আলুর ন্যায্যমূল্যে বাধা রফতানি নীতির জটিলতা ও বাজার ব্যবস্থাপনা সংকট

রংপুরকে বলা হয় আলুর ভাণ্ডার। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রতি বছরই কৃষকরা লাভের আশায় প্রচুর পরিমাণে এ ফসল চাষ করেন। প্রতি বছর জুলাইয়ের পর থেকেই কৃষক হিমাগারে রাখা আলু বাজারজাত করতে শুরু করেন।

রংপুরকে বলা হয় আলুর ভাণ্ডার। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রতি বছরই কৃষকরা লাভের আশায় প্রচুর পরিমাণে এ ফসল চাষ করেন। প্রতি বছর জুলাইয়ের পর থেকেই কৃষক হিমাগারে রাখা আলু বাজারজাত করতে শুরু করেন। কারণ অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে নতুন আলু উঠতে শুরু করে। তখন পুরনো আলুর চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। কিন্তু এবার চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি হওয়ায় বাজারে জোগান বেড়ে গেছে। এতে ভোক্তাপর্যায়ে দাম কমে গেছে ব্যাপকভাবে। সরকার হিমাগার গেটে আলুর ন্যূনতম মূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও তা মানা হয়নি। এ অবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে কৃষক।

অনেক চাষী বলছেন, হিমাগার থেকে আলু বের করে কম দামে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না। তাই অনেকেই আপাতত আলু বাজারজাত না করে অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু নতুন আলু বাজারে উঠতে শুরু করলে পুরনো আলুর চাহিদা আরো কমে যাবে। তখন লোকসান ছাড়া বিক্রির আর কোনো উপায় থাকবে না।

পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামের কৃষক মো. মোকসেদুল ইসলাম। কৃষির প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মানুষটির মূল স্বপ্ন ছিল আলু উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি। তিনি ভেবেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পেলে একদিকে যেমন লাভ হবে, অন্যদিকে এলাকার অন্যান্য কৃষকও উদ্বুদ্ধ হবেন। এজন্য তিনি জমি বন্ধক রেখে ন্যাশনাল ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক থেকে মোট ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন।

মোকসেদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদেশে আলু পাঠাব ভেবেই আমি এত বড় ঝুঁকি নিয়েছি। রফতানিযোগ্য আলুর জন্য জমিতে ব্যাপকভাবে চাষ করেছি। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতায় শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।’ সরকারিভাবে কোনো সহায়তা না পাওয়া, রফতানির নীতিগত জটিলতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা তাকে হতাশ করেছে বলেও জানান।

চলতি মৌসুমে দুই একর জমিতে সানশাইন ও এস্টারিচ জাতের আলু চাষ করেছিলেন কৃষক মোকসেদুল। প্রতি একরে প্রায় ১২ হাজার কেজি আলু উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদন খরচ হিসেবে প্রতি কেজির খরচ পড়েছে গড়ে সাড়ে ১৯ টাকা, আর একরপ্রতি খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে সার, বীজ, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন এবং হিমাগারের ভাড়া।

সরকারি উৎস থেকে মোকসেদুল প্রতি কেজি আলুর বীজ ৬৫ টাকা এবং বেসরকারি উৎস থেকে ১১০ টাকা দরে কিনেছিলেন। মৌসুমে মাঠ থেকে কিছু আলু বিক্রি করেছিলেন সাড়ে ৮ টাকা থেকে ১০ টাকা কেজি দরে। তবে বেশি লাভের আশায় গত মে মাসে প্রতি কেজি ১২ টাকা দরে আলু কিনে নিজের উৎপাদিতসহ মোট ৭৫ টন আলু হিমাগারে মজুদ করেন। বর্তমানে হিমাগার গেটে আলুর দাম কেজিপ্রতি ১২ টাকা। অথচ হিমাগারে রাখা এক বস্তা (৬০ কেজি) আলুর জন্য ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন খরচ ১২০ টাকা যোগ হচ্ছে। সব মিলিয়ে এক বস্তার খরচই দাঁড়াচ্ছে ৫২০ টাকা। এ অবস্থায় ৬০ কেজি আলু ১২ টাকা দরে বিক্রি করলে পাওয়া যাচ্ছে ৭২০ টাকা। খরচ বাদ দিলে হিমাগারে রাখা প্রতি কেজি আলুর দাম দাঁড়াচ্ছে মাত্র ৩ টাকা ৩৩ পয়সা। ক্ষোভ প্রকাশ করে এ কৃষক বলেন, ‘হিমাগার থেকে আলু তুললে খরচই মেটানো যাবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপাতত তা হিমাগারেই রেখে দেব।’

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ৪০টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭৪৭ টন। এর মধ্যে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৯১৮ টন।

মোকসেদুলের অভিযোগ, সরকার হিমাগার গেটে আলুর সর্বনিম্ন দাম ২২ টাকা কেজি নির্ধারণ করলেও তা কার্যকর হয়নি। ফলে কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘সরকার আলু রফতানির যে ঘোষণা দিয়েছে তা কার্যকর হলে চাষীরা কিছুটা হলেও ন্যায্যমূল্য পাবেন। এছাড়া আগামী মৌসুমে যে প্রণোদনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হলেও উপকৃত হবেন কৃষক। তবে আগামী নভেম্বর থেকে বাজারে নতুন মৌসুমের আলু উঠতে শুরু করবে। তাই সরকারের ঘোষিত কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে অধিকাংশ আলুচাষীর ভাগ্য ফেরার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।’

কৃষক মোকসেদুলের মতো হাজারো কৃষক একই সমস্যায় ভুগছেন। একদিকে ঋণের চাপ, অন্যদিকে বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়া—সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৫৫ হাজার টন, আগের মৌসুমে হয়েছিল ১৫ লাখ ৪২ হাজার টন।

লেখক: বণিক বার্তা প্রতিনিধি, রংপুর

আরও