২০২৪-এর ৫ আগস্টের রক্তের দাম কত?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সোমবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ২টা ১৫ মিনিট থেকে বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটের মধ্যবর্তী সময়।

স্থান রাজধানী ঢাকার হৃৎপিণ্ডতুল্য বঙ্গভবন, সেনাসদর, শাহবাগ মোড়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, রক্তস্নাত যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা ও ক্ষমতার চরম দম্ভে থমথমে হয়ে থাকা গণভবন। ঢাকার আকাশে তখন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ও সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারের বিকট, আতঙ্কময় ও বধির করে দেয়া গর্জন; বাতাসে বাতাসে ফাঁকা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেলের তীব্র ঝাঁঝালো বিষাক্ত গন্ধ; আর রাজপথজুড়ে অগণিত, অকুতোভয় জনতার টিএসসি ও যাত্রাবাড়ী থেকে শাহবাগের দিকে ধেয়ে আসার এক বাঁধভাঙা অগ্নিসমুদ্র। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র, আয়নাঘর এবং প্রশাসনিক নির্যাতনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভয়ের যে বিশাল ও নিরেট দেয়ালটি গড়ে উঠেছিল, তা মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে গেল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল বন্দিদশা থেকে অবমুক্ত এক বিশাল, উন্মুক্ত ও গভীর দীর্ঘশ্বাসের স্বস্তি।

এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল কিংবা একজন শাসকের স্থলে অন্য কারো স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সাধারণ ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি সর্বগ্রাসী, সুসংগঠিত, ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গোটা বাঙালি জাতির ভূরাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ব রক্ষার শেকল ভাঙার ঐতিহাসিক সূচনা। ৫ আগস্ট কোনো সাধারণ তারিখ নয়—এটি শোষণ, নিপীড়ন, লুটপাট ও ভোটাধিকার হরণের অন্ধকার যুগ থেকে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মুক্তি এবং রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক মহিমান্বিত জাতীয় পুনর্জন্মের দিন।

২৪-এর রক্তস্নাত শ্রাবণের কালানুক্রম, ইতিহাস কাঁপানো স্লোগান ও তথ্য-উপাত্ত

অগ্নিকণার মতো জ্বলে ওঠা এ অভ্যুত্থান একদিনে বা এক মুহূর্তে তৈরি হয়নি; এর নেপথ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের শ্রাবণের এক দীর্ঘ, নির্মম, নিদানকামী ও রক্তাক্ত পথপরিক্রমা। মিছিলের সামনের সারিতে ধেয়ে আসা তরুণের কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হচ্ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গর্জনমুখী স্লোগান:

চেয়েছিলাম অধিকার,

হয়ে গেলাম রাজাকার!

কে বলেছে? কে বলেছে?

স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!"

১৬ জুলাই (আবু সাঈদের মহাকাব্যিক আত্মত্যাগ): রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে, বুক চিতিয়ে ঘাতকের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া অকুতোভয় তরুণ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ছিল পুরো আন্দোলনের নৈতিক বাঁক পরিবর্তনের প্রথম ও প্রধান স্ফুলিঙ্গ। ওই একই দিনে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলায় শহীদ হন ওয়াসিম আকরাম ও ফয়সাল আহমেদ শান্ত, আর ঢাকায় প্রাণ দেন রেজাউল করিম সুমন ও মো. শাহজাহান। রক্তে লাল হয়ে যায় বাংলার রাজপথ। রাজপথ থেকে তখন বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ ওঠে:

আমার ভাই রক্তে ভেসেছে,

স্বৈরাচার তুই গদি ছাড়!

১৮ জুলাই (‌কমপ্লিট শাটডাউন ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট): ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসকগোষ্ঠী যখন বুলেটের ভাষায় ছাত্র-জনতার ন্যায়সংগত আন্দোলন স্তব্ধ করতে চাইল, তখন সারা দেশে শুরু হলো সর্বাত্মক ‘‌কমপ্লিট শাটডাউন’। ওইদিনই উত্তরায় টিয়ার শেল ও বুলেটের মুখে শহীদ হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ১৯ ব্যাচের প্রাক্তন গ্র্যাজুয়েট ও বিইউপির এমবিএ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তিনি মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন আর বলছিলেন—ভাই, পানি লাগবে কারো, পানি?" ওইদিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় নির্দেশে ঘটানো হয় ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম ও পরিকল্পিত ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট—ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে পুরো দেশকে বৈশ্বিক সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়, যাতে ভেতরের নারকীয় গণহত্যার খবর বিশ্ববাসী জানতে না পারে।

১৯-২০ জুলাই (কারফিউ ও শুট-অন-সাইট): সারা দেশে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করা হয় এবং পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবিকে দেয়া হয় ‘‌শুট-অন-সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নজিরবিহীন অমানবিক নির্দেশ। রাজপথ পরিণত হয় কসাইখানায়। কিন্তু মৃত্যুর ভয়কে তুচ্ছ করে টিএসসি ও রাজপথে উল্টো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে আত্মত্যাগের কালজয়ী হাঁক:

বুকের ভেতর বহুত তুফান,

নয়ন ভরা জল

বুক পেতেছি গুলি কর,

কার কত শক্তি বল!"

২১-২২ জুলাই (অসম সামরিক শক্তি প্রয়োগ): সাভার, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরায় স্নাইপার এবং হেভি মেশিনগান ব্যবহার করে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়।

৩ আগস্ট (ঐতিহাসিক এক দফা): কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত জনসমুদ্রের বাঁধভাঙা ভিড় থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এক দফা দাবি ঘোষণা করেন—ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন। আর লাখো জনতার কণ্ঠে সুর মিলে যায় মহাজাগরণের স্লোগানে:

এক-দুই-তিন-চার,

স্বৈরাচার তুই গদি ছাড়!"

৪ আগস্ট (সর্বাত্মক অসহযোগ): সারা দেশে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় পুলিশ ও শাসক দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতে ১৫০ জনেরও বেশি মুক্তিকামী নাগরিক শাহাদত বরণ করেন। ওই রাতে রাজপথের প্রতিটি মোড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় প্রকম্পিত গর্জন ওঠে: "দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ!

৫ আগস্ট (লং মার্চ টু ঢাকা): লাখো জনতার বিজয়ী পদযাত্রায় অর্জিত হয় রক্তে কেনা ভোরের চূড়ান্ত মানচিত্র।

আকাশ থেকে মৃত্যু ও মর্গের নারকীয় বাস্তবতা:

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কিংবা প্রাথমিক সরকারি নথিপত্রে এ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ও নারকীয় অধ্যায়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে—তা হলো আকাশ থেকে নির্বিচারে বর্ষিত মৃত্যু। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় র‍্যাব ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি ছররা ও রাইফেলে ব্যবহৃত প্রাণঘাতী স্প্লিন্টার বুলেট বর্ষণ করা হয়। ঘরের নিরাপদে থাকা ছাদ ও বারান্দাও রেহাই পায়নি এ আকাশপথের বর্বরতা থেকে; নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ছয় বছরের ছোট্ট শিশু রিয়া গোপ কিংবা ছাদে খেলাধুলার সময় গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া শিশু আহাদ ও সামীর আকাশে উড়ন্ত ঘাতকের বুলেটের শিকার হয়ে প্রাণ হারায়।

অন্য ভয়াবহ চিত্র উদ্ঘাটিত হয় ঢাকার হাসপাতাল ও মর্গগুলোয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল (মিটফোর্ড) ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তখন ছিল রক্তের নদী, আর মর্গে জমেছিল নাম না জানা তরুণের লাশের স্তূপ। তার চেয়েও মারাত্মক ছিল রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের চাপ—স্বজনদের হাতে প্রিয়জনের নিথর দেহ তুলে দেয়ার শর্ত হিসেবে ডেথ সার্টিফিকেটটিতে মৃত্যুর আসল কারণ (গুলিকাণ্ড) না লিখে ভুয়া বা স্বাভাবিক মৃত্যুর তথ্য লিখতে বাধ্য করার অমানবিক নজির তৈরি করা হয়েছিল।

সোর্সভিত্তিক নিখুঁত স্ট্যাটিসটিক্যাল ডেটা

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), অ্যাফ্রিমেটিভ অ্যাকশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী:

 জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ১ হাজার ৪০০-এর বেশি (যাদের মধ্যে শতাধিক শিশু ও শিক্ষার্থী রয়েছে)।

 আহতের সংখ্যা ৩১ হাজার অতিক্রম করেছে।

 ছররা বুলেটের মারাত্মক আঘাতে ৫০০ জনেরও বেশি নাগরিক চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন (যার মধ্যে অনেকেই দুই চোখ হারিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধ)।

 সহস্রাধিক মানুষ হাত-পা হারিয়ে কিংবা মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে পঙ্গুত্বের শিকার হয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গু

হয়ে গেছেন।

জাতীয় ও প্রান্তিক চরিত্র এবং রাজপথের অকুতোভয় আখ্যান

এ রক্তাক্ত বিজয়ের পেছনে ছিল দৃশ্যমান জাতীয় নেতৃত্ব এবং অগণিত অলিখিত নায়কের অকুতোভয় আত্মত্যাগ। রাজপথের লড়াইয়ে সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী দিকনির্দেশনা দিয়ে আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, মহিউদ্দিন রনি, ওসমান হাদী, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, মাহিন সরকার, বাকের মজুমদার, আব্দুল হান্নান মাসউদ ও উমামা ফাতিমার মতো তরুণ এবং নির্ভীক ছাত্রনেতারা। তাদের কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনকে আরো সঠিকভাবে বেগবান করতে সাহায্য করেছে আমি (দাউদ ইব্রাহিম), রফিকুল ইসলাম, মাশুক আহমেদসহ আরো প্রকৃত বীর যোদ্ধারা। ‌তাদের মিছিলে তখন বারবার প্রকম্পিত হয়েছে জাতীয় ঐক্যের মহাকাব্যিক সুর:

তুমি কে? আমি কে?

রাজাকার, রাজাকার

কে বলেছে? কে বলেছে?

স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!"

এবং

কোটা না মেধা?

মেধা! মেধা!"

তাদের পাশাপাশি শিক্ষক, আইনজীবী, চিন্তাবিদ ও নাগরিক সমাজ নিয়ে গঠিত ‘‌পীড়িত অভিভাবক সমাজ’ ও ‘‌বিক্ষুব্ধ শিক্ষক সমাজ’ যেমন আমি (সহযোগী অধ্যাপক ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব), অধ্যাপক আসিফ নজরুল, তানজীমউদ্দিন খান, গীতি আরা নাসরীন, সাবেক ভিসি জিন্নাত আরা নাজনীন, যারা ক্ষমতার চরম হুমকির মুখেও নিজেদের নৈতিক অবস্থান থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি এবং অভিভাবক হিসেবে রাজপথে নেমে শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর প্রতিরক্ষার শক্তিশালী ঢাল তৈরি করেছিলেন।

অদৃশ্য কারিগর ও অপ্রকাশিত অলিখিত নায়করা:

একই সঙ্গে স্মরণ করতে হয় সেই অদৃশ্য কারিগর ও অপ্রকাশিত চরিত্রদের, যাদের নাম ইতিহাস হয়তো আলাদা করে শিরোনাম করবে না, কিন্তু তাদের রক্তেই গড়ে উঠেছে স্বাধীনতার ভিত্তি।

 রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষ: উত্তরা, সাভার, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীর মোড়গুলোয় যখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সোজাসুজি গুলি চালাচ্ছিল, তখন নিজেদের একমাত্র সম্বল রিকশাকে মানবঢাল বানিয়ে বুলেটের সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন নাম না জানা অকুতোভয় রিকশাচালকরা।

 অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরচালক: জীবন বাজি রেখে রক্তে ভেসে যাওয়া গুলিবিদ্ধ রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাইভেট কার চালকরা ছিলেন রাজপথের দেবদূত।

 ডিজিটাল প্রতিরোধকারী: ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার অন্ধকার দিনে হাতে লেখা চিরকুট, অফলাইন অ্যাপস (Mesh Messaging Apps) ও পাড়ায় পাড়ায় মুখে মুখে খবর পৌঁছে দেয়া তরুণরা এ বিপ্লবের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছেন।

 গৃহিণী ও সাধারণ নাগরিক: টিয়ার শেলে চোখ জ্বলতে থাকা ক্লান্ত ছাত্রদের মুখে গলি থেকে পানি, বিস্কুট ও স্যালাইন বিলিয়ে দেয়া অচেনা গৃহিণী এবং মধ্যরাতে রক্ত দেয়ার জন্য হাসপাতালের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত তরুণ প্রমাণ করেছে এ লড়াই ছিল প্রকৃত অর্থেই এক সর্বজনীন গণসংগ্রাম।

স্বৈরাচারের অর্থনীতি, লাগামহীন শোষণের ব্যবচ্ছেদ

এ গণ-অভ্যুত্থানের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষোভ ছিল না, বরং ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের তীব্র অর্থনৈতিক নিপীড়ন, লুটপাট ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত নাগরিক বিষফোঁড়া।

 অর্থনৈতিক শোষণের চিত্র: ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মেগা প্রজেক্টের নামে ওভার-ইনভয়েসিং ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যার পরিমাণ গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির মতে বছরে গড়ে ৮-১০ বিলিয়ন ডলার।

 মধ্যবিত্ত ও তরুণের দেয়াল: লাগামহীন মূল্যস্ফীতি (যা ১০ শতাংশ অতিক্রম করেছিল), নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের উচ্চহার (প্রায় ২৮ শতাংশ) দেশের বিশাল মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজকে পিষ্ট করছিল। সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল।

অতএব, ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি ‘‌ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠা করা। রাজপথ ও প্রশাসনিক স্তরের চাঁদাবাজি, কৃত্রিম বাজার সিন্ডিকেট, মেগা প্রজেক্টের দুর্নীতি এবং ব্যাংক খাতের মাফিয়া তন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির নিরাপত্তা ও সাম্য নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব। অর্থনৈতিক সততা ছাড়া রাজপথের এ অর্জিত রক্তদান সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

বিশ্বমঞ্চে ৫ আগস্টের মহিমান্বিত মর্মার্থ ও চার দফা জাতীয় করণীয়

বিশ্বমঞ্চে ৫ আগস্টকে কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক রদবদল হিসেবে দেখলে চরম ভুল হবে। এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও মানবাধিকারের ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ অধ্যায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দিনটিকে তুলে ধরতে হবে বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও নাগরিক প্রতিরোধের এক সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে। কীভাবে একটি জেনজি প্রজন্ম সর্বাধুনিক রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা, পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার এবং সরাসরি স্টেট ক্যাডার ও বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে একটি শক্তিশালী ফ্যাসিবাদী শাসনকে পতন ঘটিয়েছে, তা বৈশ্বিক রাজনীতি ও একাডেমিক কেস স্টাডি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।

এ ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে রক্তে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে টেকসই, বৈষম্যহীন ও সার্থক করতে হলে চার দফা জরুরি ও জাতীয় করণীয় বাস্তবায়ন করতেই হবে।

স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক আইনি বিচার: জুলাই-আগস্টে সংঘটিত প্রতিটি গণহত্যা, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও জাতিসংঘের সরাসরি তদারকিতে নিরপেক্ষ বিচার সুনিশ্চিত করা।

স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংস্কার: বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও নির্বাচন কমিশনকে স্থায়ী আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে চিরতরে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারের পুনর্জন্ম না ঘটে।

শহীদ ও আহতদের আজীবন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: শহীদ ওসমান হাদী, আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ সব শহীদ পরিবারের স্থায়ী পুনর্বাসন, আজীবন সম্মাননা এবং আন্দোলনে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী সব নাগরিকের আজীবন বিনামূল্যে পূর্ণাঙ্গ দেশী-বিদেশী চিকিৎসার জন্য আইনি স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা।

তরুণদের নীতিনির্ধারণী অংশীদারত্ব: তরুণ প্রজন্মের যে মেধা, সাহস ও দৃষ্টিভঙ্গি এ অবিশ্বাস্য পতন ঘটিয়েছে; রাষ্ট্র পুনর্গঠন, সংস্কার কমিটি ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব ও সরাসরি অংশীদারত্ব সুনিশ্চিত করা।

রক্তের ঋণে কেনা ভোরের পবিত্র আমানত

যাত্রাবাড়ী, উত্তরা কিংবা সাভারের পিচঢালা রাজপথে ভেসে যাওয়া তাজা রক্ত, চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলা শত শত তরুণের করুণ চাহনি, কিংবা শহীদ ওসমান হাদীর মতো অগণিত প্রাণোচ্ছল স্বপ্নবানের অকালে ঝরে যাওয়া—আমাদের প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেয় এ অর্জিত নতুন ভোর কোনো করুণা বা উপহার হিসেবে আসেনি। এ স্বাধীনতা কেনা হয়েছে হাজারো তাজা প্রাণ, সহস্রাধিক মানুষের রক্ত ও পঙ্গুত্ব এবং অগণিত মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের বিনিময়ে।

এটি এক পরম পবিত্র, ভারী ও ঐতিহাসিক আমানত। ৫ আগস্ট কেবল এক আনন্দ উৎসবের দিন নয়; এটি সত্য, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার শপথে বলীয়ান হওয়ার দিন। ক্ষমতার লোভ, কায়েমি স্বার্থ কিংবা দলীয় সংকীর্ণতার কাছে যেন এ পবিত্র রক্তের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস না ঘটে—সেটিই হোক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া আমাদের চূড়ান্ত জাতীয় অঙ্গীকার। রক্তের ঋণে কেনা এ মানচিত্রকে রক্ষা করার দায় আমাদের প্রত্যেকের।

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহযোগী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ, যুক্তরাজ্য

দাউদ ইব্রাহিম হাসান: রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; মাস্টার্স‌ স্টুডেন্ট (অর্থনীতি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; প্রজেক্ট অ্যানালিস্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ

আরও