লাল বর্ষা: ছবির ফ্রেমে রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা

৪ আগস্ট, বেলা ৩টার দিকে ফার্মগেটের উত্তাল রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয় ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্র গোলাম নাফিজ। একটানা গুলির শব্দ, ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ পেরিয়ে আমি যখন পৌঁছাই, তখনো রিকশার পাদানিতে পড়ে ছিল নাফিজের দেহ।

৪ আগস্ট, বেলা ৩টার দিকে ফার্মগেটের উত্তাল রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয় ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্র গোলাম নাফিজ। একটানা গুলির শব্দ, ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ পেরিয়ে আমি যখন পৌঁছাই, তখনো রিকশার পাদানিতে পড়ে ছিল নাফিজের দেহ। কিন্তু নাফিজ আর পারেনি—রিকশার পাদানিতেই নিশ্বাস ছেড়ে দিয়েছিল সে। সেদিন রাতেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে নাফিজের নিথর ছবি। তাতেই সন্তানের খোঁজ পান তার মা-বাবা। কল্পনা করা যায়? সন্তানকে খুঁজে পাওয়া একটা ভাইরাল ছবিতে।

এ ছবিই তুলেছিলাম আমি। কিন্তু কেবল একটি ছবি নয়, আমি যেন একটি গোটা প্রজন্মের প্রতিরোধ, যন্ত্রণার দলিল তুলে এনেছিলাম। সেদিন জুলাই-আগস্টের অন্য উত্তাল দিনের মতোই আমি সকালেই বের হই পেশাগত দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে। প্রথমে যাই শাহবাগে। সেখানেই জানতে পারি ছাত্রদের একটি দল বাংলামোটর হয়ে গণভবনের দিকে যাচ্ছে। আমি ও আরো কয়েকজন সাংবাদিক ফার্মগেটের দিকে এগোই। কারওয়ান বাজার মোড়ে পৌঁছে দেখি ছাত্র-জনতা আবার সেদিকেই এগিয়ে আসছে, পুলিশও ধীরে ধীরে ফার্মগেটের দিকে সরছে।

আমরাও সেদিকে যেতে থাকি। ঠিক তখনই ডেইলি স্টার ভবনের সামনে নজরে পড়ে সেই মর্মান্তিক দৃশ্য—এক ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে রিকশায়। সময় ছিল আনুমানিক বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা। ছবি তুলতে যেতেই পুলিশ বাধা দেয়। কিন্তু থামিনি। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে বন্দি করতে থাকি ইতিহাসের এক রক্তাক্ত মুহূর্ত।

রিকশাটি ফার্মগেট হয়ে আল রাজি হাসপাতালের সামনে দাঁড়ালে সেখানেই দেখা যায় আরেক ভয়ংকর দৃশ্য। যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা হাসপাতালে ঢুকতে দেয়নি। ছবি তুলতেও নিষেধ করে। আমি থামিনি। আবার ক্যামেরা তুলি। তখনই একদল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। রড দিয়ে আঘাত করে। একের পর এক ঘুসি, লাথি—মুহূর্তেই আমি লুটিয়ে পড়ি। বেহুঁশ হয়ে যাই। আশপাশের সহকর্মীরা অফিসে খবর দেয়। আমাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে অফিসে আনা হয়।

সেদিন ফার্মগেটের রাস্তায় একটি তরুণ প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। কিন্তু রিকশায় পড়ে থাকা তার নিথর দেহ আজও মনে গেঁথে আছে। সেই দৃশ্য প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—এ প্রজন্ম হেরে যেতে রাজি নয়, মেনে নিতে জানে না অন্যায়, থেমে যেতে চায় না জীবনের কাছে।

আরও