অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথরেখা

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান ভিত্তি হলো পরিবহন খাত, যা উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যান্য বহু খাতের সঙ্গে এ খাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জাতীয় অগ্রগতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে আরো জোরদার করে তোলে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান ভিত্তি হলো পরিবহন খাত, যা উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যান্য বহু খাতের সঙ্গে এ খাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জাতীয় অগ্রগতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে আরো জোরদার করে তোলে। পরিবহন নেটওয়ার্কের দক্ষতা ও বিস্তৃতি বাণিজ্য সহজতর করে, নাগরিকদের যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করে এবং পণ্য ও মানুষের চলাচলে সহায়তা করে, যা দেশের সার্বিক উন্নয়ন কৌশলের অপরিহার্য অংশ।

বাংলাদেশ পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং কিছু বৃহৎ প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ায় সংযুক্তি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু—যা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত—দেশের দীর্ঘতম সেতু হিসেবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে বাকি অংশের সংযুক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। এর পরিপূরক হিসেবে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প সড়ক ও রেল উভয় পরিবহনের দক্ষতা উন্নত করেছে।

আরেকটি চমকপ্রদ প্রকল্প হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব টানেল, যা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে নির্মিত ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেল। এটি শহরের সঙ্গে আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করেছে, যাত্রার সময় ও দূরত্ব উভয়ই কমিয়েছে। নগর পরিবহনে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-৬-এর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উদ্বোধন রাজধানীর যানজট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা বছরে ৮-২৪ মিলিয়নে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্প সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের পরিবহন অবকাঠামোকে শক্তিশালী করছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করছে এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করছে।

তবে এ অগ্রগতির সত্ত্বেও সাম্প্রতিক একটি হোয়াইট পেপারে (সাদা পত্রে) উল্লেখ করা হয়েছে, এ সফলতা এসেছে বিপুল সময় ও সম্পদের বিনিময়ে, যার ফলে ব্যাপক সম্পদ অপচয় হয়েছে। আরো উল্লেখযোগ্য হলো এসব উন্নয়ন কোনো সমন্বিত ভূমি ব্যবহার ও পরিবহন কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে না। এসব সমস্যা গভীর গঠনতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে তুলে ধরছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও সংযুক্তি উন্নয়নের টেকসইতায় বড় চ্যালেন সৃষ্টি করছে।

এ দুর্বলতা নিরসন ও অর্থবহ গঠনমূলক সংস্কার বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলো দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয় এবং সর্বোচ্চ সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিশ্চিত হয়।

নবগঠিত অন্তর্বর্তী সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে তাদের সামনে রয়েছে পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এবং পূর্বে অবহেলিত সমস্যাগুলোর মূল কারণ উদ্ঘাটনের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে একটি ১২ সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যারা ‘‌‍অর্থনীতির পুনর্নীতিনির্ধারণ এবং ন্যায়সংগত ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সম্পদ সংগ্রহ’ শীর্ষক একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রণয়নে কাজ করছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য একটি ন্যায্য, টেকসই ও গতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করা।

জাতীয় পর্যায়ে পরিবহন খাতকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে নিতে হলে এর ভেতরকার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত অদক্ষতাগুলোর প্রতি অবিলম্বে কৌশলগত হস্তক্ষেপ করা জরুরি। এ সংকটময় মুহূর্তে ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়নের তাগিদ সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এগুলোই বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি ভিশন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য পরিবহন খাতের সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায় রয়েছে সড়ক ও মহাসড়ক, রেলপথ, অভ্যন্তরীণ জলপথ, সমুদ্রবন্দর, নৌ-পরিবহন ও বেসামরিক বিমান চলাচল। তবে প্রকল্প নির্বাচন ও রূপায়ণ লাইন মন্ত্রণালয়গুলো স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করে থাকে, যা অঞ্চলভিত্তিক স্থানীয় পরিকল্পনা কিংবা মাল্টিমোডাল পরিবহন মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয়হীন। এ খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবহন ব্যবস্থার বিকাশে বহু সমস্যার জন্ম দিচ্ছে, যার ফলে ভারসাম্যহীনতা ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং একটি কার্যকর ও সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্ক গঠনে বাধা সৃষ্টি করছে।

২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের যাত্রী পরিবহনে প্রধান ভূমিকা রাখছে সড়কপথ, যা মোট যাত্রী চলাচলের প্রায় ৮৮ শতাংশ। এর বিপরীতে রেলপথের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহনের অংশ মাত্র ৪ শতাংশ।

একটি ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অভাবে সড়ক উন্নয়নের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যার ফলে মাল পরিবহনে সড়কপথের অংশ ১৯৭৫ সালের ৩৫ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ শতাংশে। অন্যদিকে একই সময়ে রেলপথের অবদান ২৮ থেকে ১৬ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের অবদান ৩৭ থেকে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

যদিও সড়ক পরিবহন ব্যক্তিগত ও দরজা-থেকে-দরজায় সেবা প্রদান করে, এটি অত্যন্ত সম্পদনির্ভর ও পরিবেশ-অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যা বাংলাদেশের সীমিত ভূমিসম্পদ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের সমুদ্র-সংযুক্ত নদীমাতৃক ভৌগোলিক অবস্থানের বিশাল সম্ভাবনা এবং রেলপথের ইন্টারমোডাল কনটেইনার সেবার সুযোগকে কাজে লাগাতে সক্ষম।

একটি সমন্বিত পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে নৌযান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চতা রক্ষা করা যায়নি এবং অননুমোদিত লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়েছে, যা রেল চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ সড়ককেন্দ্রিক উন্নয়ন নীতি পরিবহন ব্যবস্থাকে করেছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও টেকসইহীন—যেখানে নিয়মিত যানজট, অতিরিক্ত দূষণ এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি লক্ষ করা যায়। রেল ও নৌপথের বিপুল সম্ভাবনা আজও পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো হয়নি, যার ফলে একটি ভূমি ও সম্পদ সংরক্ষণকারী ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।

অপরদিকে রেলভিত্তিক ও ট্রান্সিট-অরিয়েন্টেড টেকসই ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার সম্ভাবনাকে এখনো কাজে লাগানো হয়নি। বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর জন্য প্রযোজন একটি এমন নেটওয়ার্ক, যেখানে সড়ক, রেলপথ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, বিমান পরিবহন, বন্দর, শিপিং এবং নগর ও গ্রামীণ পরিবহন একে অপরকে কার্যকরভাবে পরিপূরক করে।

সম্প্রতিক গ্লোবাল কমপেটিটিভনেস ইনডেক্স (জিসিআই)-এ বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, মূলত তথ্য স্বল্পতা বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ডেটা সরবরাহের কারণে। তবে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) কর্তৃক প্রকাশিত গ্লোবাল কমপেটিটিভনেস রিপোর্ট ২০১৯ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৪১টি দেশের মধ্যে ১০৫তম অবস্থানে ছিল। এর আগেরবার ছিলো ১০৩তম অবস্থানে। বাংলাদেশ ১২টি মূল খাতের মধ্যে ১০টি পতনের মুখে পড়েছে, বিশেষ করে ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা, শ্রমবাজারের দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং অবকাঠামো খাতে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ৬৮তম, শ্রীলংকা ৮৪তম, নেপাল ১০৮তম এবং পাকিস্তান ১১০তম অবস্থানে রয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ নেপালের ওপরে এবং পাকিস্তানের নিচে অবস্থান করছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশের অবকাঠামো ২০১০ সালে ৭২তম স্থান থেকে ২০১৯ সালে ১০০তম স্থানে নেমে গেছে, যা পরিবহন, সংযোগ এবং নগর চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতিফলন। এ দুর্বলতাগুলো নিরসন করা অত্যর জরুরি, বাংলাদেশ তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশে পরিবহন অবকাঠামো বিভিন্ন পৃথক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেমন সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় (এলজিআরডি), রেলপথ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন ও বন্দর মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

এ বিভাজনের ফলে সমন্বয়হীন উন্নয়ন ঘটে, যার কারণে সংঘাত, অদক্ষতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং দীর্ঘতর ভ্রমণ সময়ের সৃষ্টি হয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যেখানে নদীপথ, রেলপথ, সড়কপথ ও আকাশপথকে একত্রে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করে, সেখানে বাংলাদেশে পরিবহন নেটওয়ার্কটি ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।

২০১৪ সালে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে আলাদা করা হয় এবং ১৯৮৫ সালে বড় সেতু ব্যবস্থাপনার জন্য বিবিএ (বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ) গঠন করা হয়।

এছাড়া সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব দুটি সংস্থার মধ্যে ভাগ করা হয়েছে-এলজিডি গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন এবং আরএইচডি জাতীয় ও আঞ্চলিক মানসম্পন্ন সড়কগুলোর দায়িত্বে রয়েছে।

এ বিভাজনকেই অনেকেই বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার অবনতি এবং ব্যয়বহুল, খণ্ডিত অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান কারণ বলে মনে করেন।

নিম্নলিখিত কিছু বাস্তব সমস্যা তুলে ধরা হলো, যা নদীপথ, রেলপথ, সড়কপথ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন সম্পর্কিত চারটি পৃথক মন্ত্রণালয় একত্র করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে—

অনাবশ্যক সংঘাত এড়ানো: বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন বিভাগের মধ্যে জমি ভাগাভাগির মানসিকতা না থাকায় দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

উদাহরণস্বরূপ—

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনালে (কেসিটি) রেলপথ ইন্টারমোডাল সুবিধার জন্য জমি দেয়নি।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রেলস্টেশনে প্রস্তাবিত মাল্টিমোডাল হাব বাস্তবায়ন হতে পারেনি তীব্র জমি বিভাজন সমস্যার কারণে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, রেলপথ বিভাগ এবং সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ সবাই মিলে এ ট্রান্সফার হাবটি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু সফল হতে পারেনি, যার ফলে বিমানবন্দরের সঙ্গে মাল্টিমোডাল সংযোগ স্থাপনের একটি সোনালি সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। একই ধরনের জটিলতা দেখা গিয়েছিল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে মাল্টিমোডাল হাব বাস্তবায়নে এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে করিডোর ভাগাভাগি নিয়ে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়।

আলাদা জমি অধিগ্রহণ: পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প (বাংলাদেশ রেলওয়ে) এবং ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে—দুটি প্রকল্প আলাদাভাবে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়েছিল, ফলে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে, যদিও খাদ্যনিরাপত্তা এখন একটি জাতীয় অগ্রাধিকার। অথচ এ দুটি পরিবহন মাধ্যম একই রাইট অব ওয়ে না ব্যবহার করে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যেত।

অবকাঠামোগত আপস: পদ্মা ও যমুনা সেতুতে বিবিএ রেলপথকে একমাত্রিক রেললাইন নির্মাণে বাধ্য করে। যমুনা বহুমুখী সেতুতে রেলকে মাত্র ২০ কিমি/ঘণ্টা গতিসীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়, যার ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে যমুনা নদীতে আলাদা দ্বৈতগেজ ডাবল লাইন রেল সেতু নির্মাণে বাধ্য হয়, এতে বিশাল পরিমাণ সম্পদ অপচয় হয়।

সড়ক সম্প্রসারণে বাধা: ১৭০ কিমি দীর্ঘ পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কারণে এলজিইডি-এর ভবিষ্যৎ সড়ক সম্প্রসারণ প্রায় ৩০০ স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ সংকীর্ণ ও স্বল্প উচ্চতার ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়গুলোর আধিপত্যবাদী মনোভাব: চারটি পৃথক মন্ত্রণালয় এবং তাদের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নে আধিপত্যবাদী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়, যা প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক ম্যান্ডেট লঙ্ঘন করে।

সেতুর দৈর্ঘ্য ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন: এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) মধ্যে বিরোধের কারণে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সেতুর দৈর্ঘ্য ছোট ও বড় করে প্রকল্পগুলোর পরিসর নিজেদের অনুমোদিত সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয় যখন শুধু সেতু নির্মাণের জন্য বিবিএ গঠিত হয়, যা বৈশ্বিকভাবে একটি অনন্য ঘটনা। এ তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেতু নির্মাণ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের পরস্পরবিরোধী ও অতিক্রান্ত দায়িত্ববণ্টনের ফলে বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপ্রয়োজনীয় অপচয় ঘটছে।

নিরবচ্ছিন্ন মাল্টিমোডাল সংযোগের অভাব: বাংলাদেশে কোনো কার্যকর মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা নেই, যেখানে পরিবহন মাধ্যমগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ ও ট্রান্সফার হাব থাকে। বাস, ট্রাক, রেল, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর টার্মিনাল, ইপিজেড/এসইজেড, আইসিডি ও পরিবহন লজিস্টিকস সেমি-ট্রেইলার হাবগুলোতে মাল্টিমোডাল সংযোগ অনুপস্থিত।

নীতিমালার দুর্বল বাস্তবায়ন: বাংলাদেশে ২০১৩ সালের 'ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট পলিসি’ প্রণয়ন করেছিল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, যার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমকে সমন্বিত করা। তবে দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে অনেক অবকাঠামো প্রকল্প এ নীতিমালার নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২৩ সালের এনআইএমটিপি, যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত, তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, কারণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-এর অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবহন পরিকল্পনার যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ম্যান্ডেট ও কারিগরি দক্ষতা নেই। আন্তর্জাতিকভাবে, এ ধরনের সমন্বিত মাল্টিমোডাল পরিবহন নীতি সাধারণত সংশ্লিষ্ট পরিবহন ও অবকাঠামো পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় দ্বারা তৈরি ও তত্ত্বাবধান করা হয়।

এ ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও চারটি পরিবহন মাধ্যম—সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান— একটি একক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা উচিত। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের সমন্বয় সাধিত হয় জাতীয় পরিবহন মন্ত্রণালয় অধবা নির্দিষ্ট পরিবহন বিভাগ দ্বারা, যারা যথাযথ সমন্বয় ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশের জন্য, একটি সুস্পষ্ট, ক্ষমতাসম্পন্ন এবং কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যারা মাল্টিমোডাল পরিবহন সমন্বয় তত্ত্বাবধান করবে এবং দক্ষ, টেকসই ও স্থিতিশীল পরিবহন নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করবে।

লেখক: অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও