কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই আইন ও বিধিমালায় হাত দিতে হবে

বাংলাদেশের কৃষি খাত এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার ব্যাপক সুযোগ আছে। আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

বাংলাদেশের কৃষি খাত এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার ব্যাপক সুযোগ আছে। আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। কৃষিতে অধিক শ্রমশক্তি কাজ করলেও জিডিপি কন্ট্রিবিউশন খুবই কম। জিডিপি ও শ্রমশক্তির অনুপাত অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অধিকসংখ্যক শ্রমশক্তি কৃষিতে নিয়োজিত, যার অধিকাংশ দরিদ্র। তাই কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপন করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, ফসলের বিন্যাস পরিবর্তন, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ সমাধানে নজর দিয়ে কৃষিকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

১. কৃষি ফসল চাষাবাদের জন্য রাসায়নিক সার ও সেচ প্রদানের মতো কীটনাশকও একটি অত্যাবশকীয় উপাদান। কীটনাশক ব্যতীত ষোলআনা ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব। তাই উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই যেখানে কৃষি চাষাবাদ আছে, সেখানে বালাইনাশকের ব্যবহার হচ্ছে। যেমন আমেরিকা, ফ্রান্স ও জাপানের মতো উন্নত দেশে প্রতি হেক্টরে যে পরিমাণ বালাইনাশক ব্যবহার হয় তার চেয়ে আমাদের দেশে অনেক গুণ কম ব্যবহৃত হচ্ছে। ওইসব দেশের বালাইনাশক-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার সঙ্গে আমাদের দেশের আইন ও বিধিবিধানের পার্থক্য আছে। দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে ব্যবসায়ীবান্ধব পলিসি তৈরি করে এ শিল্পকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই আইন ও বিধিমালায় হাত দিতে হবে। বর্তমান আইন ও বিধির আলোকে কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আইন ও বিধি করতে হবে স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে অগ্রাধিকার দিয়ে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হলে আমরা অতি সহজে মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারব এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত করে জনস্বার্থে সংরক্ষণ করা যাবে।

২. আইপিএম নিয়ে নতুন করে ভাবার কিছু নেই। পেস্ট ম্যানেজমেন্ট বলতে যতগুলো ব্যবস্থাপনা আছে তাদের মধ্যে একটি হলো আইপিএম, যা শুরু থেকেই ছিল, এখনো আছে। আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে আমরা ফসল ফলানোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় রাসায়নিক আর কতকাল আমদানি করে চালাব। আমাদের দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি নীতিনির্ধারকরা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে বালাইনাশক স্থানীয় উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিষাক্ততার মানদণ্ড অনুযায়ী অপেক্ষাকৃত কম বিষাক্ত বালাইনাশকের ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়ে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বিধিবদ্ধ করা প্রয়োজন। গবেষণার মাধ্যমে আইপিএম ও জৈব বালাইনাশকের কার্যকারিতা নিরূপণ করে রেজিস্ট্রেশন দিতে হবে। তা না হলে অকার্যকর বালাইনাশকে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

৩. সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রথমত সমঝোতা করে একসঙ্গে কাজ করা অতীব জরুরি। সরকার বাণিজ্যিক সংগঠন ও এফবিসিসিআইয়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উন্নয়নের প্রতিকূলতা শনাক্তকরণ এবং ওইসব বাধাবিপত্তি সমাধানের আইন বিধিমালা প্রণয়নে বেসরকারি খাতকে সহায়তা করা সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ।

সরকারের সক্ষমতা প্রদর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাজস্ব আহরণে কতটুকু সক্ষম। করনীতির ত্রুটির কারণে বেসরকারি খাত পিছিয়ে থাকে। উৎপাদন ও রফতানিমুখী শিল্প স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিয়ে করনীতি সাজাতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতে নেতাদের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।

৪. অন্তর্বর্তী সরকার দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে এমন কিছু পদক্ষেপ ও সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিতে পারে, যা বিগত কোনো সরকার নিতে পারেনি। প্রথমত, কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা দিয়ে একটি কৃষি কমিশন গঠন করতে পারে। কমিশনের সদস্য হবে সরকারি ও বেসরকারি খাতে যাদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী জ্ঞানের সফলতার ইতিহাস আছে। যাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অসামান্য অবদান আছে। ওই কমিশন কৃষির প্রতিটি ক্ষেত্র একটা একটা করে ধরে ধরে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য কাজ করবে। কৃষি উৎপাদনে প্রতিটি স্তরে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করবে। যেসব উপকরণ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব তা প্রতিটি উপকরণ উৎপাদনের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগকে এমনভাবে আর্কষণীয় করে দেবে, যাতে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারী আমাদের দেশে আমদানি বিকল্প পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও রফতানির উদ্যোগ নেয়। কৃষকের উৎপাদিত ফসল দ্বারা পরিচালিত হতে পারে এমন শিল্প-কারখানায় সম্ভাব্য যাচাই করে অগ্রাধিকার ও লাভজনক শিল্পকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করে দিতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পের জোয়ার করে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হবে।

৫. বর্তমানে কীটনাশক আমদানি ও অনুমোদনে ব্যাপক সংস্কারের সুযোগ আছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ’৪৭-এ বিভাজন হওয়ার পর শুধু বাংলাদেশ এ খাতে পিছিয়ে আছে। পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ পেস্টিসাইড আইন ও বিধিমালায় দেশীয় শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন ও রফতানিমুখী শিল্প করার সরকারি উদ্যোগ প্রতিফলন প্রতীয়মান হয়নি। অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তার মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনে বাধাগুলো দূরীকরণ অতীব জরুরি। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবেলা, মাননিয়ন্ত্রণ সাশ্রয়ী মূল্যে কৃষকের ফসল সুরক্ষার স্বার্থে কীটনাশক স্থানীয় উৎপাদন করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের ভুলনীতির কারণে রাষ্ট্রের কল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান লাভবান হচ্ছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করলে পাকিস্তান, ভারত ও চায়নার মতো আমরাও কীটনাশক উৎপাদন ও রফতানি করতে পারি। আমাদের দেশে আমদানি বাণিজ্যকে আকর্ষণীয় করে রাখা হয়েছে। উৎপাদনের উদ্যোক্তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে অস্বাভাবিক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে। অর্থাৎ আমদানি শুল্ক কম, উৎপাদনের শুল্ক অস্বাভাবিক বেশি। এসব শুল্ক বাধা ও অশুল্ক বাধা দূর করা গেলে বালাইনাশক উৎপাদনে বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান ও চায়নার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপ

সভাপতি, বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন

আরও