বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় বদ্বীপ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদ-নদী ২০২৪ গ্রন্থ অনুসারে বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪১৫টি নদী রয়েছে, যার মধ্যে ৫৭টি নদী আন্তঃনদী। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই তিনটি হচ্ছে সবচেয়ে বড় নদী, যা দিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে আনুমানিক ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ও ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন পলি প্রবেশ করে। এখানে উল্লেখ্য যে পদ্মা-মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ৯৩ শতাংশ বাংলাদেশের বাইরে, কেবল ৭ শতাংশের ওপর বাংলাদেশের কর্তৃত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের নদ-নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা বুঝতে হলে আমাদের এ বিষয়টি সর্বাগ্রে অনুধাবন করতে হবে।
বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ভাটির দিকে। যার ফলে উজানের যেকোনো কার্যক্রম ভাটির নদ-নদী ও পানির ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উজান কর্তৃক যদি কোনো নদীতে পানির রিজার্ভার কিংবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি অপসারণ করা হয়, তবে ভাটি অঞ্চল শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পাবে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা তেমনি দেখতে পাই গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ কিংবা তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত গজলডোবা ব্যারাজের ফলে গঙ্গা ও তিস্তার ভাটিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আমাদের নদীগুলো তার নাব্যতা হারিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি চাষ ব্যাহত হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর তলদেশ পলিতে জমে যাওয়ায় বর্ষায় এখন অল্প প্রবাহেই অধিক এলাকা বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। জিবিএম (গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিন) বেসিনের এ ৯৩ শতাংশের ওপর যেহেতু আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই প্রয়োজন আন্তঃনদী চুক্তির মাধ্যমে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতকরণ।
আমাদের দেশের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরো কিছু বিষয় চলে আসবে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর যে কয়টি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মাঝে বাংলাদেশ অন্যতম। সর্বশেষ আইপিসিসির (ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) ষষ্ঠতম রিপোর্ট (২০২১) অনুসারে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে পুরো পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ থেকে ৪ ডিগ্রি বাড়বে। আর এ গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর সর্বত্র জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। যদি বাংলাদেশের কথা চিন্তা করি তাহলে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি বাড়বে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ দশমিক ৮৬ মিটার পর্যন্ত বাড়বে। এ পরিবর্তনের ফলে দেশের যে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হতো সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরো বাড়বে, মানে বন্যা, নদীভাঙন এসব দুর্যোগ আরো বাড়বে এবং যেসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হতো সেখানে আরো খরা দেখা দেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জোয়ারের পানি উপকূলের আরো ভেতরে প্রবেশ করবে এবং সেসব অঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা আরো বাড়বে। সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ বৃদ্ধি পাবে।
তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে আমাদের বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। আশার কথা যে এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান ২০২২ করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন প্ল্যান মোতাবেক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। এখানে আমি একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, আমাদের দেশে প্রচুর মাস্টারপ্ল্যান হয়ে থাকে, কিন্তু যেটার কমতি থাকে তা হচ্ছে একটি মাস্টারপ্ল্যান ধরে একাধিক প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। দেখা যায় যে কয়েকটি প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে করতেই আমাদের ১০-১৫ বছর পার হয়ে যায়। অতঃপর আমরা ব্যস্ত হয়ে উঠি আরেকটি মাস্টারপ্ল্যানের জন্য। এ চক্র চলতেই থাকে।
বাংলাদেশের নদ-নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের দেশের হাইড্রোলজিক বিভাজনটা প্রথমে একটু বুঝতে হবে। ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান, ন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, ডেল্টা প্ল্যান এবং ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান অনুসারে বাংলাদেশকে মোট সাতটি হাইড্রোলজিক্যাল জোনে বিভক্ত করা হয়। এ জোনগুলো বিভাজন করা হয় মূলত তাদের নিজ নিজ হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের জন্য।
যেমন প্রথমেই আসে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কথা। রংপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা এসব অঞ্চল মিলে এ এলাকা। এ এলাকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে বৃষ্টিপাত কম হয় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায়। যে কারণে কৃষিকাজে এ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহৃত হয় বেশি। ফলে বরেন্দ্র এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল প্রতি বছর নিচে নেমে যাচ্ছে। আবার এ অঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, ইছামতী ইত্যাদি। ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি না থাকার ফলে তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। আবার উল্টোদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের ফলে বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়।
এরপর আসে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কথা। সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এ অঞ্চলে পড়ে। এ অঞ্চলের মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আকস্মিক বন্যা ও আগাম বন্যা। যমুনা, পদ্মার বন্যার সঙ্গে এ অঞ্চলের বন্যার পার্থক্য হচ্ছে পাহাড়ি এলাকা হওয়ার কারণে উজানের পানি খুব দ্রুত বাংলাদেশের সীমানায় চলে আসে এবং একদিন বা কয়েক ঘণ্টায় নদীর পানির উচ্চতা কয়েক মিটার বেড়ে যায়। আকস্মিক বন্যার মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ বন্যা সম্পর্কে আগাম সতর্কবাণী পাওয়া যায় না। আর আগাম বন্যার বিষয়টা হচ্ছে যে এ অঞ্চলে যদি মধ্য এপ্রিলের পর বন্যা আসে তাহলে হাওর এলাকায় যে বোরো ধান হয় তা হারভেস্ট করা সম্ভব হয় এবং দেশের খাদ্যের ক্ষেত্রে তেমন সংকট দেখা দেয় না। কিন্তু যদি কোনো কারণে উজানে আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে আগাম বন্যা চলে আসে, তবে ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। এছাড়া এ এলাকায় নির্মিত রাস্তা এবং রাস্তাগুলোয় পর্যাপ্ত পরিমাণ কালভার্ট/ব্রিজ না থাকার ফলে জলাবদ্ধতা আরো বাড়ছে।
পরবর্তী যে অঞ্চলের কথা আসে তা হচ্ছে উত্তর-মধ্যাঞ্চল যা ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী এসব এলাকা নিয়ে গঠিত। ঢাকাকে বন্যা, প্লাবন থেকে মুক্ত রাখার জন্য একসময় ডিএনডি বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং এর চারপাশের নদীগুলো বরাবর একাধিক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। ফলে ঢাকা বন্যামুক্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বর্ষার সময় ঢাকার ভেতরের পানি নিষ্কাশন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত খালের অভাব, খাল ভরাট হয়ে যাওয়া, খাল দখল হয়ে যাওয়া, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের অভাব, পর্যাপ্ত পাম্পের অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবসহ একাধিক কারণে ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন নিত্যবর্ষার সঙ্গী।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকার চারপাশে অবস্থিত তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু এসব নদ-নদীর দূষণ। বিভিন্ন শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য, বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্যের কারণে ঢাকার মতো ঘনজনবসতির মানুষের প্রয়োজনীয় সুপেয় পানি এ নদীগুলো থেকে আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ পানির চাহিদা মেটাতে ঢাকায় অজস্র গভীর-অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল প্রতি বছর তিন মিটার করে নেমে যাচ্ছে। বর্তমানে পানির লেভেল ভূপৃষ্ঠ থেকে কোথাও কোথাও প্রায় ৬০ মিটারের বেশি নিচে নেমে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল নিচে নেমে যাওয়ার ফলে ঢাকা শহর ভূমিধসের মতো হুমকির মুখে রয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমি একটি বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। জাতীয় পানি নীতি (১৯৯৯), পানি আইন (২০১৩) ও পানি বিধিমালা (২০১৮) সব ক্ষেত্রেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ব্যাপারে নিরাপদ সীমার কথা স্পষ্টভাবে বলা রয়েছে এবং ওয়ারপোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এ নিরাপদ সীমা নির্ধারণের। সম্প্রতি ওয়ারপো এ নিরাপদ সীমা নির্ধারণে বেশকিছু সমীক্ষা হাতে নিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘদিন এ ক্ষেত্র বিশেষভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। আমাদের ভূগর্ভস্থ পানিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ আরো বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ মূলত একটি সমতলভূমি। আমাদের পক্ষে চাইলেও বাঁধ বা রিজার্ভার বানিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানিকে ধারণ করে রাখা সম্ভব হবে না। কিন্তু আমরা চাইলে বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি ভূগর্ভে সংরক্ষণ করতে পারি। ওয়ারপোর কার্যক্রম মূলত পলিসি ও নীতিনির্ধারকের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতো প্রকল্প প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন নয়। তাই আমি মনে করি আমাদের যেমন পানি উন্নয়ন বোর্ড রয়েছে, হাওর ও জলাভূমির জন্য যেমন আলাদা অধিদপ্তর রয়েছে, তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির জন্য পৃথক ও স্বাধীন একটি অধিদপ্তর তৈরি করা যেতে পারে। তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির যথাযথ ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে।
এবার আসি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কথায়। সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, ভোলা,সহ সব দক্ষিণ উপকূল অঞ্চল এ জোনে পড়ে। এ অঞ্চলের সমস্যার মধ্যে যেসব সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়/জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততার সমস্যা, পোল্ডারাইজেশনের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কথা অন্যতম। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে জোয়ারের পানি উপকূলের আরো ভেতরে প্রবেশ করবে। নিম্নাঞ্চলগুলো আরো বেশি প্লাবিত হবে। এরই মধ্যে ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গা ও পদ্মায় পানি কমে যাওয়ার কারণে গড়াই, মধুমতী, বলেশ্বর, পশুর, কপোতাক্ষ—এসব নদ-নদীতে শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে কোনো পানিপ্রবাহ থাকে না বললেই চলে। যার ফলে এসব নদীতে জোয়ারের পানি বেশি আসায় নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও নদীর তলদেশ প্লাবনভূমি থেকে উঁচু হয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হয় না। যশোরের ভবদহ, সাতক্ষীরার তালা উপজেলাসহ অনেক এলাকায় বছরের ছয় মাস বুকসমান পানি জমে থাকে। উপরন্তু এসব নদীতে পানিপ্রবাহ না থাকায় লবণাক্ত পানি উপকূলের আরো ভেতরে চলে আসছে। তাই আমাদের প্রয়োজন এ আন্তঃনদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা। পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না পাওয়া গেলে এ নদীগুলোর নাব্যতার সমস্যা থাকবেই এবং এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েই যাবে।
এর পরের অঞ্চল হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল যা কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী এ এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত। এখানকার মূল সমস্যাগুলোর একটি প্রভাব হচ্ছে সম্প্রতিকালে ঘটে যাওয়া ফেনী নদীর আকস্মিক বন্যা। এটিও একটি আন্তঃনদী। এ মূল পাঁচটি অঞ্চলের বাইরে আরো দুটি অঞ্চল দেখানো হয়েছে। একটি হচ্ছে চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন এসব এলাকার পাহাড়ি অঞ্চল। এ অঞ্চলে আমাদের হালদা নদী, কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, নাফ এ নদীগুলো রয়েছে। আমাদের দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কাপ্তাইয়ে রয়েছে। এ অঞ্চলে তিনটি আন্তঃনদী রয়েছে, যা মিয়ানমার থেকে এসেছে। এ অঞ্চলের পাহাড়ি পানির ঢলের সঙ্গে ভূমিধস একটি বড় দুর্যোগ। এ অঞ্চলে রয়েছে আমাদের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এবং একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাড় ভাঙা বরাবর আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা।
পাহাড়ি অঞ্চল ব্যতীত শেষ যে অঞ্চলটিকে আলাদা করে বিভাজন করা হয়েছে তা হচ্ছে দেশের বৃহৎ নদ-নদী ও জলাভূমিকে। এ নদ-নদী ও জলাভূমি হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমাদের দেশে হয়তো অনেক দেশের মতো অফুরন্ত গ্যাস, কয়লা, পাথরের মতো সম্পদ নেই, কিন্তু আমাদের রয়েছে এক বিশাল নদ-নদীর নেটওয়ার্ক, বহু হাওর, বিল ও উপকূলীয় অঞ্চল। এ নদ-নদী দিয়ে প্রতি বছর ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন ঘনমিটার মিঠা পানি এবং ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন পলি প্রবাহিত হয়। আমরা যদি এ পানি ও পলিকে যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারি তাহলে অনেক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।
সমস্যা হচ্ছে ভূ-উপরিস্থ সব পানি এবং নদ-নদীগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের—বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের, যেখানে পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না। বাংলাদেশের সব নদ-নদী ও জলাভূমিকে সচল করতে যে পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন, সে রকম কোনো পরিকল্পনাই সরকারের বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব কোনো মহাপরিকল্পনাও নেই। তারা কাজ করে ডেল্টা প্ল্যান বা মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত চাহিদার ভিত্তিতে। গত সরকারের আমলে ৬৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচি কিছুটা শুরু হয়েছে। কিন্তু দেশের সব নদ-নদীর যে পর্যায়ক্রমিক খনন কর্মসূচির প্রয়োজন সে রকম কোনো প্রস্তাব পরিলক্ষিত হয়নি। তবে এখানে উল্লেখ্য যে যেকোনো খনন কর্মসূচির ক্ষেত্রে খননকৃত মাটি বা পলি কীভাবে ব্যবহৃত হবে সেটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে একটি পরামর্শ হতে পারে মাটি বা পলি দিয়ে সমুদ্রের উপকূলীয় এলাকায় ল্যান্ড রিক্লেমেশনের প্রজেক্ট নেয়া যেতে পারে।
এবার আসা যেতে পারে আন্তঃনদীর বিষয়টি নিয়ে। আমরা এরই মধ্যে বলেছি যে বাংলাদেশে মোট ৫৭টি আন্তঃনদী রয়েছে, যার মধ্যে ৫৪টি ভারতের সঙ্গে আর তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে। এর মধ্যে কেবল একটি নদীর হিস্যা নিয়ে চুক্তি রয়েছে—গঙ্গা চুক্তি। ২০২৬ সালে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় আমাদের সময় এসেছে একটি নতুন চুক্তির জন্য আলোচনা করা এবং আগের চুক্তির দুর্বলতাগুলোকে অ্যাড্রেস করা। গঙ্গা চুক্তির ব্যাপারে দেশে-বিদেশের অনেকেই লেখালেখি করেছেন এবং জার্নাল পেপারও প্রকাশ করেছেন।
আমার মতে বর্তমান চুক্তির সমস্যাগুলো হচ্ছে: ১. এখানে ফারাক্কা ব্যারাজের পানিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে চুক্তিটি করা হয়েছে। ফলে ফারাক্কার উজানে ভারত কত পানি প্রত্যাহার করছে সে সম্পর্কিত কোনো তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ২. এই চুক্তির গ্যারান্টি ক্লজ অনুসারে ভারত তার নির্দিষ্ট দশ দিনে পানি প্রত্যাহার করলেও পরের দশদিনে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য পানি পায়নি প্রাপ্যতার অভাবে। দেখা গেছে, ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মোট ৬৫ শতাংশ সময়ে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য পানি পায়নি। ৩. বর্তমান চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতের পানির প্রবাহ হ্রাস বা বৃদ্ধির বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা হয়নি। ৪. বর্তমান চুক্তিতে নদীর নিজের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় পানি, যেটিকে আমরা ইনস্ট্রিম ফ্লো বলি সেটাকে বিবেচনায় আনা হয়নি। ২০২৬-এ অবশ্যই নতুন চুক্তি করা লাগবে এবং সেই চুক্তিতে এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অন্যান্য আন্তঃনদীকেও চুক্তির আওতায় এনে দেশের প্রাপ্য পানির হিস্যা বুঝে নেয়া কর্তব্য।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। আপনারা জানেন যে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পানিবিষয়ক কনভেনশন, ১৯৯২-এ স্বাক্ষরকারী একটি দেশ হয়েছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ এবং এর জন্য অবশ্যই বর্তমান সরকারের ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে ১৯৯২-এর কনভেনশনের মূল বিষয় আন্তঃনদীর পানির দূষণ নিয়ে। সেখানে পানির ন্যায্য হিস্যাটি মূল প্রতিপাদ্য নয়, যা আসলে ১৯৯৭-এর কনভেনশনে আছে। আমাদের উচিত ১৯৯২ কনভেনশনের পাশাপাশি ১৯৯৭-এর কনভেনশনেও স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া; যদি আমরা আসলেই আমাদের অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা পেতে চাই। আশা করি, বর্তমান সরকার এবং পরবর্তী সময়ে যারাই সরকারে আসুক না কেন তারা বিষয়টি বিবেচনায় রাখবে।
এবার কিছু নদ-নদীসংক্রান্ত কিছু সমসাময়িক ঘটনার অবতারণা করতে চাই। আমরা বেশ কিছুদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং যমুনা নদীকে সংকোচনসংক্রান্ত পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন পত্রিকা মারফত শুনতে পাই। একজন রিভার মরফোলজিস্ট হিসেবে বলতে পারি, তিস্তা, ধরলা, যমুনা, এগুলো হচ্ছে ব্রেইডেড রিভার। একটি ব্রেইডেড রিভারকে রিভার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে এর চওড়া কমিয়ে আনা বাস্তবসম্মত কিনা, তা নিরূপণে যথেষ্ট সমীক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজন। ব্রেইডেড রিভারের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পানির প্রবাহের সঙ্গে আসা প্রচুর পরিমাণ পলি। এ পলিগুলো জমে একটি নদী তার নাব্যতা হারায়, যার ফলে নদী আরো চওড়া হয়। তাই এ পলিকে খননের মাধ্যমে অপসারণ করা যেতে পারে, কিন্তু নদীর চওড়া কমিয়ে সেটিকে ধরে রাখা যাবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মহাপরিকল্পনার যে প্রাথমিক রিপোর্ট দেয়া হয়েছে সেখানে এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য বা সমীক্ষা দেখানো হয়নি এবং কোনো গাণিতিক কিংবা ফিজিক্যাল মডেলিং করে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। তাই আমি আশা করব প্রকল্প নেয়ার আগে যথাযথ গাণিতিক ও ফিজিক্যাল মডেলিং স্টাডি করা হবে।
আরেকটি বিষয় নিয়েও সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হতে দেখেছি সেটি হচ্ছে চলনবিলের মধ্যে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাটি ভরাট করা হচ্ছে, যা পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পানি আইন, ২০১৩ এবং বিধিমালা ২০১৮-এ সুস্পষ্টভাবে বলা রয়েছে, জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করে এমন কোনো স্থাপনা করতে হলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। ওই প্রকল্পের ছাড়পত্র কীভাবে দেয়া হলো বা ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব কতটুকু হয়েছে সেগুলো কতটুকু বিবেচনায় রাখা হয়েছে এগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় আমি উল্লেখ করব, যেকোনো প্রকল্প ছাড়পত্র পেতে সবাই মূলত পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিয়ে থাকে। কিন্তু পানি আইন (২০১৩) এবং পানি বিধিমালায় (২০১৮) সুস্পষ্টভাবে বলা রয়েছে যে ভূগর্ভস্থ পানি এবং জলপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এমন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ওয়ারপো থেকেও ছাড়পত্র বা অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত করতে হলে পরিবেশ ছাড়পত্রের পাশাপাশি ওয়ারপো থেকে ছাড়পত্র নেয়ার বিষয়টিকেও বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সবশেষে আমি এটি উল্লেখ করতে চাই যে বাংলাদেশের নদ-নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত বিস্তৃত, বৈচিত্র্যময় ও জটিল। আমাদের দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের নদ-নদী ব্যবস্থাপনার মিল যেমন রয়েছে, তেমনি অনেক অনেক বিষয়ে স্বতন্ত্রতাও রয়েছে, যা কেবল একজন দেশীয় গবেষক/বিশেষজ্ঞের পক্ষেই জানা সম্ভব। তাই যেকোনো প্রকল্পে কেবল বিদেশী পরমার্শক বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ না দিয়ে এর পাশাপাশি অবশ্যই দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দেশের নদ-নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা আবশ্যক।
ড. মো. মোস্তফা আলী, অধ্যাপক, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বুয়েট, ঢাকা)