রিপোর্টারের ডায়েরি

আন্দোলনকারীরা কোনো কিছুর ভয়েই পিছু হটছিল না

৩ আগস্ট শহীদ মিনারে এক দফা ঘোষণার পর সবার মনে হচ্ছিল আওয়ামী লীগ টিকে থাকার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এমন শঙ্কা নিয়েই ৪ আগস্ট বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে কাজীপাড়া পৌঁছাই।

৩ আগস্ট শহীদ মিনারে এক দফা ঘোষণার পর সবার মনে হচ্ছিল আওয়ামী লীগ টিকে থাকার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এমন শঙ্কা নিয়েই ৪ আগস্ট বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে কাজীপাড়া পৌঁছাই। প্রায় দেড়-দুই শতাধিক আন্দোলনকারী তখন রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে অবস্থান করছে। বেশির ভাগই ছিল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। পুলিশের অবস্থান ছিল কাজীপাড়া থেকে কিছুটা সামনে আল-হেলাল হাসপাতালের কাছে। তখনো সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল না। এর কিছুটা সামনেই মিরপুর গোলচত্বরের নিচে চলছিল আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সমাবেশ। সমাবেশে উপস্থিত কর্মীদের বেশির ভাগই ছিল হেলমেট পরিহিত এবং অনেকেই সশস্ত্র। সমাবেশের ছবি তোলা শুরু করতেই হেলমেট পরিহিত একজন বেশ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তেড়ে এসে ছবি তুলছি কেন বলতে বলতে ফোন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি আমি সংবাদকর্মী এবং আমার আইডি কার্ড দেখাই। কিন্তু তিনি পুনরায় ফোন কেড়ে নিতে চেষ্টা করেন। এর মাঝেই পাশে থাকা একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি এসে তাকে আটকান। এবার তারা আমাকে তোলা ছবিগুলো ডিলিট করতে বলেন। তখন তাদের সামনেই ছবি ডিলিট করতে বাধ্য হই। পরবর্তী সময়ে মধ্যবয়সী ব্যক্তিটি আমাকে দ্রুত চলে যেতে বলেন। এর মাঝেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। কোনোমতে শাহ আলী মার্কেটের গলির ভেতরে আশ্রয় নিই। সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে ভেতরের একটি গলি দিয়ে কাজীপাড়ায় ফিরে আসি। কাজীপাড়া থেকে কারওয়ান বাজার আসার পথে ফার্মগেট এলাকায় আওয়ামী লীগ ও মহিলা লীগের কর্মীদের অবস্থান দেখতে পাই। আনুমানিক বেলা দেড়টার দিকে কারওয়ান বাজার পৌঁছে আবারো সংঘর্ষের মুখোমুখি হই। তখন কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশ ও ধারালো দেশীয় অস্ত্রসহ আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ কর্মীরা আর বাংলামোটরের দিকে আন্দোলনকারীরা অবস্থান করছিল। আমার এক সহকর্মী অফিসে প্রবেশের সময় ছাত্রলীগের কর্মীদের হামলার শিকার হন। এর মাঝে কারওয়ান বাজার এলাকায় সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অফিসের ছাদ থেকে আমার বেশ কয়েকজন সহকর্মী চেষ্টা করেন সংঘর্ষের ছবি-ভিডিও সংগ্রহ করার। কারওয়ান বাজারের সংঘর্ষে যেসব আন্দোলনকারী সামনের সারিতে ছিল তাদের প্রায় সবাই কিশোর-তরুণ। গুলি, কাঁদানে গ্যাস, দেশী অস্ত্র—কোনো কিছুর ভয়েই কেউ পিছু হটছিল না। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ইট-পাটকেলে পুলিশ ও ছাত্রলীগই পিছু হটতে বাধ্য হয়। আন্দোলনকারীরা যখন এগোচ্ছিল ওই পর্যন্ত সড়কের আইল্যান্ডের রেলিংয়ে লাঠি দিয়ে শব্দ করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল তারা ওই এলাকা পর্যন্ত এগিয়েছেন। অস্ত্রের সামনে কিশোর-তরুণদের এ সাহস অবাক করেছিল। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তাদের সামনে এগিয়ে আসা দেখে বুঝে নিয়েছিলাম সরকার যত শক্তিই প্রয়োগ করুক না কেন এ তরুণরা অপ্রতিরোধ্য। ওইদিন চোখের সামনেই আমরা অন্তত চার-পাঁচজনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যেতে দেখি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রায় ১ ঘণ্টা পর অফিসে ফিরে আসি। জুলাই-আগস্ট জুড়ে চোখের সামনে গুলি, মৃত্যুর ঘটনা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে সংবাদ লেখাটাই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন মনে হচ্ছিল। এর মাঝে জানতে পারি বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী আহত হয়েছেন। এদের কয়েকজন আবার আমার অফিস সহকর্মী। সব মিলিয়ে আমাদের শঙ্কা-উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছিল। পরিবারের সবাইও চিন্তিত ও ভীত হয়ে পড়ছিল। চারপাশের অবস্থা এমন ছিল ওইদিন বাসায় ফেরাই অনিশ্চিত হয়ে যায়। নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে অফিস থেকে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে আমি আনুমানিক রাত ১০টায় এক সহকর্মীর বাসার উদ্দেশে রওনা হই। কারওয়ান বাজারে এত নিস্তব্ধতা, এত অন্ধকার আগে কখনো দেখিনি। রাস্তা পার হতেই ২-৩টা রিকশার দেখা মেলে। রিকশা নিয়েই বাসার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। ভীত ছিলাম আমরা আদৌ বাসায় পৌঁছতে পারব কিনা। সময় যেন খুব ধীরগতিতে চলছিল। একেকটি সেকেন্ডকে মনে হচ্ছিল একেক ঘণ্টা। এর মাঝেই মধ্যবয়সী রিকশাচালক জানাচ্ছিলেন সরকারের প্রতি তার ক্ষোভের কথা। যখন বাসায় পৌঁছি তখন রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। বাসায় নিরাপদে ফিরলেও মনে স্বস্তি ফিরছিল না। চোখের সামনে বারবার আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির দৃশ্য ফিরে আসছিল। এরপর প্রায় এক বছর পার হয়েছে। তবে সেসব ঘটনা এখনো স্মৃতি থেকে দূরে সরে যায়নি। নিজের অজান্তে প্রশ্ন জাগে, সেই সব সাহসী তরুণের আত্মত্যাগের যথার্থ মূল্যায়ন হয়েছে কি?

ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া: প্রতিবেদক, বণিক বার্তা

আরও