩ সালে শুরু করে নয় বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পর খালেদা জিয়া তখন দেশনেত্রী।