দেশের বিভিন্ন খাত সংস্কারে কমিশন গঠন হলেও শিক্ষা সংস্কারে আলাদা কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। শিক্ষার মানোন্নয়নে এমন কমিশনের প্রয়োজনীয়তা ছিল কি?
অন্যান্য খাত যেমন নির্বাচন, স্বাস্থ্য বা প্রশাসন সংস্কারে কমিশন থাকা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষায় কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। ‘হায়ার এডুকেশন রিফর্ম কমিশন’ গঠন করা দরকার ছিল, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে। সমন্বিত পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রম, গবেষণা, শিক্ষাপ্রযুক্তি—এসব বিষয়ের জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিশন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য ছিল।
উচ্চশিক্ষায় সুনির্দিষ্ট কোন সংস্কারগুলো জরুরি বলে আপনি মনে করেন? বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত মানোন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি?
শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী সমন্বিত প্রশিক্ষণ, মাইক্রোক্রেডেনশিয়াল কোর্স চালু করা দরকার। শিক্ষকদের মানোন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণাভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। স্থায়ী প্রফেশনাল মানদণ্ড প্রতিষ্ঠায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কৌশলগত মূল্যায়ন ও নিয়মিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অলাভজনক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সরকারের করছাড়, ভর্তুকি ও নীতিসহায়তা দেয়া প্রয়োজন।
বলা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ব্যয়ও অনেক বেশি, যা সমাজের বৃহৎ শ্রেণীর সামর্থ্যের বাইরে। আবার সরকার এ ‘অলাভজনক’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ট্যাক্স নির্ধারণ করেছে। বিষয়গুলো কীভাবে দেখছেন?
উচ্চশিক্ষা ব্যয় নির্বাহ করা অনেকের জন্য সামর্থ্যের বাইরে। অথচ সরকার এ অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর নির্ধারণ করেছে। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসংগতি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে কর সংগ্রহ করা হচ্ছে, কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তুকি পাচ্ছে। এটি এক ধরনের বৈষম্য। সরকারের উচিত করছাড় ও অনুদানভিত্তিক নীতিনির্ধারণ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ নেই। গত তিন দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে। কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা সফল?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ দ্রুত হলেও দক্ষ জনশক্তি সরবরাহে এখনো বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর। শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। তবে উদ্ভাবনী উদ্যোগ—যেমন ডিআইইউর ল্যাপটপ প্রজেক্ট, ক্যাপস্টোন, স্কিল ডট জবস—শিক্ষার্থীদের রিয়াল-ওয়ার্ল্ড দক্ষতায় রূপান্তর করছে। কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে চাকরির বাজারে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের জন্য সরকারি নীতিসহায়তা, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও শিল্পের সঙ্গে মেলবন্ধন জরুরি।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও সার্বিক উন্নয়নে আপনার কোনো বার্তা বা পরামর্শ থাকলে জানতে চাই।
প্রথম বিষয় হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘শিল্পবান্ধব’, ‘ডিজিটাল-ফার্স্ট’ ও ‘গবেষণামুখী’ করতে হবে। এ খাতে সরকারি নীতিসহায়তা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। করছাড়, অনুদান, গবেষণা তহবিল সহায়তা ও আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন বাড়াতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত; প্রযুক্তিভিত্তিক বৃত্তির ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থায়ী সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। সবার মধ্যে সম্পৃক্ততা ও সমন্বয় এ খাতকে এগিয়ে নেবে। এজন্য একটি জাতীয় উচ্চশিক্ষা নীতিপ্রণয়ন আবশ্যক।