বাংলাদেশে বিদ্যুৎ অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সড়ক ও পরিবেশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে ইডকল। এসব খাতের বাইরে ইডকলের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা কী?
ইডকল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যে খাতগুলো দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নমূলক প্রভাব তৈরি করে, সেই খাতগুলোয় বিনিয়োগ করছে। আমাদের ইনভেস্টমেন্ট ডিপার্টমেন্ট ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্য নিয়েছে, যার মধ্যে গ্রিন ট্রান্সপোর্ট, আইসিটি, সিএমএসএমই, স্টার্টআপ ও রিয়েল এস্টেটের মতো পাঁচটি নতুন খাত আছে।
অন্যদিকে আমাদের রিনিউয়েবল এনার্জি ডিপার্টমেন্ট প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়েছে। চলমান রুফটপ সোলার, গ্রিড-টাইড আইপিপি ও সোলার সেচ প্রকল্প ছাড়াও তারা ১০টি নতুন উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যেমন ফ্লোটিং সোলার, উইন্ড পাওয়ার, ওয়েস্ট-টু-এনার্জি, এগ্রো-পিভি, উপকূলীয় বনায়ন (জলবায়ু অভিযোজন), ইলেকট্রিক ভেহিকল, সোলার কোল্ড স্টোরেজ, চার্জিং স্টেশন ও ছোট দ্বীপে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ।
এ বহুমাত্রিক পরিকল্পনা বাংলাদেশে টেকসই অর্থায়নের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইডকলকে আরো শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে। সরকারের এ উৎসাহে ইডকল নতুন বিনিয়োগে কী ধরনের পলিসি নিয়েছে?
সরকারের এ অগ্রাধিকার আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনার (স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান) সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ইডকল এখন পলিসি অ্যালাইন্ড অর্থায়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে, বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই অবকাঠামো ও সবুজ পরিবহনে। পাশাপাশি আমরা বন্ড ইস্যু, বিদেশী ক্রেডিট লাইন ও ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সের মতো আধুনিক অর্থায়ন মডেল তৈরি করছি, যাতে বিদেশী বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও খরচ কমানো যায়। আমরা ঝুঁকি ভাগাভাগির অংশীদার হিসেবে প্রকল্পগুলোকে বিনিয়োগযোগ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছি।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তির বিভিন্ন খাতে ইডকলের বিনিয়োগ রয়েছে। ক্লিন এনার্জির প্রসারে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়াতে এ খাতের বিনিয়োগের আকার কত এখন?
এখন পর্যন্ত ইডকল ১৬৫ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার, ৩৩৩ মেগাওয়াট গ্রিড-টাইড আইপিপি, ১ হাজার ৪৯৫টি সোলার সেচ পাম্প, ৭১ হাজার বায়োগ্যাস প্লান্ট এবং ৪১ লাখ উন্নত চুলায় অর্থায়ন করেছে।
আগামী দিনে রিনিউয়েবল এনার্জি ডিপার্টমেন্টের লক্ষ্য হলো প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে ৩ দশমিক ২ গিগাওয়াট রুফটপ সোলার, ২ দশমিক ১ গিগাওয়াট গ্রিড-টাইড সোলার ও উইন্ড, এক কোটি পরিবারের জন্য উন্নত চুলা এবং ১০ হাজার সোলার সেচ পাম্প বাস্তবায়িত হবে।
এছাড়া আমরা ১০টি নতুন উদ্যোগ চালু করছি যেমন ফ্লোটিং সোলার, এগ্রো-পিভি, ওয়েস্ট-টু-এনার্জি, ইলেকট্রিক ভেহিকল, সোলার কোল্ড স্টোরেজ ইত্যাদি। আমরা ঝুঁকি কমানো, স্বল্পসুদে ঋণ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে লাভজনক ও আকর্ষণীয় করে তুলছি।
ইডকলের মাধ্যমে বিদেশী বিভিন্ন দাতা সংস্থা অর্থায়ন করছে। প্রায় তিন দশক হলো প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা। এ যাত্রায় বিদেশী বিনিয়োগ পেতে ইডকল নতুন কোনো চালেঞ্জ দেখছে কিনা?
সুশাসন ও ভালো ট্র্যাক রেকর্ডের কারণে উন্নয়ন অংশীদাররা এখনো ইডকলের ওপর আস্থা রাখছে। তবে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার বর্তমানে কিছুটা জটিল। সুদের হার বৃদ্ধি, কঠোর যাচাই-বাছাই এবং বাড়তি ইএসজি মানদণ্ড এখন নতুন বাস্তবতা। এ পরিস্থিতিতে ইডকল ক্লাইমেট ফান্ড, ডিএফআই, শেয়ারবাজার ও কার্বন ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে আমরা ইমপ্যাক্ট মেজারমেন্ট ও রিপোর্টিংকে শক্তিশালী করছি, যাতে প্রতিটি ডলার বিনিয়োগের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা যায়।
বৈশ্বিকভাবে কার্বন কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বদ্ধপরিকর। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশের উন্নয়নে ইডকল কোন বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে?
আমাদের অগ্রাধিকার প্রকল্প ও প্রোগ্রামগুলো সরাসরি বাংলাদেশের এনডিসি ও বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে:
জ্বালানির ডিকার্বনাইজেশন: সোলার, উইন্ড ও পরিচ্ছন্ন রান্নার ব্যবস্থা
সবুজ পরিবহন: ইভি অর্থায়ন ও সৌর চার্জিং
কার্বন ক্রেডিট: ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ লাখ সিইআর উৎপাদন
জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প: উপকূলীয় বনায়ন ও সোলার কোল্ড স্টোরেজ
কার্বন কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বাড়ায় এমন প্রকল্পগুলোয় আমরা এখন বেশি জোর দিচ্ছি।
ইডকলের অর্থায়ন নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করছে। সামনের দিনগুলোয় স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে ও ঋণ প্রবৃদ্ধি নিয়ে পরিকল্পনা কী?
আমাদের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ঋণ পোর্টফোলিও ২৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা, যেখানে অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনুপাত হবে প্রায় সমান (অবকাঠামো ৫১ ও নবায়নযোগ্য ৪৯ শতাংশ)। স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে আমরা দেশীয় বন্ড ইস্যু, সিএমএসএমই অর্থায়ন এবং স্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের উদ্যোগ নিচ্ছি। প্রতিটি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আমরা ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজে লাগাতে চাই, যাতে তার বহুগুণ পুঁজি বিনিয়োগ হয়।