নিরাপদ খাদ্যের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ কৃষি

বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অধিক খাদ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতা। শুধু খাদ্যশস্য নয়, মৎস্য, পোলট্রি থেকে শুরু করে কৃষির সঙ্গে সংযুক্ত সব অনুষঙ্গই এ প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত।

বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অধিক খাদ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতা। শুধু খাদ্যশস্য নয়, মৎস্য, পোলট্রি থেকে শুরু করে কৃষির সঙ্গে সংযুক্ত সব অনুষঙ্গই এ প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতি অনেকটা কমেও গেছে। কিন্তু আমরা যা খাচ্ছি তা শরীরের জন্য কতটা নিরাপদ, সেটি নিয়ে শঙ্কা দিন দিন জোরালো হচ্ছে। কৃষিতে বিষাক্ত কীটনাশক ও সারের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং দূষিত জায়গায় চাষাবাদের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসল আমাদের আহারের জোগান দিলেও স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি করছে তা বিবেচনার দাবি রাখে।

কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করতে গিয়ে নানা ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কীটনাশক ব্যবহারের ইতিহাসকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। যেখানে প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ ১৮৭০-এর দশকের আগে বিভিন্ন প্রাকৃতিক যৌগ ব্যবহার করে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। তবে কীটনাশকের প্রথম ব্যবহার হয় প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে সুমেরীয়দের দ্বারা। তারা পোকামাকড় এবং মাইট নিয়ন্ত্রণের জন্য সালফার যৌগ ব্যবহার করত। প্রায় ৩ হাজার ২০০ বছর আগে চীনারা শরীরের উকুন নিয়ন্ত্রণের জন্য পারদ ও আর্সেনিক যৌগ ব্যবহার করত বলে জানা যায়। এছাড়া প্রায়ই ধূমায়ন পদ্ধতিতে উদ্বায়ী রাসায়নিক প্রয়োগ করা হতো।

দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ ১৮৭০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে মানুষ অজৈব সিন্থেটিক উপকরণ ব্যবহার শুরু করে। ১৮ শতকের শেষের দিকে সুইডেনের মানুষ ফল ও আলুতে ছত্রাকের আক্রমণের বিরুদ্ধে তামা ও সালফার যৌগ ব্যবহার করা শুরু করে। তার পর থেকে মানুষ অনেক অজৈব রাসায়নিক ব্যবহার করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে কপার সালফেট এবং চুন-আর্সেনিকের সমন্বয়ে তৈরি বোর্দো মিশ্রণ, যা কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি এখনো অসংখ্য ছত্রাকজনিত রোগ প্রতিরোধে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তৃতীয় পর্যায়টি শুরু হয় ১৯৪৫ সালের পর। এ সময় ডাইক্লোরোডাইফিনাইলট্রাইক্লোরোইথেন (ডিডিটি), বিটা-হেক্সাক্লোরো সাইক্লোহেক্সেন, অ্যালড্রিন, ডাইঅ্যালড্রিন, এনড্রিন, ক্লোরডেন, প্যারাথিয়ন, ক্যাপ্টান ও ২, ৪-ডির ব্যবহার শুরু হয়। অর্গানোক্লোরিন কীটনাশক হিসেবে পরিচিত এসব রাসায়নিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে নানাভাবে।

সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে অতিমাত্রায় সার এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের প্রয়োগ করা হচ্ছে। এভাবে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যে সার, কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে তার বিরাট একটি অংশ মূলত অব্যবহৃত অবস্থায় মাটি-পানির মাধ্যমে খাদ্যচক্রে যুক্ত হচ্ছে এবং সময়ের চক্রে সঞ্চিত হচ্ছে জীবদেহে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোয় পানিতে আগাছা, পোকামাকড় ও রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছ, ব্যাঙ, শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যুহার বেড়েছে, যেগুলো ঐতিহ্যগতভাবে ধানের পাশাপাশি ধানখেত থেকে খাদ্যের জন্য সংগৃহীত হয়ে আসছে। ধানখেতে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এসব প্রজাতির জীব বিষক্রিয়ায় মারা গেছে। এদের প্রজনন হার কমে গেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবুজ বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ার পর দেখা গেল কৃষকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার শুরু করেন এটা ভেবে যে এর ফলে ফলন বেড়ে যাবে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলে ধান উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয় মূলত পোকামাকড়, পঙ্গপাল, আগাছাসহ নানা বালাই দমন করার জন্য। আশঙ্কার ব্যাপার হলো কৃষিতে ব্যবহৃত এসব কীটনাশকের বড় একটি অংশ টার্গেট পোকামাকড় বা পঙ্গপাল দমনে কাজ করে না। বরং অব্যবহৃত থেকে মাটি ও পানির দূষণ ঘটায়। মাটি ও পানি থেকে এসব কীটনাশক খাদ্যচক্রে ছড়িয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে তা মানবদেহে প্রবেশ করে এবং পরিশেষে ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ইরি ধানের ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়। এর আগে মানুষ বছরে নির্দিষ্ট মৌসুমে ধান উৎপাদন করত। খাদ্যের বিশাল চাহিদা এবং ঘাটতির দিকে খেয়াল রেখে এ জাতের ধানের আবাদ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। পাশাপাশি এ সময় উচ্চফলনশীল জাতের ধান আবাদ শুরু হয়। উচ্চফলনশীল ধানের জন্য নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হয় অর্থাৎ ফসলে পরিমিত সার ও কীটনাশক দিতে হবে। যেহেতু এগুলো নতুন প্রজাতি, আমাদের স্থানীয় পোকামাকড়ের আক্রমণ এগুলোর জন্য সহনশীল ছিল না। ফসলকে পোকামাকড় থেকে বাঁচাতে শুরু হলো কীটনাশক প্রয়োগ।

শুধু কৃষি নয়, বরং মশা নিধনের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া প্রশমনের জন্যও কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে একসময় ম্যালেরিয়ার বেশ প্রকোপ ছিল। সত্তরের দশক বা এর কাছাকাছি সময় ম্যালেরিয়ার জীবাণু বাহক মশা নিধনের জন্য কীটনাশকের ব্যবহার শুরু হতে থাকে। এর মধ্যে প্রধান হলো ডিডিটি। এ শ্রেণীর কীটনাশক সাধারণত পরিবেশেও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি পানিতে দ্রবীভূত হয় না এবং জীবদেহের চর্বিতে জমে থাকে। ফলে এটি রেচন প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে নির্গত না হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হতে থাকে।

মশা ও কীটপতঙ্গ দমনে যখন ডিডিটির ব্যবহার শুরু হলো তখন মানুষ বুঝতে পারেনি এটি প্রকৃতিতে এত দীর্ঘস্থায়ী হব। আর্থসামাজিকভাবে আমাদের অধিকাংশ কৃষকের নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে, যার ফলে তাদের ব্যবহৃত বিপজ্জনক পদ্ধতি পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে। পোকামাকড় দমনের জন্য সবসময় কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে এগুলোর মধ্যে একধরনের কীটনাশক সহনশীলতা তৈরি হয়েছে। এসব পোকামাকড় পরিণত হয়েছে ভয়ানক দানবে। আবার দিন দিন রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়ায় খাদ্যের বিশুদ্ধতাও বিনষ্ট হচ্ছে।

কীটনাশকের ব্যবহার সম্পর্কিত জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে কৃষক এনড্রিন, এলড্রিন, ডাইএলড্রিন জাতীয় অর্গানোক্লোরিন কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন। ভয়াবহ কথা হলো শুধু কৃষিতে নয়, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের জন্যও এ কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। যেমন শুঁটকি মাছকে পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য ডিডিটি দেয়া হতো। আর এটি মাধ্যমেও মানবদেহে কীটনাশক জমা হতে থাকে।

রাচেল কার্সনের ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ বইটিতে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর কীটনাশকের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে যে আলোচনা করা হয় তা বিশ্বব্যাপী গবেষক ও জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরে ১৯৭২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডিডিটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কারণ এটি টার্গেটের বাইরেও উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষতি করে। একই সঙ্গে টিস্যুতে জমা হওয়ার এবং টিকে থাকার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতার কারণে বাস্তুসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সৃষ্টি করে।

অর্গানোক্লোরিন কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পরিমাণে এগুলো জমা ও ব্যবহার হতে থাকে। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে এসব কীটনাশক নিয়ে এসে মজুদ করা হয়। নিষিদ্ধ জানা সত্ত্বেও কৃষকরা এটা ব্যবহার করেন। এ কীটনাশকের প্রভাব তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়, অর্থাৎ স্প্রে করার সঙ্গে সঙ্গে পামরি পোকা ও মাজরা পোকা মারা যায়। এসব কীটনাশক প্রয়োগের মাত্রা বা এগুলো ব্যবহারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও কৃষকের জানা ছিল না। ফলে তা মানারও সুযোগ ছিল না।

কীটনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি কৃষকরা ফলন বাড়ানোর জন্য সার প্রয়োগ শুরু করেন। আমাদের কৃষকরা জানেন না, কী পরিমাণ জমিতে কতটুকু সার প্রয়োগ করতে হয়। তারা জানেন সার দিলেই ফলন ভালো হবে। অতিরিক্ত সার উদ্ভিদ গ্রহণ করে না। সেটি মাটি ও পানিতে যুক্ত হয়ে মাটির উর্বরতা নষ্ট ও পানির দূষণ ঘটাল। অব্যবহৃত অতিরিক্ত কীটনাশক ও সারের বড় অংশ নদী হয়ে চলে গেছে আমাদের উপকূলীয় এলাকায়। সেখানকার মাটি-পানিও প্রচণ্ড রকম দূষিত হলো।

উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য আধুনিককালে নতুন কীটনাশক বাজারে এল এবং অর্গানো ফসফরাস, কার্বামেট এগুলোর ব্যবহার শুরু হলো। এগুলোও কৃষকরা সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করতে না পারায় এর ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কীটনাশক দিয়ে পামরি পোকা নিধনের কারণে এর খাদক ব্যাঙও প্রকৃতি থেকে হারাতে শুরু করেছে। ব্যাঙ কমে গেলে পামরি পোকা বেড়ে যায়। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা খুবই সাজানো। যখনই আমরা এটাকে এলোমেলো করে ফেলি তখন প্রকৃতিও আমাদের নানাভাবে ভোগান্তিতে ফেলে দেয়। পামরি পোকার আক্রমণ বেড়ে গেলে ফসল ব্যাপক আকারে নষ্ট হতে থাকে। ফলে এটি মারার জন্য কীটনাশকের ব্যবহার আরো বাড়ল। ব্যাঙ যে পোকা খেয়ে কমাত, সেটি এখন ক্ষতিকর কীটনাশক দিয়ে কমাতে হচ্ছে। কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে প্রকৃতিতে পাখি মরল, মাছ মরল, সাপ মরল, শামুক হারিয়ে গেল। আমরা মারতে চেয়েছি ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, কিন্তু আদতে মারা পড়েছে অনেক প্রাণী। জীববৈচিত্র্যের হিসাব নিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ব্যাঙ, সাপ, গুঁইসাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং এগুলোর সঙ্গে কীটনাশক ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে।

এখন আমরা কিন্তু সার আর কীটনাশক থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। মাটির উর্বরতার জন্য তাকে এসব দিতেই হচ্ছে। যেমন আমরা অসুস্থ হলে ওষুধ ধরে ফেলি। সেটি কিন্তু একেবারে ছাড়া যায় না। আমাদের মাটি- পানি এখন ওসব না পেলে ভালো ফলন ফলাতে পারে না। যদিও আমরা এখন আর ক্ষতিকর অর্গানোক্লোরিন কীটনাশক ব্যবহার করি না, তবে যেটা নিরাপদ জেনে ব্যবহার করছি, অদূরভবিষ্যতে হয়তো দেখা যাবে এটাই পরিবেশের জন্য এক বিরাট ক্ষতি বয়ে এনেছে। কে জানে হয়তো আমরা বলব এটাও নিষিদ্ধ করে দাও। আরো সহনশীল কীটনাশক আনো। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে আমাদের বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হয়েছে। আমাদের জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতির স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশকের মধ্যে ট্রায়াজোলোপাইরিমিডিন, ট্রাইকেটোন এবং আইসোক্সাজোল ভেষজনাশক, স্ট্রোবিলুরিন এবং অ্যাজোলোন ছত্রাকনাশক, ক্লোরোনিকোটিনাইল, স্পিনোসিন, ফাইপ্রোল ডায়াসিলহাইড্রাজিন এবং অর্গানোফসফেট কীটনাশকের মতো নতুন রাসায়নিক বাজারে আনা হয়েছে। এগুলো স্বল্পমাত্রায় অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে কিলোগ্রামের পরিবর্তে গ্রামেও ব্যবহার করা যায়।

যে পেটের ক্ষুধা মেটাতে প্রকৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছি, এর বিপরীতে আরো বড় সমস্যা আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। জটিল রোগ, প্রাকৃতিক সমস্যা আমাদের বেঁচে থাকাকে জটিল করে তুলছে। আমরা হয়তো বেঁচে আছি। কিন্তু আমাদের এ বেঁচে থাকা ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটা আরো আশঙ্কাজনক।

ব্যবহারের বাইরে সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময়ও কীটনাশক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। অপব্যবহারের কারণে কীটনাশকের বিষক্রিয়ার অনেক ঘটনা ঘটছে। কৃষকদের স্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাবের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতাও হ্রাস পেয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে খাদ্য সরবরাহ এবং পানীয়, স্নান ও কাপড় ধোয়ার জন্য ব্যবহৃত জলাশয়ে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যার ফলে কৃষক এবং সাধারণ জনগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কীটনাশক বিষক্রিয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। আশির দশকে রেডিওতে একটি বিজ্ঞাপন শোনা যেত ‘ফুরাডান মানে আরো ধান’, যেটির ব্যাখ্যা বিভিন্ন হতে পারে; মনে হতে পারে কীটনাশক ফুরাডান ব্যবহার করলেই বুঝি ধানের ফলন বেড়ে যাবে। আসলে বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। এ ধরনের বিজ্ঞাপনে আরো কৌশলী হওয়া উচিত ছিল। ২০১৪ সালের তথ্যমতে, ফসল সুরক্ষার জন্য দেশে ২৪২টি ট্রেড নামে ৮৪টি রাসায়নিকের নিবন্ধন রয়েছে। বাংলাদেশ ফসল সুরক্ষা সমিতির ২০২২ সালের তথ্যমতে, বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক রয়েছে যার মধ্যে ১৬০টি ফর্মুলায় ২ হাজার ৫০২টি ব্র্যান্ড, ছত্রাকনাশকের ১০৩টি ফর্মুলায় ১ হাজার ৫০টি ব্র্যান্ড এবং ৬৮টি ফর্মুলায় ৩৫টি ব্র্যান্ড। এর বাইরে রয়েছে স্বল্পসংখ্যক অ্যাকারিসাইড, শস্য সংরক্ষণের কীটনাশক এবং ইঁদুরনাশকের ফর্মুলেশন ও ব্র্যান্ড। এসব কীটনাশক নিত্যব্যবহার করা হচ্ছে দেশব্যাপী।

কৃষিজাত পণ্য ও শুঁটকি মাছকে পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় হরহামেশা। এ কারণে নিয়মিত যারা শুঁটকি মাছ খেয়ে থাকেন, তাদের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই কীটনাশক সঞ্চিত হয় এবং পর্যায়ক্রমে তা বাড়তে থাকে। কিন্তু ভয়ংকর কথা হলো মায়ের দুধেও কীটনাশক ডিডিটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ শুঁটকি মাছ গ্রহণকারীদের মধ্যে বেশি। পর্যায়ক্রমে এ ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান শিশুর শরীরে ঢুকছে। তার মানে হলো এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আমরা হিরোশিমা-নাগাসাকির কথা বলি। সে সময়ের তেজস্ক্রিয়তার কারণে এখনো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয়রা। অর্গানোক্লোরিন পেস্টিসাইডের কারণেও যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

বাংলাদেশের বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য অধিক ফসল উৎপাদন আবশ্যক এ কথা সত্যি, তেমনি জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিরাপদ আবাদও জরুরি। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পোকামাকড় মোকাবেলায় কীটনাশক অপরিহার্য। তবে এর অত্যধিক ব্যবহার এবং অপব্যবহারের কারণে গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং আর্থসামাজিক চ্যালেঞ্জের দিকটিতেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া উচিত। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির সবজি চাষকারী কৃষকরা উৎপাদন প্রক্রিয়াজুড়ে কীটনাশকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেন। কৃষকদের প্রায়ই সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব থাকে। এর ফলে বিপজ্জনক কীটনাশকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে পোকামাকড়ও কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে ওঠায় টেকসই কৃষিকে আরো জটিল করে তুলছে। কীটনাশকসহ নানা রাসায়নিক কৃষিতে যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে জীবন রক্ষাকারী খাবার এখন জীবন সংহারী হয়ে উঠছে।

লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও